
"চোখে যা দেখেছো, কানে যা শুনেছো, সেগুলো সঠিক নয়, সেসব ভুলে যাও।" - জর্জ অরওয়েল
অনেকদিন ধরে একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। এতদিন নাকি ভারতের পরামর্শে হাসিনা সরকার ও প্রথম আলো মিলে জঙ্গি গল্পগুলো বানিয়েছে। হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার মতো স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনাও নাকি ছিল সাজানো নাটক।
যারা এই জঙ্গি হামলার ঘটনাগুলোকে সাজানো নাটক বলছে, এই চরম মিথ্যা বলার দুঃসাহস তারা কোথায় পেল এবং এটা বলার কারণ কী? উত্তর হল, জঙ্গি গল্পগুলো বানানো এই বয়ান তৈরির মাধ্যমে সহিংস ইসলামপন্থি শক্তিগুলোকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হচ্ছে। এভাবে বাংলাদেশে পাকিস্তানের আদলে জঙ্গিবাদের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
জামাতকে আমরা জানি ধর্মব্যবসায়ী রাজনৈতিক দল হিসেবে। ৭১-এ গণহত্যাকারী, ধর্ষক, লুটেরা, অগ্নিসংযোগকারী। হানাদার বাহিনীর দোসর ও যুদ্ধাপরাধী। জামাতের কৌশলগুলোর মধ্যে ধর্মের নামে নিজেদের ঘৃণ্য মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার ও বাঙালি সংস্কৃতিকে লক্ষ্য করে ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া তাদের প্রধান কাজ। জামাতের রাজনীতি আশরাফ বা অভিজাত ইসলামপন্থি রাজনীতি। ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিতরা তাদের ফুট-সোলজার, কিন্তু উচ্চ পদগুলোতে কোট-প্যান্ট-টাই পড়া পেশাজীবী ইসলামপন্থিদের দখলে।
অপরদিকে আমার দেশের হেফাজতকেন্দ্রিক রাজনীতি শাহবাগ আন্দোলন ও যুদ্ধাপরাধী বিচারের পাল্টা বয়ানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটিও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, তবে এর ন্যারেটিভটি তৈরি হয়েছে ইমান বনাম নাস্তিকতা - এই বিরোধের ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক কৌশলে রূপান্তরের মাধ্যমে। এই মিথ্যা উৎপাদন করে তারা হেফাজত-শাহবাগ মুখোমুখি দাড় করিয়েছিল। আওয়ামী দুঃশাসনের সময়ে হেফাজতের ছোট ছোট অনেক নিরীহ ছেলের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছিল তাদের রাজনীতি। এই বয়ানের সঙ্গে আরও ঘৃণা ও অপপ্রচার মিশিয়ে পিনাকি-ইলিয়াসরা দেশে মবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
রাজাকার-আলবদরের সঙ্গে মাহমুদুর-পিনাকি-ইলিয়াসের অপপ্রচার, ঘৃণা এবং মবসন্ত্রাস যুক্ত হয়ে এমন এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি হয়েছে, যা থেকে জঙ্গিগোষ্ঠিগুলোকে আলাদা রাখাটা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। জামাত এবং হেফাজতের শক্তিকে আওয়ামী লীগ যে কোনো সময় প্রতিহত করতে পারে, এই ভয়টা জামাতের ছিল। জামাত জানে তারা মানুষের কাছে জনপ্রিয় নয়, বরং মানুষ তাদের ঘৃনা করে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই জঙ্গিগোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা করা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না।
তাই একক দল হিসেবে না পারলেও ছাতাসংগঠন হিসেবে জামাতের শক্তিবৃদ্ধি করার কৌশল নিতে হয়। এতদিন ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে শিবির গোপনে সংগঠিত হয়েছে। জুলাই-পরবর্তী সময়ে সাদেক কাইয়ুম, সার্জিস আলমসহ একাধিক ব্যক্তি নিজেরাই স্বীকার করেছেন, কীভাবে তারা পরিচয় গোপন রেখে ভিন্ন ব্যানারে সক্রিয় ছিলেন।
প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে ছিল সহিংস ইসলামপন্থি অন্য শক্তিগুলোকে নিজের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তার জন্য আদর্শিক জমিন তৈরি। এই প্রক্রিয়ায় হেফাজতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এরপর সবচেয়ে ভয়ংকর ধাপ। এধাপে চরমপন্থী ও সশস্ত্র জঙ্গিদের যুক্ত করে ভয় ও সন্ত্রাসের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৫ আগস্টের পরে সক্রিয় জঙ্গিদের বড় একটি অংশ জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের একজন হারুন ইজহার, যিনি প্রকাশ্যেই সহিংস ইসলামপন্থি রাজনীতিতে যুক্ত। তার মাধ্যমে আল-কায়েদা ও টিটিপির নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে সক্রিয় হয়। এভাবে পাকিস্তান ও পরাশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছে সশস্ত্র জঙ্গি কাঠামোর উগ্র ইসলামপন্থি রাজনীতি। তাদের ভেতরে আল-কায়েদা শাখাও সক্রিয়।
এ প্রসংগে জামাতের আমির ডাঃ তাহেরের কথা প্রণিধানযোগ্য। তিনি দাবি করেছেন, ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে ভারতের কাছে পরাজয়ের বদলা নিতে তারা গাজওয়াতুল হিন্দ এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার বক্তব্য অনুসারে, ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৫০ লাখ জঙ্গি অংশ নেবে, যারা গেরিলা যুদ্ধ করবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিদের অন্তর্ভুক্তি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর জন্যও প্রয়োজন। পরাশক্তির "ওয়ার অন টেরর" কৌশল টিকিয়ে রাখতে হলে "জঙ্গি মুসলিম, সহিংস ইসলাম এবং ব্যর্থ রাষ্ট্র" এই ছবিগুলো দরকার। ফলে একদিকে স্থানীয়ভাবে জঙ্গিদের ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হবে, অন্যদিকে সেই সহিংসতা সাম্রাজ্যবাদীদের ইসলামবিরোধী যুদ্ধবয়ানকে বৈধতা দেবে। ভয়, সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতা দুই পক্ষেরই প্রয়োজন।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১২:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




