somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সংসদে যা ঘটেছে সেটা কি অপ্রত্যাশিত ছিল ?

১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দুই দিন আগে কুমিল্লার পরিচিত এক মুদি দোকানে সদাই কিনতে গিয়েছিলাম; সেখান থেকে প্রায়ই বাজার করি। হিসাব মেলাচ্ছিলাম, হঠাৎ তিনি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন—"আগামীকাল তো সংসদ! হাসনাত আবদুল্লাহ আছে এবার, একটা বিরাট ফাটাফাটি হবে!" উনার চোখে-মুখে উত্তেজনার ছাপ । হাতে আমার বাজারের থলি, মাথায় সংসারের হিসাব, কিন্তু মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। ভদ্রলোকের উৎসাহ দেখে মনে হলো তিনি সংসদকে একটা ক্রিকেট মাঠ ভাবছেন, যেখানে হাসনাত হয়তো বিশেষ কোনো ডেলিভারিতে ছক্কা মারবেন আর গ্যালারি ফেটে পড়বে।

কিন্তু সংসদ তো ফাটাফাটি করার জায়গা না; এটা নীতিনির্ধারণের জায়গা, আইন বানানোর জায়গা, বাজেটের হিসাব চাওয়ার জায়গা। ফাটাফাটি দেখতে ভালো লাগে বটে, কিন্তু সেটা দিয়ে মানুষের চাকরি হয় না, রাস্তা ঠিক হয় না কিংবা হাসপাতালে ওষুধ আসে না। যাই হোক, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিন নিয়ে যা হইচই হচ্ছে, সেটা দেখে একটাই প্রশ্ন মাথায় আসছে—এত অবাক হওয়ার কী আছে?

মার্চ মাসে সংসদ শুরু হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের মাসে। স্পিকার একজন বীর বিক্রম মুক্তিযোদ্ধা। অথচ সেই সংসদেই প্রয়াত জামায়াত ও বিএনপির কতিপয় নেতা যারা শেখ হাসিনার আমলে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত তাদের নামে শোকপ্রস্তাব উঠেছে। অনেকে টেবিল চাপড়াচ্ছেন: "মার্চ মাসে এটা কীভাবে হলো!" কিন্তু একটু থামলে প্রশ্নটা উল্টো দিক থেকেও করা যায়—কেন হবে না? ইতিহাস বলে বিএনপি সবসময় জামায়াত কে সাথে নিয়েই পথ চলেছে । যেটুকু বিরোধীতা বিএনপি দেখিয়েছে সেটা ভোটের রাজনীতিতে দেখাতে হয় ।

১৯৯১ সালে তাদের সমর্থন নিয়েই বিএনপি সরকার গঠন করে। ২০০১ সালে নিজামী-মুজাহিদ গং বিএনপির জোটেই মন্ত্রী হয়েছিলেন। এই ইতিহাস তো পুরনো। তাই চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি যখন নিজেই উদ্যোগী হয়ে ওই নামগুলো শোকপ্রস্তাবে যোগ করলেন, সেটা তো বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রের বাইরের কিছু ছিল না।এখানে অবাক হওয়াটাই বরং অবাক করার মতো বিষয়।

একই কথা খাটে জামায়াতের ক্ষেত্রেও। জাতীয় সংগীতের সময় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়ায়নি দেখে অনেকে ক্ষুব্ধ। কিন্তু এটাও কি নতুন কিছু? গোলাম আযমের ছেলে আমান আযমী তো জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের প্রস্তাবই দিয়েছিলেন। জামায়াত বরাবরই রবীন্দ্রনাথকে ভিন্ন নজরে দেখে। এবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে তারা শহীদ মিনারে গেছে রাষ্ট্রীয় আচার পালনের দায়বদ্ধতা থেকে, হৃদয়ের টান থেকে নয়। সংসদেও তারা যা করেছে, সেটা তাদের দীর্ঘদিনের মতাদর্শেরই প্রকাশ।

আবার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে নিয়ে জামায়াত ও এনসিপি সদস্যরা ফ্যাসিস্টের দোসর বলে ওয়াকআউট করলেন। অথচ এরাই তো তার কাছে শপথ নিয়ে উপদেষ্টা হয়েছিলেন। নাহিদ ইসলাম কিংবা আসিফ মাহমুদদের কাছে তখন কি রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য ছিলেন? সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নিজেও এক বিচিত্র চরিত্র। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার প্রতিবাদ করে জেল খাটা মানুষটি আওয়ামী লীগ আমলে সব বড় বড় পদ পেলেন, শেষে রাষ্ট্রপতিও হলেন। আর এখন সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন বলছেন, তারেক রহমানের প্রশংসা করছেন। এটা কোনো ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং বাংলাদেশের সরকারি আমলাতান্ত্রিক শ্রেণির একটি চেনা বৈশিষ্ট্য-যে যখন ক্ষমতায়, তার হয়ে কথা বলো। এই ধারা এখানে দশকের পর দশক ধরে চলছে।

এখন অনেকে টুপি-দাড়িওয়ালা সদস্যদের আধিক্য দেখে সংসদকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনা করছেন। পোশাক দেখে বিচার করাটা আসলে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে না । কিন্তু অতীতে সুট-টাই পরা অনেক সংসদ সদস্যও তো সংসদকে অপবিত্র করেছেন, লুটপাট করেছেন, কোনোদিন বিল পড়ে দেখেননি। তাই পোশাক দিয়ে কার্যকারিতা মাপা যায় না। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত এই ৬৮টি আসন পাওয়া জামায়াত কিংবা নতুন মুখের এনসিপি আগামী পাঁচ বছরে কী করে ? তারা কি শিক্ষার বাজেট নিয়ে কথা বলবে? স্বাস্থ্যসেবার দুর্দশা বা খেলাপি ঋণ নিয়ে সরকারকে জবাবদিহি করাবে? নাকি পাঁচ বছর কেবল জ্বালাময়ী বক্তৃতা আর ওয়াকআউটেই পার করে দেবে ?

রংপুর, যশোর কিংবা সাতক্ষীরার মানুষ জামায়াতকে উজাড় করে ভোট দিয়েছেন স্থানীয় সমস্যার সমাধান আর দুর্নীতিমুক্ত প্রতিনিধির আশায়। সেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কথা বলা জরুরি, কিন্তু সেই কথা যদি কেবল রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় তবে তার মূল্য কতটুকু?

গতকালের সংসদ দেখে একটুও অবাক হইনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে সুবিধাই বড় এবং ইতিহাসের চেয়ে বর্তমান ক্ষমতা বড়—এই সত্যটা ধ্রুব। প্রথম দিন যা দেখলাম, তা আগামী পাঁচ বছরের ট্রেলার মাত্র। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা: আসলেই কি কোনো কাজ হবে, নাকি কেবল 'ফাটাফাটি'র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে সব?
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৮
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তেল রাশিয়ার, টাকা আমাদের, কিন্তু অনুমতি লাগবে আমেরিকার

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৫৫


গত ১১ মার্চ শেরে বাংলানগরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসেনের বৈঠকটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ সামনে এনেছে। বৈঠকের পর যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্টালিন পুত্র ইয়াকভঃ নিজের ইচ্ছামত টাট্টিখানা ব্যবহারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে শহীদ হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক মহান যোদ্ধা

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ১২ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:০৯



খবরটা ১৯৮০ সালে সানডে টাইমসে প্রকাশিত হবার আগে স্টালিনের পুত্র ইয়াকভের মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। জার্মান অফিসারদের হাতে আটক হবার পর তাকে কিছু ব্রিটিশ আর্মি স্টাফের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহর সুন্নাতের সাথে মতভেদ পরিত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ না হলে মুসলিম জাতি আল্লাহর সাহায্য পাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ২:৪৭



সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ৪৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৪৩। পৃথিবীতে অহংকার প্রকাশ এবং কূট ষড়যন্ত্রের কারণে (অকল্যাণ)।কূট ষড়যন্ত্র এর আহলকে(এর সাথে সংযুক্ত সকল ব্যক্তি) পরিবেষ্ঠন করে। তবে কি এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি যদি আরও ২০ বছর পিছিয়ে যেতে পারতেন তাহলে আপনি কী এমন কাজ করতেন?

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:৩৭



দশ বা বিশ বছর পিছিয়ে যেতে পারলে দেশটাকেই হয়তো বদলে দিতে পারতাম!
নিদেরপক্ষে সংসদে রাজাকারদের প্রবেশ করতে দিতাম না। ওদের রাজনীতি করতে দিতাম না। যারা বাংলাদেশ চাহেনি, তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার কালপুরুষ ভাইয়া

লিখেছেন অপ্‌সরা, ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:০০


আমার কালপুরুষ ভাইয়া। গত ৭ই মার্চ যিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। খবরটা আমি জানার পর থেকেই মনটা খারাপ হয়ে আছে। ভাইয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×