
গোরা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ নিজে ব্রাহ্ম হয়েও, ব্রাহ্ম সমাজের আদর্শের বিপরীতে "গোরা" নামে একটি চরিত্র তৈরি করেন। গোরা খুব কট্টরপন্থী হিন্দু যুবক। হিন্দু পরিচয়ে বড় হলেও, আসলে সে আইরিশ পিতা-মাতার সন্তান, কিন্তু এটা তার জানা নেই। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিতে ব্রিটিশ বিরোধিতা ও স্বদেশ প্রেমের ধারনাগুলো তুলে ধরতেই রবীন্দ্রনাথ গোরাকে গোঁড়া হিন্দুর ভূমিকায় দাঁড় করান। তবে গোরার গোঁড়ামি ও গল্পের শেষে গোঁড়ামি মোচনের পেছনে ছিল রবীন্দ্রনাথের অসামান্য যুক্তিবোধ।
যদিও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং ইসলামপন্থীদের গোঁড়ামি অবসানের আশা নেই, তবু তাদের ভারত বিরোধিতা ও স্বদেশ প্রেমের যুক্তি যাচাই করা প্রয়োজন। মুশকিল হলো, ইসলামপন্থীদের মধ্যে যুক্তিবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার ঘাটতি স্পষ্ট। জামাতের পাকিস্তানপন্থী মতাদর্শ এতটাই দুর্বল ও আত্মবিরোধী যে, তা গঠনমূলক আলোচনার মানদণ্ডেই পরে না। মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তারা সলিমুল্লাহ খান বা বদরুদ্দিন উমরের নামে ভুয়া উদ্ধৃতি দেয়; বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে জহির রায়হানের নাম জড়িয়ে কল্পিত গল্প তৈরি করে; আর ভারত বিরোধিতার নাম করে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও ধোঁয়াশা ছড়ায়। যে বিষয়গুলো ভারতীয় আধিপত্যের উদাহরণ হিসেবে আলোচনার কথা, যেমন, পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্তে মাদক ব্যবসা এবং অসম বাণিজ্য চুক্তি ইত্যাদি, সেসবে তাদের আগ্রহ নেই। ভারতকে অশুভ এক শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে "গাজওয়াতুল হিন্দ" নামে আজগুবি গল্প বানিয়ে ধর্মান্ধ মানুষকে উত্তেজিত করাই তাদের উদ্দেশ্য।
এ প্রসঙ্গে জামাতের আমির ডা. তাহেরের অক্টোবর মাসে নিউ ইয়র্কে প্রদত্ত ভাষণের কথা মনে করুন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের কাছে পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসেবে তারা গাজওয়াতুল হিন্দ-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর দাবি, ভারতের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে অন্তত ৫০ লাখ যুবক অংশ নেবে, যারা গেরিলা কৌশলে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। তার এই ধরনের বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় ভারতীয় আধিপত্য ঠেকাতে পাকিস্তান নামক একজন ত্রাণকর্তার দরকার পড়ে।
ইসলামপন্থীদের কেউ কেউ, কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক হেফাজতের উত্থানকে সাব-অল্টার্ন বা ক্ষমতাহীনের জাগরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের যুক্তি হলো প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী ও ছায়ানটের ওপর হামলা দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করা সেকুলার এলিটদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, যেটা বিস্ফোরিত হয়েছে। তাদের মতে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার আওয়ামী লীগের সময়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে সমর্থন ও বৈধতা দিয়েছিল। শাপলা চত্বরের মতো রাষ্ট্রীয় হত্যার ঘটনায় তারা নীরব ছিল।
এখানে হেফাজতকে সাব-অল্টার্ন বা ক্ষমতাহীন মানুষের রাজনীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই তত্ত্বের প্রবক্তা বোধহয় ফরহাদ মজহার। তিনি বিভিন্নভাবে হেফাজতের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। হেফাজতের উত্থানের সময় তাদের ১৩ দফার কোন কোনটি তার লেখা, এমনটা শোনা যায়। সাব-অল্টার্ন বলতে বোঝানো হয় সেই প্রান্তিক মানুষদের যারা খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠী। যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই এবং যাদের কোন কথা বা দাবী দাওয়া রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায় না।
বাংলাদেশে ক্ষমতাহীন কারা? দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, কৃষক নাকি মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা? যাকাত বা দানের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্কের অংশ যারা, তারা ক্ষমতাহীন নাকি তাদের চেয়েও নীচে যে প্রান্তিক শ্রেণি, তারা? হেফাজতের কর্মীরা কি দিনমজুর বা শ্রমিকের চেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী নয়? আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষেরা হয়তো ক্ষমতাহীন ঠিকই, কিন্তু যখনই তারা রাজনীতির অংশ হয়ে যায়, তখন আর তারা ক্ষমতাহীন মানুষের দলে থাকে না। শাহবাগ অন্দোলনের মুখোমুখি তাদের দাঁড় করানো কি এলিট বনাম প্রান্তিক মানুষের সম্পদ ও ক্ষমতা বণ্টনের লড়াই, নাকি মিথ্যা তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে শাহবাগকে নাস্তিকদের আন্দোলন বানিয়ে সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠীর আস্তিক-নাস্তিকের বানানো দ্বন্দ?
শাপলা চত্বরের ঘটনা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের অপরাধ। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে ব্যবহার করে জঙ্গি সহিংসতাকে নাটক বলা একটা কদর্য রাজনৈতিক কৌশল। কোন একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধের বিচার না হওয়া মানে, পরবর্তীতে তৈরি হওয়া কোন সহিংসতা বৈধ হয়ে যাওয়া নয়।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে জঙ্গি দমন নাটকের অংশ হিসেবে দেখানো ইসলামপন্থী শক্তিগুলোকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য করে তোলার কৌশল। এটা সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানো যে, এ ধরনের রিপোর্ট করলে পুড়িয়ে মারা হতে পারে। জঙ্গি ঘটনাগুলো আছে বলেই মিডিয়া খবর প্রচার করে। এখন মিডিয়াকে জঙ্গি ঘটনার কারণ বানানো মানে কারণ ও ফলাফল উল্টে দেওয়া। গত কয়েক বছরে পিনাকী গং ইসলামপন্থিদের বুঝিয়েছে যে, ছায়ানট ও উদীচী হলো আওয়ামী সেকুলারিজম-এর প্রতীক। রবীন্দ্রসংগীত, পহেলা বৈশাখ পালন - এই সবকিছুই অপরাধ।
সহিংস ইসলামপন্থার সমালোচনাকে ইসলামবিদ্বেষ বা ওয়ার অন টেররের দোসর বলে চিহ্নিত করাও কারণ ও ফলাফলকে উল্টে দেওয়াই হলো। ওয়ার অন টেররের নামে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বোমাবর্ষণ ও সামরিক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের দ্বারা পরিচালিত, এবং তারা সারা বিশ্বেই নৃশংসতা, আগ্রাসন ও দমনমূলক হস্তক্ষেপ চালিয়েছে। তাই বলে, মার্কিনি আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে জঙ্গিবাদ এবং সহিংসতাকে সমর্থন করা বা অস্বীকার করা যায় না। এই সমালোচনাকে ইসলামবিদ্বেষ বলার অর্থ ধর্মকে ঢাল বানিয়ে সহিংস রাজনীতিকে রক্ষা করা। যেটা উগ্রপন্থীরা করতে গিয়ে, সাধারন ধর্মপরায়ন মুসলিমদের দেশে এবং বিদেশে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১১:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




