somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মধ্যরাতের যাত্রী

০৬ ই মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ সুমনার কাজ একটু দেরী করেই শেষ হয়েছে। নার্সিং হোমের এই কাজে আছে প্রায় এক দশক ধরে। কাজ শেষ করতে প্রতিদিনই বেশ রাত হয়ে যায়। বৃদ্ধ রোগীদের দেখাশোনা করে তাদের সারাদিনের আর্জি আব্দার মিটিয়ে বাড়ি ফেরার যখন সময় হয়,তখন শুরু হয় আরেকটি নাটকের অধ্যায়। হোমের সকল বোর্ডারদের ভারাক্রান্ত মুখ। সুমনা চলে যাবে? কেউ তাকে ছাড়তে চায় না।ও এলে নার্সিং হোমে যেন প্রাণ আসে। আর চলে যাওয়ার সময়টা এলেই সবার মুখ কালো। তারপরও সুমনাকে তো বাড়ি ফিরতেই হবে। সেই সকাল থেকে শুরু করে রাত অব্দি কাজ। ওর খুব ভাল লাগে। তাই প্রাণ দিয়ে নিবেদিত সুমনা আরেকটু দেরী সয়ে নিতে পারে প্রয়োজনে।

কিন্তু আজকের বিকেলটা যেন অন্যরকম। কাজ শেষ করতে ওর কেন জানি মন চাইছে না। আর একটু যদি বেশী কাজ আজ থাকতো ভাবতে ভাবতেই হোমের সবচেয়ে বর্ষীয়ান মহিলা হঠাতই যেন অসুস্থ বোধ করা শুরু করলেন। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে গিয়ে সুমনার আজ বেশ দেরী হয়ে গেল। যেমন সে চাইছিলো। কিন্তু মধ্যরাত পেরুলেই বাড়ি ফেরার বাস সিডিউলের একটু পরিবর্তন হয়ে যায়। তখন বাসগুলো আসে বেশ দেরীতে। আর শীতের রাতে মাঝরাতও বেশ গভীর রাত মনে হয়। নিস্তব্ধ চারিদিকের মাঝে বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য প্রতীক্ষা এক অন্যরকম অনুভূতি। গ্রীষ্মকালে এরকমটা একেবারেই না।
গভীর রাতে তাই নার্সিং হোমের উল্টোদিকের রাস্তায় বাসের জন্য অপেক্ষারত সুমনা চেয়ে থাকে প্রিয় কর্মক্ষেত্রের আলোয় ঘেরা চত্বরের দিকে। রাস্তার এদিকে আলো না থাকলেও নার্সিং হোমের আলোটুকুর আলতো স্পর্শ বাস স্টপেজকে আলোকিত করে রাখে কিছুটা হলেও।
আধো আলো আধো অন্ধকারের মাঝে এ অপেক্ষাও তার ভাল লাগে। তবে ধৈর্য্য পেরুবার আগেই বাস চলে আসে। দু’এক জন যাত্রী এ স্টপেজে এসে মাঝে মাঝে দাঁড়ায়। কিন্তু এ মধ্যরাতে কেউ নেই আজ। সুমনা একাই অপেক্ষারত বাসের পথ বরাবর চেয়ে। এলাকাটা রেসিডেন্সিয়াল বলে এখানে যাত্রী চলাচল কম। তারপরও সুমনা খেয়াল করলো দূর থেকে কে যেন হেঁটে আসছে স্টপেজের দিকে। ধবধবে সাদা শার্ট পরিহিত ভদ্রলোকটির হাত দুটো পকেটে ভরা। শান্ত, ধীর পদক্ষেপ বেশ স্পষ্ট প্রতীয়মান। বাস ধরার তাড়া যেন খুব একটা নেই তার অথচ গন্তব্য মনে হচ্ছে এই স্টপেজ। আরেকটু কাছে যখন তিনি এলেন তার ব্যক্তিত্ব ও হাঁটার ভংগীমা দেখে সুমনার কেন জানি মনে হলো সে তাকে চিনে! এবং সত্যিই তাই। সুমনা চিনে ফেলেছে। এ তো তিনিই,তার খুব প্রিয় সেই মানুষটি যাকে দেখেই ভাল লাগতো সেই বহু আগের দিনগুলোতে। কিন্তু তিনি তো এ শহরে থাকেন না,আজ এলেনই বা কি জেনে,যে সুমনা এই স্টপেজে থেকে বাসে উঠবে? আর আজকের দিনটিও তো অন্যরকম। তার গতানুগতিক দিনের মত ঠিক রাত ১০ টায় তো কাজ শেষ হয়নি!
উনি এবার স্টপেজে এসে পৌঁছেছেন। মনে হচ্ছে যেন সুমনার কথা জেনেই তিনি এখানে এসেছেন। সুমনার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাকে দেখছেন। খুব সলজ্জ এক অস্বস্তিতে পড়ে গেল ও। এত কাছে তিনি দাঁড়িয়েছেন। দেখছেন খুব সরাসরি। এই মধ্যরাতের বাস প্রায়ই খালি আসে আর পাশের শহরে সুমনাকে পৌঁছে দেয়া অব্দি তেমন কোন স্টপেজও নেই যে নতুন যাত্রীর আগমন ঘটে। কিন্তু আজ সুমনা একা নয় উনিও যাবেন এই বাসে। সুমনার সংগী হয়ে। কিন্তু একে কি সঙ্গী বলা চলে? জীবনের পথচলায় যাকে কখনো পাশে পায়নি,আজ একঘন্টার বাস ট্রিপে তিনি পাশে উপবিষ্ট থাকলেই কি সঙ্গী হয়ে যেতে পারেন? কল্পনায় পেয়ে নিয়েছে তাকে বহুবার কিন্তু বাস্তবে আজ তার এই হঠাত উপস্থিতি তাকে বিস্মিত করে চলছে নিরন্তর। তার প্রচন্ড ভাল লাগার ধাক্কা যেন বিস্ময়েও সমাপ্তি টানতে পারছে না। নিস্তব্ধ,একাগ্র,তীক্ষ্ণ, প্রক্ষিপ্ত দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে উনি আজ তারই জন্য এসেছেন। তার সাথে যাবেন।কিন্তু তার স্টপেজেই কি নামবেন? যদি তাই হয় সুমনা কি তাকে বলতে পারবে তার বাড়িতে আসবার জন্য। তা কি করে হয়? এত চেনা হওয়া সত্ত্বেও কখনো তো কথা হয়নি ওনার সাথে। কি সব এলোমেলো চিন্তা মনে আসছে। আজ সবকিছু সত্যিই ব্যতিক্রম।

বাস আসবার পথের দিকটায় দাঁড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু এবার বুঝি অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। ওনার পেছনে ঝলসানো হেডলাইটের আলো চোখে পড়ছে সুমনার। একটা বাঁক ঘুরে এপথে মোড় নিয়েছে বাসটি। এগিয়ে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছে তাদের সামনে। এখান থেকে শুরু করে সামনের দিকে এগুলে এ শহর শেষ হয়ে শুরু হয় ঘন বনে ঘেরা সরু রাস্তা, বহুদূর পর্যন্ত যেটি বিস্তৃত হয়ে শেষ হয় পাশের শহরে এসে। এই নির্জন পথটুকু চলতে খুব ভাল লাগে সুমনার। গতি তার পছন্দ কিন্তু তার সাথে যদি থাকে নির্জনতা তা তার একাকীত্বের সাথে যেন বেশী করে মানিয়ে নেয়। কিন্তু আজ যে সে একা নয়। ঠিক মুখোমুখি বসেছেন উনি। সুমনার মুখোমুখি। সুমনাকে দেখছেন বিভোর হয়ে। কিন্তু কি-ই বা আছে দেখার? ফেলে আসার পেছনের সেই সময়গুলোর সুমনা আর আজকের সুমনা অনেকটাই যে অন্যরকম। কাজ ছাড়া যার আর কাজ নেই জীবনে,ভাললাগা যার কল্পনা, ভালবাসা যার স্বপ্ন,প্রেমহীন,সংগীবিহীন জীবনে মনের মানুষের উপস্থিতি যেখানে অলীক,সেখানে সুমনার একাকী বসবাস,তার কেটে যাওয়া প্রতিটি নিঃসঙ্গ দিনের নিস্তরঙ্গ মুহূর্তের হিসেব যেন পাই পাই করে নিচ্ছেন তিনি। দেখছেন অপলক। তীক্ষ্ণ,প্রখর সেই চিরচেনা দৃষ্টি। বাসে ওরা আজ দুজন যাত্রী।
ও খুব অস্বস্তিতে পড়েছে। বার বার দেখছে ড্রাইভারের সামনের বিশাল কাঁচের জানালা ভেদ করে ছুটে চলা সরু রাস্তা। বার বার চোখ পড়ে যাচ্ছে ওনার দিকে। চারপাশে জনবসতি নেই বলে রাস্তার আলোও নেই। বাসের হেড লাইটের ক্ষীণ আলোয় রাস্তাটি যতটুকু আলোকিত হয়,তারই সাথে পাশের গাঢ় অন্ধকারের মিশেল পুরো পথকে করে তুলেছে রহস্যময়। বাড়ি ফেরার সময়ের এই ভ্রমণ খুব ভাল লাগে সুমনার। তাই এত দূরে কাজ নিতে আসাও তার একটি কারণ। ফিরতি পথে দু চারজন যাত্রী সবসময় থাকলেও আজই ব্যতিক্রম। আসলে আজ সব কিছুই বেশ আকস্মিক ও অস্বাভাবিক। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির দিকে চোখ পড়লো সুমনার। ড্রাইভার নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাচ্ছেন তার বাস, সামনের পথটুকু পিছনে পড়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাস দ্রুত গতিতে। অথচ এতক্ষণ পরেও রাস্তা যেন আজ শেষ হতে চাইছে না। সময় দেখতে গিয়ে বেশ অবাক হলো ও এবার। বাসটি সেই ১২ টায় স্টপেজে এসে দাঁড়িয়েছিল আর এখনো সেই সময়ই দেখাচ্ছে?
সময় কি তাহলে থেমে আছে? সুমনার অবাক হওয়া দেখে এবার উনি মৃদু হেসে ফেললেন,যেন ঠিক ঠিক বুঝতে পারছেন সুমনার ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা।সুমনার খুব রাগ হচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছে না। এভাবে বহুবার সময় দেখতো সে ওনার আসবার অপেক্ষায় থেকে। আজ তিনি তো সত্যিই এসেছেন,আর তাই কি সময় দেখার প্রয়োজন যে ফুরিয়ে এসেছে তা জানিয়ে দিতে চাইছে সময় তার নিজ থেকে? এত দীর্ঘভ্রমণের পরও আজ পথ কেন জানি শেষ হতে চাইছে না। ড্রাইভারও বেশ নিশ্চিন্ত মনে স্টিয়ারিং ধরে আছেন, যেন তিনিও ভেবে নিয়েছেন আজকের এযাত্রা শেষ হবার নয়। রাস্তার উল্টোদিক থেকে আজ একটি গাড়িও এ পথ অতিক্রম করেনি। এ পথে বুঝি আজ তারা দুজনাই শুধু যাত্রী,অসীম,অনন্ত সময় ধরে।


পরদিন সকাল দশটা পেরিয়ে একঘন্টা অতিক্রান্ত। নার্সিং হোমের সদস্যরা আবারো একটি নতুন দিনের আশায় তাদের সকাল শুরু করেছেন। প্রতিদিন চোখ মেলেই যাদের প্রথম ভাবনা হয়,আমি বেঁচে আছি,তাদের জন্য একটি সকাল আসা যেন একটি আশীর্বাদের মতো। অপেক্ষাও করছেন সুমনার আগমনের। এত দেরী সে কখনোই করে না। কাল অনেক রাত অব্দি কাজ করেছিল বলেই হয়তোবা আজ হতে পারে এই দেরী।
লিভিং রুমে এসে বসেছে সকলে প্রতিদিনের মতো। একটু হালকা নাস্তার পর চা খেতে খেতে খবরকাগজ পড়া, টুকটাক গল্প করা। তেমন কোন খবর থাকলে তা নিয়ে আলাপ করা। যদিও আজ তেমন কোন খবর নেই, শুধু শেষের পাতার ডান দিকের কলাম একটি খবর ছাপিয়েছে একটু বিস্ময়কর। নার্সিং হোম থেকে দশ কিলোমিটার দূরে গতকাল রাতে একটি বাস পথচ্যুত হয়ে পাশের গভীর খাদে পড়ে যায় কোন কারণ ছাড়াই। বাসের ড্রাইভারের সাথে কন্ট্রোল রুমের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারালো তা এখনো কারো বোধগম্য নয়। বাসে ড্রাইভার ছাড়া দুজনের বেশী যাত্রী না থাকলেও অগ্নি নির্বাপক কর্মীরা জানিয়েছে, যাত্রী যে দুজন মৃত্যুবরণ করেছে তাদের দেহ কোন ভাবেই সনাক্ত করবার উপায় নেই।
.।.।.।.।.।.
চির অচেনা
এখনি সময়
নিঃসঙ্গ যাত্রী
একটু দেরী -১

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৯:০৮
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অমর একুশে বই মেলা: প্রযুক্তির যুগে ছাপার বই: প্রয়োজন, না কি স্মৃতির অবশেষ: নাকি সমন্বয়ের ভবিষ্যৎ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:৫০


মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডার দীর্ঘকাল ধরে বহন করে এনেছে মুদ্রিত বই। কাগজে ছাপা অক্ষরের বই একসময় ছিল জ্ঞানের প্রধান বাহন, সংস্কৃতির ধারক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অপরিহার্য মাধ্যম। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৫ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:২৫



জল পড়ে পাতা নড়ে- বলেছেন কবি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈশব বেলায়,
বালক মতিত্বে তাঁর কাব্যের ভেলায়
প্রাথমিক আরোহন কি চমৎকার!
যে হয় সে হয় মূর্ত সাফল্যের ছবি
শুরু থেকে। তার যাত্রা জীবন মেলায়
রাজকিয় হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি সরকার মেয়াদ পূর্ন করতে পারবে কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:০৩



এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়।
বিএনপির অতীত ইতিহাস মোটেও ভালো না। এরা যখন ক্ষমতায় ছিলো তখন শুধু দূর্নীতি করেছে। দেশের উন্নয়ন হয়নি। গত ১৭ বছর আওয়ামিলীগ বিএনপিকে কোনঠাসা করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Narrative warfare এর যুগে আপনাকে স্বাগতম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩২


২০২৫ সালের মে মাসে যখন ভারত পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল, তখন দিল্লির একটি প্রেস কনফারেন্স রুমে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুজন নারী সামরিক কর্মকর্তা। একজন হিন্দু, একজন মুসলিম। ক্যামেরার সামনে তারা কাঁধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুদ্ধে কেউ হারে না

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ০৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩০


বেশ কয়েক বছর দেশে যাই না, এবার ভাবছিলাম দেশে গিয়ে ঘুরে আসব! সামারে আমাদের ছুটি থাকে লম্বা তিন মাস, কোন ক্লাস নেই। আমেরিকায় একাডেমিক লাইনে এটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×