হাতের বালা দুটো খুলে টেবিলে রাখলো আলেয়া। তারপর কপালের চুলগুলো আলতো ভাবে সরিয়ে নিজের মুখটাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো। বহুদিন পরে আয়নার সামনে দেখে কেমন যেন অচেনা লাগছে নিজেকে। মুখে বলি রেখা পড়েছে। চোখের নিচে কালি। এই চেহারা তার খুব চেনা নয়। কিন্তু তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ,গত চল্লিশ বছরের সংগী। নিজেকে নিয়ে কখনোই আগ্রহী নয় আলেয়া। অথচ আজ এতদিন পর বড্ড প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে তার নিজেকে। কে সে?
কেন সে এখানে?
কিসের জন্য?
স্মৃতিগুলো তার পুরনো হলেও ঝাপসা নয়। খুব ভাল মনে আছে সেই দিনগুলোর কথা যখন অনেক স্বপ্নের জালে জড়ানো জীবনটা হাসি আনন্দে কেটে যেত।
আর আজ?
আজ তো তার সময়গুলো এগুতে চায়না। থেমে থাকে খুব ধীর ভাবে। একঘেয়ে মনে হয় সবকিছু। এই ক’টি বছরে এত পরিবর্তন। সময় তো বেশী চলে যায়নি। আঙুল গুনে হিসাব করলো- পনের বছর। পনেরটি বছর মাত্র কেটেছে এক উদ্দেশ্যহীন ঘোরের মাঝে। এর আগের সময়টা ছিল বেশ ছকে বাঁধা হিসেবী কায়দায় গড়া। তারপর হঠাত করেই সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে সময়ের স্রোতে শুরু এই উদ্দেশ্যহীন যাত্রা। এখনো তো সে চলছে। সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের গভীর সমুদ্রে। এরপর বলি রেখাগুলো আরো স্পষ্ট হবে। চিরচেনা চেহারাটা আরো অচেনা হবে। আশপাশের অস্তিত্ব আরো দূরের ঠেকবে। ভাবনায় আচ্ছন্ন আলেয়া ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে নিজেকে। ভাবনাগুলো যেন ঘূর্ণি আকারে ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে সামনের আয়নাটার ভেতরে। ও যাবে কিনা ভেবে পাচ্ছে না। আয়নার ভেতরের ওই জগতটাতো তার অজানা। ওখানে প্রবেশের জন্য মন সাঁয় দিচ্ছে না যে। দ্বিধা কাজ করছে। অথচ ঘূর্ণিবলয়ে ও যেন মিশে যাচ্ছে নিজেরই অজান্তে। নিজের ভার যেন এক নিমেষে হালকা হয়ে চূর্ণ করে তাকে একাকার করে ফেলেছে। প্রচন্ড গতি এসে গেছে ওর মাঝে। ছুটে যাচ্ছে সামনে। অনেক আলোর হাতছানি। দূরে দেখতে পাচ্ছে অনন্ত মহাশূন্য। আলোর কণাগুলো ওকে ঘিরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঐ অসীমের দিকে,মহাজগতের সীমানা বরাবর শেষ প্রান্তে।
চারিদিকে আলোর খেলা আর ঐ দূরের অন্ধকারে অসংখ্য তারার মেলা। এই আকাশ তার খুব চেনা। রাতের অন্ধকারে নির্মল মেঘমুক্ত শরতের আকাশ যেন। কিন্তু অসীমের পানে ধেয়ে চলার এই বিশালতার ভার এবার তৈরী করেছে অন্য এক অনুভবের, নতুন এক বোধের। আলেয়া ঠিকই বুঝতে পারছে ওর চিরচেনা বেডরুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে ও আর নেই। ওর ঘরে আর ঘরের মাঝের খাটের পাশের চেয়ারটিতে ও আর বসে নেই। এবার পিছনে ফিরে তাকালো আলেয়া। ঘনকালো আঁধারে অসংখ্য তারার ঝিকিমিকি । আর তারপর ধোঁয়াটে আবরণ। ও কি তার চিরচেনা পৃথিবীর সৌর বলয় অতিক্রম করে ছায়াপথের সীমানায় চলে এসেছে?
পৃথিবীকে স্পষ্ট আর দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু এই কয়েক সেকেন্ডে এতটা পথ পেরিয়ে এলো কিভাবে?
যত এগুচ্ছে তত যেন তার চারিদিকের ঘূর্ণি বলয়ে মিশে যাচ্ছে আরো বেশী করে। নিজেকে আবারো খুব হালকা মনে হচ্ছে। স্মৃতির ওপাড়ে আয়নার সামনে বসে অতীত রোমন্থনের বিষয়গুলো হঠাতই যেন বড্ড তুচ্ছ হয়ে গেছে। ঐ জীবনটা এক নিমেষে ক্ষুদ্র ঠেকলো আলেয়ার কাছে।
অথচ একটা মানুষের সুখে দুখে ভরা সমগ্র জীবন কিভাবে এত তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে?
এই বিশালতার মাঝে প্রবেশেই তার এ উপলব্ধি। আর তাই বোধহয় কপালের চুলগুলো সরিয়ে বলি রেখা দেখবার বাসনা অর্থহীনতায় পর্যবাসিত হলো।
নিজেকে দেখতে ইচ্ছে করছে না আর। মিশিয়ে ফেলেছে অসীমতার মাঝে। যেন খুব শান্তির হাতছানি আর অপার স্বস্তিবোধ এই নিরুদ্দেশ যাত্রায়। এমনটাই তো সারাজীবন পাবার জন্য সে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জীবনকি ঐ পৃথিবীতে থাকবার সময়টুকু? নাকি এই সীমাহীন ছুটে চলাও এক জীবন,এসব অদ্ভুত চিন্তা মাথায় জেঁকে বসেছে এতক্ষণে। কতক্ষণ হলো ও এসেছে পৃথিবী ছেড়ে? হিসাব মেলাতে পারছে না। নাকি সময়ের হিসাব এখানে মেলে না? নাকি সময় বলে আর কিছু নেই? আলেয়া হতবিহবল। ও বুঝাতে পারবে না এই নতুন আত্মপোলব্ধি যেখানে সময়ের হিসাব মেলাবার প্রয়োজন পড়ে না। পৃথিবীতে পার করা ঐ ক্ষণগুলো যেন ছিল এক স্বপ্ন। ক্ষণিকের উপলব্ধি মাত্র।
ঘূর্ণিবলয়ের সাথে মিশে আলেয়া অনন্ত মহাজগতের কেন্দ্রে নিপতিত হল। নিমেষে আবিষ্কার করলো পৃথিবীর সেই কাছের মানুষগুলো তাকে আর যেন কাছে টানছে না। কোন আকর্ষণ নেই ঐ জীবনের জন্য। উপলব্ধির অন্য মাত্রায় যেন তার প্রবেশ ঘটলো।
২
মজহার আজ কি মনে করেই আধঘন্টা আগেই অফিস থেকে রওনা দিয়েছে। আজ কেন যেন তার তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে মন চাইছে। তাই তাড়াহুড়ো করে অফিসের ফাইলপত্র গুছিয়ে সহকর্মীদের বলে অফিস থেকে বেরিয়ে এলো। রাস্তার জ্যাম পেরিয়ে বাসার গলির মোড় পৌঁছাতেই মনে হল আলেয়ার জন্য দু'স্টিক রজনীগন্ধা নিয়ে যেতে। আবারো বড় রাস্তায় ফিরে ফুলের দোকান থেকে রজনীগন্ধা স্টিক কিনে বাড়ি পৌঁছাল। উঠোনে আশপাশের বাচ্চারা আর নিজের ছেলে দুটো খেলাধূলায় মহা ব্যস্ত। আজ তাড়াতাড়ি বাবাকে আসতে দেখে ছোটটা গেইটের দরজা খুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,ফুল কার জন্য বাবা?
-তোর মায়ের জন্য। তোর মা কোথায় রে?
-মা তো ঘরেই,বলেই ছোটকা ঘরে প্রবেশ করল। গলায় তার আনন্দের উচ্ছ্বাস। মাকে ডেকে বলল, মা দেখ বাবা এসেছে। কি সুন্দর ফুলের তোড়া আর আমার জন্য চকলেট।
সারা বাড়িময় মা মা করে কোথাও মাকে খুঁজে না পেয়ে ছোটকা খেলতে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল, মাকে খুঁজে পাচ্ছিনা।
হয়তোবা আলেয়া পিছনের উঠোনে কাপড় মেলছে। এর মধ্যেই মজহার উঠোন পেরিয়ে প্রবেশ করেছে ঘরে। সামনেই বসার ঘর । তা পেরিয়ে স্টাডি আর তার পরেই শোবার ঘর। ওখানে ও আলেয়াকে দেখতে না পেয়ে পিছনের উঠোনে গেল। নাহ্ সেখানেও নেই। কলপাড়টা শুকনো। কোন কাজই বোধহয় কলপাড়ে হয়নি আজকে। ঘরে ঢুকে মজহার ফুলগুলো বিছানার পাশের ড্রেসিং টেবিলে রাখলো। টেবিলের ওপর চিরুনীটা পড়ে আছে। কিছু চুল জড়ানো। এই মাত্রই মনে হয় আলেয়া ড্রেসিং টেবিল ছেড়ে উঠে গেছে।
কিন্তু গেল কোথায়?
মজহার চারিদিকে তাকিয়ে ওকে খুঁজে পেল না। স্নানঘরের দরজাটা হাট করে খোলা। আলমারির দরজা টা আধো খোলা, সারা ঘর পরিপাটী করে সাজান। বিছানাটা খুব সুন্দর করে বিছানো। আলেয়া ঘরদোর সাজিয়ে গুছিয়েই আয়নার সামনে বসেছিল। পরিচর্যা শেষে উঠেও গেছে কোন কাজে। কিন্তু বাইরে যদি না যেয়ে থাকে তাহলে ঘরে কোথাও নেই কেন?
মজহার বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক যেন।

ফোনটা বেজে উঠলো হঠাত। ধরতে কাছে যেয়ে চোখে পড়লো টেবিলের ওপর আয়নার ওপাশে আলেয়ার হাতের বালা দুটোর প্রতিবিম্ব। বেশ অবাক করলো মজহারকে। প্রতিবিম্বে আয়নার মাঝে, সাদা লেইসের টেবিল-কভারের ওপর পড়ে আছে বালা দুটো অথচ আয়নার এপাশে কিছুই নেই। চিরুনী পাউডার আর কয়েকটা প্রসাধনী সামগ্রী ছাড়া রজনীগন্ধা স্টিকগুলো সরিয়ে মজহার খুঁজবার চেষ্টা করলো বালাদুটো। মজহার ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে কিভাবে আয়নার বালাদুটো স্পষ্ট দেখা যাবে যার অস্তিত্বই এখানে নেই।
অযথাই ফোনটা বেজে উঠলো আবার। কেউ কথা বললো না। অপর প্রান্তে মজহার আলেয়ার কন্ঠস্বর শুনতে চেয়েছিল বোধহয়।
আলেয়া যদি বলতো,আমি আসছি। আমার আসতে খুব বেশী কি দেরি?
মহাজগতের সীমানা অতিক্রম করে অনন্ত অসীম থেকে আমি আসবো তোমার কাছে। তুমি অপেক্ষা কর। আমার আর একটু দেরি।
.।.।.।.।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




