somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রলয়ঙ্করী সুনামি: উগ্র ইসলামপন্থি শক্তির প্রতারণা ও প্রপাগান্ডা

২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দেড় বছরে একটি প্রলয়ংকরী সুনামি বয়ে গেছে। সেটা হলো, উগ্র ডানপন্থী ইসলামপন্থি শক্তির ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ এবং রাজনীতির মূলধারায় স্বাভাবিকীকরণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন ঘটনা। ইসলামপন্থি শক্তি রাজনীতিতে আগে থেকে সক্রিয় ছিল, কিন্তু সীমিতভাবে। জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫-৬ শতাংশ অংশ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের পর তারা আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। সুযোগ পেলে ফাঁকফোকর দিয়ে মাথা তুলত বটে, কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাজনীতির প্রধান ধারায় তারা গ্রহণযোগ্য ছিল না।

কারণ মানুষ জানত, তাদের রাজনীতি সুস্থধারার নয়। তাদের মতাদর্শ ভ্রান্ত এবং তা কতগুলো বিকৃত ধর্মাচার বা কাল্ট মাত্র। যেখানে মানুষের প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস নৈতিকতা, আত্ম-অন্বেষণ ও আত্মিক উন্নতির উপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে ইসলামপন্থিদের মতাদর্শ ঠিক এর উল্টো - অনৈতিকতা, আত্মিক অবনতি, প্রতারণা ও দুষ্টবুদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে অস্ত্র বানিয়ে, প্রতারণা ও সুপরিকল্পিত প্রপাগান্ডার মাধ্যমে তারা মানুষের মনস্তত্ত্বে যে ঘৃণা, নির্বুদ্ধিতা এবং উগ্রপন্থার বীজ বপন করেছে, সেটি এখন ফল দিতে শুরু করেছে। ইসলামপন্থিদের প্রতারণা ও প্রপাগান্ডা কীভাবে বাংলাদেশে মানসিক দখলদারিত্ব চালিয়েছে, এই প্রক্রিয়া বুঝতে হলে প্রপাগান্ডার মানসিক কাঠামো বোঝা জরুরি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমেরিকান সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান "স্টেরিওটাইপ" ও "সম্মতির উৎপাদন" ধারণার প্রবর্তক। তিনি দেখান জনসম্মতি গঠনে প্রপাগান্ডা খুব কার্যকর। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে তিনি পেনসিলভেনিয়ার এক শ্রমজীবী তরুণীর গল্প বলেন। তীব্র বাতাসে রান্নাঘরের জানালার কাঁচ ভেঙে গেলে, সেই তরুণী এটিকে তার বাবার মৃত্যু-সংকেত বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং শোকে ভেঙে পড়ে। পরে জানা যায়, তার বাবা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।

লিপম্যানের মতে, ভাঙা কাঁচটি ছিল তার আতঙ্ক, কুসংস্কার, এবং বাবার প্রতি ভয় ও ভালোবাসার টানাপোড়েন থেকে জন্ম নেওয়া কল্পিত বার্তা। মানুষ পৃথিবীকে সরাসরি বোঝে না; বরং কল্পনায় তৈরি ছবি, ধারণা, কুসংস্কার ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝে। এটাকেই তিনি বলেন "ছদ্ম‑পরিবেশ"। মানসিক জগতের এই ছবিগুলোই স্টেরিওটাইপ, যা মানুষ প্রশ্ন না করে সত্য হিসেবে মেনে নেয়। প্রপাগান্ডা ঠিক এই মানসিক‑ছবি তৈরির জায়গাটিকেই নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ এই "ছদ্ম-পরিবেশই" বাস্তব পরিবেশে মানুষের আচরণকে পরিচালিত করে।

তবে লিপম্যান বা তার সময়ের লেখকেরা প্রপাগান্ডা ধারনাটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করতেন না। তারা মনে করতেন, গণতান্ত্রিক সমাজে প্রপাগান্ডা একটি কার্যকর ব্যবস্থা। রাজা ও জমিদারের সামন্ত সমাজে প্রপাগান্ডার প্রয়োজন হয় না, সেখানে লাঠি বা বন্দুক দিয়ে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা যখন আইনের দ্বারা সুরক্ষিত হয়, তখন রাষ্ট্র সরাসরি বলপ্রয়োগের ক্ষমতা হারায়। ফলে শক্তির মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা আর সম্ভব হয় না। তখন জনগণের সম্মতি আদায়ের জন্য "ভ্রম" ও "মায়া" তৈরি করতে হয়।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলেও, ধর্মীয় আবেগকে বিষাক্ত করে, ওয়াজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তথাকথিত ধর্মীয় বক্তাদের মাধ্যমে জনমতকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে, যা ভয়ংকর। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে সেনাবাহিনী লাগে না, গোয়েন্দা সংস্থার দরকার হয় না, এমনকি পুলিশি বলপ্রয়োগও প্রয়োজন পড়ে না। সফল প্রপাগান্ডা মানুষকে মব মানসিকতায় নামিয়ে আনে এবং তখন ভয়াবহ কাজও তাদের দিয়ে করানো যায়।

উগ্র ইসলামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় কাল্টের কাঠামোগত মিল আছে। কাল্টগুলোর ইতিহাস দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। উদাহরণ হিসেবে আমেরিকার কলোরাডোর "লাভ হ্যাজ ওয়ান" গোষ্ঠীর কথা বলা যায়। তাদের নেত্রী অনুসারীদের কাছে "মাদার গড" নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি দাবি করতেন, তিনি ক্যানসার সারাতে পারেন এবং ফেরেশতাদের সঙ্গে কথা বলেন। নিজেকে তিনি একাধারে যিশু খ্রিস্ট ও মেরিলিন মনরোর পুনর্জন্ম বলে পরিচয় দিতেন।

উগ্র ইসলামপন্থিরা দ্বিমুখী কৌশলেই কাজ করে। একদিকে তারা ভণ্ড পীরের মতো কুসংস্কার লালন করে জনগণের মগজ ধোলাই করে, অন্যদিকে কাঠামোগতভাবে তারা কু ক্লুক্স ক্ল্যানের মতো ঘৃণাভিত্তিক, বর্ণবাদী ও প্যারামিলিটারি সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই তার প্রমাণ। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস ছিল গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে জড়িত সন্ত্রাসী বাহিনী।

আজ জামাত ভোল পাল্টে প্রতারক রূপে হাজির হয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় তারা একজন বিএনপি নেত্রীর বক্তব্য টেম্পারিং করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। মূল বক্তব্যে সেই নেত্রী বলেছিলেন, "জামাতে ইসলাম দেশের শত্রু।" কিন্তু তারা "জামাতে ইসলাম" থেকে জামাত শব্দটি মুছে দিয়ে ক্লিপটি এমনভাবে বিকৃত করেছে যাতে মনে হয় তিনি বলছেন, "ইসলাম দেশের শত্রু।"

নির্বাচনী প্রচারণার তারা প্রকাশ্যেই "জান্নাতের টিকিট" বিক্রি করছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করলেও, তারা জানে, এই ধরনের প্রতারণামূলক প্রচারণাই রাজনীতিতে সবচেয়ে কার্যকর। কারণ এই প্রচারণা মানুষের মনের ছদ্ম-পরিবেশের বেহেস্তের কল্পচিত্রকে উদ্দীপ্ত করে। এসব কল্পচিত্র যুক্তি দিয়ে ভাঙা দুরূহ, কেননা এগুলো গভীর আবেগের স্তরে সযত্নে তোলা থাকে।

অতীতে তারা একবার মানুষের ধর্মীয় কুসংস্কার ব্যবহার করে তাদের একজন প্রয়াত নেতা সম্পর্কে এমন একটা মিথ তৈরি করতে পেরেছিল যে তিনি চাঁদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। প্রতারণা ও প্রপাগান্ডা এভাবেই কাজ করে। একই মিথ্যার ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি, কাল্পনিক ভয় এবং ধর্মীয় আবেগের সর্বোচ্চ ব্যবহার।

ঘটনাটি এখানে শেষ হতে গিয়েও শেষ হয়নি। বিষয়টি যদি শুধু রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে মনে করা যেত যে, অবস্থার পরিবর্তন খুব দূরে নয়। এটি এখন রাজনীতি ছাড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনস্তত্ত্বে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে আমার কেবল নাজি জার্মানির কথাই মনে পড়ছে।

আমাকে আপনারা বলুন যে, আমি অতিভাবনা করছি, এই দুঃস্বপ্নের সময় এখনও আসেনি, এখনও আশা শেষ হয়ে যায়নি...।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:৫০
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চরিত্রহীন

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৬


নিপীড়িত ভেবে যাকে করে যাবে মায়া,
সর্বস্ব বিলিয়ে দেবে যার উপকারে;
কলির সন্ধ্যা কাটলে পাবে না তো তারে,
সে তখন হয়ে যাবে নিশ্চিন্ত প্রচ্ছায়া।
যাবে না ধরা হাঁটলেও সে কাছে-ধারে;
ভুজঙ্গের ন্যায় দেখাবে বিষাক্ত কায়া,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব রাজনীতি, শক্তির খেলা এবং ন্যায়ের প্রশ্ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:৩৫

বিশ্ব রাজনীতি, শক্তির খেলা এবং ন্যায়ের প্রশ্ন

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে বারবার এমন অভিযোগ উঠেছে যে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য দুর্বল বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নস্টালজিক

লিখেছেন সামিয়া, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩৩



আমার ঘরটা এখন আর আগের মতো লাগে না। দরজার লক নষ্ট, বন্ধ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না, আধখোলা হয়ে থাকে। বুকশেলফে ধুলো জমে আছে, ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা এলোমেলোভাবে ঝুলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন যখন মাঝপথে থেমে যায়: ঢাকার জলপথ ও এক থমকে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা অভিযোগ করি না এমন দিন বোধহয় ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি আমাদের হাতের নাগালেই ছিল—আমাদের নদীগুলো। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা করেছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাগাভাগি

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

ভাগাভাগি
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

এলাকায় এক ইফতার মাহফিল-এ
দাওয়াত পাই আর যথাসময় চলে যাই।
অনেক মানুষ পড়ছে দোয়া দুরুদ
ঘনিয়ে আসছে রোজা ভাঙার সময়।

তখন সবার সামনে বিলিয়ে দিচ্ছে বিরিয়ানি
আমার ভাবনা- হয়ত কেউ ভাবছে
যদি একসাথে খাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×