somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চাদাঁবাজি বা কুকুরের বাচ্চাদের অর্থনীতি

১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমলা-অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খানের লেখা বই "পরার্থপরতার অর্থনীতি"তে "শুয়রের বাচ্চাদের অর্থনীতি" নামে একটা প্রবন্ধ আছে। ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থনীতিকে তিনি এই নাম দিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির অর্থনীতিকে সেই হিসেবে, "কুকুরের বাচ্চাদের অর্থনীতি" নাম দেওয়া যেতে পারে।

প্রবন্ধের শুরুতে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে কর্মরত মাইকেল ক্যারিট নামের একজন ইংরেজ প্রশাসকের আত্মজীবনী "আ মোল ইন দ্য ক্রাউন" থেকে একটা ঘটনার উল্লেখ করেন। ইংরেজ প্রশাসকের আদালতে একজন পাঞ্জাবি ঠিকাদার সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছেন এভাবে: সরকারি কর্মকর্তা তিন ধরনের; প্রথমে আছেন যারা কোনো প্রকার ঘুষ নেন না; দ্বিতীয়ত, যারা ঘুষ নেয়, তবে কাজ করে দেয়; তৃতীয়ত, যারা "শুয়রের বাচ্চা" - এরা ঘুষ নেয় ঠিকই কিন্তু কাজ করে না।

অনেকের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে দুর্নীতি ব্রিটিশ শাসনের ফল। ব্রিটিশরা সুবিধার জন্য এমন এক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যেখানে শাসক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী শ্রেণি গড়ে ওঠে। সরকারি সেবা পেতে হলে, এই কর্মচারীদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর সেখানেই ঘুষের সুযোগ তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতা ও জনগণের মধ্যেও এক অনানুষ্ঠানিক মধ্যবর্তী শ্রেণি গড়ে ওঠে যাদের আইনি ভিত্তি নেই, কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তারা চাঁদাবাজি করে।

ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বা কাজের সুবিধার জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত ঘুষ সাধ্যের মধ্যে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা আমলাতান্ত্রিক বাধা কাটাতে সহায়ক হতে পারে। যে টাকা দেয় এবং যে টাকা নেয় - দুই পক্ষই এখানে লাভবান হয়। তবে সরকারের সব দপ্তরে ঘুষের ফলাফল সমান নয়। একজন অপরাধী যদি পুলিশকে ঘুষ দিয়ে অন্যের জমি দখল করে অথবা খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধ করে পার পেয়ে যায়, সেখানে স্পষ্টভাবে একটি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ থাকে। তখন এটি আর দুই পক্ষের "উইন-উইন" বিষয় থাকে না, বরং তা সুশাসনের অভাব, ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয় প্রকাশ করে। ঘুষের দুর্নীতি কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হলেও, চাঁদাবাজি সামগ্রিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা দেয় না। তবে, এর যে বাস্তবতা, সেটা নিয়ে বিস্তৃত ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা হলেই কেবল একে নীতিগত সংস্কার, আইন প্রণয়নের পর্যায়ে নেওয়া যাবে।

চাঁদাবাজরা নেতাদের পেশিশক্তি হিসেবে কাজ করে। এদের লক্ষ্য রাজনৈতিক নেতা এবং দলের স্বার্থ রক্ষা করা। আগের দিনের জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর সাথে এদের মিল আছে। লাঠিয়াল বাহিনী গ্রামে বা মৌজায় ক্ষমতা দেখাত, মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করে কৃষকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখত। দলীয় ক্যাডারও মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করে প্রভাব বিস্তার করে। নেতার বডিগার্ড ও লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করে, বিরোধী পক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর লোকদের দমন করে। আবার শোডাউন করা বা শক্তি প্রদর্শন করে দলের বা নেতার পক্ষে প্রচারণা এবং বৈধ ও অবৈধ কাজে ভূমিকা রাখাও তাদের কাজ।

এলাকায় কেউ বাড়ি নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছে, মাস্তানেরা রাজনৈতিক দলের ব্যানারে হাজির হয়ে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা কত হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই - দশ হাজার হতে পারে, পাঁচ লক্ষও হতে পারে। ফুটপাতের হকার বসেছে পণ্য নিয়ে, সেখানেও চাঁদাবাজি চলে। পণ্যবাহী ট্রাক এলাকায় প্রবেশ করলে সেটি থামিয়ে চালকের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়।

চাঁদাবাজির পরিধি এমন বিস্তৃত যে সমাজের সব স্তরের মানুষ এর শিকার হয়। চাঁদা আদায় ছাড়াও আয়ের আরও কতগুলো উপায় দলীয় ক্যাডারদের আছে। যেমন ত্রাণের পণ্য চুরি করা, দরপত্রে ভাগ বসানো বা কমিশন আদায়। সরকারি অথবা বিবাদপূর্ণ জমি দখল করা বা অবৈধ ব্যবসা থেকে অংশীদারির মাধ্যমেও তারা আয় করে।

আবার কোনো ঠিকাদার যখন রাস্তা নির্মাণের দরপত্র পেতে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়, তখন সে প্রায়ই সেই অতিরিক্ত খরচ প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে রাস্তার মান খারাপ হয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বড় কোনো ব্যবসায়ী বা কোম্পানির কাছে যখন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দল চাঁদা দাবি করে, তখন সেটিকে তারা অতিরিক্ত ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে বিবেচনা করেন। চাঁদার বিনিময়ে সরকারি কাজ পাওয়া, প্রশাসনিক সহায়তা বা প্রভাবশালী মহলে সুবিধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যদি সেই ব্যবসায়ী এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন, যেখানে তাকে সহযোগিতাপরায়ণ বা "আমাদের লোক" হিসেবে দেখা হয়।

কিছু চাঁদাবাজি রয়েছে যা শুধু বড় ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসব লেনদেনের নাম আর চাঁদাবাজি থাকে না। কমিশন, ফি কিংবা চুক্তির আনুষ্ঠানিক অংশ হিসেবে সেগুলো উপস্থাপিত হয়। এলিট পর্যায়ের এসব চাঁদাবাজি লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটে এবং গণমাধ্যমেও এগুলো আড়াল করার সচেতন প্রবণতা দেখা যায়। ক্ষতিটা তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান না হলেও, শেষ পর্যন্ত এর বোঝা জনগণকেই বহন করতে হয়।

ফলে সমাজের উচুতলায় চাঁদাবাজি শব্দটির সংজ্ঞাই ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। নিচু স্তরের নগ্ন জুলুম আর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার আড়ালে সংগঠিত চাঁদাবাজি - দুটিকে মানুষ একইভাবে দেখে না। তথ্যের অভাবে বা বাস্তব প্রেক্ষাপট না বুঝে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। কোনটা স্পষ্ট অপরাধ আর কোনটা ব্যবসায়িক বৈধতার আবরণে চুরি - এই সীমারেখাটা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

চাঁদাবাজি একধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করে। যেখানে মারপিট, মাস্তানির ও ভয় সৃষ্টি করে আয়ের সুযোগ হয়। যারা চাঁদার ওপর ভর করে ক্যাডার বাহিনী চালায় এবং যারা অন্য কোন আর্থিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে সেই বাহিনী টিকিয়ে রাখে, উভয় ক্ষেত্রের কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি। যেসব দল চাঁদাবাজির ওপর নির্ভর করে না বলে প্রচার করে, তাদের নিজেদের কর্মী বাহিনীর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়। সেটা সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বা ঠিকাদারিতে প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে করা হয়। উদাহরণ হিসেবে, ২০০২-০৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সরকারি নিয়োগে প্রায় ৩০০০ জনকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল থেকে নেওয়ার অভিযোগ ছিল। সাধারণ প্রার্থীরা সবাই সেই চাকরি থেকে তখন বঞ্চিত হয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনায় সরাসরি রাস্তার চাঁদাবাজি না থাকলেও, সুযোগ বণ্টনে বড় জালিয়াতি করা হয় এবং বহু সরকারি চাকরির সুযোগ থেকে বন্চিত করা হয়।

চাঁদাবাজিকে মানুষ সহজেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, কারণ মানুষকে ভয় দেখানো, জোরপূর্বক টাকা নেওয়া ও মানসিক অত্যাচার দৃশ্যমান। কিন্তু সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের লোক নিয়োগ, পদ-পদবির বিনিময়ে আনুগত্য বা সংগঠিতভাবে আর্থিক সুবিধা আদায় - এসব সামাজিক ন্যায়বিচারকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবু এগুলোকে প্রায়ই শাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে উপস্থাপন করা হয় ও বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

কোনটি বেশি ক্ষতিকর? প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, নাকি সরকারি নিয়োগে পুরোটাই দলীয়করণের মাধ্যমে অন্যদের সুযোগ কেড়ে নেওয়া? নাকি আন্তর্জাতিক গোপন চুক্তি থেকে কমিশন আদায়?
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:০১
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এনসিপি কি সত্যিই ডঃ ইউনুসকে হত্যার চক্রান্ত করছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:১৫



এটা সত্যি যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনসিপি নেতারা ডঃ ইউনুসকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। কিন্তু, তাই বলে হত্যা কেন করবে!!! ব্লগে আমার এই পোস্টের মাধ্যমে এন,সি,পি নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেমন হলো নতুন 'মন্ত্রীসভা'?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১৪


সংসদে এমপি হিসেবে শপথপাঠ করতে জনাব তারেক রহমান যখন এসে নিজের চেয়ারে বসতে গেলেন, বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও জনাব খন্দকার মোশাররফ হোসেন তখন উঠতে একটু দেরী করে ফেললেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধন্যবাদ ওয়াকার উজ জামান স্যার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:২৭


২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই উত্তপ্ত দিনগুলোর কথা মনে করুন। রাজপথ জুড়ে তখন আগুন, কোটা আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে সরকারের দেয়ালে। এই টালমাটাল মুহূর্তে একজন সামরিক অফিসার এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রেম করে বিয়ে করবেন? নাকি বাড়ির পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করবেন?

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:৪১



লালনের একটা গান আছে,
"এমন মানব জনম আর কি হবে। মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।" চমৎকার গান। চমৎকার গানের কথা। কথা গুলো বুঝতে চেষ্টা করুন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ নিয়া ব্যাকেটের সাথে কিছুক্ষণ আগেই কথা বলমাম ---

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৬



কিছুক্ষণ আগে অফিসে আসার সময় লেগুনায় ওঠার সময় হঠাত করেই দেখি আমার পাশের সিটে বসা মি: স্যামুয়েল ব্যাকেট! একজন বিরাট ব্যাকেট ভক্ত হিসেবে উনি আমাকে চিনেন। আর কোনো কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×