
আমলা-অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খানের লেখা বই "পরার্থপরতার অর্থনীতি"-তে "শুয়রের বাচ্চাদের অর্থনীতি" নামে একটা প্রবন্ধ আছে। ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থনীতিকে তিনি এই নাম দিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির অর্থনীতিকে সেই অনুযায়ী, "কুকুরের বাচ্চাদের অর্থনীতি" নাম দেওয়া যেতে পারে।
প্রবন্ধের শুরুতে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে কর্মরত মাইকেল ক্যারিট নামের একজন ইংরেজ প্রশাসকের আত্মজীবনী "আ মোল ইন দ্য ক্রাউন" থেকে একটা ঘটনার উল্লেখ করেন। ইংরেজ প্রশাসকের আদালতে একজন পাঞ্জাবি ঠিকাদার সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছেন এভাবে: সরকারি কর্মকর্তা তিন ধরনের; প্রথমে আছেন যারা কোনো প্রকার ঘুষ নেয় না; দ্বিতীয়ত, যারা ঘুষ নেয়, তবে কাজ করে দেয়; তৃতীয়ত, যারা "শুয়রের বাচ্চা" - এরা ঘুষ নেয় ঠিকই কিন্তু কাজ করে না।
অনেকের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে দুর্নীতি ব্রিটিশ শাসনের ফল। ব্রিটিশরা সুবিধার জন্য এমন এক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যেখানে শাসক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী শ্রেণি গড়ে ওঠে। সরকারি সেবা পেতে হলে, এই কর্মচারীদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর সেখানেই ঘুষের সুযোগ তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতা ও জনগণের মধ্যেও এক মধ্যবর্তী শ্রেণি গড়ে ওঠে যাদের আইনি ভিত্তি নেই, কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তারা চাঁদাবাজি করে।
ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বা কাজের সুবিধার জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত ঘুষ সাধ্যের মধ্যে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক বাধা কাটাতে ঘুষ সহায়ক হতে পারে। যে টাকা দেয় এবং যে টাকা নেয় - দুই পক্ষই এখানে লাভবান হয়। তবে সরকারের সব দপ্তরে ঘুষের ফলাফল সমান নয়। একজন অপরাধী যদি পুলিশকে ঘুষ দিয়ে অন্যের জমি দখল করে অথবা খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধ করে পার পেয়ে যায়, সেখানে স্পষ্টভাবে একটি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ থাকে। তখন এটি আর দুটি পক্ষের "উইন-উইন" বিষয় থাকে না, বরং তা সুশাসনের অভাব, বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয় প্রকাশ করে। ঘুষের দুর্নীতি কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হলেও, চাঁদাবাজি সামগ্রিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা দেয় না। তবে, এর যে বাস্তবতা, সেটা নিয়ে বিস্তৃত ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা হলেই কেবল একে নীতিগত সংস্কার ও আইন প্রণয়নের পর্যায়ে নেওয়া যাবে।
চাঁদাবাজরা নেতাদের পেশিশক্তি হিসেবে কাজ করে। এদের লক্ষ্য রাজনৈতিক নেতা ও দলের স্বার্থ রক্ষা করা। আগের দিনের জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর সাথে এদের মিল আছে। লাঠিয়াল বাহিনী গ্রামে বা মৌজায় ক্ষমতা দেখাত, মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করে কৃষকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখত। দলীয় ক্যাডারও মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করে প্রভাব বিস্তার করে। নেতার বডিগার্ড ও লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করে বিরোধী পক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী দমন করে। আবার শোডাউন বা শক্তি প্রদর্শন করে দলের বা নেতার পক্ষে প্রচারণা করে এবং বৈধ ও অবৈধ কাজে ভূমিকা রাখে।
কেউ বাড়ি নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছে, মাস্তানেরা রাজনৈতিক দলের ব্যানারে হাজির হয়ে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা কত হবে তার নির্দিষ্ট সীমা নেই - দশ হাজার হতে পারে, পাঁচ লক্ষও হতে পারে। ফুটপাতের হকার বসেছে পণ্য নিয়ে, সেখানেও চাঁদাবাজি চলে। পণ্যবাহী ট্রাক শহরে প্রবেশ করলে সেটি থামিয়ে চালকের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়।
চাঁদাবাজির পরিধি এমন বিস্তৃত যে সমাজের সব স্তরের মানুষ এর শিকার হয়। চাঁদা ছাড়াও আয়ের আরও কতগুলো উপায় দলীয় ক্যাডারদের আছে। ত্রাণের পণ্য চুরি করা থেকে শুরু করে দরপত্রে ভাগ বসানো অথবা সরকারি বা বিবাদপূর্ণ জমি দখল করা কিংবা অবৈধ ব্যবসা থেকে অংশীদারির মাধ্যমেও তারা আয় করে।
চাঁদাবাজি একধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করে। যেখানে মারপিট, মাস্তানি ও ভয় সৃষ্টি করে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। যারা চাঁদার ওপর ভর করে ক্যাডার বাহিনী চালায় তাদের কর্মীদের জন্য আলাদাভাবে কাজের বন্দোবস্ত না করলেও চলে। কিন্তু যেসব দল চাঁদাবাজির ওপর নির্ভর করে না বলে প্রচার করে, তাদের কর্মীদের জন্য চাকুরির ব্যবস্থা করতে হয়। সেটা সাধারণত সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বা ঠিকাদারিতে প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, ২০০২-০৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সরকারি নিয়োগে প্রায় ৩০০০ জনকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল থেকে নিয়োগের অভিযোগ ছিল। সাধারণ প্রার্থীদের সকলে সেই চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনায় সরাসরি চাঁদাবাজি না থাকলেও, সুযোগ বণ্টনের ক্ষেত্রে এখানে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয় এবং সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়।
কোনো ঠিকাদার যখন রাস্তা নির্মাণের দরপত্র পেতে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়, তখন সে প্রায়ই অতিরিক্ত খরচ প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে রাস্তার মান খারাপ হয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বড় কোনো ব্যবসায় থেকে যখন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দল চাঁদা দাবি করে, তখন সেটিকে তারা অতিরিক্ত ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে বিবেচনা করে। চাঁদার বিনিময়ে সরকারি কাজ পাওয়া, প্রশাসনের সহায়তা বা প্রভাবশালী মহলে সুবিধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যদি সেই ব্যবসায়ী এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন, যেখানে তাকে সহযোগিতাপরায়ণ বা "আমাদের লোক" হিসেবে দেখা হয়।
কিছু চাঁদাবাজি রয়েছে যা শুধু এলিট গোষ্ঠীর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। এসব লেনদেনের নাম তখন আর চাঁদাবাজি থাকে না। কমিশন, ফি বা চুক্তির আনুষ্ঠানিক অংশ হিসেবে সেগুলো উপস্থাপন করা হয়। এলিট পর্যায়ের চাঁদাবাজি লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটে এবং গণমাধ্যমেও এগুলো আড়াল করার সচেতন প্রবণতা দেখা যায়। ক্ষতিটা তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান না হলেও, শেষ পর্যন্ত এর বোঝা জনগণকেই বহন করতে হয়।
ফলে দেখা যায়, সমাজের উচুতলায় চাঁদাবাজি শব্দটির সংজ্ঞাই ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। নিচু স্তরের নগ্ন জুলুম আর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার আড়ালে সংগঠিত চাঁদাবাজি - দুটিকে মানুষ ভিন্ন ভাবে দেখে এবং ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। তথ্যের অভাবে কোনটা স্পষ্ট অপরাধ আর কোনটা ব্যবসায়িক বৈধতার আড়ালে চুরি - এই সীমারেখা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
চাঁদাবাজি মানুষ সহজেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। কারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক টাকা নেওয়া ও মানসিক অত্যাচার দৃশ্যমান। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ দলের লোক নিয়োগ, পদ-পদবির বিনিময়ে আনুগত্য বা সংগঠিতভাবে আর্থিক সুবিধা আদায়ের ঘটনাগুলো দৃশ্যমান অত্যাচার না হলেও, সামাজিক ন্যায়বিচারকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কোনটা বেশি ক্ষতিকর - প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, সরকারি নিয়োগ সম্পূর্ন দলীয়করণ করে অন্যদের বঞ্চিত করা, নাকি গোপন চুক্তি থেকে কমিশন নেওয়া? একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র সব ধরনের অন্যায়কেই গুরুত্বের সাথে নিয়ে সেগুলো বন্ধ করার জন্য কাজ করে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




