
সাত বছর বয়সের ছোট্ট শিশু রামিসাকে ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যার ঘটনার সমাধান হিসেবে, মোল্লাতন্ত্রের মুখপাত্র আহমাদুল্লাহ হুজুর পুরাতন এক ফতোয়া নিয়ে হাজির হয়েছেন। এইসব নৃশঃসতার মাত্রা কমিয়ে আনার একমাত্র সমাধান নাকি শরীয়া আইন। আহমাদুল্লাহ হুজুর যেটাকে নারীশিশুর উপর নৃশংসতার সমাধান মনে করেছেন, সেটা সমাধান নয় - বরং সেটাই আসলে নৃশংসতাগুলো ঘটার প্রধান কারণ।
শরীয়াতন্ত্রের নামে তারা যা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটা হলো প্রাগৈতিহাসিক পুরুষতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার আধুনিক রূপ। আধুনিক বলতে এখানে কেবল সময়ের দিক থেকেই আধুনিকতা। অর্থাৎ বেদুইন সমাজের মতো মরুভূমিতে প্রবল তাপে উট না চড়িয়ে অথবা যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত না থেকে, শুধু ভোগের বেলায় সেগুলো ষোল আনা পাওয়া।
এই লোলুপতা পূরণ হয় বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এবং নারীর উপর দমন-পীড়ন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। সেই ব্যবস্থাগুলোর জন্য আবার প্রয়োজন নারীদের দাসী করে রাখা। তাদের অশিক্ষিত, ক্ষমতাহীন, দুর্বল ও অধীনস্থ করে রাখা। নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখার একটি উপায় হলো কঠোর লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং রীতিনীতি, যা নারীর জীবনকে ক্ষুদ্র করে, তুচ্ছ করে, সীমিত করে এবং শৃঙ্খলিত করে।
এর সাথে যুক্ত হয় অর্থনীতির প্রশ্ন। দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রান্তিক গোষ্ঠীর নারী ও শিশুরাই এই নরখাদকদের ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। বাংলাদেশে বাস করতে হলে টাকার জোর আপনার থাকতেই হবে। যদি দরিদ্র হন, তাহলে মোল্লাদের পরামর্শ এই যে, শিশুর বয়স দুই-তিন বছর হলেই তাকে গায়ে-মাথায় আপাদমস্তক কয়েকটি কালো কাপড়ে আবৃত করে দিন। এতে করে সে যদি দম বন্ধ হয়ে মারাও যায়, মরে গেলেও অন্তত ধর্মান্ধদের শাণিত জিহবা থেকে বাবা-মা রক্ষা পেতে পারেন।
ধর্মের নাম করে কতগুলো বিকৃত তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে। যেমন, নারীর চলাফেরার জন্য পুরুষ অভিভাবক সাথে থাকার বাধ্যবাধকতা অথবা নারীর চলাফেরার ক্ষেত্রে পোশাকবিধি আরোপ করা। নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার ঘোষণা এবং নারীর পোশাক, মাতৃত্ব, যৌনতা, সম্পর্ক, শিক্ষা ও চলাফেরার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করা।
এভাবে মোল্লাতান্ত্রিক সমাজে নারীর স্বাধীনতা ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়। পাশাপাশি সামান্যতম বিচ্যুতিতেই নারীকে "বেশ্যা" বলে অভিহিত করা হয়। বিষয়গুলো একত্রিত হলে যে পরিস্থিতি হয়, তা হলো এক প্রবল পুরুষতান্ত্রিক বা অতিপুরুষালি একটা ব্যবস্থা। যেটা এমন পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ছোট্ট রামিসারা সহজেই সহিংসতা ও হত্যার শিকার হয়ে পরে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামপন্থি রাজনীতির পুনরুত্থান ধর্ষণ-হত্যা ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির জন্য অনুকূল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। ড. ইউনূসের সময়কাল থেকে উগ্রপন্থিদের স্বাভাবিকীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার রাশ টেনে ধরতে বর্তমান বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে এবং এ পরিস্থিতি থেকে থেকে উত্তরণের কোনো চেষ্টাও তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
এর শুরুটা হয়েছিল বেগম রোকেয়াকে কুৎসিত ভাষায় গালি দেওয়ার মাধ্যমে এবং তাঁর জন্মদিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নামধারী এক দুর্বৃত্তের তাঁকে "মুরতাদ ও কাফের" ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের নারী জাগরণের পথিকৃৎ যে নারী, তাকে "বেশ্যা" বলে অভিহিত করার অর্থ বাংলাদেশের নারীদের যা কিছু সম্মিলিত অর্জন - শিক্ষা, উন্নয়ন এবং নারী অধিকার - তা ধুলোয় লুটিয়ে দেওয়া এবং সময়ের উল্টো দিকে হাটা শুরু করা। বিগত দুই বছরে সেটাই ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ের নারী ও শিশু নির্যাতন, নারী স্বাধীনতার ওপর হুমকি এবং শিল্প-সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ সমাজে কঠোর পুরুষতান্ত্রিকতা, ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ এবং উগ্র মতাদর্শের বিস্তারকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে।
উদাহরণ হিসেবে, কিছুদিন আগে উগ্রবাদীরা দেশের উত্তরাঞ্চলে দুটি নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেয়। জয়পুরহাটে একটি নারী ফুটবল ম্যাচ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সহিংস বিক্ষোভের কারণে বাতিল করতে হয়। উগ্রবাদীরা সেখানে ভাঙচুর চালায় এবং দর্শকদের তাড়িয়ে দেয়। এর আগে, দিনাজপুরে আরেকটি নারী ফুটবল ম্যাচ একই ধরনের বিক্ষোভের কারণে স্থগিত করা হয়, যেখানে বিক্ষোভকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে অংশ নেয়।
সেই সময়েই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ মেলা ও সংগীত আয়োজন বাতিল করা হয়। বাউল ও লোকসংগীতের মতো সাংস্কৃতিক ধারা অনেক জায়গায় বাধার মুখে পড়ে। এই ঘটনাগুলো বহুত্ববাদী বাঙালী সংস্কৃতির পরিসর সংকুচিত হওয়ার ধারাবাহিকতার অংশ। সমাজ ধীরে ধীরে আরও সংকীর্ণ ও অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। আগের যেকোন সময়ের চেয়ে এই প্রবণতা শক্তিশালী হওয়ায় নারী অধিকার, নারী স্বাধীনতা, সংস্কৃতি চর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ - সবকিছুই চাপের মুখে পড়ে।
ইসলামপন্থিদের দৃষ্টিতে সংগীত, নৃত্যসহ সকল ধরনের শিল্পকলা নিষিদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। বিগত বছরগুলোতে পিনাকী ও ইলিয়াসরা মানুষকে বুঝিয়েছে যে, শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষরা সেকুলার এবং আওয়ামী পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত। তাদের মতে, শিল্পচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন ছায়ানট ও উদীচী - অপরাধী সংগঠন। এগুলোকে ধ্বংস করার জন্য তারা মানুষকে উস্কানি দিয়েছে, যা এখনও অব্যাহত আছে। ফলে বিগত বছরগুলোতে মব তৈরি করে ছায়ানট ও উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
যে শিল্পকলা মানুষের সুকুমার বৃত্তির অংশ, সেগুলোকে যখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং শিল্পকলার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার জন্য মব তৈরি করা হয় - তখন সমাজে ধর্ষণের মত যৌন সহিংসতা ও বিকৃতি ছাড়া আমরা কী আশা করতে পারি?
এই বিকৃতি ও অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমেই মোল্লাতান্ত্রিক প্রভাব ও ফতোয়া থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের ছেলে-মেয়েদের সংগীত, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল চর্চায় অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শুধু ঢাকা শহর বা বিভাগীয় শহর নয়, প্রতিটি জেলা, উপজেলা, পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে ছায়ানট বা উদীচীর মতো সংগঠন ও ক্লাব গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদের ছেলেমেয়েরা গাইবে, নাচবে, কবিতা লিখবে, ছবি আঁকবে, গীতিকাব্য এবং নাটকে অভিনয় করবে।
সংস্কৃতি চর্চাকে শুধু মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সে চেষ্টা করতে হবে। তাদের প্রচলিত ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গা - যেমন পালাগানের আসর বা মাজার - যাতে কোনো ধরনের ক্ষতি বা ভাঙচুরের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে।
কোথাও পড়েছিলাম যে, শিল্পকলার চর্চা না থাকলে মানুষের সংবেদনশীলতা বা আবেগ-অনুভূতির ইন্দ্রিয়গুলো পুরোপুরি বিকশিত হয় না। অতএব উগ্রবাদী চিন্তাগুলোকে প্রতিহত করার জন্য মানবিক অনুভূতিগুলোকে জাগ্রত করতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন উগ্রবাদকে প্রতিরোধ করা যাবে, তেমনি এ ধরনের সহিংসতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করি।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০২৬ সকাল ১১:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
.jpg)
