somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশ কি একটি "ব্যর্থ রাষ্ট্রে" পরিণত হতে যাচ্ছে? - তৌহিদি জনতা বা ইসলামপন্থি গুণ্ডাবাহিনীর উত্থান

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


তৌহিদি জনতা হল ইসলামপন্থি গুণ্ডাবাহিনী। সমাজের এক পশ্চাৎপদ শ্রেণি, যারা গুহাজীবনের মধ্যে আটকে আছে। সময়ের সাথে সাথে তারা নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি। বাইরের পৃথিবী যে বদলে গেছে, সেই খবর তারা কিছু কিছু হয়ত জানে, কিন্তু পরিবর্তনগুলোকে গ্রহণ করে না। তারা যেসব কেতাব পড়ে সেগুলোর মধ্যে নতুন পৃথিবী নেই, নতুন চিন্তা নেই। সেখানে জানালা-দরজাগুলো বন্ধ; বাইরের আলো-বাতাস যে ঢুকবে তারও সুযোগ নেই।

এই গুণ্ডাবাহিনী জঙ্গিদের মতো বুকে বোমা বেঁধে আত্মঘাতী হামলা করে না, তবে তাদের শক্তি এমন যে, তারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে দীপু চন্দ্র দাসকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করতে পারে, কবর থেকে পীরের লাশ তুলে এনে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে, মুসলিম নারীর সাথে প্রেম করার অপরাধে হিন্দু যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে শাস্তি দিতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সরকার এদের দমন তো করেই না; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমন নির্দেশনা দেয় যে, তৌহিদি বাহিনীকে তারা তোয়াজ করে চলে।

অথচ এরা সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এক শক্তি, যার রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। বহুত্ববাদী ও আধুনিক নাগরিক সমাজের সাথে তাদের জীবনদর্শনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারী-পুরুষের সমতা, শিল্প-সংস্কৃতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের এসব ধারণা তারা গ্রহণ করে না; বরং এই বিষয়গুলো নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

ধর্ম যখন জীবন্ত মানুষের ওপর মৃত নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, তখন ধর্মগ্রন্থের অর্থ অনুধাবনের চেয়ে তার বাণী আওড়ানোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন বিবেক, বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের চেয়ে "আল্লাহর আইন" বড় হয়ে ওঠে, আর কেতাবে কী লেখা আছে, সেটাই সত্যের মাপকাঠি হয়ে যায়। তৌহিদিরা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে না, কোনো কিছুর অনুসন্ধানও করে না; নিজেদের আল্লাহর আইনের দারোয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই তাদের যত স্বার্থকতা। তাদের ক্ষমতা জ্ঞানে নয়, জ্ঞানের সীমা নির্ধারণে।

তৌহিদি জনতার পিছনের সামাজিক ইতিহাসটা আমাদের জানা। এর শিকড় আছে দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা দুটি বিচ্ছিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। বাংলাদেশ উত্তরাধিকারসূত্রে দুটি পরস্পর-বিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অধিকারী হয়েছিল: একটির ভিত্তি ছিল প্রথাগত ইসলামি পাঠ্যক্রম, যা ক্রমশ রক্ষণশীল হয়ে আধুনিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল; আর অন্যটির ভিত্তি ছিল ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, যা ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের প্রবর্তন ঘটালেও ঔপনিবেশিক শাসনের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষত ও বৈষম্যকে বহন করছিল। এই দুই জগতের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনৈটিক ইতিহাস সেই বিভাজনকে আরও গভীর করেছে। সামরিক শাসনের সময়ে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের অংশ হিসেবে একে ব্যবহার করা হয়েছে।

যদিও তৌহিদি জনতার রাজনৈতিক উত্থানের পথ হাসিনা সরকারই নানাভাবে তৈরি করেছিল এবং একধরনের কৃত্রিম ছিপি এঁটে তাদের উগ্রতাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর সেই ছিপিটা খুলে যায়। এরপর প্রবল স্রোতের বেগে তৌহিদিরা আত্মপ্রকাশ করে। এতদিন যেসব বিষয়কে তারা রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না, সেগুলোর ওপর সরাসরি আঘাত হানার সুযোগ তারা পায়। আধুনিক সমাজের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে সমাজটাকেই তারা নিজেদের গুহাবাসী প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরিয়ে নিতে চায়। যখন দেখে যে সমাজের বড় অংশ তাদের ধারণা গ্রহণ করছে না, তখন সেই ক্ষোভ মবের আকারে প্রকাশ করে।

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেটা কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা, সেটা হলো এই তৌহিদি জনতার সাথে ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত এলিটদের আঁতাত হওয়া। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার শুধু এই তৌহিদিদের সমর্থনও জোগায়নি, তিনি এদেরকে নিপুণতার সাথে স্ট্র্যাটেজিক সম্পদের মতো ব্যবহার করেছেন।

তৌহিদিদের সবচেয়ে ঘৃণার বিষয় হল বাঙালি সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গান, গল্প, কবিতা, নাটক - এসব। আর এসবের চর্চা করে সেক্যুলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সমাজের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এই পরিসর তৌহিদি জনতা কিংবা এলিট শ্রেণির - কারও কাছেই প্রয়োজনীয় নয়। তৌহিদিদের চিন্তার ফ্রিকোয়েন্সি বাউল গান বা লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছায় না। আবার এলিটদের মাথা জ্ঞান দিয়ে এত পরিপূর্ণ যে তাদের ফ্রিকোয়েন্সি লালন-রবীন্দ্রনাথের অনেক উপর দিয়ে যায়। ফলে দুই পক্ষের পথ আলাদা হলেও, বাঙালির সাংস্কৃতিকে ঘৃণার বিষয়ের জায়গাটি তাদের আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। তৌহিদি জনতা যখন সেই সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে, তখন এলিটরা সেই সুযোগে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ পুরণ করে।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই, যখন ষণ্ডা প্রকৃতির এক লোকের নেতৃত্বে তৌহিদি জনতার একটি দল রাস্তায় সিগারেট খাওয়ার অপরাধে দুজন মেয়েকে মারধর করেছিল, তখন সাংবাদিকদের কাছে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সেই তৌহিদিদের পক্ষ নিয়েই কথা বলেছিলেন। তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, তৌহিদিদের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না; তারাই এখন মাঠের শক্তি।

এরপর ছায়ানট ও উদীচীর ওপর হামলা এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পরও একজন উপদেষ্টাকে দেখেছিলাম, মিনমিনিয়ে তৌহিদি কর্মকাণ্ডকে অনেকটা স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করতে।

তৌহিদি জনতার সাথে এলিট শ্রেণির যে আঁতাত তৈরি হয়েছে, তার আরেকটি ব্যাখ্যা হতে পারে এই গুণ্ডাবাহিনী আসলে এলিট শ্রেণিরই এক ধরনের "অল্টার ইগো" বা দ্বিতীয় সত্ত্বা। এলিটেরা ঔপনিবেশিক শিক্ষার ফসল; ফলে তাদের ভেতরে ঔপনিবেশিক বর্ণবাদ, ধর্মান্ধতা এবং মব-মনস্তত্ত্বের কিছু উপাদান গভীরে রয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যখন সুযোগসন্ধানীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হল, জনমানুষের ক্ষতি করে নিজেদের লোভ চরিতার্থ করার সুযোগ এল, তখন এলিটদের সেই সুপ্ত বর্ণবাদ, ধর্মান্ধতা ও মব-মনস্তত্ত্বও প্রকাশ্যে বেরিয়ে পড়ল।

বর্তমান বিএনপি সরকারও ইউনূসের দেখানো পথেই হাঁটছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তার উদাহরণ। ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা পুলিশ লাইন্সে ঢুকে পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা করে। কিন্তু হামলাকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় না এনে তিনজন পুলিশ কনস্টেবলকে শাস্তি দেওয়া হয়।

পরদিন কিশোরগঞ্জে ধর্মীয় সংগঠনের আপত্তির মুখে একটি কনসার্ট বন্ধ হয়ে যায়। তাদের আপত্তি ছিল, অনুষ্ঠানটি শরিয়তবিরোধী। কিন্তু সরকার অনুষ্ঠান বাতিলের কারণ হিসেবে দেখায় প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকা।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১৮
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই প্রথম খাল বাবার পলিটিক্যাল ম্যাচুরিটির নিদর্শন পেলাম

লিখেছেন অপলক , ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪

২০১০ সালে ফেব্রুয়ারীর ২২ তারিখ। মেয়েলি ব্যাপার বলি, প্রতিহিংসার ব্যপার বলি অথবা পলিটিক্যাল ইমম্যাচুরিটির কথা বলি, বাংলাদেশ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নতুন করে আকীকা দিয়ে নাম রাখা হয়েছিল হযরত শাহজালাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাষণময়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১


বিশ্বাসগুলো হাবুডুবু খাচ্ছে
ভাগ্যের কম দোষটার হাত
ঝাঁকনি কম নেই তো- তাহলে
বিশ্বাসগুলো মরে যাচ্ছে এই;
মাটির আনন্দটা শুধু ফুল গন্ধ
নাকের সুসংবাদ যে দৌড়াচ্ছে
রাতের ঘুমটা যেনো স্বপ্নবিরল কষ্ট
ভোরের শিশির গড়ে না আর শক্ত;
তবু নিশ্বাসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=শরত তুই যাস নে ! =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৩



ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস জীবনে কেবল বৃষ্টির হাপিত্যেশ,
মেঘ বলেছে আসবো আসবো আমার উদ্দেশ,
শুভ্র মেঘেদের নাচন
উত্তাপ হাওয়ায় যায় না আর বাঁচন,
তবুও স্নিগ্ধ আবেশ মনজুড়ে,
হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা, বাজে পাতার বাঁশি সুরে।

বিকেলের হাওয়ায় দেহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ কোটি চাকরি: শর্ত প্রযোজ্য, মেধার প্রবেশ নিষেধ !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:২৫


ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×