যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক
(আগের কিস্তির পর)
[গাঢ়]চার. [/গাঢ়]
1.
আবদুর রাজ্জাক ভেবেছিল নদীপথে তাকিয়ে রাতটি পার করে দেবে। একটি অসমাপ্ত, মলিন চাঁদ উঠেছে আকাশে, তার শতখণ্ড ছায়া পড়েছে নদীতে, কিছুটা বাতাস দিচ্ছে, ধুলো উড়িয়ে--এমন বাতাস যা মানুষকে সহজে অসুখী করে। আর আবদুর রাজ্জাকের মনে পড়ল ছিন্নপত্রর সেই চিঠিটার কথা, শিলাইদহ থেকে বৃহস্পতিবার, 3 ভাদ্র 1892 সালে যা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কাকে কে জানে, যা এখন আবদুর রাজ্জাক একটুখানি দরদ দিয়ে আবৃত্তি করতে শুরু করল "বেশ লাগছে। 'কী জানি পরান কী চায়' বলতে লজ্জা বোধ হয় এবং শহরে থাকলে বলতুম না, কিন্তু ওটা ষোলো আনা কবিত্ব হলেও এখানে বলতে দোষ নেই।"
আবদুর রাজ্জাকের পেছনে খড় খড় শব্দ হল, এবং অন্ধকার থেকে একজন মানুষের গলা শোনা গেল, 'কেডা ও?'
আবদুর রাজ্জাক আবৃত্তি থামিয়ে, উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকালো পেছনের অন্ধকারের দিকে। একজন মানুষের আদল দেখা যাচ্ছে।
'কার লগে কতা কন ভাই' লোকটি জিজ্ঞেস করল। 'কারো সঙ্গে না রে ভাই, কথা বলি প্রকৃতির সঙ্গে।' বলল আবদুর রাজ্জাক এবং নদীকে শুভরাত্রি জানিয়ে স্থানত্যাগ করল।
লোকটিও এসেছে প্রকৃতির ডাকে, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্যে। এ-লোকটির সঙ্গে পরের দিন আমাদের আবার দেখা হবে--এর আগেও একবার হয়েছে। লোকটি ট্রাক চালক আবদুল খালেক।
2.
হাশেম বলল আবদুর রাজ্জাককে, মন খারাপ কইরা কী করবেন, এহন ঘুমাইয়া পড়েন।
হারিকেনের সামান্য আলোয় সে আবদুর রাজ্জাকের চোখে পানি দেখেছে, যেমন আবদুর রাজ্জাক দেখেছে চাঁদের আলোয় পদ্মার পানি। উভয়ই চিক চিক করে।
কিন্তু শুতে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক দেখল, মশারি নেই, যদিও মশা প্রচুর, নদীর তীরে মশা তার পিছু নিয়েছিল, কিন্তু হাঁটছিল বলে কাটতে পারেনি। এখন তাদের পুঞ্জিত অভিলাষ তারা চরিতার্থ করছে।
হাশেমের ভাগে একটা বেঞ্চ, আবদুর রাজ্জাকের দুটো। স্থান : প্রাগুক্ত চায়ের দোকান। আবদুর রাজ্জাক অবাক হয়, নদীর বাতাসেও মশারা স্থানচু্যত কেন হয় না, তা ভেবে; তার ধারণা হল, বিবর্তনের অবধারিত নিয়মে পদ্মা পারের মশারা বাতাসের প্রতিকূলে নিজস্ব স্থান অাঁকড়ে থাকার কৌশলটি রপ্ত করে নিয়েছে। এটি করতে গিয়ে মশাদের কত প্রজন্ম লেগেছে, সে হিসেব করতে তার ইচ্ছে হল, বিবর্তনবাদী মশারা এখন ডিডিটি বা ফেনাইলে কণামাত্র আক্রান্ত হয় না, সে দেখতে পেয়েছে। এই জ্ঞানটি তাকে প্রকারান্তরে মানবজাতির টিকে থাকার ব্যাপারেও আশান্বিত করেছে, এজন্য তার এক ধরনের সহানুভূতিই বরং আছে মশাদের প্রতি। এতদিন অন্তত ছিল, কিন্তু এখন?
বেঞ্চে শুয়ে তার মনে হল ডুরি আঙ্গুল লেনের তার বাসার রোয়াকে যেন সে শুয়ে আছে। ডুরি আঙ্গুল লেন পুরোনো ঢাকায়, যদি আমাদের জিজ্ঞেস করেন।
রাজ্জাকের জন্য কোনো তোষক, বালিশ নেই, একটি চাদরও নেই। হাশেমের জন্যও। কিন্তু ছেলেটির কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। 'হাশেম?'--সে ডাকল। কিন্তু তার সাড়ার জন্য অপেক্ষা না করেই জিজ্ঞেস করল, 'তোর কষ্ট হয় না এই কঠিন বেঞ্চে শুতে? এই মশার আক্রমণ সয়ে এভাবে ঘুমোতে?'
হাশেম উঠে বসল, সে কম কথার মানুষ। হাঁ না কিছু বলল না। বেঞ্চের নিচ থেকে একটি আধপোড়া কয়েল বের করে জ্বালালো। সেটি রাখল আবদুর রাজ্জাকের পায়ের কাছে। বলল, 'আর মন খারাপ কইরেন না, এইবার ঘুমান।'
পদ্মা থেকে একদল বাতাস এসে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল চায়ের দোকানে। আবদুর রাজ্জাকের মনে হল, নিদ্রাদেবী তাকে ডাকছেন।
3.
খবরটা আবদুল খালেক জানালো প্রথমে, আজ বাস স্ট্রাইক। মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল আবদুর রাজ্জাকের। সেকি! সাপাহার যাওয়া হবে না? ঢাকা ফিরে যেতে হবে? আবার সেই ফকিরের পুলে?
পাবনায় পুলিশের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়েছে গত সন্ধ্যায়, একজন ড্রাইভার গুলিতে মরেছে। আবদুর খালেকের ভাষ্য মত, বিষয়টা জটিল।
আবদুর রাজ্জাক ভাবছিল, চা খেয়ে সাপাহারের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়বে। সকালের তাজা আলোয় তার ভিতরটা চনমন করছে। অসংখ্য ফুলকি দিয়ে যেমন চায়ের দোকানের প্রথম চুলোটা জ্বলে ওঠে, উত্তাপ ছড়ায়, একটি আনন্দিত উত্তাপ তার শিরাগুলিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এখন, এই দুঃসংবাদ শুনে সে মাথায় হাত দিল।
'মাথায় হাত দেয়া' একটি কথার কথা; আবদুর রাজ্জাক আসলে হাত দিয়েছে তার বুকে : সেখানে গুঞ্জন হচ্ছে। কিছু অবাধ্য কণ্ঠ কোলাহল করছে, ঢাকায় না ফিরে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু বাস না হলে যায় সে কীভাবে?
এখান থেকে কোনো ট্রেন আছে, সাপাহারের? সে জিজ্ঞেস করল, আবদুল খালেক, হাশেম, অথবা যে-ই শুনুক, তাকে, অনির্দিষ্টভাবে। প্রশ্নটি এতটা অভৌগলিক যে, কেউ কোনো উত্তর দিল না। শুধু চায়ের দোকানের আজকের সর্বপ্রথম খদ্দেরটি--আবদুর রাজ্জাককে আমরা এ মুহূর্তে খদ্দের হিসেবে দেখছি না--আপন মনেই হেসে উঠল।
হাশেম দ্বিতীয় এক কাপ চা দিয়ে গেল আবদুর রাজ্জাককে, এ চায়ে প্রচুর দুধ দিয়েছে বালকটি। সে বলল, মন খারাপ কইরেন না, একটা ব্যবস্থা হইয়া যাইব।
হাশেম এখনও আবদুর রাজ্জাকের চোখে পানি দেখছে, কেন দেখছে সে-ই বলতে পারে। আবদুর রাজ্জাকের মন খারাপ হলেই বা কী, না হলেই বা কী? তার কী আসে যায়? তবুও সে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আবদুর রাজ্জাক বলল, কী ব্যবস্থা ভাই?
হাশেম আঙুল তুলে দেখালো আবদুল খালেককে। উল্টোদিকের বিড়ি-সিগারেটের দোকানে ঝুলানো জ্বলন্ত দড়ি থেকে বিড়ি ধরাচ্ছিল আবদুল খালেক। 'ওস্তাদরে বলেন' বলল হাশেম, 'ওস্তাদ আইজ নওগা যাইবে।'
আবদুর রাজ্জাকের দূরবর্তীভাবে মনে পড়ল, নওগা থেকে সাপাহার দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু আবদুল খালেক তো ট্রাকের ড্রাইভার।
'নওগা কেন যাবেন ভদ্রলোক?' সে জিজ্ঞেস করল হাশেমকে। হাশেম অবাক চোখে তাকালো। মানুষ নওগাঁ কেন যায়, এ প্রশ্নের কী উত্তর তার কাছে আছে? মানুষের যাতায়াতের রহস্য উন্মোচন করে, একটি বালকের সে শক্তি কোথায়?
সে শুধু বলল, ওস্তাদেরে জিগাইবেন না। সমস্যা হইব। অগত্যা আবদুল খালেকের ট্রাকেই উঠে বসল আবদুর রাজ্জাক, তবে সামনে নয়। সামনে পাঞ্জাবী ও সাদা লুঙ্গি পরা, চামড়ার একটি হাত ব্যাগসহ পরিপাটি চেহারার একজন মানুষ বসল। তার গায়ে আতরের খুশবুর সঙ্গে জড়ানো কতর্ৃত্বের গন্ধ।
কতর্ৃত্বের গন্ধ? কথাটা আমরা কোথায় যেন শুনেছি? না, আবদুর রাজ্জাকের কাছে গতকালের স্মৃতিরা সব মৃত; গতকালের প্রবচনওলা আজ একটি অপচ্ছায়া মাত্র, তার কাছে; সভ্যতার একটি অস্পষ্ট গ্ল্লানি। আজ সকালে প্রকৃতি উদার, আকাশ অবারিত কিন্তু ট্রাকের পেছনে গাদাগাদি মালপত্র, তার একপাশে, আট দশজন মানুষের সঙ্গে আবদুর রাজ্জাক, প্রাগুক্ত এয়ারব্যাগ হাতে দণ্ডায়মান। দণ্ডায়মান, কারণ বসার প্রবৃত্তি হচ্ছে না, কাঠের পাটাতন অসম্ভব ধুলিমলিন; তাছাড়া একটি মুরগির খাঁচা প্রায় এক ডজন মুরগি সমেত তার পায়ের কাছটাতে রাখা। হাশেমের বস চায়ের দোকানদার--হাশেমের মতই তাকে সাবধান করে দিয়েছে। অযথা প্রশ্ন করবেন না, কৌতূহল দেখাবেন না, পুলিশ জিজ্ঞেস করলে একটা দশ টাকার নোট মেলে দেবেন তার সামনে।
চোরাচালানের মাল কি যাচ্ছে এই ট্রাকে, ভারতের পথে? এ সম্ভাবনাটি মনে আসতেই তার গা গুলিয়ে উঠল।
গুলিয়ে ওঠার আরেকটি কারণ আছে। পাঁচ ছ'জন দেহাতী' মেয়েলোক, দুটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ও একটি শিশু তার সহযাত্রী। এদের মধ্যে সেই শিশুটি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে এক নাম্বার কাজটি করেছে ওই ট্রাকেই, চলন্ত ট্রাকেই। হা ঈশ্বর!
হাশেমকে পর্যাপ্ত ধন্যবাদ জানানো হয়নি; ছেলেটি এমন একটা ভাব করে ছিল যে, আবদুর রাজ্জাক তার ধারেকাছে আসলে মহা ক্ষতি হয়ে যাবে তার কাজ কর্ম বন্ধ হয়ে যাবে; আর দোকানী মশগুল ছিল বাস চালক হত্যার বর্ণনা শুনতে যার মূলে, এক খদ্দেরের ভাষ্যমত তরুণীঘটিত ব্যাপার ছিল--আবদুর রাজ্জাকের সাধ্য ছিল না এই জমজমাট আখ্যান থেকে দোকানীর দৃষ্টি অন্যত্র সরায়, ধন্যবাদ শ্রবণের মত এক মামুলী বিষয়ে; এ জন্যে সে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিল; নগরবাড়ী ঘাট মাত্র মাইল দশেক যাওয়া হয়েছে; এরি মধ্যে শিশুটির এই জৈবিক কর্ম!
তার ইচ্ছা হল, দু'হাত দিয়ে শিশুটিকে ছুড়ে ফেলে দেয় রাস্তায়। 'দেহাতী' মেয়েগুলি যাচ্ছে নওগা, কাজের সন্ধানে; তারা দৃশ্যতই দরিদ্র, কিন্তু এত নোংরা কেন? আবদুর রাজ্জাক নিজেকেই জিজ্ঞেস করে। তাদের কাপড়- চোপড় থেকে ভ্যাপসা গন্ধ বেরুচ্ছে যার সাথে মুরগির খাঁচার অবিশ্বাস্য দুর্গন্ধ যুক্ত হচ্ছে এবং এই পর্বে যার সঙ্গে আরো যুক্ত হয়েছে মানবশিশুর প্রাতকালীন বর্জ্য। হা ঈশ্বর! মানুষ কি কখনো বিবর্তনের এই পুতিগন্ধময় স্তর থেকে উঠতে পারবে না একটু ওপরে, এই বঙ্গদেশে? মেয়ে মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে অাঁতকে ওঠে আব্দুর রাজ্জাক। ভাঙা চোয়াল; মৃতপ্রায় চোখ; গভীর কোটর প্রবাসী, চুল, দাঁতে পানের করাল দাগ। কত বয়স তাদের? পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ? পঁচিশ বছরের মেয়েটির দিকে তাকালো আবদুর রাজ্জাক। কিছু কি আছে মেয়েটির? আবদুর রাজ্জাকের নারী সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা কম, তবুও তার মনে হল, যেন একটি ছায়া মাত্র, মেয়েটি যেন পরিপূর্ণা কোনো নারী নয়। তার হঠাৎ মনে পড়ল মণ্ডলের স্ত্রীর কথা, ফারিহা নাতাশা আলম থেকে মেয়েটি কি খুব বড়? ব্রাত্য এ বিষয়ে খোলামেলা কিছু কথা বলতে পারত, আমাদের প্রজন্ম নারীদের বর্ণনায় একটু রাখঢাকের পক্ষপাতি--কিন্তু ব্রাত্য এ মুহূর্তে হবিগঞ্জে; সাজ্জাদ শরিফ ও আহমদ ছফাসহ গিয়েছে চুনারুঘাটে একটি সাহিত্য সম্মেলনে। আমাকে মার্জনা করবেন, দেহাতী মেয়েটিকে মোটেও আকর্ষণীয় কোনো আলোয় স্থাপন করতে না পারায়। এজন্যে কিনা, জানি না, আবদুর রাজ্জাক অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। তার এই অস্বস্তির একটি ভাল বাংলা আছে বিবমিষা। কথাটি সে নিয়েছে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় মারফত সমর সেন থেকে। সে ট্রাকের কিনার ধরে রাস্তায় বমি করতে থাকল।
দেহাতী মেয়েটি এবার এগিয়ে আসল, আপনার খারাপ লাগতাছে? সে জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠ এতটা কোমল যে, ট্রাকের চাকায় তা পিষ্ট হয়ে গেল।
উত্তর না দিয়ে পুনর্বার মুখ ভরে বমি ফেলল আবদুর রাজ্জাক। 'দেহাতী' মেয়েটি এবার শিশুটিকে এক হাতে তুলে বয়স্কা দু'মহিলার একজনের হাতে দিয়ে, সাবধানে পা ফেলে এসে দাঁড়ালো আবদুর রাজ্জাকের কাছে। তার কুঁজো হয়ে যাওয়া পিঠে সে এবার জোরে জোরে হাত চালাতে লাগল। মানুষ, আশ্চর্য, এখনো বিশ্বাস করে পিঠে মালিশ করলে বমি বন্ধ হয়ে যায়। হা!
কিন্তু আবদুর রাজ্জাকের বমি বন্ধ হয়ে গেল। এবার তার মনে হল; এর চেয়ে, এই বিবমিষার চেয়ে ট্রাকের নিচে চাপা পড়াতেও অনেক বেশি স্বস্তি।
ভ্যাপসাগন্ধী মেয়েটি আবারো সাবধানে পা ফেলে, স্তূপ করা জিনিসপত্রের পাশ দিয়ে একটুখানি খালি জায়গাতে টেনে নিয়ে গেল আবদুর রাজ্জাককে। সেখানে ধূলিমলিন পাটাতনটি নিজের ময়লা অাঁচল দিয়ে ঝেড়ে দিয়ে সে আবদুর রাজ্জাকের ব্যাগটি সযত্নে রাখল। বলল, এই ব্যাগে মাথা দিয়া কাইত হইয়া থাহেন একটু।
বাধ্য একটি বালকের মত তা-ই করল আবদুর রাজ্জাক। কাৎ হয়ে গিয়ে প্রায় শুয়েই পড়ল এবং গরম কড়াইয়ে যেমন খইরা আছাড় খেতে থাকে, তেমনি আছাড় খেতে খেতে আবদুর রাজ্জাক চলতে লাগল সাপাহার অভিমুখে এবং সমস্ত শরীর অবশ হতে থাকল। আবারো সে শুনল নিদ্রাদেবীর আহ্বান।
কিন্তু চোখ বন্ধ হওয়ার আগে সে দেখল দেহাতী মেয়েটি শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসেছে ট্রাকের রেলিং-এ হেলান দিয়ে এবং ক্লান্তভাবে তাকাচ্ছে তার দিকে। শিশুটি নির্বিকার, কিন্তু মেয়েটি খুব হাল্কা হাসছে, একটি ভাল কাজ করতে পেরে যেমন মানুষ হাসে।
অবদুর রাজ্জাকের মনে হল, এত সুন্দর হাসি ফারিহা নাতাশা আলমকেও সে হাসতে দেখেনি জীবনে। এত সুন্দর দুটি চোখ--
একটুও বাড়িয়ে বলছি না আমি। ঠিক এই অনুভূতি খেলা করেছে আবদুর রাজ্জাকের মনে, ওই সময়ে; তার পূর্বতন শিশুঘাতী চিন্তাকে সম্পূর্ণ স্থানচু্যত করে।
আর শিশুটি?
শিশুদের নিয়ে বেশি কথা বলা উচিৎ নয় এরকম উপন্যাসে। এটি শিশু উপন্যাস নয়, জনাব। শিশুদের নিয়ে আলাদা উপন্যাস আছে। পড়ে দেখতে পারেন।
4.
নওগাঁ এসে যখন ঘুম ভাঙল আবদুর রাজ্জাকের, দেখল ট্রাকের কোথাও কেউ নেই। না দেহাতী মেয়েগুলো, না শিশুটি, না মুরগির খাঁচাটি। পরে নিশ্চয়ই কোথাও থেমেছিল ট্রাক এবং মানুষ-মুরগিরা নেমে পড়েছে। সে মাথা তুলে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করল। কোথায়, তা দেখার জন্যে। তার মনে হল রোদে সারা গায়ে ফোস্কা পড়েছে, নওগাঁ বলে কথা! শরীরের একটি হাড় অবশিষ্ট আছে বলে তার মনে হল না; সে নিজের শরীরের ঘ্রাণ নিতে গিয়ে দেখল অকথিত দুর্গন্ধ মেখে গেছে তার সারা অঙ্গে।
সে আবদুল খালেকের কণ্ঠ শুনতে পেল, এবার নামতে হয়, ভাই সাহেব।
প্রবল পরিশ্রম করে নামল আবদুর রাজ্জাক; তার প্রচণ্ড তেষ্টা পেয়েছে। তবুও, অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাতে ভুলল না আবদুল খালেককে। আবদুল খালেক অস্পষ্ট হাসল, কী জন্যে কে জানে কারণ আবদুর রাজ্জাকের দেহশ্রীও এ মুহূর্তে যথেষ্ট উপভোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে অপরিচিতজনের হাসির উদ্রেক হলেও হতে পারে। সে হাত দিয়ে রাস্তার অপর পারে একটি অনির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে বলল, সাপাহারের বাস পাইবেন, ওইহানে।
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে 'ওইহানের' উদ্দেশে হাঁটা দিল আবদুর রাজ্জাক। আপাতত একটা শীতল পানীয়, কোক অথবা পেপসি খেতে হবে। কোক অথবা পেপসি? নাহ্। আবদুর রাজ্জাকের মনে হল, আজ তাকে ডাব খেতে হবে। কচি ডাব। অনেকগুলো এবং তাতেই বহু বছরের সঞ্চিত তৃষ্ণা তার নিবারণ হবে।
5.
কুললক্ষী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পাঁচু ময়রা, যাকে বলে, শিক্ষিত লোক। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। অসামপ্রদায়িক এবং এ কারণে তার মিষ্টির দোকানের একটা অংশে চায়ের ব্যবস্থা সে করেছে, যাতে স্থানীয় প্রগতিশীল যুবকেরা সন্ধ্যাবেলাটা ওখানে আড্ডা মেরে কাটাতে পারে। পাঁচু ময়রা আওয়ামী লীগে ভোট দেয়, কিন্তু ছাত্রদলের ছেলেদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক আছে। তাদের নানা অনুষ্ঠানে মুক্ত হসত্দে চাঁদা দেয়। তাছাড়া, তার মিষ্টান্ন-কাম-চায়ের দোকানে সাপাহার কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপকরাও বসে আড্ডা দেন। এটি তার জন্যে শ্লাঘার বিষয়।
আজ সকালেই করুণানিধি এসেছিল তার দোকানে, সঙ্গে ঢাকা থেকে আসা পাঁচ দলের একজন নগর কমিটি পর্যায়ের নেতা। গতকাল রাশেদ খান মেননের জনসভা ছিল। পাঁচু ময়রা দেখে আনন্দিত হয়েছে যে, জননেতা মেনন এখন পুরোপুরি সুস্থ। আততায়ীর গুলিতে তিনি যদি প্রাণ হারাতেন, তাহলে কী যে হত! ভাবতে পারে না পাঁচু ময়রা।
বেশিক্ষণ তাকে অবশ্য ভাবার চেষ্টাও করতে হয় না। তার দোকানে উদয় হয় আবদুর রাজ্জাক। তার আলুথালু বেশ দেখে বিস্মিত হয় সে, কিন্তু গোপন করে জিজ্ঞেস করে, কাকে চান, ভাইসাহেব?
আবদুর রাজ্জাক ঢাকা থেকে আসার সময় ইত্তেফাক-এর বিজ্ঞাপনটা কেটে এনেছিল সঙ্গে। এখন সেটি খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু কথাগুলো মনে ছিল। 'আপনার নামে একটা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল ইত্তেফাক-এ তাই না? বিবাহ-সম্পর্কিত?' সে জিজ্ঞেস করে।
'আজ্ঞে।' পাঁচু ময়রা বলে, 'আমার দু'মেয়ের।' আবদুর রাজ্জাকের অবিশ্বাস বাড়ে। 'আপনার দু'মেয়ের?'
আমার মেয়ে কি হতে নেই? সে জিজ্ঞেস করে। হলই বা তারা সরফরাজ খানের। কিন্তু সাপাহারের কোন মেয়েটি আমার নয়? বলুন?
আবদুর রাজ্জাকের মনে হল, লোকটি নিতান্তই কথাপ্রিয় এবং আবেগপ্রবণ, অথচ চুটিয়ে ব্যবসা করছে সাপাহারে। কীভাবে সম্ভব? 'ভাইসাহেব, আপনি সৌভাগ্যবান। মেয়ে দুটিকে যদি দেখেন, সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হবে কাকে পছন্দ করবেন। পরমা সুন্দরী। ডানা কাটা পরী।' সে বলল আবদুর রাজ্জাককে।
'ও' বলল আবদুর রাজ্জাক, প্রায় নিস্পৃহভাবে এবং তাকালো আলমারিতে সাজানো মিষ্টির থালাগুলোর দিকে, হঠাৎ তার মনে পড়ল, কিছু মিষ্টি কিনে নিতে হবে। বস্তুত মিষ্টি কেনার পয়সাও দিয়েছে মণ্ডল। কিন্তু পয়সার কথায় তার মনে পড়ল পয়সা হারানোর কথা; তার মুখে বিষণ্নতা ভর করল।
'খুব কষ্ট হয়েছে এখানে আসতে?' আবারও জিজ্ঞেস করল আবেগপ্রবণ পাঁচু ময়রা। 'কোত্থেকে এসেছেন?'
'ঢাকা থেকে' সে বলল এবং সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল পাঁচু ময়রাকে, 'এগুলো কি কাচাগোল্ল্লা?'
আজ্ঞে--
আমাকে এক কেজি দেবেন?
পাঁচু ময়রা জানে, সরফরাজ খানের বাসায় কাচা গোল্লার প্রবেশ নিষেধ। সে ভেবে নিল, রাজ্জাককে সে এক কেজি মণ্ডা গছিয়ে দেবে; যাই হোক না কেন, প্রথম সাক্ষাৎটি প্রীতিময় হওয়া চাই। মণ্ডায় সরফরাজ খানের আপত্তি নেই, বস্তুত কাচাগোল্ল্লা ছাড়া আর কোনো মিষ্টিতেই নেই।
কেন?
সবই বলছি, ধৈর্য্য ধরুন, যেমন আবদুর রাজ্জাক ধরছে। সে ভাবছে, হাত মুখ ধুয়ে, কিছু খেয়ে, চুল টুল অাঁচড়ে, ভদ্রস্থ হয়ে যেতে হবে সরফরাজ খানের বাড়ি। কাজেই ময়রার আবেগপ্রবণ কথাবার্তা কিছুক্ষণ তাকে সহ্য করতে হবে।
6.
পাঁচু ময়রা মণ্ডার প্যাকেটটি আবদুর রাজ্জাকের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, 'আমি দুঃখিত, দাদা। কাউকে সঙ্গে দিতে পারছি না। তবে ওই মাঠটা পার হয়ে, ওই যে গরু চরছে, তাদের পাশ দিয়ে, একটু এগিয়ে গেলেই পাবেন একটা কলাবাগান। জায়গাটার নাম দীঘাপাতিয়া। আর সরফরাজ খানের বাড়িটার নাম রাজবাড়ি।'
দীঘাপাতিয়া? রাজবাড়ি? সে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে।
এই ইপ্সিত প্রশ্নে আনন্দিতই হয় পাঁচু ময়রা। সে অনেকক্ষণ ধরে দীঘাপাতিয়া রহস্যের ইতিহাস বর্ণনা করে, ভূগোল বর্ণনা করে, রাজনীতি বর্ণনা করে। কিন্তু আপনাদের যেমন, আমাদেরও তেমনি, ধৈর্যচু্যতি ঘটে পাঁচু ময়রার আবেগধর্মী দীর্ঘ বয়ানে। এজন্যে এ মুহূর্তে তার কথার একটি সারাংশ উপহার দিচ্ছি এইখানে। আর ভবিষ্যতে, নেহায়েত প্রয়োজন না হলে, পাঁচু ময়রাকে উপস্থাপিত করব না এই মর্মে অঙ্গীকারও করছি। ই এম ফর্স্টার তার প্রাগুক্ত গ্রন্থে বলেছেন, আবেগপ্রবণ গৌণ চরিত্র থেকে লেখকদের সাবধান থাকতে হবে। তিনি কোনো উদাহরণ দেননি। আমাদের উপন্যাসটি যদি তিনি পড়তেন, একটি চমৎকার আবেগপ্রবণ গৌণ চরিত্রের সাক্ষাৎ তিনি পেয়ে যেতেন, যাক সে কথা।
7.
[ইটালিক] সরফরাজ খানের পূর্ব-কথা ও দীঘাপাতিয়া রহস্য [/ইটালিক]
ক. দেখা যাচ্ছে দীলিপ কুমার ওরফে ইউসুফ খানের মত সরফরাজ খানের পূর্বপুরুষও পেশোয়ার থেকে আগত। তবে সরফরাজ খানের পিতামহের সিনেমায় অভিনয়ের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন ঘোড়ার ব্যবসা করতে। তিনি অবগত ছিলেন, ঘোড়ার ব্যবসা করতে এসেই ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বঙ্গবিজয় করেছিলেন। কোনো হর্স পাওয়ারের কাছে কোনো রাষ্ট্রীয় পাওয়ারের আত্মসমর্পণের এটি একটি বিরল ঘটনা। কিন্তু ইউসুফ খানের (সরফরাজ খানের পিতামহ) বঙ্গ বিজয়ের অভিলাষও ছিল না। তার বাংলায় আসার অবশ্য আরেকটি কারণ ছিল, সাপ বিষয়ে তার প্রচণ্ড কৌতূহল ছিল, তার স্ত্রী নিলো বানু যেমন সাপকে ভয় পেতেন, তেমনি ইউসুফ খান ভালবাসতেন সাপদের। এজন্যে নিলোর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়িও হয়। যাক সে কথা। কিন্তু যাক বল্লেই কথা কি চলে যায়? না; তাহলে discourse theory শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ত। ইউসুফ খান নিলো কতর্ৃক পরিত্যক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ তাকে আরো নিবিড়ভাবে ডাকতে থাকল। তিনি আর দেরি না করে কুড়িটি তুর্কী ঘোড়া নিয়ে বাংলাদেশ, তথা নাটোরে এসে উপস্থিত হলেন। নাটোরের রাজা তখন জয়সিংহ অথবা সূর্যবিক্রম অথবা অন্য কেউ; নাম নিয়ে আমাদের গবেষণার প্রয়োগ নেই। রাজা ঘোড়া দেখে পাগল হয়ে গেলেন; কুড়িটি ঘোড়ার বদলে ইউসুফ খানকে একশ বিঘা জমি এবং রাজবাড়িতে প্রধান সহিসের চাকরি দিলেন। ইউসুফ খান সুদর্শন মানুষ ছিলেন; তিনি রাজবাড়ির নেজারতি অফিসার বিমল ভূষণের কন্যাকে সময়ে আকৃষ্ট করলেন এবং এক জলঝড়বিদু্যৎঘন রাত্রিতে তাকে বিবাহ করলেন। পরদিন রাজবাড়ি থেকে তার চাকরি গেল বটে, কিন্তু রাজা একটি চোখ বন্ধ করে ইউসুফ খানের একশ বিঘা জমির মালিকানা জারি রাখলেন। রাজা তার চাকরি খেলেন সামাজিকতার কারণে, কিন্তু ইউসুফ খানকে নাটোরে রেখে দিলেন তার অশ্বনেশার কারণে।
খ. দিন গেল। সরফরাজ খানের জন্ম হল ইউসুফ খানের পুত্র ইমরান খানের গৃহে, এক আলোময় দিনে, দিনটিকে অধিক আলোকিত করে। আরো দিন গেল। কিন্তু ইতোমধ্যে সাপদের সঙ্গে তার ভালবাসা পিতামহের ভালবাসা থেকেও প্রগাঢ়তর হল। কুড়ি বছর বয়সেই সরফরাজ বিখ্যাত হয়ে উঠলেন সর্পরাজ হিসেবে। তার মত ওঝা ত্রিভুবনে কেউ আছে, এমনটি মনে করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ালো।
নাটোরের রাজবাড়ি একদিন সরকারের দখলে গেল, পাকিস্তানী সরকারের। তার পিতামহের জমি, তার নিজস্ব অধিকারের জমি, রূপান্তরিত হল খাস জমিতে। এক রাত্রির মধ্যে সরফরাজ খান পরিণত হলেন ভূমিহীন-এ।
সরকার থেকে যে ক্ষতিপূরণ পেলেন, সে টাকা সম্বল করে তিনি বেরিয়ে পড়লেন ভাগ্যান্বেষণে।
তার সংকল্প, 'যেখানে প্রথম সাপে কাটা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলব, সেখানেই ডেরা গাড়ব।' দ্বিতীয় সংকল্প 'যতদিন দীঘাপাতিয়া পুনরুদ্ধার না হবে, যতদিন না ফিরে আসবো নাটোরের কোলে, ততদিন কাচাগোল্ল্লা খাবো না।'
ভাগ্যক্রমে, সেই স্থানটা হয়ে দাঁড়ালো সাপাহার। আমরা সবিনয়ে জানাচ্ছি, সাপাহার নামটি আমরা মেটেও এজন্যে গ্রহণ করিনি যে এতে সাপের সাথে একটি গভীর যোগাযোগ আছে।
বরং এ কারণে, যে, এখানেই সরফরাজ খান চিকিৎসা করে সুস্থ করে তোলেন সাপে কাটা প্রথম মানুষটিকে।
: যাকে মৃত ভেবে নদীতে একটি কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দিয়েছিল বাড়ির লোকজন।
: এবং প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে নদীতীরে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে সে ডেড়ার সাক্ষাৎ লাভ করেন সরফরাজ খান।
সাপে কাটা লোকটি সুস্থ হয়ে তার আশীর্বাদ, সামাজিক সমর্থন এবং টাকাকড়ির সাথে নিজের অকাল-বিধবা মেয়েটিকেও সমর্পণ করেন সরফরাজ খানের হাতে। উল্ল্লেখ্য যে, পিতামহ ইউসুফ খান ও পিতা ইমরান খানের মত সরফরাজ খানও ছিলেন প্রকৃতই সুদর্শন।
স্ত্রী আসিয়া বানু সরফরাজ খানকে পেয়ে হাতে চাঁদ পেলেন। বললেন, কথা দাও, আমায় ছেড়ে কোথাও যাবে না তুমি।
তিনি কথা দিলেন। তার আশা ছিল, দীঘাপাতিয়া ফিরে যাবেন একদিন।
কিন্তু এখন, স্ত্রীর সনির্বন্ধ অনুরোধে, দীঘাপাতিয়াকেই আনলেন সাপাহারে, শ্বশুরের দেয়া এবং নিজের অর্থে কেনা একশ বিঘা জমির নাম দিলেন দীঘাপাতিয়া। নিজের বাড়ির নাম দিলেন 'সরফ-রাজ বাড়ি।'
দীঘাপাতিয়া রহস্যের এখানেই শেষ। রহস্যটি উন্মোচন করতে পেরে আমরা আরাম বোধ করছি। আপনারাও নিশ্চয়ই!
8.
হাশেম বলেছিল আবদুর রাজ্জাককে, 'বিশ্রাম নিবেন। মাথায় রইদ লাগাইবেন না।' তার নিদানিক অভিজ্ঞান মতে, ধুতুরার বিষের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং এসব অসাবধানতা ক্ষতিকর হতে পারে আবদুর রাজ্জাকের মত নিরীহ প্রাণীর জন্যে। হাশেম বিষয়ে আমি ডাঃ সুলতানুল আলম-এমআরসিপির সঙ্গে কথা বলেছি, তার কাঠালবাগানের চেম্বার কাম ক্লিনিকে; তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলেছেন, 'এটি toxicology-র বিষয়, para science-এর বিষয় নয়--এই হাতুড়েপনা, কোবরেজি-হেকিমী ব্যাপার সর্বত্র প্রয়োগযোগ্য নয়। সমাজের জন্যে ক্ষতিকরও বটে।' তিনি আরো কিছু বলতেন, কিন্তু তার সহকারী এসে বলল, 'স্যার, সকালের রোগির অবস্থা সংকটাপন্ন এবং ডাঃ সুলতানুল আলম, এমআরসিপি আমাকে ইনকার করে আমার পাশে বসা রোগির আত্মীয়স্বজনকে বললেন, 'দোয়া করেন ভাই, এখন দোয়া ছাড়া উপায় নাই।' তাঁর পয়ারে রচিত আহ্বানে আমিও সাড়া দিলাম এবং রোগির জন্যে দোয়া করলাম। জানি না, রোগিটা বেঁচে আছে কিনা।
কিন্তু আবদুর রাজ্জাক হাশেমের উপদেশে কর্ণপাত করেছে বলে মনে হল না। সে যখন মাঠের মধ্যখানে একটি গাছের কাছাকাছি এসে পড়েছে, তার মাথায় কেমন জানি অনুভূতি হতে লাগল। তার মনে হল মাঠে চড়ে বেড়ানো গরুগুলো ফ্রিজিয়ান জাতীয়, বিদেশী, যদিও তারা হাড়জিরজিরে দেশী গরু। তার আরো মনে হল, তার নাটোর যাওয়ার কথা ছিল, দীঘাপাতিয়া তো নাটোরে। সে ভাবল, কোথাও সে গুরুতর ভুল করেছে। এই ভুলের মোচন হয় কী করে, এখন?
এমতাবস্থায় সে উক্ত গাছের নিচে করুণানিধি এবং এমাবাদীকে দেখল এবং আত্মঘাতী প্রশ্নটি করল।
9.
এমাবাদী ঢাকা থেকে সাপাহার এসেছে রাশেদ খান মেননের সঙ্গে কিন্তু ফেরত না গিয়ে দুটো দিন অতিরিক্ত রয়ে যাবে তার সহপাঠী এবং বন্ধু করুণানিধির সঙ্গে। করুণানিধি সাপাহার কলেজের বাংলার অধ্যাপক। এ মুহূর্তে এই বিরান মাঠে তাদের আগমনের হেতু কিন্তু সাহিত্যিক। করুণানিধি একটি উপন্যাস লিখছে-আজকাল সবাই উপন্যাস লেখে, আমরাও লিখছি, সেটি নিন্দনীয় কিছু নয়; তাছাড়া করুণানিধির ভাল দখল আছে বাংলাভাষার ওপর। তবে সে আশা করছে, তার উপন্যাসটি হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ--তার উপন্যাসের ফর্মটাই আলাদা। পত্র-উপন্যাস, দিনপঞ্জী-উপন্যাস যা-ই বলা হোক এটি নতুন। তার হাতে যে ডায়েরি শোভা পাচ্ছে, তাতে কিছু খসড়া সে লিখেছে এবং তা পড়ে শোনাবার জন্যে এমাবাদীকে এই মাঠে অহ্বান।
কিন্তু এমাবাদী মার্ক্সবাদী হলেও তার চিন্তা চেতনায় এখনও Synchronic প্রভাব বিদ্যমান; তাছাড়া ডায়ালেকটিকের নানা সম্ভাবনা না খতিয়ে দেখে সে প্রতি-বাখতিনীয় monologic চিন্তার শিকার হয় প্রায়শ--এই যেমন হয়েছে, তাকে যখন আবদুর রাজ্জাক জিজ্ঞেস করছে দীঘাপাতিয়ার রাজবাড়িটি কোনদিকে।
সে একটি বৃহৎ দীঘাপাতিয়াকে জানে, একটি ভৌগলিক মতবাদকেই জানে--সেটিই তার কাছে text। তাই সে অমন অট্টহাস্য করেছিল।
আর করুণানিধিও তার বিভ্রান্ত ভূগোল জ্ঞানকে obsolute ভেবে তার করুণার কণ্ঠকে সিঞ্চিত হতে দিয়েছে ওই হাস্যরসে।
এমাবাদীর ক্ষিধে লেগেছিল, সে একটি মণ্ডা খেয়ে তৃপ্তি বোধ করেছে। আর করুণানিধি পুলকিত হয়েছে, আবদুর রাজ্জাককে চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে। তাকে নায়ক বানালে কেমন হয়? তার উপন্যাসের?
10.
আবদুর রাজ্জাককে সে যাত্রা বাঁচিয়ে দিয়েছে গরুগণ। তারা যখন বিস্মিত নেত্রপাত করছিল তার দিকে, আবদুর রাজ্জাকের হঠাৎ মনে হয়, না! এরা তো ফ্রিজিয়ান গরু না! এর তো দেশী! আর, ওই যে কলাবাগান!
10 1/2.
সে এমাবাদী ও করুণানিধিকে কোনোরূপ সম্ভাষণ না জানিয়ে কলাবাগানের পথ ধরল। নিদাঘের তপ্ত দিন। তার চোখ থেকে ঘাম ঝড়ে পড়ছে। অপমানিত হলে মানুষের চোখ দিয়ে যেমন ঘাম ঝরে পড়ে।
সূত্র : বাংলাবাজার পত্রিকা 1994-96
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ১১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



