somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিজ্ঞাপন 5 >> যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ১:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও ব্রাত্য রাইসু বিরচিত
যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক

(আগের কিস্তির পর)

[গাঢ়] পাঁচ. [/গাঢ়]

1.
বাবু বললো, 'আপনি ওদের সঙ্গে বসেন, আমি একটু ঘরে যাই। আমার মাথা ধরেছে।'

যুবতী মেয়েদের মাথা জিনিসটা খুবই স্পর্শকাতর, দেখেছে আবদুর রাজ্জাক। প্রথম সুযোগেই ধরে বসে। মণ্ডলের প্রাক্তন স্ত্রী ফারিহা নাতাশা আলম, তারও প্রায়ই মাথা ধরতো। স্ত্রীর মাথা নিয়ে টেনশন করতে করতে মাথা ধরতো মণ্ডলের, আর বসের মাথার স্পিরিচু্যয়ালটির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মাথা ধরতো আবদুর রাজ্জাকের। সেই কতো না মাথা ধরাধরির দিন গেছে। রাজ্জাক নিশ্চিত মাথা ধরা নিয়েই মণ্ডল-নাতাশার ছাড়াছাড়ি। আবদুর রাজ্জাক ধরা মাথাকে রেস্ট দেওয়ার পক্ষপাতি। সে বলে, আপনি ঘরে গিয়ে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে ঘুম দেন, দেখবেন মাথা ধরা ছেড়ে যাবে। 'ছেড়ে যাবে' কথাটা মণ্ডলের কাছ থেকে শেখা। অবশ্য মণ্ডল এখন আর এ-কথা বলে না।
বাবু হেসে ফ্যালে। লোকটিকে তার ভালো লাগছে। সরল একটা লোক। সে বলে, মাথা আসলে ধরে নাই, এমনি এমনি বলছি। আপনারা একটু বসেন, আমি রান্নাবান্নার কী হলো দেখি।

বাবু চলে গেলে সিঁড়িতে বসলো তিনজন। রাজ্জাকের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব রক্ষা করে বসেছে দুই বোন। আনজু অর সফিয়া। সিঁড়ির কোথাও কোথাও প্ল্লাস্টার উঠে গেছে। আট দশ ধাপ নিচে পানি। আবদুর রাজ্জাক একবার ভাবলো নিচে নেমে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে। সারাদিন তার ওপর দিয়ে যে ঝকমারি গেছে সেটি হয়তো কাটবে। এই সিঁড়িতে বসেও তার মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে সে ঝাকি খেতে খেতে কোথাও যাচ্ছে। ট্রাকের দুলুনি তাকে ছেড়ে যায় নি এখনো। হঠাৎ হঠাৎ মনে হচ্ছে মাথাটা সঙ্গে নেই, আবার কিছুক্ষণ পর ফিরে আসছে মাথা। সে পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। এখানকার পানিতে লোহা বেশি। কেমন ঘোলা, আর পানির ওপর তেলের মতো আস্তরন। পানিতে পা-ডোবানোটা একটু মেয়েলি আর বাংলা সিনেমা মার্কা হয়ে যেতে পারে, ভাবলো সে। ভেবে পুকুরের পানি দেখতে থাকে রাজ্জাক। মেয়ে দুটি এতক্ষণ কট কট করেছে, এখন একদম চুপ। নিস্তরঙ্গ আলোছায়াময় পানি দেখতে থাকে রাজ্জাক। আনজু এখনো চুপচাপ, সফিয়া গুনগুন করে কিছু একটা গাওয়ার চেষ্টা করছে। কী গায় আল্ল্লাই জানে। লালন লালন সুর কিন্তু চেনা যাচ্ছে না। সে ভাবে একবার জিগ্যেশ করবে। কিন্তু এত মিহি একটা পরিবেশ, কথা বললেই মনে হয় ভেঙে যাবে। দীর্ঘ সময় পুকুরের দিকে তাকিয়ে থেকে একসময় সে ডুকরে ওঠে, 'পানি! পানি!'

'চাচা, পানি খাবেন?' গান থামিয়ে জিগ্যেশ করে সফিয়া।

'না না পানি খাবো কেন? পুকুরের পানির কথা বলছি।' আবদুর বলতে থাকে, 'পানি তো আমি খুব ভালোবাসি। আমার ঘরে এক বালতি পানি রেখে দেই সবসময়, মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই পানি দেখি। আমার খুব ভালো লাগে।' আনজু বুঝতে পারে আবদুর রাজ্জাকের ভালো লাগার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। সে বলে, 'নজরুল ইসলাম স্যারও পানি ভালোবাসেন।'

নজরুল ইসলাম স্যার! পুকুর পাড়ের এই অন্তরঙ্গ মুহূর্তে ভিন্ন পুরুষের আগমনে বিরক্ত হয় আবদুর রাজ্জাক। সে বলে, 'কে, নজরুল ইসলামটা কে? কবি নাকি?'

'আমাদের স্যার। সাপাহার কলেজে বাংলা পড়ান। উনিও পানি পছন্দ করেন। উনি অবশ্য পানিরে বলেন জল।' আবদুর রাজ্জাক দেখলো পানি পছন্দ করার ব্যাপারটা সাধারণ একটা কাজ হয়ে গিয়েছে। এখন থেকে অন্য কিছু পছন্দ করতে হবে।

2.
নজরুল ইসলাম স্যার আর কেউ নন। আমাদের চশমাঅলা করুণানিধি। জগৎকে যিনি দেখে থাকেন তার বৃত্তীয় চশমার আবডাল থেকে, করুণার দৃষ্টিতে। আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে দুপুরে তার ক্ষীণ একটি সাক্ষাৎ হয়েছে তা আপনারা জানেন। আমাদের আশা, রাত্রি যখন আরো গভীর হবে, অর্থাৎ নয়টা-সোয়া নয়টা, তখন, তিনি আসবেন, তার সঙ্গে থাকবেন তার বন্ধু এমাবাদী (একদা মার্ঙ্বাদী), যার নাম, হুমায়ূন বখস, একটি দৈনিকে কর্মরত। সরফরাজ সাহেব বিকেল বেলা এই দুই জ্ঞানী ব্যক্তিকে আহ্বান করেছেন তার বাসায়, ঢাকা থেকে আসা আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার ইচ্ছায়।

3.
রাস্তায় নেমে এমাবাদী বলল, মেয়েগুলোর গঠনসৌকর্য খুব নান্দনিক।

করুণানিধি এমাবাদীর এই জিওম্যাট্রিক এক্সপ্রেশনের সঙ্গে পরিচিত। তার এ কথা থেকে কিছুই বোঝা যাবে না। সে জিগ্যেশ করে, কাউকে তোমার ভালো লেগেছে?

এমাবাদীর ভালো লাগা অত সহজ কাজ নয়। সে করুণানিধিকে অবজ্ঞার হাসি হাসে। 'কী যে তুমি বলো না! এইসব রুরাল মেয়েমানুষ আমি পছন্দ করতে যাবো কোন দুঃখে।'

'কোন দুঃখে' কথাটি করুণানিধিকে আহত করলো। তার মনে হলো এমাবাদী তাকেই রুরাল মেয়েমানুষ বলে গাল দিলো বুঝি। যাই হোক যে ভাবে হোক সে এদের শিক্ষক, এবং মেয়েগুলিও যথেষ্ট সুন্দরী, এমনকি ঢাকা শহরেও--যেই ঢাকা শহর নিয়ে এতসব গর্ব এইসব লোকদের--সেখানেও সে এদের মতো সুন্দরী দেখে নাই। সরফরাজ সাহেবের সাপ নিয়ে কাজ-কারবারের কারণে কেউ এদের বিয়ে করতে চায় না। বলে বাইদ্যার মাইয়া। আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে অবশ্য তার কথা হয়েছে এ ব্যাপারে। খাওয়ার পরে, যখন সে এগিয়ে দিতে এসেছে করুণানিধি এবং এমাবাদীকে। সেই মাঠ, যেখানে দুপুর বেলা, করুণানিধির সঙ্গে দেখা হয়েছিলো তার। ছেলেটি বলেছে যে সে মুক্তমনা। তবে সে নাকি ঠিক করেছে কখনো বিয়ে করবে না। এ ব্যাপারে পরে তাকে বোঝাতে হবে। কালকে তার বাসায় আসার কথা রাজ্জাকের। ছেলেটি এসেছে তার বসের বিয়ের ব্যাপারে। বসের ছবি দেখেছে করুণানিধি। বয়স বেশি। তার ওপর আগে একটা বিয়েও করেছে। করুণানিধি সরফরাজ সাহেবকে বলে এসেছে এই ছেলের কাছে বিয়ে দেবার কোনো কারণ নেই, ছেলের বয়স বেশি। সরফরাজ সাহেব তার কথায় কান দেবেন মনে হচ্ছে না। সরফরাজ সাহেব বললেন, আমি নিজেও তো ভাই বেশি বয়সেই বিয়ে করেছি। করুণানিধির মেয়েগুলির প্রতি যারপরনাই করুণা। মাঝে মাঝে মনে হয় এদের সবাইকে সে একাই বিয়ে করে ফ্যালে। আজকে রাতে এমাবাদীকে এখানে নিয়ে আসার পেছনে তার মনে একটা সুপ্ত ইচ্ছা কাজ করেছে। সে ভেবেছিলো এদের কাউকে এমাবাদীর মনে ধরবে। ধরে নি দেখে আশ্চর্য হয়েছে। স্বর নিচু করে সে এমাবাদীকে বললো, 'তুমি ডাক্তার দেখাও।'

4.
আবদুর রাজ্জাক করুণানিধিকে বলে, 'আপনার এই গোলগাল চশমাটা তো ভাই খুব ভালো লাগতেছে আমার। কালকে দুপুর বেলায় আপনি এমন করলেন কেন?'

করুণানিধি হাসে। বস্তুত করুণানিধি সদাসর্বদাই হাসে। সে হাসতে হাসতে বলে, 'আসলে একটু সাহিত্য করেছিলাম মাত্র, আপনাকে বিচলিত করা ব্যতীত আর কোনো উদ্দেশ্য এতে নিহিত ছিলো না।'

আবদুর রাজ্জাক করুণানিধির এই উপযর্ুপরি শব্দবাণে পর্যুদস্ত বোধ করে। সে বলে, 'সাহিত্য তো ভাই আমরাও করি। আমরা কি সাহিত্য করি না। ঢাকা শহরের অনেক সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা আছে। তাঁরা অনেকেই আমাকে নিজে চিনেন। শামসুর রাহমান আমাকে নিজে চিনেন।'

যেহেতু শামসুর রাহমান নিজে চেনেন সুতরাং করুণানিধি স্থির করে আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ ব্যাপারে কিছু আলাপ-আলোচনা করবে। সে বলে, 'সেই দিন তো আর নাই।' ব'লে হেলান দেয় করুণানিধি। বাধ্য হয়ে আবদুর রাজ্জাককে এগিয়ে আসতে হয়। সে ফিসফিস করে জিগ্যেশ করে, 'কোন দিন, আপনি কোন দিনের কথা বলছেন?'

কোন দিন সেটা করুণানিধি নিজেও জানে না। সে বলে, না নির্দিষ্ট কোনো দিনের কথা বলছি না। আমি বলছি বাংলা কবিতার সেই সব দিনের কথা। অর্থাৎ পূর্বপুরুষদের কথা। ধরেন আগেকার দিনে যেমন কবিতার বই বিক্রি হতো এখন তো তেমন হয় না।

পূর্বপুরুষদের কথা ওঠায় আবদুর রাজ্জাক একটু আবৃত্তিও করে। গলা ভয়াবহ খাদে নামিয়ে উচ্চারণ করে, আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি... তারপর লাজুক তাকায়, 'আমি ভাই ঢাকায় একটা আবৃত্তি সংগঠনে আছি, নাম কণ্ঠশোধন, শুনেছেন নিশ্চয়ই?' করুণানিধি বলে শুনেছে। আবদুর রাজ্জাক এবার গলা আরেকটু উঁচু করে। এতক্ষণ বসে ছিলো, এবার সে দাঁড়ায়। তারপর দাগানো শুরু করে, 'তার পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিলো... '

এমন সময় ঘরে ঢোকে এমাবাদী। সে এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দেখে এসেছে। প্রকৃতির চেয়ে বরং প্রকৃতির এইসব দরিদ্র সন্তানদেরই দেখতে ভালোবাসে সে। এ ব্যাপারে করুণানিধির সঙ্গে তার তফাৎ আছে। করুণানিধি যখন বাংলার নদনদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে চোখ বুজে ফ্যালে তখন হয়তো এমাবাদী চোখে আঙুল দিয়ে জেলেদের দুর্দশা দেখিয়ে দেয়। সে দিন শুরু করে সরকার এবং প্রশাসনকে গালাগাল করে। আবদুর রাজ্জাকের কণ্ঠে কবিতার আবৃত্তি শুনে সে গর্জে উঠে ধমক দেয়, 'লজ্জা করে না আপনার, স্বৈরাচারী সরকারের লোকের কবিতা আপনি আবৃত্তি করছেন।'

এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন। সে সরি বলে। আর যাই হোক, স্বৈরাচারী সরকারের লোকজনের কবিতা তো সে আবৃত্তি করতে পারে না! তবু খুতখুত তার মধ্যে কাজ করে। সে বলে, 'কিন্তু পড়তে যে ভালো লাগে!'

'পড়তে তো অনেক কিছুই ভালো লাগে। সব পড়তে হবে আমাদের?'

'সব তো সেভাবে পড়িও না।'

'সব পড়েন না! তারপর ধরেন পর্নোগ্রাফী, পর্নোগ্রাফীও তো পড়তে আমাদের ভালো লাগে। লাগে না? আমরা কি তাই বলে পর্নোগ্রাফী পড়বো?'

আবদুর রাজ্জাক বলে, 'আমি ভাই পর্নোগ্রাফী পড়ি না। আমি শুধু দেখি।'

সে তো সবাই দেখে। পড়া আর দেখা কি এক হলো। দেখি তো আমিও। বিধাতা দুটো চোখ দিয়েছেন--করুণানিধি চশমা খোলে--সে তো দেখার জন্যই। আর তা ছাড়া যে কবিতাই আপনি পড়তে যান না কেন, সে বাংলাই হোক আর তিব্বতীই হোক চোখ কিন্তু আপনার লাগবেই।

আবদুর রাজ্জাক উত্তেজনা বোধ করছিলো। সে প্রসঙ্গটা ঠিক ধরতে পারছে না। এরা কী থেকে কী বলছে, গভীর এবং পরম সত্যের এরকম অনর্গল প্রবাহ তাকে মুগ্ধ করে দেয়। সে আবিষ্ট নয়নে করুণানিধি আর এমাবাদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঢাকার বাইরের এই প্রতিভাগুলোকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে হবে। সে এবার ঢাকা গিয়েই মফিজ ভাইকে করুণানিধির কথা জানাবে। এরকম গভীর মেধাগুলোকে এক জায়গায় করতে পারলেই বাংলার শিল্প-সাহিত্য কালচারে গতিশীলতা আসবে। সে তখনো ধরতে পারে নি করুণানিধি কী নিয়ে কথা বলছে। করুণানিধি আবার বলে, আর যদি আপনি এমনকি কবিতা নাও পড়তে চান...

আবদুর রাজ্জাক অাঁতকে ওঠে, 'সে কী! তা চাইবো না কেন, কবিতাই তো আমি সারাদিন পড়তে চাই। আপনি এগুলো কী বলছেন।'

'না না, সত্যি সত্যি বলছি না। আমি বলছি যদি আপনি কবিতা পড়তে না চান তাহলে, মানে তাহলেও সে ঐ চোখেরই ব্যাপার!'

আবদুর রাজ্জাকের মাথার ওপর দিয়ে যায় বাক্যটি। সে তাল মেলানোর জন্য বলে, 'তা ঠিক তা ঠিক।'

করুণানিধি বলে, চোখ নিয়ে বাংলায় একটি প্রবন্ধ আমি লিখছি! নাম চোখ এবং বাংলা কবিতা। আপনি কি দেখতে চান?

আবদুর রাজ্জাক চোখ বড় বড় করে বলে, 'নিশ্চয়ই। আপনি লিখেছেন আমি না দেখে পারি। আর আল্লাতালা চোখ দিয়েছেন সে তো দেখার জন্যেই।'

করুণানিধি একটা ডবকা খাতা বের করে। ওপরে অপটু হাতে একটা চোখ অাঁকা। করুণানিধি একসঙ্গে দুটো চোখ কখনোই অাঁকে না। দুটো চোখ একসঙ্গে অাঁকলেই মনে হয় চোখের যে-ব্যক্তিত্ব তা নাই হয়ে গিয়েছে। আর একটি চোখ সে তো একটি মানুষেরই মতো। বিশেষত মেয়ে মানুষের মতো। সে তার অাঁকা চোখের সঙ্গে প্রায়ই কথা বলে। এ-ব্যাপারে করুণানিধিকে আমাদের ক্ষমা করতে হবে। তো, করুণানিধি তার খাতা খুলে পড়তে শুরু করে। থেমে থেমে, দাঁড়ি কমাসহ, 'পুরুষের চোখ নিয়ে কোনো বাংলা কবিতা নাই দাঁড়ি এ থেকে প্রমাণিত হয় যে কমা শুধুমাত্র পুরুষ কবিরাই চোখ নিয়ে কবিতা লেখে...'

5.
উপন্যাসে নতুন একজনকে নিয়ে আসতে হচ্ছে। ইনি সমরেশ দেবনাথ। বিশ্ব কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। এছাড়া ভাসমান মেয়েদের (ভাসমান মেয়ে=পতিতা) ওপর কাজ (কাজ=থিসিস / গবেষণা / ডক্টরেট / ভাবা) করছেন। উপন্যাসে সমরেশকে নিয়ে আসার পেছনে কাজ করেছে তার দেয়া পঞ্চাশটি টাকা। তিনি শুধু আমাকেই এটি দিয়েছেন। সৈয়দ সাহেবকে দেয়ার সুযোগ পান নি। সৈয়দ সাহেব এখন কোলকাতায় আছেন। এই ফাঁকে সমরেশকে ঢুকিয়ে দেয়া গেলো। আবদুর রাজ্জাকের বড় ভাই ধরনের বন্ধু সমরেশ। তাদের দুজনের পরিচয়ের সূত্র দার্শনিক মফিজ। তারা এখন নারী বিষয়ে আলাপ করছে। অবসর এবং পরিবেশ পেলে তারা নারী এবং নারীবাদ নিয়ে আলাপ করে। প্রথমে তারা আলাপ শুরু করেছিলো আবদুর রাজ্জাক বিষয়ে। আবদুর রাজ্জাক প্রায় আড়াই দিন ঢাকায় অনুপস্থিত। সমরেশ মণ্ডল কার সেন্টারে ফোন করেছিলো আবদুর রাজ্জাকের খোঁজে। নেই। দুদিন আগে নাটোর গিয়েছে বিয়েশাদীর ব্যাপারে। সমরেশ এতে বিস্মিত হয়েছে। তাই নাকি! পুরুষ মানুষ হয়ে বিয়ে করতে গেলো! সে তার বিস্ময় প্রকাশ করে মফিজুল হকের কাছে, 'শুনেছেন নাকি, রাজ্জাক নাকি বিয়ে করতে গেছে নাটোরে?'

মাফিজুল হক বিস্মিত হয়, 'ওর মধ্যে অবশ্য সবসময়ই মেয়েদের নিয়ে একটা আগ্রহ দেখা গেছে। ওরে কতোবার বললাম যে বিয়ে জিনিসটা একটা ফিউডাল ব্যাপার। সে শোনে কার কথা। গ্রামে বড় হইছে তো, আধুনিক লাইফ স্টাইলটা ঠিক ধরতে পারে নাই।'

'একজন সচেতন এবং মুক্ত মানুষ কীভাবে বিয়ে করে!'

'তাই তো, আমি তো ওরে বলছি তো যে দরকার হইলে মিয়া লিভ টুগেদার করো, বিয়া করবা ক্যান। ও কী বলে জানেন?'

'কী বলে?'

'বলে মেয়ে পাই না। মেয়েরা নাকি লিভ টুগেদারে রাজি না। আরে গাধা মেয়েরা এমনে এমনে রাজি হইবো নিকি, তুই অগোরে বোঝা, ক বোঝাইয়া কারে কয় লিভ টুগেদার কারে কয় ব্যক্তিস্বাধীনতা। মেয়েদের ধরে ধরে আমাদের বোঝাতে হবে যে বিয়ে জিনিসটা একটা ফিউডাল-সামন্ত ব্যাপার, বিয়ে করা যাবে না।'

মেয়েদের ধরে ধরে বোঝানোর চেষ্টা সমরেশ বেশ কয়েকবার করেছে। তাতে অনেক সমস্যা। প্রথমত মেয়েরা ধরতে গেলেই সরে সরে যায়। একবার নেপালী এক মেয়েকে (মেয়েটা বেশ কিছু নেপালী কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে দিয়েছিলো) প্রস্তাব করেছিলো সমরেশ। মেয়েটা দেখতে চালাকচতুর। বেশ কয়েকদিন একসঙ্গে কাজ করার পর ঘনিষ্ঠতা মতো যখন আসছে--অর্থাৎ বইপত্র ঘাঁটাঘাটির ছুঁতোয় হাত ছুঁয়ে দিলেও যখন সে কিছু বলছে না--তখন একদিন ফাঁক বুঝে সমরেশ প্রস্তাব দিয়ে দিলো। সে বললো, 'তোমার চোখ খুব সুন্দর আসো আমরা লিভ টুগেদার করি।' মেয়ে বলে, 'হায় হায়, আপনার মনে এই ছিলো, আমি বিদেশী মেয়ে বলে আমাকে এইভাবে অপমান করবেন?' সমরেশ তাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে কোনো অপমান টপমান করার চেষ্টা করে নি। আধুনিক বিশ্বে মানুষ মেয়েমানুষকে এভাবেই প্রস্তাব দেয়। মেয়ে কিছুতেই শুনতে রাজি না। শেষে অনেক কষ্টে, বোঝানোর পর, সে রাজি হলো। তবে তার এক কথা, আগে বিয়ে করেন, তারপর লিভ টুগেদার। আরেকবার এক ভাসমান মেয়েকে নীরিক্ষামূলকভাবে লিভ টুগেদারের প্রস্তাব দিয়েছিলো সমরেশ। যে, দেখবে কী ভাবনা তাদের লিভ টুগেদার নিয়ে। দেখলো ভাবনা তেমন সুবিধার না। ভাসমান মেয়ে এসব শব্দ কোনোদিন ভুলেও শোনেনি। একদিন সন্ধেবেলা ঘণ্টা দুয়েক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাকে বোঝানো হলো লিভ টুগেদার জিনিসটা কী। সমরেশ বললো, 'বিয়ে করবো না কিন্তু একসঙ্গে থাকবো এইটাই হইলো লিভ টুগেদার। সেই ভাসমান মেয়ে বলে, আমি রাজি কিন্তুক দিবেন কত কইরা? দিবেন কত কইরা হলে যে লিভ টুগেদার হয় না তাকে সেটা কে বোঝাবে।

সমরেশ বলে, 'মফিজ, আপনি বুঝবেন না, মেয়েরা এখনও এইসব চিন্তায় অভ্যস্ত হয় নাই। মেয়েদের আমাদের আরো ভালোভাবে শিক্ষা দিতে হবে। যাতে আস্তে আস্তে তারা নিজেরাই বিয়ের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। আমি তো ভাসমান মেয়েদের ধরে ধরে বোঝাই, বিয়া করবা না কখনো।
তা, তারা কী বলে?

তাদের কথা আর বইলেন না। খালি টাকা-পয়সা। একেকটা মেয়ে জাস্ট খালি আলাপ করবে ঘণ্টায় চায় দশ টাকা। আবার বলে কী জানেন নাকি।

বলেন শুনি।

বলে স্যারের কি হয় না!

খুবই নোংরা কথা।

এইটা আর কী নোংরা। এর চেয়ে হাজার গুণ নোংরা তারা বলে। ওদের অশ্ল্লীল অশ্ল্লীল সব ছড়া আছে। আমি সেগুলো সংগ্রহ করতেছি তো। পরে ইংরেজি করে পেঙ্গুইন থেকে বের করবো। বাংলায় তো ধরেন বের করা যাবে না। সরকার ব্যান্ড করে দেবে। তো, এগুলি ইংরেজি করাবার জন্য রাজ্জাকরে খোঁজ করতেছিলাম। ও কেমন করবে আপনার ধারণা?

মফিজ বললো, রাজ্জাক এসব অনুবাদ করবে মনে হয় না।

বলে দেখি।

তা দেখেন।


(সূত্র : বাংলাবাজার পত্রিকা, 1994-96)
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৪:৫৯
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জলে স্থলে শূন্যে আমি যত দূরে চাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৫৩



আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ভুলেই গেছো!
লম্বা সময় ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। আমিও নানান ব্যস্ততায় যোগাযোগ করতে পারিনি। তুমিও যোগাযোগ করনি! অবশ্য তুমি যোগাযোগ অব্যহত না রাখাতে আমি বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানবাধিকার' (অণু গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

'মানবাধিকার' একটা এনজিও। তারা বিদেশী সহায়তা নিয়ে মানুষ, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করে। আজ তারা একটা বড় সমাবেশ করছে প্রেসক্লাবে। সমাবেশে সাংবাদিকসহ নানান পেশার মানুষ অংশ নিয়েছে। টিভি সাংবাদিকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদী তীরের ইমাম থেকে গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার: একটি অনুপ্রেরণার গল্প

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৬




নদী তীরের ইমাম থেকে গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার: একটি অনুপ্রেরণার গল্প

একটি বিশাল নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা শান্ত এক জনপদ, আর ঠিক নদীর ঘাট ঘেঁষেই ছিল একটি সুন্দর মসজিদ। সেই মসজিদের ইমাম সাহেব... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু দ্বিতীয় রিফাইনারি (ERL-2) টা করে দেখান , সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গতকাল নাটকীয়তায় ভরা একটা দিন আমরা পার করলাম । রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন ঝড় বয়ে গেল। পুরো সোশ্যাল মিডিয়া যেন দুই ভাগে ভাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×