জীবনানন্দ দাশ
একটা মোটরকার
খটকা নিয়ে আসে।
মোটরকার সব-সময়েই একটা অন্ধকার জিনিস,
যদিও দিনের রৌদ্র আলোর পথে
রাতের সুদীপ্ত গ্যাসের ভিতর
আলোর সনত্দানদের মধ্যে
তার নাম সবচেয়ে প্রথম।
একটা অন্ধকার জিনিস :
পরিষ্কার ভোরের বেলা
দেশের মটরশুঁটি কড়াইয়ের সবুজ ক্ষেতে-মাঠে হাঁটতে-হাঁটতে
হঠাৎ অবাক হ'য়ে তাকিয়ে দেখছি
লাল সুরকির রাসত্দার ভিতর দিয়ে
হিজল গাছ দু'টোর নিচ দিয়ে
ঊনিশ শো চৌত্রিশের মডেল একটা মোটরকার
ঝকমক করছে, ঝড় উড়িয়ে ছুটেছে;
পথ ঘাট ক্ষেত শিশির স'রে যেতে থাকে,
ভোরের আলো প্রতিকূল যুক্তির বিরুদ্ধে কোণের বধূর মতো
সহসা অগোচর
মাঠ-নদী যেন নিশ্চেষ্ট,
সহসা যেন প্রতিজ্ঞা হারিয়ে ফেলে,
এই মোটর অগ্রদূত,
সে ছুটে চলেছে
যেই পথে সকলের যাওয়া উচিত;
একটা মোটরকারের পথ
সব-সময়েই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,
অন্ধকারের মতো।
স্ট্যাণ্ডে
শহরের বিরাট ময়দানের পুবে-পশ্চিমে-ফুটপাথের পাশে
মোটরকার;
নিঃশব্দ।
মাথায় হুড
ভিতরের বুরুশকরা গভীর গদিগুলো
পালিশ স্টিয়ারিং হুইল হেড্লাইট;
কী নিয়ে স্থির?
কলকাতার ময়দানের একটা গাছ অন্য কিছু নিয়ে স্থির,
আমি অন্য কিছু নিয়ে স্থির;
মোটরের স্থিরতা একটা অন্ধকার জিনিস।
একটা অন্ধকার জিনিস :
রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার কার হু হু ক'রে ছুটছে
প্যারিসে-নিউইয়র্কে-লণ্ডনে-বার্লিনে-ভিয়েনায়-কলকাতায়;-
সমুদ্রের এপার-ওপার ছুঁয়ে
অসংখ্য তারের মতো,
রাতের উল্কার মতো,
জঙ্গলের রাতে অবিরল চিতার মতো,
মানুষ-মানুষীর অবিরাম সংকল্প ও আয়োজনের অজস্র আলেয়ার মতো
তারাও চলেছে;
কোথায় চলেছে, তা আমি জানি না।
একটা মোটরকারের পথ-মোটরকার
সব-সময়েই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,
অন্ধকারের মতো।
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ ব'সে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই এসে বহন করুক : আমি প্রয়োজন বোধ করি না :
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।
রচনাকাল : (?)
প্রথম প্রকাশ : কৃত্তিবাস, 1973 (?)
সূত্র: প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র : জীবনানন্দ দাশ; সম্পাদক-সংকলক : আবদুল মান্নান সৈয়দ (প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি 1994; চতুর্থ পুনমর্ুদ্রণ : মার্চ 2005)
জীবনানন্দ দাশ, জন্ম: বরিশাল 17/2/1899 (মতানত্দরে 1998); মৃতু্য: কলিকাতা 22/10/1954
কাব্যগ্রন্থপঞ্জি >
ঙ্ ঝরাপালক; প্রকাশক : সুধীরচন্দ্র সরকার, কলিকাতা 1927;
ঙ্ ধূসর পাণ্ডুলিপি; (রচনাকাল : 1925-1929) প্রকাশক : জীবনানন্দ দাশ, কলিকাতা, ডিসেম্বর 1936;
ঙ্ বনলতা সেন; প্রকাশক : জীবনানন্দ দাশ, বরিশাল, ডিসেম্বর 1942;
ঙ্ মহাপৃথিবী; (রচনাকাল : 1929-1941) প্রকাশক : সত্যপ্রসন্ন দত্ত, কলিকাতা 1944;
ঙ্ সাতটি তারার তিমির; (রচনাকাল : 1928-1943) প্রকাশক : আতাওয়ার রহমান, কলিকাতা 1948;
ঙ্ জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা; প্রকাশক : সৌরেন্দ্রনাথ বসু, মে 1954;
বাংলা কবিতা সঞ্চালন উদযোগ থেকে
18 মার্চ 2006
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


