আজ থেকে ৪৫০ বছর আগে ঠিক এই দিনে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে প্রত্যেক কৃষক কে তার বাৎসরিক সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এর পরের দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা অর্থাৎ জমিদাররা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। যেসব কৃষক চৈত্র মাসের শেষ দিনে পহেলা বৈশাখের খাজনা পরিশোধ করার মত ফসল তুলতে পারতো না, গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া আর তাদের কোন পরিণতি ছিলো না। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের দিনটি আমাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে কোন আনন্দদায়ক দিন ছিল না। পহেলা বৈশাখের দিনটি ছিল আমাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে এক বিভীষিকাময় দিন। কারন যদি কোন কারনে তারা পহেলা বৈশাখের দিনে জমির বাৎসরিক খাজনা পরিশোধ না করতে পারত তাইলে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী দ্বারা ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ায় ছিল তাদের ভাগ্য। পহেলা বৈশাখের আরেক নাম কিন্তু পুণ্যাহ। পুণ্যাহ মূলত সংস্কৃত শব্দ। অর্থ ভালো কাজের সুফল পাবার দিন। জমিদার প্রথার সময় বছরের সূচনার দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে এই পুণ্যাহ অনুষ্ঠানটি করা হতো। আক্ষরিক অর্থে এই পুণ্যাহ অনুষ্ঠানটি ছিল রাজা-প্রজার দেখা হবার এবং কথা বলার দিন। আসলে পুণ্যাহ ছিল জমিদারদের দিক থেকে আর্থিক স্বার্থ উদ্ধারের কৌশল। ১৯২০ সাল পর্যন্ত জমিদার এবং বড় বড় তালুকদারদের কাচারিতে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো। সেদিন প্রজারা ভালো কাপড়-চোপড় পরে খাজনা দিতে আসতো এবং অতীতের বাকী থাকা খাজনা আদায় করতো।
সে আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খাজনা আদায় শুরু হয়। সরকার বাহাদুর সকল জমিদার, তালুকদার, ইজারাদার, এবং অন্যান্য রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদেরকে আামন্ত্রণ জানানো হতো পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে। সে অনুষ্ঠানের সেরেস্তায় বা খাজনা আদায়ের নির্ধারিত দরবারে নায়েব তহসিলদারকে পূর্বের রাজস্ব পরিশোধ করে নতুনভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। আর সে দরবার পরিচালনা করতেন নওয়াবগণ। আর যারা নওয়াবদের সন্তুষ্ট করতে পারতেন তাদেরকে নওয়াব সন্মানসূচক খিলাত বা পোশাক দিতেন। কাচারিতে প্রজারা একত্রিত হয়ে জমিদার বা নায়েবের কাছ থেকে পানপাতা নিতেন। আগে সদর আর মফস্বল নামে দু’ধরণে পুণ্যাহ হতো। সদর পুণ্যাহ উৎসবে জমিদার এবং আন্যান্য ভূস্বামিগণ বাংলার দীউয়ানের বাসভবনে অংশগ্রহণ করতেন। আর মফস্বল পুণ্যাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হতো জমিদারের কাচারিতে।
সাহিত্যের ভাষায় তো কত চমৎকার লাগে এই পুণ্যাহ নববর্ষ পহেলা বৈশাখ শুনতে। কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখুন তো যেই কৃষক টা তার খাজনা পরিশোধ করতে পারত না তার জীবনটা কি এই পহেলা বৈশাখের দিনে দুর্বিষয় হয়ে যেত না। তাইলে আমরা কোন মুখে এই পহেলা বৈশাখ পালন করি। আরে আমাদের বেশীরভাগ পূর্ব পুরুষদের কাছে পহেলা বৈশাখের দিনটা কোন আনন্দময় দিন ছিল না পহেলা বৈশাখের দিনটা ছিল একটি দুশিন্তাগ্রস্থ দিন যে আমি কি আজ আমার ভিটামাটি রক্ষা করতে পারব কিনা। কর্পোরেট সংস্কৃতির কবলে পরে আমরা পহেলা বৈশাখের দিনে অনেক নাচগান করলেও আমাদের পূর্ব পুরুষরা সারা বছর এই পহেলা বৈশাখের দিনটা কে ভয় পেত। সত্যিকার অর্থে পুণ্যাহ নববর্ষ কোন আনন্দদায়ক উৎসব ছিল না আমাদের পূর্ব পুরুষদের জন্য।
পহেলা বৈশাখের দিনটি কি আমাদের পূর্ব পুরুষদের জন্য কোন আনন্দময় দিন ছিল ?
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর
আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন
Sajna

Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন
বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন
ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।