জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি কিন্তু বিশ্ব তাকে সংক্ষেপে রুমি নামে জানে। তিনি ত্রয়োদশ শতকের একজন ফার্সি কবি, ধর্মতাত্ত্বিক এবং সুফি দর্শনের শিক্ষক ছিলেন। রুমি যে যুগে জন্মগ্রহন করেন তখন ভয়াবহ এক আলোড়ন চলছিল । অটোম্যান সাম্রাজ্য ভিতরে এবং বাইরে থেকে আক্রান্ত ছিল ; ভিতরে ছিল খ্রিষ্টান আক্রমনকারিরা এবং অপর দিক থেকে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনী । বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি কবিদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ও পঠিত। ফারসি ভাষাভাষীদের গবেষকেরা জালালউদ্দিন রুমিকে তাদের সবচেয়ে বড় কবি হিসেবে স্বীকার করেন। পশ্চিমা বিশ্বে তার জনপ্রিয়তার কারণ তার কবিতা। তিনি তার কবিতার মাধ্যমে যে বার্তা তুলে ধরেছেন তা তার ভাষার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে ভাব প্রকাশের তুঙ্গে উঠেছে।
আত্তার রুমি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে , " এই বালকটি ভালবাসার অন্তরে একটি দ্বার উদ্ঘাটন করবে ।" রুমিও কখনও আত্তারকে ভুলতে পারেনি , রুমি আত্তার সম্পরকে বলেছেন " আত্তার ভালবাসার সাতটি নগরই ভ্রমন করেছেন আর আমি এখনও একটি গলির প্রান্তে অবস্তান করছি । তিনি তার সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন পবিত্র কোরআন ও হাদীস থেকে। ইসলামকে তিনি উপলদ্ধি করেছেন অন্তর দিয়ে। মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া মানব জাতির মুক্তি নেই। রুমীর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল আশাবাদ (Optimism)| মানুষ বিরহ বেদনা, দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকবে- কোন হতাশ নৈরাশ্য নয়। তিনি গদ্য ও পদ্যাকারে একাধিক রচনা রেখে গিয়েছেন।
১২৪৪ সালে রুমির জিবেনর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন একটি সাল । এ বছরি তার প্রিয় ব্ন্ধুর সাক্ষাত পয় রুমি । সে আর কেউ না সামশেদ তাবরেজ । যার কারনে রুমিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুফিতে পরিনিত করেছে । তাবরেজ ছিলেন একজন দরবেশ । যাকে অনেকেই ড্যান্সিং দরবেশ বলে থাকেন কেননা সে রাস্তায় নেচে নেচে আল্লাহর জিকির করতেন । লোকো তাকে নেহায়েত পাগল বলে মনে করত এমনি প্রথমদিকে রুমি নিযেও । । তাবরেজ এর মাঝে এমন কিছু পেয়ে যায় যা সে এতো দিন খুজে বেরাচ্ছিল ।
১/ আমি অনেক মানুষকে দেখেছি যাদের পড়ার কোন জামা ছিল না । আবার আমি অনেক কেই দেখেছি যাদের জামা ছিল ঠিকই কিন্তু তার ভিতর কোন মানুষ ছিল না।
২/ আমাদের জীবনের শক্তিশালি উপাদান নিহিত আছে হৃদয় এর ভদ্রতা ও কোমলতায় ।
৩/ যখন আমি আমাকে ভালবাসি তখন মনে হয় তোমাকেই ভালবাসি , আর যখন তোমাকে ভালবাসি তখন মনে হয় আমি আমাকেই ভালবাসি ।
৪/ বিদায় শব্দটা তাদের জন্য খাটে যারা কেবল চোখ দিয়ে মানুষকে ভালবাসে।কিন্তু যারা অন্তর ও আত্মা দিয়ে মানুষকে ভালোবাসে তাদের বেলায় বিদায় বলে কোন শব্দ নেই।
৫/ অতীতে আমি চালাক ছিলাম তাই সারা দুনিয়াকে বদলে ফেলার কথা ভাবতাম , বর্তমানে আমি জ্ঞানী হয়েছি , তাই এখন নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করছি।
৬/ অন্তরের দিকে গভীর মনোযোগ দাও ।সকল রহস্য এই অন্তরের ভিতরই লুকিয়ে আছে।কেবল আত্মা হতেই পরম-আত্মার রহস্য জানা যায়।
৭/ প্রভুর দরজায় আঘাত কর,সে তোমার জন্য তার দরজা উন্মুক্ত করে দিবেন।
৮/ বন্ধু আমাদের ঘনিষ্টতা হচ্ছে/ যেখানেই তুমি তোমার পা রাখবে/ পদতলে দৃঢ়তার মাঝে/ আমাকেই অনুভব করবে
(মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি)
গভীরতার মানদণ্ডে রুমির তুলনায় শেক্সপিয়রের মান হচ্ছে মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ। পশ্চিমা সাহিত্যিকদের মান প্রসেঙ্গ তিনি আরো লিখেছেন, ‘পাশ্চাত্যের গ্যাটে, চসার ও ইমারসন পর্যন্ত রুমির প্রভাব প্রতিপত্তি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, রুমির সমকক্ষ যেমন গাজ্জালি, গালিব, জামি, সাদি, জিবরান, এমনকি কাজমি, দেহলভি বা জাউকের (Zauk) সাহিত্যকর্মের তুলনায় পশ্চিমা সাহিত্য বলতে গেলে হাস্যকর পর্যায়ের অগভীর।
রুমি বিশ্বাস করেন, সৌন্দর্য মানব মনের চিরন্তন কাম্য। কেননা আল্লাহ নিজেই সুন্দর এবং তিনি সব সৌন্দর্যের উৎস। জালালউদ্দিন রুমি ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানের বালাখে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাহা ওয়ালাদ ছিলেন সর্বজনবিদিত পণ্ডিত ও সুফি। মহৎ কাজ ও সৃষ্টির মাঝে আজো বেঁচে আছেন। মহা মনীষীদেরই একজন ফারসি কবি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির উপরে মুর্শিদ শামসে তাবরীযির এহন প্রভাব প্রতিপত্তি লক্ষ্য করে মাওলানা রুমির অনুসারী ও অনুরাগীরা ভীষন ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন। মাওলানা রুমিকে সামনে রেখে জাগতিক প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারের যে স্বপ্ন তারা এতোদিন দেখে আসছিলেন, শামসে তাবরীযির আগমনে তা ধুলিসাৎ হয়ে যায়।
মাওলানা রুনী ১২৭৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মোতাবেক ৬৭২ হিজরির ৫ জমাদিউস সানি ৬৮ বছর বয়সে ইস্তেকাল করেন। পাঁচ ধর্মের অনুসারী এক বিরাট জনতা কবর পর্যন্ত তার শবযাত্রায় অংশ গ্রহন করে। তার ইন্তেকালের রাতটিকে শাবে আরুস বা মিলনের রাত বলে আখ্যায়িত করা হয়। মাওলানা রুমী ভক্ত দরবেশরা, ওই দিনটিকে ওরস উৎসব পালন করে থাকে। তুরস্কে অবস্থিত মাওলানা রুমীর মাজার টিকে বলা হয় মাওলানার মাকবারা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



