
মেয়ের আবদার আমি যেন তাকে একদিন স্কুলে দিয়ে আসি। কিন্তু আমি একেবারেই সময় পাই না। সকাল আট টায় অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হই। অফিসে দেরী করে গেলে এডমিন এমন কুৎসিত ভাবে তাকায় যে প্রচন্ড ঘৃণা লাগে। এই জন্য আমি জিদ করে আধা ঘন্টা আগে অফিসে গিয়ে উপস্থিত হই। যাই হোক আজ মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গেলাম। বাসা থেকে স্কুল অনেক দূর। সেই গুলশান- ১। অবশ্য সকালবেলা খুব অল্প সময়েই স্কুলে পৌঁছে যায় মেয়ে। সকাল সাত টায় বের হয়- আর সাতটা চল্লিশ এ স্কুলে।

যেহেতু আমি ফোটোগ্রাফার, তাই মেয়ের ছবির অভাব নেই।
আমার মেয়ের নাম যাহ্রা তাবাসসুম রোজা। অবশ্য আমি পরী বলেই ডাকি। প্রতিদিন মেয়ে ফোন দিয়ে বলবে বাবা আজ তাড়াতাড়ি চলে আসো। প্লীজ বাবা। আমার স্কুলের অনেক হোমওয়ার্ক আছে। আমি মেয়েকে কথা দেই, আজ অবশ্যই তাড়াতাড়ি চলে আসবো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো- আমি তাড়াতাড়ি ফিরতে পারি না। অফিসের বড় স্যার আটকে রাখেন। মিটিং আছে, মিটিং। আমি মন খারাপ করে বসে থাকি। অফিস ছুটির সময় পার হয়ে আরও দুই ঘন্টা চলে যায়- মিটিং আর শুরু হয় না। রাত আট টার পর বড় স্যার বলেন আজ মিটিং হবে না। শরীরটা ভালো লাগছে না। চলে যান।

নানান ঢঙ্গের, নানান রঙের তার ছবি আছে।
আজ মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসার সময়, মেয়ে নানান গল্প শুরু করেছে। বাবা, গাড়ির পেছনে এটা কিসের নাম্বার? বাবা, আমার মতোন তুমি বক্সে করে টিফিন নাও না কেন? বাবা, তোমাকে ছোটবেলায় কে স্কুলে দিয়ে আসতো? বাবা, আজ কিন্তু বাসায় ফিরে আমাকে একটা ভূতের গল্প বলবে। বাবা, আমরা আবার কবে বাইরে খেতে যাবো? বাবা, দিদা (আমার মা) বলল- তুমি নাকি একদিন স্কুলে পটি করে দিয়েছিলে? ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারও প্রশ্ন। আমি একটুও রাগ করি না। বিরক্ত হই না। বরং হাসিমুখে মেয়ের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাই।

একদিন পার্কে নিয়ে গিয়েছিলাম।
আমি অফিস ছুটির পর তুফানের মতোন বাসায় ফিরি। বাস তো একদিনও পাই না। হেঁটেই ফিরি। বাসায় ফেরার সাথে সাথে মেয়ে বাবা বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরে। মেয়েকে পড়াতে বসাই। পড়া শেষে নিজের হাতে খাইয়ে দেই। তারপর নানান মজার মজার গল্প বলে ঘুম পাড়িয়ে দেই। ভোর সাড়ে ছয়টায় আমিই মেয়েকে ডেকে তুলি স্কুলে যাওয়ার জন্য। মেয়ের মা'র ব্যস্ততার শেষ নেই। তার আছে- অনলাইন শপিং, মেকাপ, মোবাইলে কথা, পার্লার আর বান্ধবী। ঘরের কাজ তো সব বুয়া করে। তবে সে রান্না করে। খাওয়ার সময় দেখি, তরকারিতে লবন দেয়নি। আবার কোনোদিন এত লবন দেয়, যে খাবার মুখেই দেয়া যায় না। ভাজি একদম পুড়ে ফেলে। তবু সে স্বীকার করে না ভাজি পুড়ে গেছে, বলে- আজ ভাজিটা একটু পোড়া পোড়া করেছি। আমি তাকে কিছু বলি না। সে থাকুক তার মতো। মেয়ে নাকি তার কাছে পড়তে বসে না, তার কাছে খেতে চায় না। ইত্যাদি ইত্যাদি...

এক শবে বরাতের রাতে সে নামাজ পড়ছে।
এই কিছু দিন আগে আমার মেয়ের বয়স ৫ বছর হলো। সারা পৃথিবীতে আমার একটুকরো আনন্দ হলো আমার মেয়ে। সারাদিন পর যখন মেয়েকে দেখি- আমার সব পরিশ্রম পানি হয়ে যায়। মেয়েটার জন্য ইচ্ছা করে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকি। দোকান থেকে সব কিছু কিনে এনে মেয়েটাকে দেই। মেয়েটার দারুন বুদ্ধি। কোন সময় কোন কথাটা বলতে হয় সে খুব ভালো করেই জানে। মাঝে মাঝে আমার মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা হয়, তখন মেয়ের মা বলে- মাথা ব্যাথার ওষুধ খেয়ে, লাইট বন্ধ করে শুয়ে থাকো। আর মেয়ে আমার মাথার কাছে বসে তার ছোট ছোট হাত দিয়ে মাথা টিপে দেয়, চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। একটু পর জিজ্ঞেস করে- বাবা, ব্যাথা কমেছে? ব্যাথা কমে না, তারপরও আমি লাফ দিয়ে উঠে বলি আরে- আমার মেয়ের হাতে তো জাদু আছে। ব্যাথা একটুও নেই। মেয়েটা হেসে উঠে- মেয়েটার হাসিমুখ বড় ভালো লাগে।

যখন সে একেবারে ছোট ছিল।
মেয়েটার জন্য সবাই দোয়া করবেন। যেন সে সুস্থ থাকে। ভালো থাকে। এবং তার দ্বারা যেন মানুষের মঙ্গল হয়।

পরীর পায়ে নূপুর।

একদিন ঈদের সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি...
ভালো থাকুক আমার মেয়ে। ভালো থাকুন আপনার মেয়ে। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব বাবার মেয়ে।

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



