
''সত্য কি তেঁতো, সেকি জীবনের মতো?
বেঁচেও মরা নাকি বিভেদের ক্ষত।
কানামাছি মিথ্যা...কানামাছি সত্য
কানামাছি তুমি আমি যে যার মত''
নীলার শুধু ভয় আর ভয়। এত ভয়ের কি আছে শাহেদ বুঝে না। কত মানুষ দিব্যি প্রেম করে বেড়াচ্ছে। কাউকে পরোয়া করে না। চুমু খাচ্ছে। আর নীলা শাহেদের সাথে দেখা করতেই ভয় পায়। সব জাগায় নাকি তার আত্মীয় দিয়ে ভরা। তারা নীলাকে দেখে ফেলবে। পাবলিক লাইব্রেরীতে আজ দেখা হলো তাদের। শাহেদ মন ভরে নীলাকে দেখতেও পারলো না, কোনো কথা বলতে পারলো না- তার আগেই নীলা বলল, আমি যাই। কে না কে দেখে ফেলে। শাহেদ বুঝে না মেয়েটা এত ভয় কেন? শাহেদ ভালো ছেলে। লেখাপড়া শেষ করে এখন চাকরি করছে, বেতন বেশ ভালো। নীলার মাস্টার্স শেষ হলেই তারা বিয়ে করবে। আর ততদিনে নীলার ডাক্তার বাবা মালোশিয়া থেকে ঢাকা চলে আসবেন। নীলার অবশ্য মাঝে মাঝে তার মাকে বলতে ইচ্ছা করে শাহেদের কথা। কিন্তু মাকে বললেই- বাবার কানে চলে যাবে। আর তার বাবা তখন ভাববে তিনি দেশে নেই বলে তার একমাত্র আদরের কন্যা প্রেম করে বেড়াচ্ছে। নীলা তার বাবাকে কষ্ট দিতে চায় না। আসলে কোনো ছেলে মেয়েই তাদের বাবা মাকে কষ্ট দিতে চায় না।
কোনো কোনো রাতে শাহেদের খুব ইচ্ছা করে সারারাত জেগে নীলার সাথে গল্প করতে। আরে প্রেমের আসল মজাই তো সারারাত জেগে কথা বলাতে। কথা দিয়েই তো মানুষ মানূষকে আপন করে নেয়। কথা না বললে কি দূরত্ব ঘুচে? কিন্তু নীলার সাথে রাতে কিছুইতেই কথা বলা যাবে না। নীলা তার মায়ের সাথে ঘুমায়। মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে, প্রেমের সময়। এই প্রেমটাই শাহেদ মনের মতো করতে পারছে না। কোথাও বসে দু'জন মিলে অনেকক্ষন গল্প করবে। স্যুপ খাবে, চিকেন ফ্রাই খাবে, চকলেট কফি খাবে। চোখে চোখ। হাতে হাত। তবেই না মজা। চোখে চোখ, হাতে হাত রাখা নিশ্চয়ই পাপ নয়। প্রেম ভালোবাসা নাম দিয়ে নোংরামো করা শাহেদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব না। তাদের সম্পর্ক স্বচ্ছ। নীলা আর শাহেদ তারা দু'জনেই বিশ্বাস করে, তাদের সম্পর্ক হচ্ছে সহজ সরল সুন্দর সম্পর্ক। যখনই তাদের দেখা হয়- একে অন্যের প্রতি চিঠি আদান প্রদান করে। নীলা এ পর্যন্ত একশো সাতটা চিঠি দিয়েছে শাহেদকে। প্রতিটা চিঠি শাহেদ খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
কি অদ্ভুত ভাবেই না তাদের পরিচয় হলো। শাহেদ অফিস থেকে বাসায় ফিরছিল। রাস্তায় জ্যামের কারনে সে সব সময় সাথে একটা বই রাখে। জ্যামে পড়লেই শাহেদ মোবাইলে গেমস খেলতে ঠাকে। এটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। সেদিনও সে গেমস খেলছিল। তার নামার কথা বাংলামটর কিন্তু অনেকক্ষন আগেই বাস বাংলামটর পার হয়ে শাহবাগ চলে গেছে। তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নামতে গিয়ে সে শাহবাগ মোড়ে পড়ে যায়। না সে ব্যথা পায়নি কিন্তু মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। ঠিক এই সময় অনেকেই তাকে দেখেছে কিন্তু সাহায্যের জন্য কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি। ঢাকা শহরের মানুষ এমন'ই। খুব বেশি নিষ্ঠুর। কিন্তু ঢাকা শহরের সব মানুষ নিষ্ঠুর নয়। নীলা ঠিকই এগিয়ে এসে শাহেদের দিকে নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে- ধরুন, আমার হাত ধরুন। তারপর উঠতে চেষ্টা করুন। শাহেদ হাত কি ধরবে! নীলার দিকে বোকা মানূষের মতো হা করে তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে ভাবছে একটা মেয়ে এত সুন্দর হয় কি করে? নীলা তাকে টেনে তুলল।
নীলা কখনও অন্য মেয়েদের মতো খুব সাঁজে না। তার সাঁজ বলতে চোখে মোটা করে কাজল দেওয়া আর কপালে একটা টিপ। তাতেই নীলাকে দারুন মায়াবি লাগে। তার কথা বার্তা, চাল চলন একদম সহজ সরল। নীলাকে দেখলেই মনে হয়- পৃথিবীর কোনো পাপ তাকে এখনও স্পর্শ করেনি। নীলা খুব বই পড়ে। নীলার কাছ থেকেই শাহেদের বই পড়ার অভ্যাস পেয়েছে। নীলা তাকে বেছে বেছে বেশ কয়েকটা এমন বই দিয়েছে- সেগুলো পড়ে শাহেদ বইয়ের দুনিয়ায় ঝাঁপ দিয়েছে। এখন শাহেদের আফসোস হয় সে কেন আরও আগে থেকে বই পড়া শুরু করেনি। ছুটির দিন শাহেদ সারাদিন বই পড়ে কাটায়। বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু শাহেদের আর কেউ নেই। নীলা তার জীবনে এসে জীবনটাই বদলে দিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তাদের একদিন মাত্র দেখা হয় পাবলিক লাইব্রেরীতে। তারা দু'জনে প্রেম ভালোবাসা সংক্রান্ত কোনো কথা বলে না। তারা বই নিয়ে আলোচনা করে।
মানুষ যে রকম ভাবে, বাস্তবে সেরকম কিছুই ঘটে না। অবচেতন মনের ভাবনা আর বাস্তব এক নয়। বাস্তব বড় কঠিন। মানুষ যখন কিছু ভাবে সহজ করে ভাবে- এটাই মানুষের জীবনে মস্ত বড় ভুল। নীলা ভেবেছিল তার বাবা দেশে ফিরলে শাহেদের সাথে তার বিয়ে হবে। কিন্তু তার বাবা দেশে ফিরেই মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন নিজের পছন্দ করা ছেলের সাথে। সেই ছেলে আবার ডাক্তার। মেয়ের পছন্দের উপর তার কোনো বিশ্বাস নেই। নীলা ভেবেছিল তার বাবা নীলার পছন্দের উপর আস্থা রাখবেন। সব মেনে নিবেন। মানুষের নিয়তি বড় অদ্ভুত। নিয়তির কাছে সবাইকে পরাজিত হয়। আজ নীলার বিয়ে। খুব ধূমধাম করে নীলার বিয়ে হয়ে গেল। নীলা-শাহেদ কি পারতো না পালিয়ে বিয়ে করতে? একসময় ঠিকই দু'জনের পরিবার মেনে নিত। এরকম তো হরহামাশাই হচ্ছে।
পাঁচ বছর হয়েছে নীলার বিয়ের। এখন তার দু'টা ছেলে। ভীষন ব্যস্ত নীলা তার সংসার নিয়ে। সংসার জীবনে প্রবেশ করে শাহেদের কথা পুরোপুরি ভুলে যেতে সক্ষম হয়েছে নীলা। নীলার বিয়ের পর শাহেদ বই পড়া তিন গুন বাড়িয়ে দিল। বই পড়লে নীলাকে ভুলে থাকা যায়। বইয়ের ভূবনে হুট করে কেউ ঢুকে যেতে পারে না। নীলাও না। আজকাল শাহেদ লেখালেখি শুরু করেছে। সে সস্তা প্রেম ভালোবাসার কিছু লিখে না। সে লিখে দেশের সমস্যা ও সমাধানের কথা। গত মাসে তার গ্রীনহাউজ নিয়ে প্রবন্ধটা সুধীজনের বেশ নজর কেড়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ১১:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



