
মানুষ যেমন ভালো কাজ করে, আবার মন্দ কাজও করে। আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি আমি আমার জীবনে মন্দ কাজ খুব কম করেছি। মৃত্যুর পর আল্লাহ যখন আমার পাপ পূন্য দাড়িপাল্লা দিয়ে মাপবেন তখন আমার পূণ্যের পাল্লা ভারি হবে। তাই বলে পাপ কি কিছু করিনি? খারাপ কাজের কথা বলতে ইচ্ছা করে না। ভালো কাজের কথাই বলতে ইচ্ছা করে। আমার জীবনে আমি বেশ কিছু ভালো কাজ করেছি। এই ভালো কাজ গুলোর জন্য আমার খুব গর্ব হয়, আনন্দ হয়। আজ আপনাদের আমি আমার দু'টা ভালো কাজের গল্প বলব।
১। আব্বা তখন গাড়ির ব্যবসা করতেন। অনেক গুলো গাড়ি ছিল। একজন ড্রাইভার আমাদের বাসায় থাকতো। তার নাম ছিল রহিম। বয়স আনুমানিক পয়ত্রিশ হবে। রহিম আমাকে সব সময় চাচা বলে ডাকতো। তখন আমি কলেজে পড়ি। রহিম আমাকে নানান বিষয় নিয়ে গল্প শোনাতো। বেশির ভাগ গল্পই ছিল ভূতের। আব্বা ঢাকার বাইরে গেলেই, গাড়ি চালানো শিখাতো আমাকে।
একদিন রহিম আমাকে বলল, চাচা আমার খুব কষ্ট। আমি লেখা পড়া করি নাই। এটাই আমার জীবনের সবেচেয়ে বড় ভুল। রাস্তায় সিনেমার পোষ্টার দেখি কিন্তু সিনেমার নাম পড়তে পারি না। অথচ নায়ক নায়িকা সবাইকে চিনি। কি যে কষ্ট লাগে! আমি বললাম, লেখা পড়া শিখবেন? যদি সত্যি সত্যি লেখা পড়া শেখার ইচ্ছা থাকে তাহলে প্রতিদিন এক ঘন্টা করে আমার কাছে পড়তে বসবেন।
রহিম সত্যি সত্যি একমাস আমার কাছে পড়তে বসলো। এই একমাসে আমি অসাধ্য সাধন করলাম। তাকে বাংলা পড়তে শিখিয়ে দিলাম। তার প্রচুর আগ্রহেই তাকে খুব অল্প সময়ে শিখাতে পারলাম। রহিম যে কি পরিমান খুশি হলো, আনন্দে তার চোখে পানি চলে এলো। সে এখন রাস্তায় শুধু সিনেমার পোষ্টার দেখে না, নামও পড়তে পারে। নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ে। আমি তাকে বলেছি প্রচুর বই পড়তে। সে প্রচুর বই পড়ে। তার নিজের সংগ্রহ করা বইয়ের সংখ্যা দুই শ'র উপরে।
এক যুগের বেশি হয়ে গেল রহিম আমাদের গাড়ি চালায় না। ভয়াবহ সমস্যায় পড়ে আব্বা গাড়ি বিক্রি করে দেয়। কিন্তু রহিমের সাথে মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হয়। রাস্তায় দেখা হলেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে। তখন তার চোখের পানি জমে থাকে।
২। কয়েক বছর আগের কথা। সেবার প্রচন্ড শীত পড়েছে। আমি শেরাটন (রুপসী বাংলা) হোটেলের উলটা পাশ দিয়ে হেঁটে শাহবের দিকে যাচ্ছি। তিনদিন ধরে কোনো রোদ নেই। খুব কুয়াশা। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। সারা দেশ শীতে কাঁপছে। হঠাৎ দেখি রাস্তার ফুটপাতে এক বুড়ি হাঁ করে নিশ্বাস নিচ্ছে। বুড়ি দেখে খুব মায়া লাগল। বুড়ির মুখটা অনেকটা আমার দাদীর মতোন। একেবারে ক্ষুনক্ষুনে বুড়ি। সামনের পাটির তিনটি দাঁত নেই। একটা ছেঁড়া পাতলা কম্বল প্যাচিয়ে রেখেছে সারা গায়ে। খুব হাঁপাচ্ছে। ঠিক করে নিশ্বাস নিতে পারছে না। আমি খুব নরম স্বরে বললাম, কি হয়েছে? বুড়ি তার ইনহেলার দেখিয়ে বলল, শেষ হয়ে গেছে। তার হাপানীর সমস্যা আছে। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বুড়িটাকে দেখে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো।
বুড়ির হাত থেকে ইনহেলারটি নিয়ে আমি দৌড়ে শাহবাগ মোড়ে গেলাম। পকেটে চার শ' টাকা ছিল। তিন শ' সত্তর টাকা দিয়ে বুড়ির জন্য ইনহেলার কিনে ফেললাম। বুড়ির হাতে ইনহেলার দিলাম। সে সাথে সাথে ইনহেলার ব্যবহার করলো। এবং কিছুক্ষনের মধ্যে তার শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলো। বুড়ি এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে আমার মাথায় হাত রাখলো। ফোকলা দাঁত বের করে হাসলো অথচ তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।
(আজ সারাদিন অফিসের কাজে আমাকে নানান জায়গায় ছোটাছোটি করতে হয়েছে। প্রচন্ড রোদ উঠেছে আজ। রোদের তেজ ছিল মারাত্মক। দুপুর থেকেই খুব মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। মাথা ব্যথা নিয়েই লেখাটা লিখতে বসলাম। মাথা ব্যথার ওষুধ খেয়েছি। ব্যথা কমছে না। ক্ষুধা লেগেছে কিন্তু কিচ্ছু খেতেও ইচ্ছা করছে না। সামুর ব্লগারদের অনুরোধ করবো, যদি দেশকে ভালোবাসেন তাহলে মাসে একটি হলেও ভালো কাজ করুন। )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
