somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

প্রবৃত্তি

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পুরানো পেঁচারা সব কোটরের থেকে
এসেছে বাহির হ'য়ে অন্ধকার দেখে
মাঠের মুখের’পরে,
সবুজ ধানের নিচে–মাটির ভিতরে
ইঁদুরেরা চ'লে গেছে–আঁটির ভিতর থেকে চ'লে গেছে চাষা,
শস্যের ক্ষেতের পাশে আজ রাতে আমাদের জেগেছে পিপাসা!
------- জীবনানন্দ দাশ।


শাহেদ মনে মনে তিনবার বলল, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি গুলোকে আমি ঘৃণা করি।
রুপা স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যানের স্ত্রী আজ ফ্যাক্টরীতে এসেছেন। খুবই উগ্র সাঁজ তার। মাসে তিন লাখ টাকার বেশি পার্লারে ব্যয় করেন। তবু তাকে সুন্দর লাগে না। তার নিজের ব্যাক্তিগত বিউটিশিয়ান আছে তিনজন। নব্বই লক্ষ টাকা দামের গাড়িতে চলাচল করেন। যদিও একসময় তিনি ভয়াবহ অভাবের মধ্যে দিন যাপন করেছেন। সেসব অতীত। মানুষের বর্তমানটাই আসল। শাহেদ যতবার চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে দেখে ততবার মনে মনে বলে, ম্যাডাম আপনার চেহারার মধ্যে একটুও সৌন্দর্য নেই। চোখে মুখে কোনো মায়া নেই। আপনি যখন কড়া মেকাপ করেন তখন আপনার মনের কলুষতা গুলো আরও বেশি ফুটে উঠে। কুৎসিত লাগে আপনাকে। আপনার চেয়ে হাজার গুন বেশি সুন্দর লাগে আপনার বাসার কাজের মেয়ে গুল নাহারকে। শাহেদ প্রতিদিন তার ডায়েরীতে ফ্যাক্টরীর ঘটনা গুলো লিখে রাখে। আবার ভাবে লিখেই বা কী হবে? তবু কিছু লিখতে ইচ্ছে করে। যাদের কথা শোনার কেউ নেই, তাদেরও তো অনেক কিছু বলার থাকে! আজ সে অফিসে সবচেয়ে বেশি টাকা বেতন পায়। বেতনের ডবল সে অন্যভাবে ইনকাম করে।

চেয়ারম্যান সাহেবের মায়ের নাম ছিল সুফিয়া। তিনি মায়ের নামেই কোম্পানীর নাম রেখেছিলেন- 'সুফিয়া স্পিনিং মিল।' মা মারা যাবার পর কোম্পানীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ত্রীর নামে, রুপা স্পিনিং মিল। এই স্পিনিং মিলে শাহেদ চাকরি করে পাঁচ বছর ধরে। শাহেদ যখন এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করে তখন তার চেহারা বেশ সুন্দর ছিল। সুঠাম স্বাস্থ্য। আজ তার চেহারা হয়েছে লিকলিকে। গালের হনু বের হয়ে গেছে। তাকে দেখলে মনে হয় জন্ডিসের রোগী। অফিস ছুটির পরও তার অনেক কাজ করে দিতে হয় চেয়ারম্যানের। যেদিন চেয়ারম্যানের কাজ থাকে সেদিন থাকে তার স্ত্রীর কাজ। তাতে বাড়তি কিছু পয়সা পাওয়া যায়। অনেক সময় তাকে ছুটির দিনেও ডিউটি করতে হয়। সে তার স্ত্রীকে সময় দিতে পারে না। মা-বাবা অথবা ভাই বোনকে সময় দিতে পারে না। তবে তার পরিবারের প্রতিটা সদস্যকে সে সুখী করতে পেরেছে। আজ তাদের কোনো অভাব নেই। বেশ স্বচ্ছল। পরিবারকে খুশি রাখতে গিয়ে তার প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। শাহেদ মনে মনে ভাবে কাজ করার এখনই সময়। যে কাজই হোক। টাকা হাতে আসলেই হলো। আর যে কাজে টাকা আসার সুযোগ একেবারেই নেই, সে কাজে শাহেদ অফিসের অন্য লোকজনদের পাঠায়।

চেয়ারম্যানের স্ত্রী রুপা বিবেক ছাড়া মানুষ। এটা ফ্যাক্টরীর সবাই জানে। শাহেদ এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বুঝতে শিখেছে- সমাজের বেশিরভাগ মানুষ আইন নয়, বিবেক দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। আইন অমান্য করেন কিছু সংখ্যক প্রভাবশালী মানুষ। তার প্রভাব পড়ে অন্যদের ওপর। এতে তারা ন্যায় আর অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে ভুলে যায়। গালগল্প ও অন্যের সমালোচনা করা প্রায় প্রতিটি মানুষের এক সহজাত কুপ্রবৃত্তি। রুপা স্পিনিং মিলে সব কিছু মিলিয়ে শাহেদ খুশি। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তার সংসার ভালোই চলছে। বেশ কিছু টাকাও জমাতে সক্ষম হয়েছে সে।
শাহেদ গিয়েছে গ্রামের বাড়ি নরসিংদী। তার নানু অসুস্থ। এমন সময় রুপা ফ্যাক্টরী এসে উপস্থিত। শাহেদ গ্রামে যাওয়ার আগে রুমা ম্যাডামকে বলেই গেছেন। তবু রুপা এসেই সমনজারি করলো এক্ষন শাহেদকে আসতে বলো। অফিস থেকে শাহেদকে ফোন করা হলো। শাহেদ তার নানুকে হাসপাতালে রেখেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রুপা ম্যাডাম একটা পিতলের বড় পাতিল কিনতে বলেছিলেন। সেই পিতলের পাতিলে বনসাই লাগানো হবে। তিনি তার এক বান্ধবীর বাড়িতে এমনটা দেখেছিলেন। শাহেদ জানে পয়সাওয়ালা লোকদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে নেই। ফ্রয়েড বলেছেন, মানুষ সভ্যতার মুখোশ পরে আছে। চেয়ারম্যান এবং তার স্ত্রী খানদানী বড়লোক না। হুট করে ধনী হওয়া লোক বড় ভয়ঙ্কর। আচ্ছা, মানুষের মনের অজান্তে ঘটে যাওয়া কোন নির্দেশকে সহজাত প্রবৃত্তি বলে? প্রবৃত্তি নিজের চেষ্টায় অর্জিত হয়?

শাহেদ ঢাকা ফিরে পিতলের পাতিল আর বনসাই কিনে ম্যাডামের বাসায় যায়। ম্যাডাম বনসাই দেখে বাচ্চাদের মতো খুশি হয়। শাহেদ ম্যাডামকে পা ছুঁয়ে সালাম করে। এটা অলিখিত নিয়ম। যতবার দেখা হয় ততবার পা ছুঁয়ে সালাম করে। এই সমস্ত সস্তা কাজ করেই ধনীদের খুশি রাখতে হয়। দয়াদাক্ষিণ্য বেশ ভালোই পাওয়া যায়। শাহেদ গত বছর বুড়িগঙ্গা নদীর ওপাড়ে জায়গা কিনে ফেলেছে। আগামী বছর বাড়ির কাজ ধরবে। তার অনেক টাকার দরকার। এই ফ্যাক্টরীতে কাজ করতে এসে যে শাহেদ কত কিছু শিখলো! একটি শিশু জন্মের পরপর কান্না করছে। সব ধরনের পশু-পাখি জন্মের পর এক ধরনের শব্দ করে। তাকে কিন্তু কেউ শিখিয়ে দেয়নি এই আওয়াজটা করতে, তাহলে সে কোথা থেকে নির্দেশ পেলো এই কান্না বা শব্দ করার? প্রয়োজন শাহেদকে সব কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে। কিন্তু কোথাও চাকরি পায়নি। দরিদ্র পরিবারের ছেলে সে। তাই সে রুপা স্পিনিং মিলের এই চাকরিটা খুব মন দিয়ে করে। প্রতিনিয়িত তাকে অনেক অপমানের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। সে অপমান আজকাল আর গায়ে মাখে না। অভ্যাস হয়ে গেছে।

শাহেদ চেয়ারম্যান আর চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে হাজারটা মিথ্যা বলে তাদেরকে খুশি করে। চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য মিথ্যা বলাটা দোষের না। শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ কথা বলার সময় প্রতি ১০ মিনিটে অন্তত একটি মিথ্যা কথা বলে। শাহেদ ভালো করেই জানে খারাপ প্রবৃত্তি মানুষের সহজাত, ভাল গুণ মানুষের অর্জন। মূলত ফ্যাক্টরীতে শাহেদের পদ ম্যানেজার। আসলে সে চেয়ারম্যানের ডাম হাত এবং চেয়ারম্যানের স্ত্রীর পিএস। ফ্যাক্টরীর সবাই তাকে সমীহ করে। শাহেদ ইচ্ছা করলে অনেকের চাকরি খেয়ে দিতে পারে। যাকে শাহেদের ভালো লাগে না, গোপনে সে ব্যবস্থা নিয়ে নেয়। পরের দিন দেখা যায় তার চাকরি চলে গেছে। অনেক কষ্টে সব কিছু শাহেদ নিজের কন্টোলে এনেছে। এখন সে যা চায়, যেভাবে চায় তাই'ই হয় এই ফ্যাক্টরীতে। কোম্পানীর চেয়ারম্যান বা তার স্ত্রী বুঝতেই পারেন না আজকাল শাহেদের ইচ্ছা'ই তাদের চলতে হচ্ছে। অতি চালাক মানুষের এইভাবেই ধরা খায়।

আপনি কি জানেন প্রতিটা অফিসে এই রকম একটা করে শাহেদ আছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১১:১৯
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘সবচেয়ে কঠিন’

লিখেছেন আবু সিদ, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:১৫


আমি সাদ। আমার বয়স ১৭ বছর। আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। আমার ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৫ বা তার আশপাশে। আমারও ১৫ বছর বয়সে ক্লাস টেনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্চে রাজনৈতিক বিভাজন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৪



উদীচী পুড়ার সময় কি হারমোনিয়াম, তবলা, একতারা, দোতারা, সেতার কিংবা বাঁশি পুড়েনি?, মনে রাখবেন তখন আগুন শুধু কিছু বাদ্যযন্ত্র পোড়ায়নি, -পুড়েছিল এই বাংলার সংস্কৃতির, এই বাংলার শত কোটি মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মেটিকুলাসলি ডিজাইন' করে সিলেটকে অশান্ত করে তোলার অর্থ কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:১৫

সিলেটে এন,সি,পি সাংগঠনিক ভাবে দূর্বল।
দলের ভিতরে কোন্দল মারাত্মক তা ফেসবুকে দলীয় নেতা কর্মীদের পোস্ট দেখে বুঝা যায়।
অথচ, সামনে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন।
এই পরিস্থিতিতে, দলের মানুষদের 'গরম' করে তোলার একটাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২৮

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।
================================
ইতিহাস কখনো মুছে যায় না। যে জাতি তার মানুষের কান্না, আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি ভুলে যায়, সে জাতির ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আজ এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দহনের ওপারে প্রশান্তি

লিখেছেন মুহাম্মদ তমাল, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৫৩



প্রিয় আকাশ,
মাঝে মাঝে তোমার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তুমিই সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে নিঃশব্দ প্রাঙ্গণ। তাই আমার সমস্ত অভিযোগ, অনুযোগ, ক্ষোভ, দীর্ঘশ্বাস আর অব্যক্ত আর্তনাদ তোমার দিকেই ছুড়ে দিই। তুমি নির্লিপ্ত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×