somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

ফুলার রোড

০৭ ই এপ্রিল, ২০১৮ দুপুর ২:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শাহেদ আর নীলার সম্ভবত আজ ব্রেক আপ হয়ে যাবে। দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের সম্পর্কের আজ ইতি ঘটবে। কত স্মৃতি তাদের। রিকশায় করে ঘুরে বেড়ানো। রাত জেগে মোবাইলে কথা বলা। পার্কে অথবা লেকের ধারে বসে কত গল্প, রাগ, মান-অভিমান। ছাত্র ছাত্রী থাকা অবস্থায় যারা প্রেম ভালোবাসা করে তাদের সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় খুব কম। পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকা আর অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় ভালবাসা ভেঙ্গে যাওয়ার কারণ হয়ে দাড়ায়। কিন্তু শাহেদ আর নীলার ব্যাপারটা অন্যরকম। তারা কখনও ভাবেনি ব্রেক-আপের সম্মুখীন হতে হবে। একটা সম্পর্ক অনেক যত্নে একটু একটু করে গড়ে উঠে। শাহেদ নীলার সাথে সম্পর্কের শুরুতেই বলেছিল- কাউকে যেমন ঠকাতে পারবো না ঠিক তেমনি কারও কাছ থেকে ঠকতেও পারবো না। তাই আমি তথাকথিত সভ্য সমাজে বড়ই অচল।
শাহেদ নীলার প্রেমটা এযুগের ছেলে মেয়েদের মতোন নয়। শাহেদ কোনো দিন'ই সুযোগ খুঁজেনি হাত ধরার জন্য বা চুমু দেওয়ার জন্য। রিকশায় উঠেই দুষ্ট ছেলেরা হুড লাগানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। চিপাচাপা নিরিবিলি জায়গা খুঁজে। বন্ধুর ফ্লাটে নিয়ে যায়। নানান অন্যায় আবদার করে। শাহেদ কোনো দিনই এসব করেনি। তার রুচিতে বাঁধে। শাহেদ মনে করে প্রেমের সম্পর্ক হবে সহজ সরল স্বচ্ছ এবং পবিত্র। যারা নোংরামো করে প্রেম ভালোবাসার নাম দিয়ে তারা বিরাট বদ। এই বদ'দের কাজই হলো মেয়েদের ভুলিয়ে ভালিয়ে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। আর নির্বোধ মেয়ে গুলো যেন এই ভুলের স্বীকার হওয়ার জন্য যেন পা বাড়িয়েই থাকে। যুগ যুগ ধরে তো এমনই চলছে।

শাহেদের প্রধান অপরাধ লেখাপড়া শেষ করেও একটা চাকরি যোগাড় করতে পারেনি। প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল। তার বাবা মা ভাই বোন শাহেদের উপর খুব বিরক্ত। তাদের পরিবারের সবাই ধরেই নিয়েছে শাহেদ ভাঙ্গা কূলা। যে ছেলে মাস্টার্স পাশ করে একটা চাকরি যোগাড় করতে পারে না সে অবশ্যই ভাঙ্গা কূলা। কিন্তু এদেশে মামা চাচা ছাড়া চাকরি পাওয়া যায় না। অথবা অনেক টাকা ঘুষ দিতে হয়। একটা সরকারি অফিসে পিয়নের চাকরির জন্যও তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়।
শাহেদ ইন্টারভিউ দিতে দিতে ক্লান্ত। তার ঘৃণা ধরে গেছে নিজের উপর আর চাকরির উপর। বাপের টাকা নাই যে সে ব্যবসা করবে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানের কষ্টের শেষ নেই। যে সব বন্ধুদের চাকরি হয়ে গেছে তাদেরও আজকাল পাওয়া যায় না। সবাই ব্যস্ত। কেউ কেউ বিয়েশাদী করে ফেলেছে। বাচ্চা কাচ্চা আছে। তাদের কারো কাছে গেলেই ভাবে বেকার বন্ধু টাকা চাইতে এসেছে। কিন্তু শাহেদ কোনো দিনও তার কোনো বন্ধুর কাছে টাকা ধার করেনি। তার দুইটা টিউশনি আছে। সেই টাকা দিয়েই সে মাস চালায়। শাহেদ সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়ে যায়, ফিরে রাতে বাসার সবাই যে যার ঘরে ঘুমুতে চলে যাওয়ার পর। সপ্তাহে একটা দিন শাহেদের আনন্দের দিন। সেদিন নীলা তার সাথে দেখা করতে আসে। নীলার দিকে তাকালেই তার মন ভালো হয়ে যায়। নীলাকে খুব সাঁজতে হয় না। শুধু চোখে কাজল আর কপালে একটা ছোট্র টিপ দিলেই তাকে অপূর্ব দেখায়।

নীলা দাঁড়িয়ে আছে ফুলার রোডে একটা জারুল গাছের নিচে। সময় বিকেল পাঁচটা। সে আজ একটা আকাশি রঙের শাড়ি পরেছে। বেশির ভাগ মেয়েই সুন্দর করে শাড়ি পড়তে পারে না। বিশেষ করে শাড়ির কুঁচিটা তাদের সুন্দর হয় না। শাড়ি পরার ব্যাপারে নীলা এক্সপার্ট। তার বান্ধবীরা তার কাছে আসে শাড়ি পড়তে। নীলার মাথা ভর্তি এক আকাশ খোলা চুল সারা পিঠময় ছড়িয়ে আছে। এযুগের কোনো মেয়ের মাথায় এত চুল থাকে না। তারা পার্লারে গিয়ে এটা-সেটা করে চুলের বারোটা বাজিয়ে দেয়। নীলার শাড়ির আচল আর চুল গুলো বাতাসে উড়ছে। চোখে মোটা করে কাজল দিয়েছে। আর কপালে একটা ছোট্র টিপ। শাহেদ প্রায়ই বলে, নীলা তোমার সাজার কোনো দরকার নেই। শুধু মাত্র চোখে কাজল দিলেই তোমাকে অসাধারন লাগে। নীলার দুই হাত ভরতি কাঁচের চুড়ি। শাহেদ কাঁচের চুড়ি খুব পছন্দ করে। কাঁচের চুড়ির টুং টাং শব্দ তার নাকি খুব ভালো লাগে। আশপাশ থেকে শুধু ছেলেরা না মেয়েরাও মুগ্ধ চোখে নীলার দিকে তাকাচ্ছে। নীলা আছে একটা ঘোরের মধ্যে। ভয়াবহ অস্থিরতার মধ্যে আছে সে। তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সে নানান তালবাহানা করে দুই বছর বিয়ে পিছিয়েছে। আর সম্ভব না। বাবা মা রেগে গেছেন। আজই শাহেদের সাথে তার শেষ দেখা, এটা ভাবতেই তার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। শাহেদ নীলা দু'জন দু'জনকে প্রচন্ড ভালোবাসে। স্বচ্ছ পবিত্র ভালোবাসা।

আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে তাই বোধহয় ফুলার রোডটা আজ বড় বেশি নির্জন। চারিদিকে শীতল বাতাস বইছে। বাতাসে গাছের পাতা টুপটাপ ঝরে পড়ছে। শাহেদ গালে এক হাত দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। অনেকক্ষন নিরবতা পালন করার পর নীলা খুবই নরম স্বরে বলল, ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিও। আমার উপর মন খারাপ করে থেকো না। আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। নীলার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। চোখের কাজল লেপটে গেছে। আবার নিরবতা। কত সময় পার হয়েছে কে জানে! নিরবতা ভেঙ্গে নীলা বলল, আমি যাচ্ছি। যাওয়ার আগে আমার কপালে কি একটা চুমু দিয়ে দিবে? শাহেদ নীলার দিকে তাকালো। শাহেদের চোখ ভেজা। শাহেদের ইচ্ছা করছে নীলাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে তাহলে হয়তো তার কষ্ট কিছুটা কমতো। নীলা এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে শাহেদের হাত ধরলো। ভালোবাসার শেষ স্পর্শ। শাহেদের বুকের ভেতরটা কেমন করছে নীলা অনুভব করতে পারলো। কতক্ষন সময় পার হয়েছে কে জানে! আকাশে মেঘের গর্জন শুরু হয়েছে। যে কোনো সময় প্রবল বর্ষণ শুরু হবে।

শাহেদ বৃষ্টিতে ভিজছে। নীলা কখন চলে গেছে কে জানে! বাস্তব বড় কঠিন। বাস্তবে শাহেদরা মামা চাচা আর টাকা না থাকার কারনে চাকরি পায় না। তারপরও এক আকাশ আশা নিয়ে একটার পর একটা ইন্টারভিউ দিয়ে যায়। নীলাদের বিয়ে হয়ে যায় যথাসময়েই। তারা বেশ সুন্দর ভাবেই সংসার করতে থাকে শ্বশুড় শ্বাশুড়ি আর দেবর ননদ নিয়ে। বছর শেষ হতেই তাদের সংসারে নতুন শিশু আসে। নীলারা ভয়াবহ ব্যস্ত হয়ে যায়। এত ব্যস্ততার মাঝে নীলাদের আর শাহেদের কথা মনে পড়ে না। শাহেদরা পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। চাকরি খুঁজে বেড়ায়। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে। পুরোনো প্রেমের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে চেষ্টা করে। একসময় কঠিন অসুখে পড়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। মৃত্যুর পরে জানা যায় শাহেদেরা কয়েক শ' কবিতা লিখেছে নীলাদের নিয়ে। বালিশের নিচে নীলাদের ছবি পাওয়া যায়। সে সব খবর কেউ রাখে না।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০১৮ বিকাল ৪:০৯
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্তর্দহনের ওপারে প্রশান্তি

লিখেছেন মুহাম্মদ তমাল, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৫৩



প্রিয় আকাশ,
মাঝে মাঝে তোমার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তুমিই সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে নিঃশব্দ প্রাঙ্গণ। তাই আমার সমস্ত অভিযোগ, অনুযোগ, ক্ষোভ, দীর্ঘশ্বাস আর অব্যক্ত আর্তনাদ তোমার দিকেই ছুড়ে দিই। তুমি নির্লিপ্ত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দক্ষিণ কোরিয়ার 'নতুন গ্রাম আন্দোলন'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২৭



বাংলাদেশের উন্নতি হতে হলে, গ্রামগুলোর উন্নয়ন ছাড়া উপায় নাই। গত ৫৬ বছরে আমাদের দেশের গ্রামবাসীদের উন্নয়ন খুবই কম হয়েছে। সেখানকার মানুষ অবহেলার সম্মুখীন হয়ে নিম্ন সেলারির জব... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবার সমস্যা, ব্লগ আমাকে কেন ভোগাচ্ছে?

লিখেছেন মেহবুবা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

আবার সমস্যা ব্লগ ঠিকমত দেখা যায় না। কিছুদিন আগে এমনটি হয়েছিল। ব্লগার সুলাইমান সহজ করে সমাধান বের করে দিয়েছিল। এবার একই সমস্যা হচ্ছে তবে সেই একই উপায়ে কাজ হচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ইরানের নতুন শত্রু হতে চলেছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৬


মরুভূমির গরম বাতাস আর লোহিত সাগরের নোনা জলীয় বাষ্প যেখানে এসে মেশে, বাব এল মানদেব প্রণালীর সেই জায়গাটায় রাতের অন্ধকার নামলেই একটা অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কল্প-গল্প : প্রমিথিউসের শেষ রাত

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১১



“স্যার, কিছু কয়েন দেন!” মোলায়েম স্বরে বলেই হাত কচলায়।

কয়েনটি যিনি চাইলেন, তিনি একজন ভিক্ষুক। ব্যস্ত শহরের এই চৌরাস্তায় বসে নিয়মিত কয়েন আবদার করাই তার একমাত্র কাজ। মালদার পার্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×