
১৯৬৪ সালে ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসটি লিখেন। লেখক এই উপন্যাসটির জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার পান। উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন- কালের আবর্তে সময় গড়ায়। প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসে। শুধু পরিবর্তন আসেনা অন্ধকার, কুসংস্কারাছন্ন গ্রাম বাংলার আচলায়াতন সমাজে। নারীর কোন অধিকার নাই। নারী হাতের পুতুল মাত্র। পুরুষ তাকে যেমন নাচায় তেমন নাচে। নিজের ইচ্ছেতে কাউকে বিয়ে করাটা এমন সমাজে অপরাধ, গুরুতর অপরাধ। অন্ধকার এই সমাজে আনাচে কানাচে বাস করে কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, নারী নির্যাতন। ৫৪ বছর আগে যেরকম অবস্থা ছিল আজ সেই একই অবস্থা।
উপন্যাসের কাহিনি এই রকমঃ পরীর দীঘির পাড়ের একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কাহিনী। কখন এই গ্রামের গোড়াপত্তন হয়েছিল কেউ বলতে পারে না। এক বন্যায় “কাষেম শিকদার” আর তার বউ বানের পানিতে ভেলায় ভাসতে ভাসতে এসে ঠাই নিয়েছিল এই জায়গায়। সেই থেকে এখানে পত্তন হয়েছিল শিকদার বাড়ির। একটি গ্রামের একান্নবর্তী পরিবারের সংঘাতময় জীবনের কাহিনী। জীবিকার তাগিদে বাড়ির পুরুষদের কাজ করতে হয় ঘরে বাইরে , দিন রাত যেন অক্লান্ত পরিশ্রম । বাড়ির নারী সদস্যরাও বাদ যায়না । তারা চাটাই বোনা,অন্যের ধান ভাঙা,শাপলা তোলা এরকম আরো অনেক কাজ করে যতটা পারা যায় তারা পরিবারের আয় উন্নতিতে সাহায্য করে । তবুও তাদের লড়তে হয় কঠিনতম জীবন সংগ্রামে । এরপরেও আছে নানারকম কুসংস্কার,নানাবিধ ধর্মীয় গোঁড়ামী আর বিধি নিষেধের বেঁড়া জাল ।
এই উপন্যাসে বাল্য বিবাহের প্রসঙ্গ এসেছে, বহু বিবাহের কথা এসেছে। নারীদের অসম্মান করার ব্যাপার উঠে এসেছে, এমনকি বউকে পিটিয়ে মেরে ফেলাও যে তৎকালীন সময়ে এমন অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার ছিল না সেটাও লেখক অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। এই বইয়ে সামাজিক কুসংস্কারের কথা উঠে এসেছেন, পরকীয়া প্রেমের কথাও বাদ যায় নি.কেন্দ্রীয় চরিত্র টুনি আর মন্তুর মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন এই হাজার বছর বয়স্কা বাংলার হাজারো যুবক যুবতীর হৃদয়ের কথা, হৃদয় ভাঙার কথা।
রাত বাড়ছে। হাজার বছরের পুরনো সেই রাত।
জহির রায়হানের প্রথম স্ত্রী কোহিনুর আক্তার সুচন্দা হাজার বছর ধরে উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সরকারি অনুদানে। যদিও ছবিটি নির্মাণ করতে অনেক টাকা লেগেছে কিন্তু সরকার দিয়ে ২৫ লক্ষ টাকা। পরিচালক সুচন্দা ছবির শুটিং স্পট বেছে নেন গাজীপুরের হোতাপারা। উপন্যাসটা পড়ার পর যেরকম ভালো লেগেছিল ছবিটা দেখেও অনুভূতি সেরকম। যারা ছবিটি দেখেননি বা যারা অনেক দিন ভালো গ্রামীণ বাংলা ছবি দেখেন না তারা এটি দেখতে পারেন। যদি কেউ মুভিটি দেখতে চান 'হাজার বছর ধরে' এই ছবিটির মন্ত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য (নায়ক রিয়াজ) পারিশ্রমিক হিসাবে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র ১০১ টাকা।
ফরমায়েশী লেখা লিখতে গিয়ে জহির রায়হান এ উপন্যাসটি লিখেছিলেন! লেখকের বয়স তখন ২৯। ‘সচিত্র সন্ধানী’ সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ জহির রায়হানের বন্ধু ছিলেন। গাজী শাহাবুদ্দিন তাঁর কাছে অনেকদিন ধরে ‘সচিত্র সন্ধানী’র ঈদসংখ্যার জন্যে একটি উপন্যাস চেয়েছিলেন। কিন্তু জহির রায়হান তার পরিচালিত সিনেমা নিয়ে খুব ব্যস্ত। তখন গাজী শাহাবুদ্দিন মনু এক পর্যায়ে তিনি ‘সচিত্র সন্ধানী’র ঈদ সংখ্যায় লেখার জন্য জহির রায়হানকে একরকম অপহরণ করলেন! তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন, একটা ঘরে ঢুকিয়ে বললেন, সাত দিনের মধ্যে উপন্যাস লিখতে হবে। দরজা বন্ধ করে দিয়ে চা, সিগারেট, যা লাগে সব দিলেন। বললেন, যা চাই সব পাবে, শুধু বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। কারো সাথে যোগাযোগ নেই। এভাবে গাজী শাহাবুদ্দিন মনু তাকে দিয়ে একটা উপন্যাস লেখালেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
