
সোমবারের ঘটনা।
রিকশা করে যাচ্ছি খিলগা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে। গুলবাগ থেকে রিকশায় উঠেছি। রিকশা চালকের বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথায় লাল কাপড় প্যাঁচিয়ে রেখেছেন।
গুলবাগ বাজার পার হতেই রিকশাওয়ালা বলল, বাবা তুই কেমন আসিছ?
আমি প্রচন্ড অবাক হয়ে বললাম, আমাকে বলছেন?
রিকশা চালক বললেন, হ তোরেই কইতাছি।
আমি প্রচন্ড মর্মাহত। অপরিচিত কেউ আমাকে তুই করে বললে মেনে নিতে পারি না। অপমান বোধ হয়, কষ্ট হয়।
আমি চুপ করে আছি। রিকশা চালক তুই করে বলাতে খুব মন খারাপ হয়েছে।
রিকশাচালক বললেন, বাবা তুই একটা সরিষা তেলের বোতল কিন। আমি ফু দিয়ে দিব। তাতে তোর মঙ্গল হবে।
সারা জীবন আমি কুসংস্কার অবিশ্বাস করে গেছি। আর রিকশাওয়ালা বলে কি! প্রচন্ড রাগ লাগছে। এর চেয়ে ভালো হতো যদি- রিকশাওয়ালা বলতো- আমি দরিদ্র মানুষ আমাকে সাহায্য করুন। আমি অবশ্যই তাকে সাহায্য করতাম।
রিকশাওয়ালা বলল, আমি আগে বোবা ছিলাম। বিশ বছর কথা বলতে পারি নাই। একজন স্বপ্নে দেখা দিয়ে আমাকে অলৌকিক একটা জিনিস দিছে। আর আমার মুখের জবান ফিরায়ে দিয়েছে।
আমি বললাম, চুপ করো। সামনে তাকিয়ে রিকশা চালাও। তুমি তো একসিডেন্ট করবে।
রিকশাওয়ালা হঠাৎ এক দোকানের সামনে রিকশা থামিয়ে একটা মাম পানির বোতল কিনল। তারপর অনেকক্ষন সময় নিয়ে কি কি পড়ে পানিতে ফু দিল। আমাকেও ফু দিয়ে বলল, এই পানি ওজু করে খাবি। মনের ইচ্ছা পূর্ণ হবে। আরে ভয় পাচ্ছিস নাকি? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি টাকা পয়সা নিই না। তোকে ভালো লাগলো, তাই ফু দিয়ে দিলাম। তোর মঙ্গল হবে।
আমি আমার গন্তব্যে নামলাম। রিকশাভাড়া দিলাম। তখন রিকশাওয়ালা বলল, কিছু বেশি দে। যদিও আমি কারো কাছ থেকে ফু-টু দিয়ে টাকা পয়সা নিই না। তবে তোর কাছ থেকে নিবো। দে বাবা দে। মন খুলে দে।
আমি বললাম, ভন্ডামি বাদ দেন। আমি অন্য জিনিস। আপনি ভুল মানুষের কাছে এসে নাটক করেছেন। এইসব বাদ দেন। মানুষ ঠকানো ভালো নয়। যদিও আমার উচিত আপনাকে পুলিশে দেওয়া। কিন্তু আমি আপনাকে ভালো হওয়ার জন্য সুযোগ দিলাম।

মঙ্গলবারের ঘটনা
প্রতিদিনের মতো অফিস শেষ করে হেটে হেঁটে বাসায় ফিরছি। রাস্তায় ভয়াবহ জ্যাম থাকে ইফতারীর আগে। ইফতারী বলে কথা না, সব সময়'ই জ্যাম থাকে। তাই হেঁটে হেঁটেই রোজ বাসায় ফিরি। বাসায় ফেরার পথে প্রতিদিন কিছু না কিছু সুরভির জন্য কিনে নিয়ে যাই। ভাবলাম আজ আম নিয়ে যাবো। এবছর এখনও আম কিনি নাই। চলতি পথে কয়েক জায়গায় আম দেখলাম, এক শ' টাকা কেজি চায় কিন্তু আমের মান ভালো না, তাই কিনি নি।
গুলবাগ রেল লাইনের কাছে একলোক আম বিক্রি করছে। আমি বললাম, এগুলো কি আম?
লোকটি বলল, এগুলো হিমসাগর।
আমি বললাম এখনও তো হিম সাগর বাজারে আসেনি। মিথ্যা বলছো কেন? এগুলো তো গুটি আমি। আমি আম খুব ভালো চিনি। আম আমার প্রিয় ফল।
আমওয়ালা রেগেমেগে অস্থির। বলল, এগুলো হিমসাগর না হলে আমি আপনাকে এক লাখ টাকা দিমু।
আমি বললাম, ঠিক আছে তুমি আমার সাথে বাসায় চলো। আমার বাসায় আম বিশেষজ্ঞ আছে। যদি সত্যি এগুলো হিমসাগর হয় তাহলে সব আম কিনবো।
আমওয়ালা বলল, আমি যামু না। আপনি কারে দিয়া পরীক্ষা করবেন তারে নিয়া আসেন। আমি আছি এইখানে।
আমি বললাম, এসে যদি দেখি তুমি চলে গেছো?
তখন আমওয়ালা তার মোবাইল নম্বর দিল আমাকে। তারপর রাস্তার ওইপারে একটা ছয় তালা বাড়িয়ে দেখিয়ে বলল, আমি অই বিল্ডিং এর তিন তালায় থাকি।
আমি আমওয়ালার মোবাইল নম্বর টুকে নিলাম।
আমওয়ালা বলল, এখন'ই একটা ফোন দেন। আমিও আপনার নাম্বার সেভ করে রাখি। আমওয়ালা আম দেখিয়ে বলল, এগুলো হিমসাগর না প্রমান করে এক লাখ টাকা নিয়ে যাবেন। ব্যস।
বাসায় এসে আমি আমওয়ালার কথা পুরোপুরি ভুলে গেলাম। পথে ঘাটে তো এরকম কত কিছুই ঘটে।
পরের দিন একজন ফোন করে বলল, কিরে কি খবর? আমাকে চিনতে পেরেছিস? আমি আমওয়ালা।
আমি প্রচন্ড অবাক!! আমওয়ালা আমাকে তুই তুই করে বলছে!!!
আমি বললাম, তোমার সমস্যা কি?
আমওয়ালা বলল, ইফতারী কি দিয়ে করলি? আমি কি ছিল? ও ভালো কথা, পরে আম কি কিনেছিলি?
আমি ফোন কেটে দিলাম।
আমওয়ালা একঘন্টা পর-পর ফোন দিয়েই যাচ্ছে। আমি ফোন ধরছি না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
