
আমার নাম সিকদার আলী। আজ আমার বয়স হলো একাত্তর। আমি স্কয়ার হাসপাতালে ভরতি আজ সতের দিন ধরে। মনে হয় আর বাঁচবো না। জীবনে পাপ তো কম করি নাই। বিয়েই করেছি তিনটা। আমার তিন ঘরে ছেলে মেয়ের সংখ্যা মোট এগারো জন। আমার সব ছেলেমেয়ে শিক্ষিত। তারা সবাই ভালো ভালো চাকরি করে। এক মেয়ে থাকে লন্ডন। তার বিশাল অবস্থা। আমাকে লন্ডন নেওয়ার জন্য অস্থির। আরেক ছেলে হজ্ব করার কথা বলছে। হাসপাতাল থেকে মুক্তি পেলেই হজ্ব অথবা ওমরা করে ফেলব। আমার তৃতীয় বউ এর এক ছেলে, এক মেয়ে। এরা দু'জনেই ছোট। তৃতীয় বিয়েটা কিভাবে করি সেটা সংক্ষেপে বলি। ঢাকার বাইরে বনভোজনে যাই। সেই বোনভোজনে লুনা নামে এক মেয়ে নাচে। তাকে নাচার জন্যই ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে। লুনা মেয়েটাকে ভালো লেগে গেল। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। মেয়েটা রাজী হয়ে গেল।
মুক্তিযুদ্ধের আগে এমএ পাশ করে আমি জাহাজে চাকরি নিই। তখন আমার যুবক বয়স। আমি দেখতে দারুন স্মার্ট। তাছাড়া আমার চলা ফেরায় একটা আভিজাত্যভাব আছে। আমার বাপ দাদার সম্পত্তির অভাব ছিল না। জাহাজে চাকরি করার সময় ঢাকার এক মেয়েকে ভালো লেগে যায়। সেই মেয়েকে নিয়ে প্রতি সপ্তাহে দু'টা সিনেমা দেখতাম। মেয়েটা আমার প্রেমে পাগল হয়ে গেল। অবশ্য মেয়েটার সাথে প্রেম করার সময় আমি খুব মিথ্যা বলতাম। প্রেম ভালোবাসা করার সময় সব ছেলেই মিথ্যা। আর এই মিথ্যা সোসাইটি এলাউ করে। মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেলি। মেয়েটা মোটামটি ধনীর মেয়ে বলা যায়। বিয়ে করে আমি জাহাজে চলে যাই। ছুটিতে গ্রামে যাই বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে। গ্রামে যাওয়ার পর বাবা আমাকে তার পছন্দের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। আমার বাবা অনেক রাগী। তাই তাকে বলতে পারিনি যে আমি ঢাকা একটা বিয়ে করেছি।
একসময় আমার দুই বিয়ের কথা জানাজানি হয়ে গেল। বিরাট ক্যাচাল লেগে গেল। যাই হোক, আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান তাই ব্যাপারটা সুন্দরভাবে মিটিয়ে ফেলতে সক্ষম হলাম। নিয়ম করে কিছু দিব ঢাকা থাকি, কিছু দিন গ্রামে থাকি। হঠাৎ জাহাজের চাকরিটা চলে গেল। পড়ে গেলাম ভয়াবহ বিপদে। তখন এক বউ ঢাকায়। আরেক বউ গ্রামে। ঢাকা এবং গ্রামে দুই বউ এর ঘরে প্রতি বছর বাচ্চা জন্ম নিতে থাকলো। দেখতে দেখতে গ্রামের বউ এর মোট পাঁচটা বাচ্চা হলো। আর ঢাকার বউ এর মোট চারটা বাচ্চা হলো। দুই দিকের খরচ টানতে টানতে আমাকে প্রচন্ড হিমসিম খেতে হলো। বাবার সম্পত্তি নামে বেনামে লুকিয়ে বিক্রি করতে শুরু করলাম। এক সময় সম্পত্তি সব শেষ হয়ে গেল। এদিকে এত গুলা ছেলে মেয়ে, তাদের খাওয়া দাওয়া আর লেখা পড়ার খরচ চালাতে-চালাতে আমার অবস্থা শেষ। আমার আবার মদ্যপানের খুব নেশা। প্রতি সপ্তাহে একদিন মন ভরে মদ না খেতে পারলে আমার ভালো লাগে না।
গ্রামের বউ জিদ করেছে সে আর গ্রামে থাকবে না। গ্রামে ভালো স্কুল নেই। নিয়ে এলাম তাদের ঢাকায়। বড় ফ্লাট বাসা ভাড়া করলাম। এদিকে আমার কতদিন ধরে চাকরি নাই। শুরু করলাম আদম ব্যবসা। হাতে আসতে শুরু করলো কাচা পয়সা। তখন দুইহাতে টাকা উড়াতাম। ধূমধাম করে ছেলে মেয়ের জন্মদিন পালন করতাম। যে বউ ঝগড়া করতো তার কাছে যেতাম না দিনের পর দিন। খরচও দিতাম না। একসময় আদম ব্যবসা করে চরম ধরা খেলাম। তারপর অনেদিন লুকিয়ে থাকতে হলো। পাওনাদাররা এসে বাসায় হইচই করতো। শেষে এমন অবস্থাও হলো- আমার এক ছেলে নতুন এক জোড়া জুতার জন্য কান্নাকাটি শুরু করেছে। তাকে জুতা কিনে দেইনি। কিভাবে জুতা কিনব(?) যদি ছেলেকে জুতা কিনে দিতাম, তাহলে সেরাতে আমি মদ খেতে পারতাম না। আমার কাছে ছেলের জুতার চেয়ে মদটাই গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে এই না যে আমি আমার ছেলেকে ভালোবাসি না।
বুড়া বয়সে তৃতীয় বিয়েটা করে মনে হয় ভুল'ই করেছি। তখন আমার বড় ছেলে আর বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে। আমার তিন নম্বর বঊ এর কথা এক বছর পর সবাই জেনে গেল। আমার ভাই বোন, দুই বউ আর সব ছেলে মেয়ে জেনে গেল। তবু কেন জানি আমার লজ্জা লাগলো না। আমি পুরুষ মানুষ। সোনার চামুচ। আমাদের হিসাব আলাদা। আমাদের নবিজিও অনেক গুলো বিয়ে করেছেন। যাই হোক, আজ আমার সব ছেলে মেয়ে বড় বড় হয়ে গেছে। তারা বিয়ে করে ফেলেছে। তারা আমার সেবা যত্নের কোনো ত্রুটি করে না। প্রতিমাসে মাসে আমাকে অনেক টাকা হাত খরচ দেয়। এই টাকা থেকেই আমি আমার তৃতীয় বউ এর ছোট দুই ছেলে মেয়ের সব খরচ চালাই। অনেক অন্যায় অবিচার করেও আমি বেশ ভালোভাবেই জীবন যাপন করেছি। এখন শেষ বয়সে এসেও বেশ ভালো আছি। সবচেয়ে বড় সমস্যা আর্থিক সমস্যাই নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০১৮ সকাল ১১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




