
আমি কোথাও বেড়াতে গেলে কৃপণতা করি না। দুই হাতে টাকা খরচ করি। সুরভি যা খেতে চেয়েছে, খাইয়েছি। যা কিনতে চেয়েছে কিনে দিয়েছি। পাহাড়িদের হাতে বোনা জামা কাপড় কিনেছে। (আমি খুব ভালো করেই জানি, এইসব জামা কাপড় সে কোনো দিনও পড়বে না)। বাসার সবার জন্য কিছু না কিছু কিনেছে। বান্দরবানে কোনো হোটেলের খাবারের মান ভালো না। কিন্তু দাম অনেক বেশি। মাছ মাংস কিছুই খেয়ে আরাম পাইনি। সামান্য চা-ও এরা ভালো বানায় না।
সব শহরেই পাগল থাকে। বান্দরবান শহরেও একজন পাগল দেখছি। বেশ কয়েকবার তার সাথে দেখা হয়েছে। একবার দেখলাম- সে ন্যাংটা হয়ে একটা ব্রিজের নিচে নেমে পটি করে আসলো। বান্দরবানের ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় থাকে কখন টুরিস্ট আসবে। টুরিস্ট আসলেই তাদের হাতে অনেক টাকা হয়। যে যেভাবে পারে টাকা-পয়সা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নিয়ে নিচ্ছে। সরকারের কোনো নীতিমালা নেই।
বান্দরবানে নীলাচল, মেঘলা আর নীলগিরিতে টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়। তারা গেট করে রেখেছে। ইট পাথরের দালান করে ভরে রেখেছে। এই ব্যাপারটা আমার মোটেও ভালো লাগেনি। যাতায়াত ব্যবস্থা আরও ভালো করা উচিত। প্রচুর মানূষ সেখানে ভ্রমনে যায়। এবং যাতায়াত ভাড়া সরকারের নিদিষ্ট করে দেওয়া উচিত। রাস্তা গুলো পাশে আরেকটু বাড়ানো উচিত- তাতে দুর্ঘটনা কমবে। তাহলে যারা ভ্রমন করতে যাবে তাদের জন্য ভালো হবে।
পাহাড়ে অনেক আদীবাসী থাকে। তাদের মধ্যে কম করে হলেও দশটা জাত আছে। তারা বেশ সবাই ভালোই মিলেমিশে আছে। তাদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো। অল্প কিছু আদীবাসীর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। আদীবাসীরা লেখা পড়ায় খুব মন দিয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার- আদীবাসী পুরুষদের স্বাস্থ্য বেশ ভালো। এবং নারীরা খুব পরিশ্রমী। তাদের বছরে একবারও ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না।
আদীবাসী নারীদের প্রসব জনিত কারনে মৃত্যুর হার- বলা যায় শূন্য। ডেলিভারীর জন্য তারা কখনও হাসপাতালে যায় না। তাদের আট্রাসোনো করতে হয় না, রক্তের টেস্ট করতে হয়, ওষুধ খেতে হয় না। বেশ কিছু আদীবাসী নারী পুরুষের সাথে আমি কথা বলেছি। তারা চমৎকার সব তথ্য আমাকে দিয়েছেন। পাহাড়ের মেয়ে গুলো খুব সুন্দর। কোনো কালো মেয়ে দেখি নাই। তারা বাংলা ভাষা এবং তাদের নিজেদের ভাষায় সুন্দর কথা বলে। তাদের ব্যবহার ভালো।
আদীবাসীরা তাদের রান্নায় তেল খুব কম খায়। পাঁচ জনের পরিবারে এক কেজি তেলও লাগে না মাসে। তারা বেশি খায় সবজি। সিদ্ধ করে খায়। পাহাড়ের গায়ে তারা সবজি চাষ করে। নিজেদের জন্য রেখে বাকিটা বাজারে বিক্রি করে দেয়। তবে এই সমস্ত সবজিতে স্বাদ কম। এখানে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়। সংসারের কাজ ছাড়াও তারা জমিতে কাজ করে। সবার স্বাস্থ্য বেশ ভালো। মানে কেউ পুষ্টিজনিত সমস্যা ভূগে না।
বান্দরবান প্রেস ক্লাবে ইচ্ছা করেই যাইনি। আমার পরিচয় দিলে দুই একজন আমাকে চেনার কথা। মং খিং নামের এক ছেলে আছে, সে আমাদের পত্রিকার বান্দরবান জেলার প্রতিনিধি। সে বেশ কয়েকবার ফোন করেছে যেন তার সাথে দেখা করি। দেখা করিনি। বেড়াতে গিয়ে পরিচিত মানূষদের সাথে আড্ডা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। কিন্তু এক সন্ধায় দেখা হয়ে গেল সুরভির বান্ধবীর সাথে। সে এসেছে তার স্বামীর সাথে হানিমুনে। দুই বান্ধবী গল্প শুরু করে দিলে। তাদের গল্প আর শেষ হয় না।
সুরভি'রা দুই বোন। তাও আবার যমজ। একজন থাকে আমার সাথে আরেকজন ইটালী স্বামীর সাথে। ইটালী থেকে সে ফোন করে জানালো, বান্দরবান শহরে তার ননদের বাড়ি। আমরা যেন অবশ্যই সেখানে যাই। সুরভি'র বোনের স্বামী ফোন করে আমাকেও খুব অনুরোধ করলো। কেউ অনুরোধ করলে আমি মানা করতে পারি না। গেলাম শাম্মির ননদের বাড়ি। (সুরভির বোনের নাম শাম্মি)। সরকারি বাড়ি। ভদ্রলোক সরকারি কর্মকর্তা। আমদের দেখে তারা সত্যিই খুব খুশি হলেন।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা খাবারের বিশাল আয়োজন করলেন। কক্সবাজার থেকে ইলিশ আর চিংড়ি মাছ আনালেন। নানান রকম ফলফলাদি। চালের আটার রুটি। গরুর মাংস, মূরগীর মাংস, হাঁস। ছোট মাছ, বড় মাছ ইত্যাদি ইত্যাদি। রান্না ভালো হয়নি। অথবা বলা যায় তাদের রান্না বান্দরবানের আদীবাসীদের মতো হয়েছে। অনেক গল্প শুনলাম তাদের কাছ থেকে বান্দবানের।
তারা যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখালেন। তারা রাগ করলেন, কেন বান্দবান এসে হোটেলে উঠেছি। খাগড়াছড়িতে যাওয়ার জন্য বললেন, সেখানে তাদের নিজেদের বাড়ি আছে। সরকারি ডাকবাংলো আছে। অনেক গল্প হলো। তাদের বাসায় যাওয়ার আগে বান্দরবান শহর থেকে ছয় কেজি মিষ্টি কিনে নিয়েছিলাম। কারো বাসায় তো আর খালি হাতে যাওয়া যায় না।
ঢাকা ফিরলাম এসি বাসে করে। পনের শ' টাকা করে টিকিট। টিকিটের দাম খুব বেশি দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া হওয়া উচিত ছিল ৮০০ টাকা। দেখার কেউ নেই, কাকে বলব? সরকারের নজর দেওয়া উচিত এসব ব্যাপারে। আরও অনেক খুটিনাটি বিষয় আছে সেগুলো অন্য কোনো সময় লিখব। যারা এখনও বান্দরবান যাননি সময় সুযোগ পেলে ঘুরে আসবেন। সব মিলিয়ে ভালোই লাগবে। সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

পরী যে জামাটা পড়েছে, সেটাকে বলে থামি।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে আগস্ট, ২০১৮ দুপুর ১২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




