
দুই যুগের বেশি সময় ধরে জাহাঙ্গীরের সাথে আমার পরিচয়। আমরা একই সাথে স্কুলে পড়তাম। ভীষন দুষ্ট ছিল জাহাঙ্গীর। মেয়েদের পিছে খুব ঘুরঘুর করতো। পেরি নামের একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিল। এই মেয়ের বাসায়ও আমরা গিয়েছি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এক কোয়াটারে। আমার মনে আছে ঈদের দিন গিয়েছিলাম পেরিদের বাসায়। পেরি মা সেমাই খেতে দিয়েছিলেন। যেদিন পেরি'রা গ্রামে যাবে, সেদিন আমি আর জাহাঙ্গীর ভোর থেকে দাঁড়িয়ে ছিলাম পেরিদের বাসার সামনের পুকুর পাড়ে। কিন্তু সেদিন পেরি গ্রামে যাবার বেলা এক মুহূর্তের জন্য জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা হলো না। শেষে জাহাঙ্গীর আর আমি চলে গেলাম সিলেট। নানান কাহিনির পর পেরিদের বাসা খুঁজে বের করি। এক পলকের জন্য পেরিকে জাহাঙ্গীরের সাথে দেখার ব্যবস্থা করে দেই। এগুলো বহু বছর আগের কথা। এই ঘটনার ৩/৪ বছর পর জাহাঙ্গীর চলে গেল সৌদি আরব। সৌদি আরব থেকে অনেক বছর পর ফেরার পর একদিন আমি আর জাহাঙ্গীর আড্ডা দিচ্ছিলাম শাহবাগ। তখন হুট করে আমরা পেরিকে দেখতে পাই, সে ফুলের দোকান গুলোর সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছে। অসংখ্য চিঠি দুজন দু'জনকে লিখেছিল। জাহাঙ্গীরের কাছে থাকা পেরি চিঠি গুলো আগুনে পোড়ানো হয়েছিল।
জাহাঙ্গীর আর আমি আমরা এক এলাকায়'ই থাকতাম। প্রতিদিন'ই দেখা হতো আড্ডা হতো। হাজার লক্ষ সৃতি আছে আমার জাহাঙ্গীরের সাথে। জাহাঙ্গীর প্রথম বার সৌদি থেকে আসার পর আমরা দু'জন চলে যাই কক্সবাজার। সেখানে আমাদের আড্ডা আর গল্প শেষ হয় না। বিদেশে থাকতে জাহাঙ্গীর আমাকে প্রতি সপ্তাহে তিন চার বার করে ফোন দিত। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতো। সেই আমলে মোবাইল ছিল না। আমরা দুইজন দুজনকে নিয়মিত চিঠি লিখতাম। জাহাঙ্গীর বিদেশ যাওয়ার সময় আমাকে বলে গিয়েছিল- আমি যেন তাদের বাসায় নিয়মিত যাই, তার মা বোনদের খোজ খবর রাখি। আমি জাহাঙ্গীরের কথা মতো নিয়মিত তাদের বাসায় যেতাম। মা, ভাই বোনদের খোজ খবর রাখতাম। জাহাঙ্গীরের মা, বোন এবং ভাই আমাকে খুব পছন্দ করেন। এমন কোনোদিন হয় নাই, ওদের বাসায় গিয়েছি আর ভাত না খেয়ে ফিরেছি। জাহাঙ্গীর'রা আমাদের এলাকা ছেড়ে প্রথম গেল, বাসাবো, তারপর নন্দীপাড়া এবং সব শেষে নারায়ণগঞ্জ। এই তিন বাসাতেই আমাকে অসংখ্যবার যেতে হয়েছে। জাহাঙ্গীর খুব খরচে ছিল। প্রচুর টাকা খরচ করতো।
জাহাঙ্গীরের বড় ভাই করিম। করিম ভাই সৌদি থাকতেন তিনিই জাহাঙ্গীরকে সৌদি নিয়ে যান। করিম ভাই খুব ভালো মানুষ। তিনি যতবার দেশে ফিরেছেন আমি তাকে এয়ারপোর্টে থেকে আনতে গিয়েছি। তার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখেছি। সেই বিয়েতে আমি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলাম। করিম ভাই এর কথা অন্য কোনোদিন বলব। জাহাঙ্গীরের জন্য মেয়ে দেখা হলো। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলাম। বিয়েতে আমাদের আরেকজন বন্ধু 'বুলবুল' ছিল। বুলবুল বর্তমানে দুবাই আছে হয়তো। জাহাঙ্গীরের বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি আমিই তুলি। বিয়ের পর জাহাঙ্গীর বউ নিয়ে আমার বাসায় বেড়াতে আসে। সেদিন আমরা খুব আড্ডা দেই। আরেকদিন আমরা সবাই মিলে বাইরে যাই। রেস্টুরেন্টে খাবার খাই একসাথে। জাহাঙ্গীরের বেশ কিছু ঘটনা আছে যা আমাদের অন্য কোনো বন্ধু বান্ধব জানে না। শুধু আমি জানি। একমাত্র আমি। সেই সব ঘটনা গুলো আমি লিখতে চাই না। জাহাঙ্গীর যখন প্রতিদিন আমাকে বিদেশ থেকে ফোন দিত, আমি বলতাম এতবার ফোন দিস না, অনেক টাকা খরচ হয়। এর চেয়ে ভালো তুই ফেসবুক শুরু কর। সেখানে আমরা কথা বলব।
জাহাঙ্গীর তখন ফেসবুক কি কিছুই বুঝেই না। আমি তাকে ফেসবুক একাউন্ট খুলে দেই। ফেসবুক কিভাবে ব্যবহার করতে হয়- আমিই তাকে ফোনে ফোনে সব শিখাই। একদিন জাহাঙ্গীর বলল, দোস্ত একটা ছদ্ম নাম দিয়ে দে। তারপর আমি মোঃ জাহাঙ্গির আলম নামের শেষে 'জীবন' নামটা যোগ করে দেই। আমাদের বন্ধুর নাম একটাই ''মোঃ জাহাঙ্গীর আলম।'' জীবন নয়। জীবন নামটা দেওয়ার পেছনে একটা কারন আছে। সেই কারন আজ আর বলার দরকার নেই। জাহাঙ্গীরের বয়স ৩৮ নয়। আরও কম। বড়জোর ৩৪/৩৫ হবে। আমি শুধু জাহাঙ্গীরের সাথে নয় ওর পরিবারের সবার সাথে জড়িত। জাহাঙ্গীর'রা তিন বোন, দুই ভাই। সুলতানা আপা, জোছনা আপা আর সবার ছোট মলি। জাহাঙ্গীরের বাবা অনেক আগেই মারা যান। সম্ভবত তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আমি যতবার ওদের বাসায় গিয়েছি- ওদের বসার ঘরের দেয়ালে আংকেলের একটা ছবি দেখেছি। তার মূখ ভরতি দাড়ি, সাদা পাঞ্জাবি পরা। জাহাঙ্গীরের ছোট বোন মলি। মলিকে হাফ প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখেছি। এখন তার দুই সন্তান। মলির জামাই খুব সহজ সরল ভালো মানূষ।
দুই বছর আগে জাহাঙ্গীরের সাথে আমার একটা ফালতু বিষয় নিয়ে খুব তর্ক হয়। সৌদি থেকে জাহাঙ্গীর বারবার ফোন করলো, ফেসবুকে অনেক চ্যাট হলো। আমি জাহাঙ্গীরকে বুঝাতে পারি না, জাহাঙ্গীরও আমাকে বুঝাতে পারে না। শেষমেষ দুই বন্ধুর মনোমালিন্য দেখা দিল। আমি তাকে নক করি না, সে-ও আমাকে নক করে না। আমি মনে করি, সে আমাকে স্যরি বলবে, সে মনে করে আমি তাকে স্যরি বলব। এইভাবে দুই বছর পার হয়ে গেল। যদিও জাহাঙ্গীরের সাথে আমার কথা বার্তা বন্ধ কিন্তু তার পরিবারের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা চলতে থাকলো আগের মতোই নিয়মিত। এর ভিতরে আরও অনেক কাহিনি আছে। আন্টি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তাকে বারডেমে দেখতে গেলাম। সুলতানা আপা'র ছেলের জন্মদিনে গেলাম। জাহাঙ্গীরদের গাজীপুরে জায়গা রাখলো সেই জায়গা দেখতে গেলাম। সবশেষে জাহাঙ্গীর সৌদি থাকতেই নারায়ণগঞ্জ জায়গা কিনলো। সেই জায়গা দেখতে গেলাম। বাড়ির কাজ শুরু হলো। বাড়ির কাজ দেখতে গেলাম। আন্টিকে বুদ্ধি পরামর্শ দিলাম। মিস্ত্রীদের সাথে কথা বললাম।
কয়েকদিন আগে, মানে ঈদের দিন বিকেল তিনটায় জাহাঙ্গীরের বড় ভাই কাঁদতে কাঁদতে আমাকে ফোনে জানালেন, জাহাঙ্গীর স্ট্রোক করে মারা গেছে। এই কথা শুনে- আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমি সত্যি সত্যি ঠাস করে মাটিতে পড়ে যাই। সুরভি দৌড়ে এসে আমাকে ধরে। টানা দশ মিনিট আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। সুরভি আমাকে মাথায় পানি দেয়। অনেকক্ষন পর সুস্থ হয়ে আমি সুরভিকে জাহাঙ্গীরের কথা বলি। সে-ও প্রচন্ড কষ্ট পায়। জাহাঙ্গীরের সাথে অনেকবার কথা হয়েছে সুরভি'র। আমাকে যতবার ফোন দিত, ফোন রাখার আগে বলতো ভাবীকে দে। সুরভি'র সাথে নানান বিষয় নিয়ে গল্প করতো। ফোন রাখার আগে বলতো, ভাবী আপনার হাতের রান্না অনেক মজা। আমি দেশে আসলে আমাকে এটা ওটা (লম্বা একটা লিস্ট দিত) রান্না করে খাওয়াতে হবে। মিষ্টি আর ফল নিয়ে জাহাঙ্গীর সুরভি'দের বাড়িতেও গিয়েছেল। অবশ্য আমি বিয়ে করার সময় রাগ করে জাহাঙ্গীরকে জানাই নাই, এই নিয়ে জাহাঙ্গীরের অনেক রাগ ছিল। অবশ্য যখন আমি বিয়ে করি তখন জাহাঙ্গীরের সাথে আমার কঠিন মনোমালিন্য চলছিল। যাই হোক, আমি আমাদের বন্ধু রকিবকে ফোনে জাহাঙ্গীরের মৃত্যু সংবাদ জানাই। রকিব প্রথমে ভেবেছিল আমি মজা করছি। শেষে রকিব কেদে দেয়।
আমাদের বন্ধু রাকিব হাসান ফেসবুকে খুজে খুঁজে সব বন্ধুদের বের করে। সবার সাথে সবার দেখা করার ব্যবস্থা করে। একদিন খুব ধুমধাম করে একটা গেটটুগেদারের ব্যবস্থা করে। ফেসবুকে গ্রুপে নিয়মিত সব বন্ধুদের আড্ডা চলতে থাকে দিনের পর দিন। পুরনো দিনের সৃতি মনে করে সব বন্ধুরা আবেগে আপ্লুত হলো। সবার সাথে সবার যোগাযোগ আরও গভীর হলো। ফেসবুকে গ্রুপ হবার আগে আমি জাহাঙ্গীরকে মোবাইলে সব জানাতাম, যে বন্ধুর যতটুকু খবর জানতাম- সবই জাহাঙ্গীরকে মোবাইলে বলতাম। যাই হোক, এখন মনে প্রানে চাই পরপারে জাহাঙ্গীর ভালো থাকুক। আল্লাহ যেন তাকে বেহেশত দান করেন। জাহাঙ্গীরের একটা ছেলে আছে। এই ছেলেটা যেন সুস্থ সবল থাকে। আমার খুব ইচ্ছা ছেলেটার লেখাপড়া খরচের দায়িত্ব নিই। আল্লাহ যেন আমাকে সেই দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা দান করেন। শুধু মুখে মুখে বন্ধু বললে হবে না। দায়িত্বও পালন করা উচিত। আমি তো ভুলে যেতে পারব না- জাহাঙ্গীর আমার বিপদের সময়, সব সময় আমার পাশে ছিল। আমার জন্য তার সীমাহীন টান ছিল, ভালোবাসা ছিল। জাহাঙ্গীর বারবার আমাকে বলতো ''তুই আমার বন্ধু না, তুই আমার ভাই''। সেসব যদি আজ আমি অস্বীকার করি, তাহলে মানুষ হিসেবে আজ আমি অমানবিক হয়ে যাবো।
গতকাল জাহাঙ্গীরের বোন সুলতানা আপার সাথে কথা হলো। তার কাছে থেকে জানলাম জাহাঙ্গীরের অনেক ঋণ। বাড়ি করতে গিয়ে অনেক টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ঋণের পরিমান প্রায় ৫/৭ লাখ টাকা। আমি বুঝি না এত বছর বিদেশ করার পর ঋণ কেন থাকবে? জাহাঙ্গীর তো বিদেশে ভালো টাকা ইনকাম করতো। জায়গা কিনেছে আর সেই জায়গাতে বাড়ি করতে গিয়ে ধারদেনা কেন করতে হবে? তাহলে এত বছর বিদেশে থেকে লাভ কি হলো? আজও বাড়ির কাজ কমপ্লিট হয়নি। ব্যাপারটা যেন কেমন? এদিকে জাহাঙ্গীরের ভাই করিম ভাইও দীর্ঘদিন বিদেশ ছিলেন। তাহলে তার টাকা পয়সা কোথায়? তার কাছেও নাকি কোনো টাকা পয়সা নেই। সে একেবারে দেশে ফিরে এসেছেন! এখন এক বছর ধরে বেকার বসে আছেন। তাহলে এখন জাহাঙ্গীরদের সংসার চলবে কেমন করে? আর ৫/৭ লাখ টাকা দেনা শোধ হবে কেমন করে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার মাথা কাজ করছে না।
গতকাল জাহাঙ্গীরের বোন সুলতানা আপার সাথে কথা হলো। তার কাছে থেকে জানলাম জাহাঙ্গীরের অনেক ঋণ। বাড়ি করতে গিয়ে অনেক টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ঋণের পরিমান প্রায় ১০ লাখ টাকা। আমি বুঝি না এত বছর বিদেশ করার পর ঋণ কেন থাকবে? জাহাঙ্গীর তো বিদেশে ভালো টাকা ইনকাম করতো। জায়গা কিনেছে আর সেই জায়গাতে বাড়ি করতে গিয়ে ধারদেনা কেন করতে হবে? তাহলে এত বছর বিদেশে থেকে লাভ কি হলো? আজও বাড়ির কাজ কমপ্লিট হয়নি। ব্যাপারটা যেন কেমন? এদিকে জাহাঙ্গীরের ভাই করিম ভাইও দীর্ঘদিন বিদেশ ছিলেন। তাহলে তার টাকা পয়সা কোথায়? তার কাছেও নাকি কোনো টাকা পয়সা নেই। সে একেবারে দেশে ফিরে এসেছেন! এখন এক বছর ধরে বেকার বসে আছেন। তাহলে এখন জাহাঙ্গীরদের সংসার চলবে কেমন করে? ১০ লাখ টাকা দেনা শোধ হবে কেমন করে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার মাথা কাজ করছে না।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১৮ সকাল ৮:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




