
১। অনেক বছর আগে-
খুব দূরে কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলাম বাপ মার সাথে। বাপ মা'য় সারাদিন ভিসিআরে মুভি দেখায় ব্যস্ত। আমি বাচ্চা মানুষ মুভি তো আর বুঝি না। আমি আমার মতো করে খেলাধুলা করতে থাকলাম।
যে বাগান বাড়িতে আমরা উঠেছিলাম, তার সামনেই বিশাল এক কবরস্থান। অসংখ্য কবর সেখানে। সেই কবরস্থানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে ছিলাম। একটুও ভয় করেনি। বরং গাছ থেকে আম পেড়ে খেয়েছি। সেই কবরস্থানে এক কিশোরী আমার মতোই বয়স হবে হয়তো- লাকড়ি টোকাতে আসতো। মেয়েটির সাথে আমার খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল। চার দিন ছিলাম সেই বাগান বাড়িতে। প্রতিদিন মেয়েটার সাথে দেখা হতো।
গতমাসে মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখে ফেললাম এবং দিনেরবেলা ভুলে গেলাম। গতকাল রাতে হুট করে আবার সেই মেয়েটির কথা মনে পড়লো! মেয়েটাকে দেখার জন্য খুব অস্থিরতা অনুভব করলাম।
২। মৃত্যু আসন্ন হলে অনেক কিছু খেতে ইচ্ছা করে। এক মৃতপথযাত্রীকে দেখেছি চাপটি (চাল (খুদ) বেটে পেয়াজ মরিচ দিয়ে বানানো একধরনের খাবার) খেতে চাইছে। সাথে ধনেপাতা ভর্তা দিয়ে সে চাপটি খাবেই। খুব জিদ ধরেছে। যাই হোক তাকে চাপটি বানিয়ে দেওয়া হলো। এক কামড় মুখে দিয়ে আর খেলো না। আরেকজনকে দেখেছি, সে রসগোল্লা খাবে। রসে ডোবানো গরম রসগোল্লা। তাড়াহুড়ো করে রসগোল্লা আনা হলো। এক কামড় দিয়ে সে আর খেলো না। ইদানিং আমার হুটহাট করে অনেক খাবার খেতে ইচ্ছা করে। সেদিন ইচ্ছা করলো- ইলিশ মাছের ভর্তা খেতে। গতকাল ইচ্ছা করলো- গরম ঝরঝরা ভাত দিয়ে দেশী কই মাছ খেতে- মটরশুটি, আলু আর টোমোটে দিয়ে ঝোল করে। আজ ইচ্ছা করলো হাঁসের মাংস দিয়ে চালের আটার রুটি খেতে। মনে হয় আমি মরে যাব, এই জন্যই নানান কিছু হুটহাট করে খেতে ইচ্ছা করছে অথবা হয়তো পকেটে টাকা নেই বলেই নানান কিছু খেতে ইচ্ছা করে।
৩। ইদানিং প্রতিদিন রাত্রে মৃত মানুষ স্বপ্নে দেখছি। স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর প্রচন্ড ভয়-ভয় লাগে। সুরভি আমার পাশে গভীর ঘুমে থাকে। তাকে আমি কিছুই বুঝতে দেই না। এ মাসের সতের তারিখ স্বপ্ন দেখলাম- আমার এক মামাকে। তিনি মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। মামা বিআরটিসি'র বাস চালাতেন। মাসে এক-দুই দিন আমাদের বাসায় আসতেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল ছেড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন। উনি আমাদের বাসায় চা ছাড়া কখনও অন্য কিছু খাননি। আমাকে দেখলেই বলতেন- কি খবর মামু? সৌদি চলো হজ্ব করে আসি। স্বপ্নেও দেখলাম- মামা বলছেন, ''কি খবর মামু? সৌদি চলো হজ্ব করে আসি।'' ছোটবেলা এক শিক্ষক আমাকে বাসায় এসে পড়াতেন। তার নাম ছিল ইউনূস। ইউনূস স্যার কমপক্ষে বিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন। তাকে স্বপ্ন দেখলাম! তার চেহারা আমার একটুও মনে নেই। অথচ স্বপ্নে দেখেই তাকে চিনতে পারলাম। দেখলাম তিনি একটা পাহাড়ের উপর বসে আছেন। আমাকে বললেন, আয় পড়তে বস। আমি স্যারের কাছে বসলাম। তিনি বললেন, (a + b)² = a² + 2ab + b² মনে আছে তো?
৪। সেদিন বড় অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটেছে। অবশ্য ঢাকা শহরে মাঝে মাঝে প্রায়ই অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। সকালে বাসা থেকে বের হয়েছি। কিছু দূর গিয়ে দেখি- কবরস্থানে কবর দেওয়ার জন্য লাশ নিয়ে যাচ্ছে। মরার খাটে একজন মৃত মানুষ নিয়ে যাচ্ছে। মৃত মানুষটি সাদা কাপড়ে মোড়ানো। আমার খুব ইচ্ছা করলো- কাপফনের কাপড় সরিয়ে মুখটি দেখি।
আমি বাসে উঠে গেলাম। ভাটারা নামলাম। গলির ভিতরে যেতেই দেখি, একজন মারা গেছেন। তাকে খাটে শুইয়ে রাখা হয়েছে। কিছুক্ষনের মধ্যে জানাজার জন্য তাকে মসজিদে নেওয়া হবে। শেষ বারের মতো আত্মীয় স্বজনরা তাকে দেখে নিচ্ছেন। পাড়া প্রতিবেশীরা দেখে নিচ্ছেন। আমিও এক পলক দেখলাম। মনে হলো মৃত মানুষটি আমাকে দেখে হাসলেন। আমার সারা শরীর শিউরে উঠলো। আমি দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেলাম। সন্ধ্যার সময় ধানমন্ডি সাত মসজিদে রোডে দেখলাম- মাগরিবের নামাজ শেষে এক মৃত ব্যাক্তির জানাজা হচ্ছে। কি মনে করে আমিও জানাজায় দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার মনে হলো- আমি মরে গেছি। আমিই এখন আমার জানাজায় দাড়িয়েছি!
৫। এই কোরবানীর ঈদের দিন সৌদি আরবে আমার বন্ধু মারা গেল স্ট্রোক করে। তার লাশ দেশে আনতে পুরো দুই মাস সময় লেগেছে। আমি তার লাশ দেখতে যাইনি। মিলাদে যাইনি। অথচ আমার খুব কাছের বন্ধু। সেদিন রাত তিনটায় আমার মোবাইল বেজে উঠলো। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মোবাইলের রিংটোন শুনেই মনে হচ্ছে- আমার বন্ধু সৌদি থেকে ফোন করেছে। হঠাত মনে পড়লো আরে--- আমার বন্ধু তো মারা গেছে। সুরভি ফোনের শব্দে ঘুম থেকে উঠলো। বলল, ফোন ধরছো না কেন? এত রাতে যখন ফোন বেজেছে নিশ্চয়'ই কোনো দরকারী ফোন। পরপর তিন বার ফোন বাজলো। আমি ফোন ধরলাম না। কোনো কারন ছাড়াই আমার খুব ভয় করতে লাগলো। ইদানিং প্রায়'ই ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর অদ্ভুত সব শব্দ শুনি। মনে হয় দরজার কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। আবার মনে হয় জানালার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে। আমাকে নিতে এসেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



