somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

জীবনের গল্প- ৩১

০৯ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমি আমার স্ত্রীর লেখা চিঠি হাতে নিয়ে বসে আছি।
কি সুন্দর করে ছোট্র একটা চিঠি লিখেছে। "আমার যদি আম্মুর মত ক্যান্সার হয় তখন কিভাবে চিকিৎসা হবে? ক্যান্সার তো ব্যায়বহুল রোগ আর আমাদের সংসার তো গরীবের সংসার!! দয়া করে তখন মানুষের কাছে হাত পেত না...এমন কি আমার বাপ ভাইয়ের কাছেও নাহ!" আজ থেকে চার বছর আগের লেখা চিঠি। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সুন্দর হাতের লেখা। আমার চোখের পানির ফোটা পড়ছে চিঠির উপর। ঝাপসা চোখে আমি তাকিয়ে আছি- চিঠির দিকে। সকাল থেকে অসংখ্যবার চিঠিটি আমি পড়েছি। লিলি কিভাবে জানত তার ক্যান্সার হবে? বিয়ের পর প্রথম রাতে এই চিঠিটি লিলি আমার হাতে দিয়ে বলেছিল- আমি যেদিন তোমাকে এই চিঠি পড়তে বলব সেদিন পড়বে, তার আগে কখনও না। নো নেভার। আমি লিলির কথা রেখেছি- চিঠি পড়িনি। চার বছর আগের লেখা চিঠির কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। গতকাল রাতে লিলিকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার পর লিলি- এই চিঠির কথা আমাকে মনে করিয়ে দিল। সকালে হাসপাতালে এসে চিঠিটি আমি লিলির হাতে দেই। লিলি বলল- ক্যান্টিনে গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে- চিঠিটি পড়বে।

আজ একমাস হলো লিলিকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি।
নানান ডাক্তারি পরীক্ষা করানোর পর ডাক্তার আমাকে জানায় লিলির খুব কঠিন ক্যান্সার হয়েছে। সে বেশী দিন বাঁচবে না। বিদেশ নিয়ে গেলেও না। আমি লিলিকে ডাক্তারের এ কথা বলিনি। বলেছি- ভালো হয়ে যাবে তবে সময় লাগবে। তুমি কোনো চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। লিলি এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি খুব চেষ্টা করি- আমার বুকের ভেতরের ভাংচুরের ছাপ যেন আমার মুখে না পড়ে। আমার মুখ দেখে লিলি যেন কিছু বুঝতে না পারে। দিন দিন লিলির শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। শুকিয়ে যাচ্ছে। মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে। মায়াময় একটি মুখ স্থায়ীভাবে মলিন হয়ে গেছে। কঠিন এক অসুখের নাম ক্যান্সার। প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পরে না, ফলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ভালো কোনও চিকিৎসা দেয়াও সম্ভব হয় না। বাস্তবিক অর্থে এখনও পর্যন্ত ক্যান্সারের চিকিৎসায় পুরোপুরি কার্যকর কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয় নি। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারকেই ক্যান্সার বলে। কেমোথেরাপি হলো শেষ চিকিৎসা। এই ব্যবস্থায় ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করতে অ্যান্টি-ক্যান্সার (সাইটোটক্সিক) ড্রাগস বা ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

লিলি তার মেয়ের নাম রেখেছে- লিলিয়ান।
লিলিয়ানের বয়স আড়াই বছর। প্রতিদিন বিকেলে লিলিয়ান তার বাবার সাথে মাকে দেখতে যায়। লিলি, লিলিয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষন কাঁদে। তখন লিলিয়ান তার ছোট দুই হাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। এবং একটু পর-পর মায়ের চোখের পানি আঙ্গুল দিয়ে মুছে দেয়। কপালে চুমু দিয়ে দেয়। ঠিক এই সময় লিলিয়ানের বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। খুব কাদেন। সবাই সবার কান্না দেখে- সবাই সবাইকে শান্ত্বনা দেয়। কিন্তু লিলিয়ানের বাবাকে কেউ শান্ত্বনা বা ভরসার কথা বলে না। শুধু লিলি বুঝে মানুষটা ভিতরে ভিতরে কষ্টে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার কিছু করার নেই। সুন্দর একটা হাঁসি খুশি পরিবার কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। ঈশ্বর চাইলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো তারা তিনজন ত ধরে পার্কে ঘুরে বেড়াবে।

ক্যান্সার রোগীর হাসপাতালের খরচ অনেক।
এই খরচ চালানো- একজন ফোটোগ্রাফারের পক্ষে সম্ভব নয়। আমি একটা পত্রিকা অফিসে চাকরী করি। খুব সামান্য বেতন। বেতন পেয়ে আমি লিলির হাতে সব টাকা দিয়ে দেই। এত অল্প টাকায় লিলি কিভাবে সংসার চালায় কে জানে! তবে লিলি কোনোদিন কোনো অভিযোগ করেনি। অন্য মেয়েদের মতন সংসারে টাকা নিয়ে অশান্তি করেনি। দু'জন দু'জনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। আসলে আমরা দু'জন ছিলাম খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু এক সময় আমরা দু'জন তীব্রভাবে অনুভব করি-দু'জন দু'জনকে অনেক ভালোবাসি। তারপর একদিন হুট করে বিয়ে করে ফেলি। বিয়ের দেড় বছর পর লিলিয়ান হয়। যাই হোক, আমি লিলির চিঠি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে- পরিচিত-অপিরিচিত সবার কাছে হাত পাতলাম। লিলিকে বাঁচাতেই হবে। আমি সারাদিন পাগলের মতন ঘুরে ঘুরে- লিলির চিকিৎসার জন্য টাকা ধার-দেনা করতে লাগলাম। লিলির চিন্তায়-চিন্তায়, আমার ঘুম নেই, আমার খাওয়া-দাওয়া নেই।

চোখের সামনে দিনদিন লিলি বিছানার সাথে মিশে যাচ্ছে।
মাথার সব চুল পড়ে যাচ্ছে। লিলির মাথার এক আকাশ চুল আমার খুব পছন্দের। সেই চুল গাছের পাতার মতন ঝরে যাচ্ছে। এখন লিলি কথা বলতে পারে না। বিছানায় উঠে বসতে পারে না। নাকের ভিতরে পাইপ দিয়ে তরল খাবার খাওয়ানো হয়। আমি লিলির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। লিলির চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরে। লিলির সারা শরীর মরে গেছে- শুধু চোখ বেঁচে আছে। ডাক্তার'রা বলেছেন- আল্লাহকে ডাকুন। আমাদের কিছুই করার নেই। এখন, আমরা শুধু রোগীর ব্যাথা কমানোর চেষ্টা করছি। একদিন সন্ধ্যায় লিলির বিছানার পাশে বসে লিলির হাত ধরে বললাম- বেবি, তোমার কিচ্ছু হবে না। আমি টাকার ব্যবস্থা করেছি। আগামী রবিবার তোমাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাচ্ছি। লিলির জীর্ণ হাতে চুমু দিয়ে বললাম- কোনো ভয় নেই। লিলি মলিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল আর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। আমি লিলির চোখের পানি মুছে দিলাম- কিন্তু লিলি আমার চোখের পানি মুছে দিতে পারল না। ডাক্তার এসে বললেন- রোগীকে ডিস্টার্ব করবেন। তাকে একা থাকতে দেন।

আজ ২২ শে শ্রাবন। আকাশ ভরা মেঘ।
গুমগুম শব্দে আকাশ নাঁচছে। যে কোনো সময় ঝুমঝুম বৃষ্টি নামবে। লিলিয়ান এবং তার বাবা রাস্তার পাশের দোকান থেকে চা খাচ্ছে। চা শেষ করে লিলিয়ান তার বাবার কোলে উঠে বসে- তার মাকে দেখতে যাবে। ডাক্তার বলেছেন- আজ লিলি অন্যদিনের চেয়ে অনেক ভালো আছে। তার ব্যাথাবোধ কমে গেছে। এবং লিলিয়ান ইচ্ছা করলে তার মায়ের সাথে অনেকক্ষন গল্প করতে পারবে। লিলিয়ান হাসপাতালে গিয়ে তার মায়ের মাথার কাছে বসল। লিলিয়ান তার ছোট হাত দিয়ে মায়ের গালে হাত রাখল। লিলি তার বাচ্চার দিকে এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে তাকালো। লিলির চোখের ইশারায় লিলিয়ান এবং তার বাবা দুইজন লিলির দুই হাত ধরল। লিলির চোখে এক আকাশ আনন্দ খেলা করল। কিন্তু এই আনন্দ বেশীক্ষন লিলি ধরে রাখতে পারল না। হঠাত তার খুব কষ্ট শুরু হলো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসলো। মুখ দিয়ে লালা পরতে লাগল। বুকের ভিতর গরগর শব্দ হতে শুরু করলো। লিলিয়ান এবং লিলিয়ানের বাবা লিলির কষ্ট দেখে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। লিলিয়ান আম্মু আম্মু বলে মাকে জড়িয়ে ধরল। লিলিয়ানের বাবা ডাক্তার ডাকতে লাগলেন। আর কি আশ্চর্য ডাক্তার আশার আগেই লিলি মারা গেল।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ১:০৬
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×