somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

সেই রাতে যা ঘটেছিলো

২৭ শে জুন, ২০২০ রাত ১০:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(প্রথমেই বলে নিচ্ছি, দুর্বল হার্টের কেউ এই লেখাটা পড়বেন না)

বাগেরহাট যাচ্ছি। সুন্দরবনের পাশে একটি গ্রাম।
গ্রামের নাম রসুলপুর। ঢাকা কমলাপুর থেকে সকাল দশটায় বাসে উঠলাম। রাস্তায় তিনবার বাস নষ্ট হলো। বিকেলে পৌঁছানোর কথা ছিল রায়েন্দা। আমি পৌছালাম রাত ৩ টায়। পনের বছর আগের কথা। তখন রাস্তাঘাট খুব উন্নত ছিল না। প্রচন্ড শীত। সুন্দবনের বিখ্যাত শীত উড়ে এসে গায়ে লাগছে। বাস থেকে নেমে আমি কাঁপছি। চারপাশে ঘুটঘুট অন্ধকার। আমার সাথে যে ক'জন বাস থেকে নেমেছিল তারা মুহুর্তের মধ্যে কে কোথায় চলে গেল। ঈদের ছুটিতে বন্ধুর গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। তখন মোবাইল ছিল না। গত পাঁচ বছর ধরে যাব যাব করছিলাম, যাওয়া আর হয়নি।

বাজারের মতো একটা জায়গায় বাস নামিয়ে দিয়েছে।
চার পাঁচটা কুকুর একটা ভাঙ্গা চায়ের দোকানের সামনে জট পাকিয়ে বসে আছে। আমি ভীতু টাইপ মানুষ না। আমার আছে লজিক। কত কঠিন কঠিন ভূতের বই পড়ে আর মুভি দেখে ভয় পাইনি। যাই হোক, আমার বন্ধু বাবলু বলেছিল- তুই বাস থেকে নেমে দেখবি আমি তোর জন্য বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছি। হয়তো বাবলু বাইক নিয়ে বিকেলে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে চলে গেছে। বাবলু ছেলে হিসেবে খুব ভালো। যথেষ্ট আন্তরিক। বন্ধু বাবলু বলেছিল- রায়েন্দা থেকে ভ্যানে করে রসুলপুর গ্রামে যেতে এক ঘন্টা লাগে। এত রাতে একটা ভ্যানও নেই। আমি সকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে হাঁটা শুরু করলাম। আমার হাতে দু'টা বড় ব্যাগ। ব্যাগের মধ্যে আমার জামা কাপড় আর জুতো।

মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। চারিপাশে ভয়াবহ অন্ধকার।
প্রচন্ড কুয়াশা। নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি ঝরছে। বাতাসে গাছের পাতার শন শন শব্দ। কেমন ভুতুড়ে পরিবেশ! বন্ধু বাবলু বলেছিল- মাটির রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই আমাদের গ্রাম শুরু। বাবলুর বাবা গ্রামের ডাক্তার। খুব নাম ডাক আছে। সুন্দরবন থেকে নানাবিদ জিনিসপত্র নিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করে তারা বনের পশু দ্বারা আক্রান্ত হলে বাবলুর বাবার ফার্মেসীতে আসে চিকিৎসা নিতে। কেউ মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে গেছে, কেউ বাঘের থাবা খেয়েছে, কেউ সাপের কামড় খেয়েছে। শুনেছি গ্রামের লোকদের ভয়ডর খুব কম থাকে। আমি শহরের মানুষ আমার প্রচন্ড ভয়।

এই প্রচন্ড শীতেও আমি ঘেমে গেছি।
অনেকক্ষন ধরে হাঁটছি। পথ আর শেষ হয় না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। খুব ক্ষুধাও পেয়েছে। বিকেলের পর আর কিছুই খাইনি। ক্ষুধার সময় আমার মাথা কাজ করে না। ইচ্ছে করছে আশেপাশের কোনো বাড়িতে গিয়ে বলি- আমি অমুক, অমুক জায়গা থেকে আসছি। আমার খুব ক্ষুধা লাগছে আমাকে কিছু খাবার দিন। প্লীজ। যদি কিছু না থাকে- তাহলে গুড় মুড়ি দেন। আর চাপকল থেকে ঠান্ডা এক মগ পানি। সমস্যা হলো আশেপাশে কোনো বাড়ি দেখতে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে আমি জংগলের মধ্য দিয়ে হাঁটছি। ঠিক এই সময় একটা ভ্যান গাড়ি দেখতে পেলাম। ভ্যানগাড়ির নিচে একটা হারিকেন মিটমিট করে জ্বলছে। আমি দৌড়ে ভ্যানগাড়ির সামনে গেলাম। এবং অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম।

ভ্যানগাড়িতে সতের আঠারো বছরের একটা রুপসী মেয়ে বসে আছে।
কিন্তু মেয়েটা কাঁদছে। খুব কাঁদছে। মেয়েটাকে দেখে খুব মায়া লাগলো। মেয়েটার পাশে একটা লোক শুয়ে আছে। তার সমস্ত শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা। আর বুড়ো মতো একলোক ভ্যান চালাচ্ছে। আমি ভ্যান চালককে বললাম- রসুলপুর গ্রামে যাব। ডা. শাহজাহান তালুকদারের বাড়িতে। মনে হয় আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। দয়া করে কি আমাকে সেখানে নিয়ে যাবেন? প্লীজ। বুড়ো ভ্যান চালক- মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, শেফালি বুবুকে জিজ্ঞেস করেন। আমি শেফালি'র দিকে তাকাতেই, তিনি ভ্যানে উঠে বসতে ইশারা করলেন। এতটুকু আন্তরিকতা করার জন্য আমার ইচ্ছা করলো মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরি।

অন্ধকার রাস্তা আর প্রচন্ড বাতাস ভেঙ্গে ধীরে ধীরে ভ্যান চলছে।
বেশ ভালো লাগছে। মানুষের মনে এখনও মায়ামমতা আছে। এই মধ্যরাত্রে সাহায্য চাইতেই পেয়ে গেলাম। শেফালি এখনও কেঁদে চলেছে। শেফালি আর আমার মাঝখানে একটি লোক শুয়ে আছে। তার চোখ মুখ ঢাকা। এই মেয়েটি এই লোকটির কি হয়? আমি বেশিক্ষন চুপ করে থাকতে পারি না। শেফালিকে জিজ্ঞেস করলাম, বোন আপনি কাদছেন কেন? কি হয়েছে? শেফালি কান্না থামিয়ে বলল- যে লোকটি শুয়ে আশে, সে আমার স্বামী। সাপের কামড়ে সে আজ সন্ধ্যায় মারা গেছে। তাকে নিয়ে উত্তরপাড়ার শ্মশানে যাচ্ছি। হঠাত করে আমি প্রচন্ড ভয় পেলাম। আমার হাত পা কাঁপছে। আমি এতক্ষন একটা লাশের পাশে বসে আছি! ইচ্ছা করছে- একটা লাফ দিয়ে বাবাগো মাগো বলে ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে দৌড় দেই।

আমি গল্পের একদম শেষ প্রান্তে চলে এসেছি।
এরপর যা ঘটল, আমি তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ধুম করে লাশটি দাঁড়িয়ে গেল! তার হাতে ইয়া লম্বা একটা রাম দা। এই রাম দা দিয়ে সাত ফিট দূর থেকেও আমার গলা কেটে নিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। শেফালি বুবু'র হাতে একটা চাইনিজ কুড়াল। মিথ্যা বলব না, চাইনিজ কুড়াল হাতে মেয়েটিকে খুব সুন্দর লাগছিল। বুড়ো ভ্যানচালক আমার পেছন দিয়ে এসে আমাকে জাপটে ধরল। বুড়োর এত শক্তি আমি বুঝতেই পারিনি। তাকে দেখে তো মনে হচ্ছিল তার ভ্যান চালাতেই খুব কষ্ট হচ্ছে।

মুহূর্তের মধ্যে আমার সব কিছু নিয়ে নিল।
গলার চেন, হাতের আঙটি। ম্যানিব্যাগ। দুই ব্যাগ ভরতি জামা কাপড়। শেফালি বুবু বলল- ওর শার্ট প্যান্ট খুলে, ওকে ন্যাংটা করে ধানক্ষেতে ফেলে রাখলে কেমন হয়? ভ্যানচালক আর রাম দা হাতে লোকটি শেফালির কথায় শায় দিল। আমি মেয়েটির নিষ্ঠুরতায় প্রচন্ড মর্মাহত হলাম। দুঃখ,কষ্ট আর অপমানে আমি জ্ঞান হারালাম।

ভোরবেলা গ্রামের কিছু মুরব্বী মসজিদে ফযরের নামাজ পড়তে গিয়ে আমাকে ধানক্ষেত থেকে উলঙ্গ অবস্থায় উদ্দার করেন। এরপর আমি টানা সাত দিন জ্বরে ভুগলাম। অনেক থানা পুলিশ হলো। সমস্ত গ্রামের মানুষ আমাকে দেখতে এলো। স্থানীয় সংবাদকর্মী আমার উপর এই বিরাট প্রতিবেদন লিখল।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০২০ রাত ১০:২৯
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×