
আমি কেন তাকে খুঁজব?
সে আর আমি তো একই
তাঁর অস্তিত্ব আমার মাঝে বিরাজ করে
আমি নিজেকেই খুঁজছি।
মাওলানা রুমির ভেতর গভীর চিন্তা-চেতনার বোধ জন্ম আসলে এমনি এমনি হয়নি। প্রচুর পড়াশোনা আর জগত জানার চেষ্টাই তাকে নিয়ে গেছে জ্ঞানের গভীরতম শাখায়। তার বাবার এক ছাত্রের কাছে তিনি টানা নয় বছর পড়াশোনা করেন ইসলামী শরিয়া আর সুফীবাদ নিয়ে। রুমির লেখায় জীবন নিয়ে যেসব গভীর ভাবনা আমাদের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়, সে অবস্থায় যেতে আসলে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে জ্ঞানের এক বিশাল পথ। সেই সাথে নিজের ভেতর আলো জ্বালিয়ে রাখতে করতে হয়েছে নানা রকম জ্ঞানগত পরিশ্রম, কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজই হলো আলো বিলানো।
মাওলানা রুমির জন্ম অত্যন্ত সচ্ছল পরিবারে। মায়ের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল, বাবাও বেশ সম্মানিত কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। জমিনে ছিল রুমির পা, অথচ ছিলেন আকাশের মতো বিশাল। মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালাতে যা লিখে গেছেন, তার সবই অমরত্ব পেয়েছে। আধুনিক বিশ্বেও তাই এক শ' বছর পরও রুমির বলা প্রতিটি কথা তুমুল আলোচিত। সুফিবাদেও যিনি যোগ করেছেন এক নতুন আলো, যা মানুষের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করতে সক্ষম।
আমি পাথর হয়ে মরি আবার গাছ হয়ে জন্মাই
গাছ হয়ে মরি আবার পশু হয়ে জাগি,
পশু হয়ে মরি আবার মানুষ হয়ে জন্মাই
তাহলে ভয় কীসের? কীবা হারাবার আছে মৃত্যুতে?
মাওলানা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি।
মলানা রুমি নামেই বেশি পরিচিত। রুমি ১৩ শতকের একজন ফার্সি সুন্নি মুসলিম কবি, আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিবাদী এবং সুফী। রুমিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি এবং বেস্ট সেলিং পয়েট বলা হয়। রুমির সাহিত্যকর্ম বেশির ভাগই ফার্সি ভাষায় রচিত হলেও তিনি তুর্কি, আরবি এবং গ্রিক ভাষায়ও রচনা করেছেন। তার লেখা 'মসনবী'-কে ফার্সি ভাষায় লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয়। ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর, বর্তমান আফগানিস্তান, বাহা উদ্দিন ওয়ালাদ এবং মুইমিনা খাতুনের কোল জুড়ে আসে এক ফুটফুটে সন্তান। পিতা তার নাম রাখেন জালাল উদ্দিন। তাকে ইংরেজিতে 'রুমি' নামে সবচেয়ে বেশি ডাকা হয়। শৈশব থেকেই রুমি সমাজের উঁচু স্তরের লোকজনদের সাথে মিলেমিশে বড় হতে থাকেন। কবিতায় রুমি প্রেম, মদ, মদে মদ্যপ থাকা- এসবের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন যা ইসলামের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এখানে তার এই মদ আক্ষরিক অর্থে কোনো মদ নয়, এটি খোদার প্রতি, সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার পরম ভালোবাসা, আত্মসমর্পণ তথা তার সাথে লীন হয়ে যাওয়ার এক পরম উপলদ্ধিকেই বোঝায়।
অল্প খাও, স্বল্প ঘুমাও, কম কথা বল। গুনাহ থেকে দূরে থাক, সবসময় কাজ কর। সুখের অনুসন্ধানী মানুষদের থেকে দূরে থাক, এসব মানুষ তোমাকে যন্ত্রণা দিবে। সৎ, ভালো ও সুভাষী মানুষের সাথে থাক। ভালো মানুষ তারা, যাদের দ্বারা সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়। আর, ভালো কথা হলো তাই, যা সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ।
১২২৫ সালে রুমি গওহর খাতুনকে বিয়ে করেন।
তাদের দুজন ছেলে- সুলতান ওয়ালাদ এবং আলাঊদ্দিন চালাবী। এরপর গওহর খাতুন মারা গেলে রুমি এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেন, যার আগে একটি মেয়ে ছিল, কিমিয়া খাতুন নামে। এখানে রুমির এক ছেলে আমির আলিম চালাবী এবং এক মেয়ে মালাখী খাতুনের জন্ম হয়।
সকল স্তরের মানুষদের সাথে অবলীলায় মিশতেন রুমি।
শ্রেণি বৈষম্য তার মধ্যে ঠাঁই পায়নি। কখনো কোনো মুচি, কখনো বা কোনো স্বর্ণকার হয়ে যেত তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। আর এভাবেই ১২৪৪ সালের ১৫ই নভেম্বর তার সাথে পরিচয় হয়ে যায় 'শামস তাবরিজি'র। শামস তাবরিজি ছিলেন একজন চালচুলোহীন ভবঘুরে সাধু, লোকে যাকে ‘পাখি’ বলে ডাকতো। কারণ তিনি এক জায়গায় বেশিদিন স্থির থাকতে পারতেন না আর প্রচলিত ছিল, তাকে একই সময় দুই জায়গায় দেখা যেত, যাতে মনে হতো তিনি উড়ে বা নিজের ইচ্ছামতো চোখের পলকে অবস্থান বদল করতে পারতেন। শামস তাবরিজির সংস্পর্শে এসে রুমির আমুল পরিবর্তন হয়।
মাওলানা রুমি তার বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব মসনবির প্রশংসায় বলেছেন যে 'কুরআনের সমস্ত মগজ আমি রুমি চেটে খেয়ে ফেলেছি, শুধু তার হাড় গুলি রেখে দিয়েছি শরিয়তের অল্প বুদ্ধির আলেম রূপী কুকুরদের জন্য'। তাহার এই উক্তিতে বুঝতে আর বাকি থাকে না যে তিনি কোন পর্যায়ের আলেম।
রুমির কবিতার সতেজ ভাষা এবং ছন্দ সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিতো। তার প্রতিটি শব্দ শুনে মনে হতো- এগুলো সাধারণ ভাষা নয়, মানুষের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনের অনুবাদ, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের ভাষা। তিনি তার কবিতাগুলো বা গজল গুলো লেখার অনুপ্রেরণা পেতেন তার পারিপার্শ্বিকতা থেকেই। কখনো বা রাখালের বাজানো বাঁশির সুর শুনে, কখনো ঢাকের আওয়াজ শুনে, আবার কখনো স্বর্ণকারের হাতুড়ির আওয়াজ শুনে। রুমি বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টিকর্তার খোঁজ কোনো মসজিদ বা গির্জার পাওয়া সম্ভব নয়, সৃষ্টিকর্তার খোঁজ করতে হয় নিজের হৃদয়ে। রুমি প্রায়ই তার অনুসারীদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতির মাঝে ঈশ্বর অদৃশ্য জগতের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। রুমি প্রকৃতিকে ঈশ্বরের ভালোবাসার প্রতিফলন রূপে দেখতেন এবং সেখান থেকে কবিতা গজল রচনা করার অনুপ্রেরণা পেতেন। ‘মাসনাভী’ রুমির বিশ্ববিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। ৪০ হাজার লাইনের এই গ্রন্থ রচনা করতে সময় লাগে তার ২২ বছর।
তোমার দু’টো চোখকেই বন্ধ করে দাও
যদি অন্য চোখটি দিয়ে দেখতে চাও।
রুমির মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে সুলতান ওয়ালাদ এবং এবং শিষ্য হুসাম আল চেলেবি রুমির অনুসারীদের নিয়ে মৌলভী সম্প্রদায় গড়ে তোলেন, যারা বর্তমানে তুর্কিস্থানের ‘ঘূর্ণায়মান দরবেশ’ নামে পরিচিত। মাওলানা রুমির বয়স যখন মাত্র ১১ বছর, সে সময় মঙ্গোলরা মধ্য এশিয়ায় আক্রমণ করে। ফলে মাওলানা রুমির বাবা তার কিছু অনুসারীসহ তাদের বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র রওয়ানা হন। সে সময় রুমি চলার পথে অনেকের সান্নিধ্যে আসেন, যা তার জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। মাওলানা রুমি প্রাথমিক জীবনে সারা দিন হাদিস, তফসির ইত্যাদি ধর্ম গ্রন্থের কিতাব পাঠে সময় ব্যায় করতেন। মাওলানা রুমির আশে পাশে লক্ষ লক্ষ মুরিদান, আলেম, মুহাদ্দিস বসে থাকতেন শুধু তার মুখের একটু বানী শোনার জন্য। মাওলানা রুমি যেদিন দুনিয়া ছেড়ে চলে যান, সেদিন তুরস্কের ইহুদি, নাসারা, খিরিস্তান সহ সকল ধর্মের মানুষ রুমির মৃত দেহের সামনে তাদের নিজ নিজ ধর্ম গ্রন্থ পাঠ করা শুরু করে, শুধু তাই নয় একসাথে কাতার বন্ধী হয়ে নামাজের জানাজা আদায় করেন। কত বড় মাপের মানুষ হলে অন্য ধর্মের মানুষও তাকে শ্রদ্ধা জানায়, এটা রীতিমত ভাবনার বিষয়!
যখন কেউ তোমার সমালোচনা করে অথবা তোমার বিরোধিতা করে, তখন তোমার হৃদয়ে ছোট পিঁপড়ার সমান একটুখানি ঘৃণা আর শত্রুতার জন্ম হয়। তুমি যদি সাথে সাথে সেটাকে মেরে না ফেলো তবে সেটা একটা সাপে পরিণত হতে পারে, এমনকি আরো বড় দানবেও।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা ইকবালসহ বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা লেখক ও ব্যক্তিরা রুমির লেখা দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। রুমির বয়স যখন ২৫ বছর তখন তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। রুমি মাদরাসা প্রধান হিসেবে তার বাবার পদে স্থলাভিষিক্ত হন।
১২৪৪ সালের এক দিনে দরবেশ শামস তাবরিজির সাথে দেখা হওয়ার পর রুমির জীবন পুরোপুরিভাবে বদলে যায়। একজন সুপ্রতিষ্ঠিত গুরু ও আইনজ্ঞ থেকে রুমি একজন সাধুতে রূপান্তরিত হন। শামস একজন সঙ্গী খুঁজছিলেন যে তাকে সঙ্গ দিতে পারবে। এ কথা শুনে রুমি তাকে জিজ্ঞেস করেন- বিনিময়ে শামস তাকে কী দেবে? শামস বললেন, তার শির। তার পর রুমি বলেন, তুমি যাকে খুঁজছ সে কোনিয়ার জালাল উদ্দিন রুমি। রুমি শামসের দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। শামসের মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক ও অতীন্দ্রিবাদী হয়ে ওঠেন। ১২৪৮ সালের ৫ ডিসেম্বর রাতে রুমি এবং শামস কথা বলছিলেন, এমন সময় কেউ শামসকে পিছনের দরজায় ডাকে। তিনি বের হয়ে যান এবং এরপর আর কোথাও কখনো দেখা যায়নি। গুজব শোনা যায় যে রুমির পুত্র আলাউদ্দিন এর মৌন সম্মতিতে শামসকে হত্যা করা হয়।
এত দূর তোমাকে নিয়ে এসেছেন যিনি, আরও সামনে নিয়ে যাবেন তিনিই।
রুমির পাঁচ টি জনপ্রিয় বই-
১। মসনবী, (৬ খণ্ড)
২। দিওয়ানে কবির, (৪০০০০ কবিতার লাইন)
৩। ফিহি মা ফিহি, (বিভিন্ন সভা ও মসলিসে দেয়া বক্তব্য)
৪। মাজালিশ-ই শব, (সাতটি বড় বক্তৃতা)
৫। মাকতুবাত, (১৪৭ টি চিঠি)
হে তরুন শিক্ষার্থী। আয়নার দিকে তাকাও কিন্তু এর ভিতরের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হইও না। এই তারুন্য এক সময় বিবর্ণ হয়ে যাবে এবং অবশ্যই বার্ধক্য প্রকাশিত হবে।
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি নিজেকে কখনোই ধর্মের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। আবার তিনি ধর্ম থেকে বিচ্যুতও হয়ে যান নি। তিনি মানব আত্মার সাথে সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ককে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তাঁর কবিতার মাধ্যমে তা তুলে ধরেছেন। যে কারনে সকল ধর্মের মানুষের কাছেই তিনি সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এই সাধক ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে ৬৮ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
আমাদের জীবনের গোটা গল্পটাই যেন রুমি এক লাইনে বলে দিয়েছেন। এই উক্তি দিয়ে শেষ করি লেখাটা। রুমি বলেন, 'আমাদের জীবনের অর্ধেককাল কেটে যায় অন্যকে মুগ্ধ করার প্রচেষ্টায়, আর বাকি অর্ধেক কাটে অন্যের দেয়া দুশ্চিন্তার ভারে।'
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ২:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



