
জ্ঞান সাধনা ছিলো রুমির সবচেয়ে প্রিয়।
জ্ঞানের পথে মাওলানা রুমীর শ্রম-সাধনা ও প্রচেষ্টা ছিল অতুলনীয়। মানুষ তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত। লোকজন তাকে বলতো জ্ঞানের জাহাজ। নিজের আরাম আয়েশ নিয়ে রুমি কখনও ভাবেন নি। এমনকি রুমি বিছানা, বালিশ পর্যন্ত ব্যবহার করতেন না। স্বেচ্ছায় কখনও শয়ন করতেন না। নিদ্রার আক্রমণ হলে বসে বসে ঘুমিয়ে নিতেন অল্প কিছু সময়। রুমি নামাজ কখনও মিস করতেন না। নামাজ পড়তে খুব ভালোবাসতেন সব সময়। তিনি বলতেন নামাজ হলো ধ্যান। এই ধ্যানে প্রভুকে পাওয়া যায়। প্রভুকে অনুভব করা যায়। নামাযের সময় হলে তিনি যে অবস্থায় থাকতেন, তৎক্ষণাৎ কেবলার দিকে ঘুরে যেতেন। তখন তার চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে যেত। নামাযে তিনি একেবারে তন্ময় হয়ে যেতেন। অনেক সময় দেখা গেছে, এশার নামায শেষ করতে ভোর হয়ে গেছে।
একবার কনকনে শীতের মৌসুমে খোলা জায়গায় মাওলানা নামাযে দাঁড়ালেন। নামাজ শেষ করে মোনাজাতের সময় দুই হাত তুলে খুব কান্না করলেন। চোখের জলে তার দাড়ি চুইয়ে চুইয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছে। এমন কি, অত্যাধিক শীতের প্রকোপে দাড়িতে অশ্রু জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ ছিল না, যথারীতি নামাজে মশগুল ছিলেন তিনি। তিনি বলতেন নামাজে দাড়ালে শান্তি লাগে। পবিত্র লাগে। আনন্দ হয়। নামাজ আর জ্ঞানের চেয়ে শান্তি দুনিয়াতে আর কিছুতেই নেই। এক জীবনে 'জ্ঞান' থাকলে আর কিছুই লাগে না বেঁচে থাকার জন্য। রুমি প্রচুর পড়তেন, প্রচুর লিখতেন। আর প্রচুর ভাবতেন। তিনি দিনের পর দিন লিখেছন, পড়েছেন আর ভেবেছেন।
রুমি স্বভাবতঃ চরম পর্যায়ের সংসার-বিরাগী
এবং অল্পে খুশি থাকা মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন দেশের সুলতান ও বাদশাহগণ নগদ টাকা-পয়সা এবং বিভিন্ন রকমের খাদ্য ও ব্যবহার্য বস্তু তার খেদমতে হাদিয়া স্বরূপ প্রেরণ করতেন। কিন্তু তিনি উহার কিছুই নিজের জন্য না রেখে গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। তিনি বলতেন, এইসব জিনিস আমি সংগ্রহে রাখতে চাই না। আমি শুধু জ্ঞান সংগ্রহ করতে চাই। জ্ঞানের চেয়ে বড় সম্পদ দুনিয়াতে আর কিছুই নাই। অথচ কোনো কোনো সময় মাওলানার গৃহে খাওয়ার জন্য কিছুই থাকত না। এরূপ সময়ে কোন কোনদিন মাওলানা রুমির বড় ছেলে বাহাউদ্দীন পীড়াপীড়ি করলে যৎসামান্য কিছু নিজের জন্য রাখতেন মাঝে মাঝে।
যেদিন ঘরে খাবার কিছুই থাকত না,
সেদিন মাওলানা খুব বেশী খুশী হয়ে বলতেন, আমার ঘর হতে দরবেশীর ঘ্রাণ আসছে। তার দানশীলতা ও পরার্থপরতার অবস্থা এরূপ ছিল যে, কোন ভিক্ষুক এসে কিছু চাইলে আংটি, পাগড়ী, কোর্তা, পরিধানে যা কিছু থাকত, দেহ হতে খুলে ভিক্ষুককে দিয়ে দিতেন। তার সহজ সরল জীবনের জন্যই মানুষ তাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। রুমি আকাশ দেখতে খুব ভালোবাসতেন। প্রতিদিন সময় করে তিনি আকাশের দিকে অনেক সময় ধরে তাকিয়ে থাকতেন। তখন তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তো। যদি তাকে প্রশ্ন করা হতো- আপনি কেন কাঁদছেন? তার উত্তরে তিনি কিছু বলতেন না।
একবার তিনি বাজারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
ছেলেরা তার হাত চুম্বন করার জন্য দৌড়ে আসতে লাগল। তা দেখে তিনি দুই হাত প্রসারিত করে দিলেন। মাওলানাও ছোট ছোট শিশুদের হাতে চুমো খেতেন। অদূরে একটি ছেলে কোন কাজে মশগুল ছিল। সে বলল, মাওলানা! একটু অপেক্ষা করুন, আমি আমার হাতের কাজ শেষ করে আপনার হাত চুম্বন করব। ছেলেটি তার কাজ হতে অবসর না হওয়া পর্যন্ত মাওলানা ঐ স্থানে দাড়িয়ে ছিলেন। ছেলেটি কাজ শেষ করে এসে মাওলানার হাত চুম্বন করার পর তিনি নিজের গন্তব্য স্থানে চলে গেলেন।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০২০ রাত ১১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



