
আমার উচ্ছ্বসিত অশ্রুর কারণে বহিস্কৃত হচ্ছি আমি
তোমার জলসা ঘর থেকে হায়, নিজের অশ্রুর ওপরও
কি কোনো অধিকার নেই আমার?
আমাদের জানতে হবে শায়েরী জিনিসটা কি বা কাকে বলে।
আমরা অনেক সময় অনেক ব্যাপারেই অনেকেই 'শায়েরী' শুনিয়ে থাকি বা বলে থাকি। শের বা শায়েরী হলো উর্দু কবিদের ছোট ছোট কবিতা যা দিয়ে অল্প কোথায় অনেক বিশাল মনের ভাব প্রকাশ করে। শায়েরীর অন্যতম জন্মদাতা হলো ওমর খৈয়াম। উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় পাঠক-নন্দিত এসব শের-শায়েরীর অনুবাদ হয়েছে বহু ভাষায়। বাংলা ভাষার বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকরা এইসব মনগ্রাহী শের-শায়েরীর অনুবাদও করেছেন।
আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম বড়োলোক ভেবে
আমি তোকে ভালোবেসেছিলাম বড়োলোক ভেবে
আর তোমার বাবা আমায় জ্বালিয়ে দিলো ধূপকাঠি ভেবে।
শের-শায়েরী যারা করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখ্য যোগ্য হলেন- আল্লামা ইকবাল, ওমর খৈয়াম, মীর্জা গালীব, জালালউদ্দিন রুমি, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, মীর তকী মীর, হাফেজ জলান্ধরী, ইসমাইল মেরঠী। একজন জ্ঞানী ব্যাক্তি বলেছেন, ভারতবর্ষে দু’টো মাত্র প্রেরিত পুস্তক আছে, একটি পবিত্র বেদ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে গালিবের কাব্য সংকলন। ১৭৯৭ সালে আগ্রায় জন্ম নিয়ে ছিলেন মির্জা আসাদুল্লাহ খান। কবি নাম ‘গালিব’, যার অর্থ বিজয়ী। গালিবের একটা শায়েরী- 'তোমার দরজার সামনেই ঘর বানিয়ে নিয়েছি আমি, এবারও কি বলবে আমার ঘরের ঠিকানা জানো না তুমি!''
মন খুঁজে ফেরে সেই অবসর সময় গুলো,
শুধু তার ভাবনায় ডুবে থাকতাম যখন।
মূলঃ মীর্জা গালিব।
শের শায়েরী মানুষকে মুগ্ধ করে।
ভারতে শের শায়েরী খুব জনপ্রিয়। তাদের আড্ডায়, মুভিতে শের থাকবেই। শের শায়েরী মানুষকে আনন্দ দেয়, বিষন্ন করে তোলে। সুখে দুঃখে মানুষ বারবার শের শায়েরীতে আশ্রয় নিয়েছে। যা একশ' লাইন বুঝাতে পারে না, দুই লাইনে বুঝিয়ে দেন মহৎ কবিতা। বাংলাদেশে একজনও ভালো শায়েরী নেই। তবে ফানি কয়েকজন আছে, খুব মজা করে দু চার লাইন লিখেন। অবশ্য সেগুলো শের শায়েরী না। বহু লোক শায়েরী লিখতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। চান্দ মে চাঁদনি কাম, হ্যাঁয় জ্যায়সে গীত মে ধুন/ ক্যায়দ মেরি কায়া, আব রানঝে কি ছায়া।/ ও ঢুন্ডে, মুঝে ঢুন্ডে, তেরি বাতো মে, আঁখো মে/ মেরে রানঝা, সামঝা যা, মেরা মিলনা হ্যাঁয় মুশকিল। বাংলায় অনুবাদ করলে হয়- চাঁদের জোছনা হারিয়ে গেছে, হারিয়েছে গান থেকে সুর/ আর আমার কায়া মিলিয়ে গিয়ে হয়েছি প্রেমিকের ছায়া।/ সবাই আমায় খোঁজে তোমার কথায়, তোমার চোখে/ প্রিয়তম, তুমি বলে দাও, ওরা আমায় আর খুঁজে পাবে না।
আপনাদের জন্য কয়েকটা শের শায়েরীঃ
১। মাসজিদ উপার মুল্লা পুকারে
কেয়া সাহিব তেরা বেহরা হ্যাঁয়?
চিটি কে পাগ নে ভার বান্ধে
সো ভি সাহিব সুনতা হ্যাঁয়।
আমি বাংলা অনুবাদ করেছি-
মিনারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে মোয়াজ্জিম,
কেন রে, কানে কম শুনেন তোমার আল্লা?
একটা পিঁপড়াও যদি হেঁটে যায়
সেই সামান্য শব্দও আল্লার কাছে যায়।
২। নেশা-ভরা সেই মুখ যেন সদ্য ফোঁটা গোলাপ
চোখে চোখে ডুব দিয়ে শুষে নেই ক’ফোঁটা বিষ।
মূলঃ মীর্গা গালিব।
৩। আমার যদি একটা পৃথিবী থাকতো,
তা হলে সেখানে গিয়ে, চিৎকার করে কাঁদতাম।
তোমার দেওয়া স্মৃতি, এত যন্ত্রনা দেয় আমাকে,
যা সহিবার মত শক্তি, আমার মাঝে নেই।
৪। পোকারে পোকা, মহাপাজি ছারপোকা
বিছানার তলায় থাকিস, খুব যন্ত্রনা দিস
মাঝরাতে তুই ইচ্ছে মতো, রক্ত শুষে নিস।
এটা আমার শের।
৫। হৃদয়ের কাছে বুদ্ধির বাস সেটা ভাল কথা। কিন্তু মাঝে মাঝে হৃদয়ের ওপর থেকে বুদ্ধির শাসন তুলে দিতে হয়, হৃদয়কে স্বাধীন করে দিতে হয়, মুক্ত করে দিতে হয়। স্বাধীন মুক্ত হৃদয়ের ধর্মকে সবসময় বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে নেই।
৬। আমার নিজের একটা শের দিয়ে, লেখাটা শেষ করছি-
তুমি যাচ্ছো চার কাঁধে চড়ে
আমিও যাচ্ছি চার কাঁধে চড়ে
তুমি যাচ্ছো শ্বশুর বাড়ি
আমি যাচ্ছি গোরস্থানে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০২০ রাত ১০:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



