somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

হায় ডাক্তার, হায় নাপিত!

১১ ই নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ছোট্ট একটা মফস্বল শহর।
সেখানে সবচাইতে বড় ডাক্তার হইয়া পড়িল এক নাপিত। ছোটখাট অসুখে এটা ও্টা ঔষধ দিয়াই নয়, ফোঁড়া কাটা হইতে আরম্ভ করিয়া, রোগীর পেট চিরিয়া পেট হইতে পুঁজ বাহির করিয়া দেওয়া পর্যন্ত বড় বড় কাটা ছেঁড়ার কাজও সে অতি সহজেই করিয়া দেয়। এসব কাজ করিতে ডাক্তারেরা কত রকমের যন্ত্র লয়। ছুরি, কাঁচি ভালো মত গরম পানিতে সিদ্ধ করিয়া, পানিতে ভালো ভাবে হাত পরিষ্কার করিয়া কত সাবধান হইয়া তাহারা রোগীর গায়ে অস্ত্র ধরে। নাপিত কিন্তু সবের ধারধারে না। সে হাতের তোলায় তাহার ক্ষুর আর নরুণ ভালো মত ঘষিয়া খসাখস বড় বড় কাটা ছেঁড়ার কাজ করিয়া যায়।

এমন পাকা নাপিতের হাত।
রোগীর পেট চিরিয়া, পেটের মধ্যে হাত দিয়া, সেখানে নাড়ির ভিতরে ফোঁড়াটি হইয়াছে, অতি সহজেই সেখানে ক্ষুর চালাইয়া পুঁজরক্ত বাহির করিয়া আনে। তারপর সাধারন সুঁই সুতা দিয়া ক্ষতস্থান সেলাই করিয়া, আর একটু হলুদ গুঁড়া মাখাইয়া দেয়। ক্ষতস্থান সারিয়া যায়। চোখের পলক ফেলিতে না ফেলিতে সে বড় বড় কাটাছেঁড়ার কাজ করিয়া ফেলে। কাহারও ফোঁড়া হইয়াছে, বেদনায় চিৎকার করিতেছে। দেখি, দেখি বলিয়া নাপিত সেখানে তার ক্ষুর চালাইয়া দিয়া পুঁজরক্ত বাহির করিয়া আনে। রোগী আরাম পাইয়া আনন্দের হাসি হাসে। নাপিতের কাজের চেয়ে বেশি ইনকাম। কিন্তু পরিশ্রম কম। রোগীও বেশ তোষামদ করে।

গলায় মাছের কাঁটা ফুটিয়াছে,
দুষ্ট ছেলে খেলিতে খেলিতে মারবেল-গুলি কানের মধ্যে ঢুকাইয়া দিয়াছে, গাছ থেকে পরে ব্যথা পেয়েছে। নাপিত নরুনের আগা দিয়া গলার ভিতর হইতে মাছের কাঁটা বাহির করিয়া আনে, কানের ভিতরে নরুনের আগা ঢুকাইয়া দিয়া মারবেল বাহির করিয়া আনে। শুধু কি তাই? পিঠে ফোঁড়া হইলে, বড় বড় ডাক্তার সেটা কাটিতে হিমশিম খাইয়া যায়। চোখের পলক ফেলিতে ফেলিতে নাপিত সেখানে ক্ষুর চালাইয়া দেয়।
এসব কাটাকুটিতে সব রোগীই কি ভাল হয়? কোনটা ভাল হয়– কোনটা পাকিয়া বিষ লাগিয়া ফুলিয়া মরে। তা এরূপ তো ডাক্তারের বেলায়ও হয়। তাদের হাতেই কি সব রোগী ভাল হয়? শহরের সব লোক তাই অসুখে বিসুখে নাপিতকেই ডাকে। ডাক্তার ডাকিলে এত টাকা দাও–অত টাকা দাও, তারপর ঔষধের দাম দাও। কত রকমের ঝামেলা। নাপিতের কাছে ভিজিটের কোন দাম-দস্তুর নাই। দুই আনা, চার আনা যার যাহা খুশি দাও। ঔষধ তো তার মুখে মুখে–গরম পানির সেক, হলুদের গুড়োর প্রলেপ, পেটে অসুখ করলে আদা নুন খাও, তাতে না সারিলে জইনের গুঁড়া চিবাও, জ্বর হইলে তুলসীর পাতা, নিউমোনিয়া হইলে আকনের পাতার সেক। এসব ঔষধ বনে জঙ্গলে, পথে ঘাটে যেখানে-সেখানে পাওয়া যায়। তাই সকলেই নাপিতকে দিয়ে চিকিৎসা করায়।

এদিকে শহরের আর সব পাশ করা ডাক্তারেরা রোগীর অভাবে ভাতে মরে।
নাপিতের ছেলেমেয়ে দুধে ভাতে খাইয়া নাদুস নুদুস। একদিন সব ডাক্তার একত্রিত হইয়া ভাবিতে বসিল, কি করিয়া তাদের পসার ফিরাইয়া আনা যায়। এক ডাক্তার বলে, 'দেখো ভাই' আগে আমার বাড়িতে রোজ সকালে শত শত রোগী আসিয়া গড়াগড়ি দিত। টাকা-পয়সা তো দিতই, সেই সঙ্গে রোগ সারিলে কলাটা মূলাটা, বলতে হত না- যে দিনের যা তাও দিয়া যাইত। এই যে আমের মওসুম এখন। আমার ছেলেমেয়েরা একটা আমও মুখে দিয়ে দেখিল না! আর নাপিতের বাড়ি দেখ গিয়ে! হাঁয় কপাল! হাঁয় ঈশ্বর!

আর এক ডাক্তার বলে, 'আরে ভাই'!
ছাড়িয়া দাও তোমার আম খাওয়া। রোগীপত্তর আসে না। টাকা-পয়সার অভাবে। এবার ভাবিয়াছি, ঔষধ মাপার পালা-পাথর, আর বুক দেখার টেথিস্কোপটা বেচিয়া ফেলিব। অপর ডাক্তার উঠিয়া বলে, তুমি তো এখনও বেচ নাই। এই দুর্দিনের বাজারে চাউলের যা দাম! ডাক্তারি যন্ত্রপাতি তো কবেই বেচিয়া খাইয়াছি। এবার মাথার উপরে টিনের চালা কয়খানা আছে। তাও বেচিবার লোক খুঁজিতেছি। ওপাশের ডাক্তার বলে, ভায়া হে, এসব দুঃখের কথা আর বলিয়া কি হইবে, দেখিতেছ না? আমাদের সকলের অবস্থাই ওই একই রকম। এখন কি করা যায় তাই ভাবিয়া বাহির কর।

আর এক ডাক্তার বলে, দেখ ভাই!
বিপদে পড়লে বুড়ো লোকের পরামর্শ লইতে হয়। শহরের মধ্যে যে বুড়ো ডাক্তার আছেন, বয়স হইয়াছে বলিয়া এখন রোগী দেখেন না। তিনি আমাদের সকলের ওস্তাদ। চল যাই, তাঁহার নিকটে যাইয়া একটা বুদ্ধি চাই, কি করিয়া আমাদের পূর্বের প্রসার বজায় রাখিতে পারি। তখন সকলে মিলিয়া সেই বুড়ো ডাক্তারের কাছে যাইয়া উপস্থিত হইল। বুড়ো ডাক্তার আগাগোড়া সমস্ত শুনিয়া বলিলেন, তোমরা কেহ সেই নাপিতকে আমার নিকট ডাকিয়া আন।

নাপিত আসিলে বুড়ো ডাক্তার তাহাকে বলিলেন-
দেখ এইসব ছোকরা ডাক্তারের কাছে শুনিতে পাইলাম, তোমার কাটাছেঁড়ার হাত পাকা। তুমি একটা কাজ কর। আমাদের নিকট হইতে শারীর বিদ্যাটা শিখিয়া লও। তাতে করিয়া তোমার ডাক্তারি বিদ্যাটা আরও পাকিবে। নাপিত বলিল, এ অতি উত্তম কথা। আমি তো মুখ্যু সুখ্যু মানুষ। আপনারা যদি কিছু শিখাইয়া দেন বড়ই উপকার হইবে।
তখন সকল ডাক্তার মিলিয়া নাপিতকে শারীরবিদ্যা শিখাইতে লাগিল। শরীরের এখান দিয়া এই নাড়ি প্রবাহিত হয়। এইটা শিরা, এইটা উপশিরা। এইখানে ধমনী। এইখানে লিভার। হাতের এইখানে এই শিরা। কাটিলে রক্ত বন্ধ হইবে না, লোক মরিয়া যাইবে। এইখানে হৃৎপিন্ড। এইভাবে সাত আট দিন ধরিয়া সব ডাক্তার মিলিয়া নাপিতকে শারীরবিদ্যা শিখাইতে লাগিল।

নাপিত বুদ্ধিমান লোক।
ডাক্তাদের যাহা শিখিতে মাসের পর মাস লাগিয়াছিল, সে তাহা সাত দিনে শিখিয়া ফেলিল। শুধু কি শারীরবিদ্যা? ডাক্তারেরা তাহাকে নানা রকম অসুখের জীবাণুর কথাও বলিয়া দিল। ডাক্তারি যন্ত্রপাতি ভালো ভাবে পরিষ্কার করিয়া না লইলে রোগীর কি কি রোগ হইতে পারে তাহাও বুঝাইয়া দিল।
তারপর সেই বুড়ো ডাক্তারের পরামর্শ মতো সকল ডাক্তার একটি রোগী আনিয়া নাপিতের সামনে খাড়া করিল। তাহার সামান্য ফোঁড়া হইয়াছিল। তাহারা তাকে সেই ফোঁড়া কাটিতে বলিল। নাপিত কতরকম করিয়া হাত ধোয়। কত ঔষধ গোলাইয়া তার ক্ষুর-নরুন পরিষ্কার করে, কিন্তু তার মনের খুঁতখূঁতি যায় না। হয়তো তার হাত ভালো ভাবে পরিষ্কার হয় নাই। হয়তো অস্ত্রে কোন রোগের জীবাণু লাগিয়া আছে। আবার নতুন করিয়া অস্ত্র সাফ করিয়া নাপিত সেই লোকটির ফোঁড়া কাটিতে আরম্ভ করিল, কিন্তু তার হাত যে আজ কাঁপিয়া ওঠে। শরীরের এইখানে এই শিরা এইখানে উপশিরা। ওইখান দিয়ে ক্ষুর চালাইলে রোগী মারা যাইবে; নাপিত ক্ষুর এভাবে ধরে, ওভাবে ধরে কিন্তু ফোঁড়া কাটিতে কিছুতেই সাহস পায় না।

কি হলো আজ নাপিতের?
এতদিন অজানাতে রোগীর গায়ের যেখানে সেখানে ক্ষুর চালাইয়াছে। কিন্তু সমস্ত জানিয়া শুনিয়া সে আজ রোগীর গায়ে ক্ষুর চালাইতে সাহস পায় না। ভয়ে তাহার হাত হইতে অস্ত্র খসিয়া পড়িয়া গেল। নাপিত আর তাহার ক্ষুর চালাইতে পারিল না। সেই হইতে নাপিতের প্রসার বন্ধ হইল। লোকেরা আবার ডাক্তার ডাকিতে আরম্ভ করিল।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:০৮
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফের 'রসগোল্লা'

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৫ ই জুন, ২০২১ রাত ৮:৪৮


মুজতবা আলী সাহেবের ‘রসগোল্লা’ গল্প পড়ে রসগোল্লার রস আস্বাদন করেননি এমন বাঙ্গালী সাহিত্যপ্রেমী খুঁজে পাওয়া দুস্কর!
কোত্থেকে যেন জেনেছিলাম রসগোল্লার উদ্ভাবক কলকাতার এক ময়রা আর সেটা উদ্ভাবিত হয়েছিল এই বিংশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালোবাসলে ভালোবাসা' ই ফিরে আসে ! ( বাদল দিনের চিঠি )

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ১৫ ই জুন, ২০২১ রাত ১১:৩২


ভালোবাসলে ভালোবাসাই ফিরে আসে ঠিক!

তুমিময় একটা শহর! ক্যাম্পাসের শীত গ্রীষ্ম, নিউ মার্কেটের বই স্টেশনারি, গাউছিয়া চাঁদনি চকের টিপ চুড়ি, ধানমন্ডি ছুঁয়ে সংসদের রাস্তায় তারুণ্যের উত্তালদিন। বয়সের সিড়ি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল নেবে গো..................( গোলাপ রহস্য)

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ১৫ ই জুন, ২০২১ রাত ১১:৪৭



বিশ্ব জুড়ে জুন মাসটিকে বলা হয় গোলাপের মাস। এই জুনকে স্মরণে লেখাটি উৎসর্গিত।


ফুল ভালোবাসেন না এমন মানুষ সম্ভবত নেই । ফুলের জন্যে ভালোবাসা কেমন হবে, কবি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আরিশের প্রথম জন্মদিন

লিখেছেন হাবিব স্যার, ১৬ ই জুন, ২০২১ রাত ১২:০৮



আমার ছেলে আরিশ রহমান।
আরিশ রহমান ছাড়াও ওর আরো একটা নাম রয়েছে। আসওয়াদ। নামটি রেখেছেন আরিশের নানু। আসওয়াদ নামে ডাকলে সাড়া দেয় বেশি। ছেলে আমার হাঁটতে শিখেছে প্রায় এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরীমনিকে যারা “মক্কার খেজুর” মনে করেন, ছবি এবং কথাগুলো তাদের জন্য।

লিখেছেন আসিফ শাহনেওয়াজ তুষার, ১৬ ই জুন, ২০২১ রাত ১২:৩৬


মাস দেড়েক আগে রোজার ভেতর সারাদেশে যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউটা আসলো, তখন পরীমনি দুবাই গিয়েছিলো অবকাশ যাপন করতে । সোশ্যাল মিডিয়ায় সে তখন এমন কিছু আয়েশী জীবনের ছবি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×