
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ক্ষুদ্রায়তন এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ প্রাচীন ইতিহাসের কোন পর্যায়েই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও একতাবদ্ধ ভাবে আপন রাষ্ট্র গড়ে তোলার সুযোগ পায়নি। আমাদের দেশটির তিনদিক বর্তমানে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং একদিকে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। প্রাগৈতিহাসিক কালে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলই এই বঙ্গোপসাগরের নিচে চাপা পড়ে ছিল। বাংলাদেশের মূল অংশ সাগরের কোল থেকেই জেগে উঠেছে। পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী বাংলাদেশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো প্রায় ৪ হাজার বছর আগে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ আমাদের কী সুফল দিয়েছে, আর কী সর্বনাশ ডেকেছে।
সেপ্টেম্বর ১৯৪৭:
'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে? বাংলা নাকি উর্দু? নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে যেখানে সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার দাবী করা হয়। সেই সময়ে সরকারী কাজকর্ম ছাড়াও সকল ডাকটিকেট, পোষ্টকার্ড, ট্রেন টিকেটে কেবলমাত্র উর্দু এবং ইংরেজীতে লেখা থাকতো। ১৯৪৭ সালের ২৬ এপ্রিল জিন্নাহর সাথে এক আলাপ-আলোচনায় লর্ড মাউন্ট বেটেন তাকে জানান, সোহরাওয়ার্দী 'মনে করেন যে তার পক্ষে যুক্ত বাংলাকে ধরে রাখতে সম্ভব হবে, যদি এটি পাকিস্তান অথবা হিন্দুস্তান কোনোটাতেই যোগদান না করে'।
জিন্নাহ জানতেন যে বাঙালি হিন্দুরা মন-প্রাণ দিয়ে যুক্ত বাংলার সমর্থন করে না। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে জিন্নাহ বলেন, দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার বেশির ভাগ হিন্দু বাংলার বিভক্তি চায়। বাংলার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় বাঙালি মুসলমানরা কখনো বাংলার বিভক্তিকরণ চায়নি। পক্ষান্তরে বাংলাকে ভাগ করার দাবি সম্পর্কে বাঙালি হিন্দুদের মনোভাব অমৃতবাজার পত্রিকা (৫ এপ্রিল, ১৯৪৭ এভাবে প্রকাশ করেঃ 'এটা শুধু পার্টিশনের প্রশ্ন নয়, এটা হিন্দুদের জীবন মরণের প্রশ্ন'।
ইতিহাসের বিচারে এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছিল এই ভূখণ্ডের সেই অঞ্চল গুলোর যেই অঞ্চল গুলো বিভেদ রেখার প্রান্তীয় ভৌগলিকতার কারণে জাতিগত ভাবে দ্বিখণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। দেশভাগের বছর মুজিব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রী লাভ করেন। ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হওয়ার সময়ে কলকাতায় ভয়ানক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়। এসময় শেখ মুজিব মুসলিমদের রক্ষা এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সোহরাওয়ার্দীর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতায় শরিক হন। পাকিস্তান-ভারত পৃথক হয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।
আমরা হারিয়েছি জীবনানন্দ দাশ, অমর্ত্য সেন, মেঘনাদ সাহা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, এদের। পশ্চিম বাংলার বর্তমানের প্রচন্ড খ্যাতনামা অনেক সাহিত্যিকের বাড়িই কিন্তু পূর্ববঙ্গে। অমর্ত্য সেনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বাড়ি পুরানো ঢাকায়। সেরকমই জ্যোতি বসুর বাড়ি। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৫ ভাগ আদিবাসী তাদের জমি হারিয়েছে। আদিাসীরা সংখ্যালঘু হওয়ার কারনে তারা কোন প্রতিবাদ করতে পারেনি। অনেকেই মনের দুঃখে আবার ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। আবার অনেকেই নিজের জমিতে দিন মজুর হিসেবে তাদের তাদের জীবন নতুন করে শুরু করেছে। অভিভক্ত বাংলায় শেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। নির্বাচনের পর সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ শক্তিশালী হয় এবং তিনিই অভিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন।
ডাঃ জাকির নয়েকের মতে ১৯৪৭ এ ভারত ভাগ হওয়া বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এর পক্ষে তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন; আজ ভারত হিন্দু-মুসলমানের এক রাষ্ট্র থাকলে সবার মেধা এক হয়ে ভারত চীনকে আরো শক্তিশালী ভাবে মোকাবেলা করতে পারত। তিনি বলেন ভারত কিছু দিনের মধ্যেই একটা সুপার পাওয়ার হতে যাচ্ছে।' শুধু মাত্র ধর্মের ভিত্তিতে হাজার মাইল এর দুরত্ব থাকা সত্বেও দুটি দেশকে একটি দেশ হিসেবে ভাগ করে দেয়া হয়। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ পাস হয়। এ আইন অনুসারে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদের হাতে এবং ১৫ আগস্ট ভারতীয় গণপরিষদের হাতে মাউন্ট ব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। উপমহাদেশ স্বাধীন হলো।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০২১ রাত ১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



