
সমাজে ওরা খুব অবহেলিত, সভ্য মানুষরা ওদের বলে হিজড়া।
হিজড়া শব্দটি এসেছে আরবী হিজরত বা হিজরী শব্দ থেকে যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন বা Migrate বা Transfer। ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বুঝায় যা দৈহিক বা জেনিটিক কারণে মেয়ে বা ছেলে কোন শ্রেণীতে পড়ে না। বাংলা অভিধানে বলা হয়েছে হিজড়া শব্দটির আগমন হয়েছে হিন্দি থেকে। সংস্কৃত ভাষায় নপুংসক শব্দটি পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে হিজড়া শব্দটি অশোভন মনে হলেও বাংলাতে হিজড়া বোঝানোর জন্য কোনও শোভন শব্দ পাওয়া যায়নি। সাধারণ অর্থে হিজড়ার অভিধানিক অর্থ বলতে আমরা বুঝি- একই দেহে নারী ও পুরুষের চিহ্নযুক্ত মানুষ। যারা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম। হিজড়া শব্দটি মুলত পুরুষ বাচক। যার স্ত্রী বাচক শব্দ হিজড়ানি হতে পারে। ইংরেজিতে হিজড়ার প্রতিশব্দ হিসেবে ইউনাক শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ নপুংসক বা খোজা। পৃথিবীতে কখন থেকে হিজড়াদের আবির্ভাব হয়েছে তা সঠিক জানা যায়নি। তবে নৃতত্ত্ববিদদের মতে, যখন থেকে পৃথিবীতে মানব জাতির আবির্ভাব তখন থেকেই হিজড়ার আবির্ভাব ।
সায়েদাবাদ এলাকায় একটি পাঁচতলা বাড়ির মালিক আবুল হিজড়া।
মানুষের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া টাকা দিয়েই তিনি এ বাড়িটি তৈরি করেছেন। এ বাড়ির তৃতীয় তলার একটি রুমের দেয়ালে তিনি সাজিয়ে রেখেছেন নিজের ছোটবেলার অসংখ্য ছবি। বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে অস্থায়ী ভাসমান বসবাসকারী প্রান্তিক হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন। চট্টগ্রামে, ঝাউতলা, হালিশহর, নীমতলা, নিউমার্কেট, স্টেশন রোড, পাহাড়তলী বন্দরটিলা এলাকায় তাদের বসবাস ।
ভ্রুনের বিকাশ কালে নিষিক্তকরন ও বিভাজনের ফলে বেশকিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সৃষ্টি হয় যেমন এক্স এক্স ওয়াই অথবা এক্স ওয়াই ওয়াই। এর ফলে বিভিন্ন গঠনের হিজড়া শিশুর জন্ম হয়। শারীরিক ও মানসিক গঠনের উপর নির্ভর করে এদেরকে ৬ ভাগে ভাগ করা যায়। শারীরিক ভাবে পুরুষ কিন্তু মানষিক ভাবে নারী বৈশীষ্ট্য এর অধীকারী হিজড়াদের বলা হয় অকুয়া।
পুরান ঢাকার হিজড়াদের গুরু দিপালী।
তিনি নিজেও প্রতারণার শিকার হয়ে হিজড়ায় পরিণত হয়েছেন। দিপালী হিজড়া বলেন, ৯-১০ বছর বয়সে তাকে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়। কয়েকদিন পর মনু (হিজড়াদের গুরু মা হিসেবে পরিচিত) নামে এক হিজড়া নেতা তাকে ভারতের একটি হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে হিজড়ায় পরিণত করে। হিজড়ারা সাধারণ মানুষের কটূক্তি থেকে রেহাই পেতে সবাই দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ হিজড়ারাই সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি পরে থাকতে পছন্দ করে এবং গহনাও পরে থাকে। অনেকে পরচুলা ব্যবহার করে এবং আবার পুরুষের পোশাকও পরে ঘুরে বেড়ায়।
হিজড়াদের কে কেউ চাকরিতে নেয় না।
কেউ ঘরভাড়া দিতে আগ্রহী হয় না। ভোটার তালিকায় তারা কেউ ছেলে বা মেয়ে হিসেবে ভোটার হয়েছেন। জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমেও হিজড়া হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ নেই। চরম অভাব অনটনে তারা দিনাতিপাত করছে। তারা কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় বলে অনেকেই দোকানে দোকানে টাকা চাঁদা নিয়ে জীবন-যাপন করের আবার অনেকেই বাঁচার জন্য যৌন কাজের সঙ্গে লিপ্ত হয় । তবে যদি ওদের কাজের সুযোগ দেয়া হয় তারা তাদের অনেকেই যৌন পেশা থেকে ফেরত আসবে বলেছে । বর্তমানে রমনা পার্কে, কুড়িল বাড্ডা, পুরান ঢাকা, খিলগাঁও মার্কেটের পেছনে ভূঁইয়াপাড়াসহ অনেক এলাকাতেই হিজড়া সম্প্রদায়ের সংঘবদ্ধভাবে বসবাস ।
হিজড়া বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মানো কোন শিশুর যদি পরিনত বয়সে যাওয়ার আগে চিকিৎসা করা হয় তাহলে বেশীভাগ ক্ষেত্রেই তাকে সুস্থ করা সম্ভব। আমাদের দেশের ন্যায় বৈষম্যমূলক হিজড়া সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। অন্যান্য দেশের হিজড়ারা তাদের পরিবারের সঙ্গেই বসবাস করেন। আমাদের যে কারো পরিবারেই হিজড়া সন্তান জন্মগ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশে তিন লাখেরও বেশি হিজড়া আছে। একজন হিজড়ার কাছে তার রক্তের সম্পর্ক বড় নয়। তার কাছে গুরুই সব। দলে ভিড়ে সে গ্রহণ করে বয়স্ক হিজড়ার শিষ্যত্ব। দলভুক্ত হয়ে থাকতে হলে তাকে গুরুর শিষ্য হতেই হবে। হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছে কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, সুস্থ জীবন, বাঁধন হিজড়া সংঘ, লাইট হাউস, দিনের আলো ইত্যাদি সংগঠন।
কথিত আছে যখন কারো হিজড়ে বাচ্চা হয় তখন তা যদি হিজড়েরা জানতে পারে তবে তারা ওৎ পেতে থাকে তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য। একসময় ঠিকই তাকে হিজড়াদের দলে নিযে যায়। যদি না নিতে পারে তাহলে তারা দলবদ্ধভাবে এসে হাতে তালি বাজাতে থাকে যা তারা সবসময়ই বাজায় আর এ হাতে তালিতে নাকি কি এক অমোঘ আকর্ষন আছে যা শুনে অন্য হিজড়ারা আর ঠিক থাকতে পারেনা সেও এসে তাদের এই হাতে তালিতে যোগ দেয় যদিও এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নাই। হিজড়াদের জীবনেও সাধারণ মানুষের মত প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপার গুলো আসে। এর পরিনতি হিসাবে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। একই লিঙ্গের দু’জন অথচ ঘর বাঁধার স্বপ্ন। আবার অনেকেই নিজের গণ্ডির বাইরে অন্য পুরুষের সঙ্গে সর্ম্পক গড়ে। তবে সে বিয়ে বেশি দিন টিকে থাকে না। হিজড়া হওয়ার কারণ সম্পর্কে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে সমাজে। কেউ এটাকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ বলে, কেউ বলে পিতামাতার দোষ কিংবা প্রকৃতির খেয়াল।
কোন নবজাতকের জন্ম হলে সেখানে গিয়ে নাচ-গান করে চাঁদা তোলে তারা।
তারা তাদের জমাকৃত সকল টাকা তাদের গুরুর কাছে দিয়ে দেয় এরপর গুরু যা দেয় তা থেকে প্রসাধনী কেনে আর ব্যাংকে জমা রাখে। তাদের খাবারের বন্দোবস্ত তাদের গুরুই করে। কোনকালেই কোন দেশেই হিজড়াদের কোন সম্মান কেউ দেয়নি।
হিন্দু ধর্মে হিজড়া সম্প্রদায়কে বিশেষ এক ধরনের কাস্ট হিসেবে ধরা হয়।
তামিলনাড়ুতে এপ্রিল-মে মাসের দিকে হিজড়ারা দিনব্যাপী ধর্মীয় উৎসব পালন করে। ভারতে এবং বিভিন্ন দেশে এদের লোভী বয় বলা হয়। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবেই স্পষ্ট বলছে ‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্খিতিজনিত আওত্তাতীত কারণে অভাব গ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার।’
মুঘল শাসকদের কাছে হিজড়ারা ছিল অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভৃত্য।
হিজড়ারা অদ্বিতীয় যৌনসত্তার জন্য অবাধে পুরুষ ও মহিলা মহলে যাতায়াত করতে পারত। এ কারনে মুঘল সম্রাটদের হেরেমের সবচেয়ে মুল্যবান নারীদের পাহারা দেয়া এবং তাদের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করত বিশ্বস্ততার সঙ্গে। এরা এতই বিশ্বস্ত ছিল যে সম্রাটের অনেক গোপন দায়িত্ব পালন, এমনকি সন্তান প্রসবের সময় সম্রাট ছাড়া শুধু হিজড়াদেরই প্রবেশাধিকার ছিল। বেইমানি এরা কখনোই করতা না। কারও প্রতি বিশ্বাস জমে গেলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা বজায় রাখত। তাই মুঘলদের সময়ে এরা ছিল সবচেয়ে নিরাপদ কর্মী।
ঢাকাতে হিজড়ারা মূলত পাঁচটি দলে বিভক্ত।
এক দলের হিজড়ারা অন্য দলের এলাকায় গিযে টাকা তুলতে পারবে না। হিজড়ারা অনেকেই মুসলিম হলেও তারা অনেকেই হিন্দু রীতি নীতিতে বিশ্বাষ করে। তাই তাদের যদিও কবর দেয়া হয় কিন্তু তারা মনে করে তাদের আবার পূণঃজনম হবে। কিন্তু তাদের কবর দেয়ার নিয়মটি খুব অদ্ভুত তাদের কবরে প্রথমে ঢালা হয় লবন, তারপর লাশ, তারপর দেয়া হয় ফুল তারপর আবার লবন। এটার মূল কারন হল- তাদের বিশ্বাষ এভাবে কবর দিলে তাদের আগের সকল পাপ ধুয়ে পরবর্তী জনমে তারা পূর্ণ নারী বা পুরূষ হিসেবে জন্ম গ্রহন করতে পারবে।
হিজড়াদের রয়েছে নিজস্ব বিচার ব্যাবস্থা।
বিচারকার্য সম্পাদন করেন গুরু মা। শাস্তি হিসেবে বেতের বাড়ি এবং আর্থিক জরিমানা করা হয়। যে আর্থিক জরিমানা প্রাপ্ত হয় তাকে একা এলাকা থেকে টাকা তুলে জরিমানার টাকা প্রদান করতে হয়। বাংলাদেশের হিজড়াদের উচ্চ বিচারালয় সাভারে। বছরে একবার এদের সমাজের অভ্যন্তরীন বড় ধরনের বিচার এখানে সম্পন্ন হয়। সব ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি আর্থিক জরিমানা। হিজড়ারা যুগ যুগ ধরে তাদের এই বিচার ব্যাবস্থা মেনে আসছে পরম আস্থায়। হিজড়ারা বাংলায় কথা বলতে পারলেও তারা অপরিচিতদের সামনে গোপন কথা সংকেতের মাধ্যমে আদান প্রদান করে। হিজড়াদের সম্মুখিন হননি এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। তারা নানা ভাবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। নেচে গেয়ে কৌতুক করে আমাদের করুনা কামনা করে। আমরা বেশির ভাগ স্বাভাবিক মানুষরা কৌতুহলী হয়ে ওঠি, ঠাট্টা মশকরা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করি তাদের নিয়ে।
একবার চিন্তা করে দেখুন- এই পৃথিবীতে ওরা জোর করে আসেনি।
দুইজন মানব মানবীর চূড়ান্ত ভালোবাসার ফসল ওরা। যারা ওদের পৃথিবীতে এনেছিলো তারাই ওদের স্থান দেয়নি। কতটা দুঃখকষ্ট আর বঞ্চনা সহ্য করে ওরা হাতে তালি দিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আমাদের মানবতা বোধকে পরিহাস করে। আসুন ওদের মানুষ ভাবি, ওদের দুঃখ কষ্ট গুলো লাঘব করার চেষ্টা করি। এ পৃথিবী থেকে ওদের পাওনা বুঝিয়ে দেই।
কবি ও সাহিত্যিকদের কলমে আরেক উপেক্ষিত হচ্ছে হিজড়া সম্প্রদায়।
হিজড়াদের একটা বড় অংশ পতিতা বৃত্তির সঙ্গে জড়িত। এরা সস্তা দামের পারফিউম দিয়ে দিনে রাতে পার্কে কিংবা জনবহুল জায়গা গুলোতে খদ্দেরের আশায় ঘুরে বেড়ায়। সামান্য কয়েক টাকার জন্য বিকৃত রুচির কিছু পুরুষের কয়েক মুহূর্তের শয্যাসঙ্গী হয়। ফলে এরা এইচআইভি/এইডস ঝুঁকিপূর্ণ। এদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং এইচআইভি ভাইরাস যাতে না ছড়ায় এ বিষয়ে সচেতন করতে কয়েকটি সংগঠন কাজে করছে। ওরা এখন অনেক সচেতন।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০২১ রাত ১:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



