
আমার গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুর।
গ্রামে আমি খুবই কম যাই। আমার গ্রামের কেউ আমাকে চিনে না। আমিও আমার গ্রামের কাউকে চিনি না। হুটহাট একদিন গ্রামে গেলে- কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে তুমি কোন গ্রামের? কোন বাড়ির? তোমার বাপ দাদার নাম কি? এটা দুঃখজনক। পদ্মানদীর কাছেই আমাদের বাড়ি। আমাদের বাড়ি থেকে পদ্মানদী হেঁটে যেতে সময় লাগে পনের মিনিট। ঢাকা থেকে আমাদের গ্রামে যেতে সময় লাগে দেড় ঘন্টা। আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগে গ্রামে যেতে সময় লাগতো ৬/৭ ঘন্টা। এখন রাস্তা অনেক উন্নত হয়েছে।

সিরাজদিখাঁর মধ্যপাড়া থেকে তোলা ছবি।
ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বহু কীর্তিমান মনীষির স্মৃতিধন্য মুন্সিগঞ্জ জেলা।
এ জেলার প্রাচীন নিদর্শন সমূহের সাথে জড়িয়ে আছে হাজারো গৌরব গাঁথা, সুখ-দু:খের নানা উপাখ্যান। সংগীত, নাটক, নৃত্য, সাহিত্য, আবৃত্তি, সংস্কৃতির সকল শাখায় সমৃদ্ধ এ মুন্সিগঞ্জ। এ জেলা সুপ্রাচীন চন্দ্ররাজাদের তাম্রশাসনের অঞ্জলি থেকে শুরু করে পাল, সেন, মোঘল, বার ভূঁইয়াদের কীর্তিতে সমুজ্জ্বল হয়ে একটি স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের রাজধানী বিক্রমপুরের কীর্তিময় অংশ।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত রয়েছে মুন্সিগঞ্জবাসীর অবিস্মরণীয় অবদান। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, বিশেষত: আলু চাষ ভিত্তিক কৃষি এবং এক লাখের অধিক প্রবাসী এ জেলার অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। বিক্রমপুর বাংলার একটি ঐতিহাসিক এলাকা। সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চল তার বৌদ্ধ জ্ঞান চর্চার জন্য এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য সুপরিচিত। বিক্রমপুর নামের ‘বিক্রম’ অর্থ সাহস বা বীরত্ব এবং ‘পুর’ অর্থ নগর বা এলাকা যা উপমহাদেশে বিভিন্ন অঞ্চল বা এলাকার নামের শেষাংশ হিসাবে সাধারণতঃ ব্যবহার করা হয়।

বঙ্গভঙ্গের সময় বিক্রমপুরবাসীর কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন বলেছিলেন, 'আমি বিক্রমপুরবাসীদের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে বেশ অবগত আছি। এ রকম সুনিপুণ রাজকর্মচারী পৃথিবীর আর কোথাও নেই।' বিক্রমপুর সম্পর্কে লর্ড কার্জনের আরো দুটি উক্তি 'দিস পার্ট অব ইন্ডিয়া ইজ দি মোস্ট অ্যাডভান্সড রুরাল ট্র্যাঙ্ক ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস পিপল আর একসেলেন্ট' এবং 'বিক্রমপুর ইজ টু দি রেস্ট অব ইন্ডিয়া হোয়াট এডিনবরা ইজ টু দি রেস্ট অব ইউরোপ'। ১৯১৫ সালে লর্ড কারমাইকেল বিক্রমপুর ভ্রমণ করে লিখলেন, 'বিক্রমপুর অনেকটা আমার দেশ স্কটল্যান্ডের মতো।

এই দৃশ্যটি মুন্সীগঞ্জের কোথায় বলতে পরবেন কেউ?
মুন্সিগঞ্জ ঢাকা বিভাগের একটি জেলা।
মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন নাম বিক্রমপুর। মুন্সিগঞ্জ জেলার উত্তরে ঢাকা জেলা, দক্ষিণে ফরিদপুর জেলা, পূর্বে মেঘনা নদী ও কুমিল্লা জেলা এবং পশ্চিমে পদ্মা নদী ও ফরিদপুর জেলা অবস্থিত। মুন্সিগঞ্জ জেলায় ছয়টি উপজেলা রয়েছে। এগুলি হল, শ্রীনগর উপজেলা, সিরাজদীখান উপজেলা, লৌহজং উপজেলা, টঙ্গীবাড়ী উপজেলা, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা এবং গজারিয়া উপজেলা।
কৃতী ব্যক্তিত্ব আছেন যেমন- অতীশ দীপঙ্কর, বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারক। লেখক হুমায়ূন আজাদ। চাষী নজরুল ইসলাম, চলচ্চিত্র পরিচালক। জগদীশ চন্দ্র বসু, বিজ্ঞানী। ব্রজেন দাস, ইংলিশ চ্যানেল জয়ী সাঁতারু। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, লেখক। চিত্তরঞ্জন দাস, রাজনীতিবিদ। বুদ্ধদেব বসু, কবি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়,ঔপন্যাসিক।

দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে- অতীশ দীপঙ্করের জন্মস্থান, রাজা শ্রীনাথের বাড়ি, রামপালে বাবা আদমের মসজিদ, হাসারার দরগা,সোনারং জোড়া মন্দির, পদ্মার চর। ইতিহাসের পাতায় বিক্রমপুর একটি জ্ঞানী তাপস জনের মিলন কেন্দ্র। পাকা রাস্তা ৫৩৫ কিলোমিটার, কাচা রাস্তা ১০০০ কিলোমিটার। হাটবাজার সংখ্যা ১০৭টি। হিমাগার ৭১টি। বিদ্যুৎ বিতরণ উপকেন্দ্র ৪টি। ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ২টি, খাদ্য গুদাম ৭টি, লাইব্রেরী ২টি, স্টেডিয়াম ২টি, সিনেমা হল ১১টি। সরকারী বেসরকারী ব্যাংক সংখ্যা ৬৪টি। বাংলাদেশে তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেরও কোনো অঞ্চলে গিয়ে 'বিক্রমপুর' নামটি বললে, আমি বিক্রমপুরের লোক বললে মানুষের মধ্যে একধরনের সমীহের ভাব জেগে ওঠে।
ক্রমাগত নদী ভাঙ্গনের ফলে প্রাচীন বিক্রমপুর শহর এবং এর পুরাতত্ত্বিক নিদর্শণসমূহ প্রায় পুরোটাই কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি নদীর দ্বীপ দেশ মুন্সিগঞ্জ। আজকের মুন্সিগঞ্জ কিংবদন্তি ইতিহাসের মহান এবং গর্বিত ভূ-ভাগ। ৬টি উপজেলা, ২টি পৌরসভা, ৬৭টি ইউনিয়ন আর ৯৫৭টি গ্রাম নিয়ে ৯৫৪.৯৬ বর্গকিলোমিটারের ঐতিহ্যমন্ডিত ভূখন্ড মুন্সিগঞ্জ।

কাঠের রেডিমেট বাড়ি।
মুন্সিগঞ্জ সে সময়ে ছিল একটি গ্রাম যার পূর্ব নাম ছিল ইদ্রাকপুর।
কথিত আছে, মোঘল শাসন আমলে এই ইদ্রাকপুর গ্রামে মুন্সী হায়দার হোসেন নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৪৫ সালে বৃটিশ ভারতের প্রশাসনিক সুবিধার্থে মুন্সিগঞ্জ থানা ও মহকুমা হিসেবে উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ মুন্সিগঞ্জ জেলায় রূপান্তরিত হয়। মুন্সিগঞ্জ জেলা ২৩০২৯ মিনিট থেকে ২৩০৪৫মিনিট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০০১০ মিনিট থেকে ৯০০৪৩ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকার দূরত্ব ৩১ কিলোমিটার। নদনদী-পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষা। যোগাযোগের মাধ্যম সড়ক ও নৌপথ। নদী বন্দর ২টি কমলা ঘাট ও দিঘলী। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়ে রামপালের কাজী কসবা গ্রামের মুন্সী এনায়েত আলীর জমিদারভুক্ত হওয়ার পর তার মুন্সী নাম থেকে ইদ্রাকপুরের নাম মুন্সিগঞ্জ হিসেবে অভিহিত হয়।

মুন্সিগঞ্জ সমতল এলাকা নয়।
জেলার কিছু কিছু অঞ্চল যথেষ্ট উচু যদিও জেলায় কোন পাহাড় নেই। মুন্সিগঞ্জের বেশির ভাগ এলাকা নিম্ন ভূমি যা বর্ষাকালে পানিতে ডুবে। মুন্সিগঞ্জের জলবায়ু সমভাবাপন্ন। আয়তন ৯৫৪.৯৬ বর্গকিলোমিটার। শিক্ষার হার শতকরা ৬৬ জন। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫০৩টি। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪৪টি। মসজিদের সংখ্যা ২০৬৬টি, জামে মসজিদ ১৭৯৫টি, মন্দিরের সংখ্যা ১০৮টি, গীর্জার সংখ্যা ১টি। মোট আবাদী জমির পরিমাণ ১,২২,১৩৯ হেক্টর।
বিক্রমপুর নামটিকে পৃথিবীর কাছে পরিচিত করিয়েছেন দুজন মানুষ, অতীশ দীপঙ্কর এবং জগদীশচন্দ্র বসু। একজন ধর্ম এবং জ্ঞানের আলোয়, আরেকজন বিজ্ঞানের। বুদ্ধদেব বসু তাঁর স্মৃতিকথা 'আমার ছেলেবেলা'য় কী অসাধারণ ভাষায় এবং মমতায় বিক্রমপুরের কথা লিখেছেন। বাংলা ভাষার একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুল নাচের ইতিকথা'। এই উপন্যাসের পটভূমি বিক্রমপুরের গাউদিয়া গ্রাম। গাউদিয়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামাবাড়ি, নিজের গ্রাম মালপদিয়া। একদা বাংলা সাহিত্য কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন সুবোধ ঘোষ। তাঁদের আদিনিবাস বিক্রমপুরের বহর গ্রাম। বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র বলা হতো সমরেশ বসুকে। তিনি বিক্রমপুরের। বিক্রমপুরের পটভূমিতে দেশভাগের সময় নিয়ে এক আশ্চর্য উপন্যাস লিখেছিলেন সমরেশ বসু। 'সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা'। বিক্রমপুরের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্দান্ত উপন্যাস লিখেছেন মাহমুদুল হক, 'খেলাঘর'। বিক্রমপুরের কৃতী লেখক কবি ভাষাবিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ বিক্রমপুর নিয়ে লিখেছেন তাঁর অসামান্য গ্রন্থ 'ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না', দীর্ঘ কবিতা 'বিক্রমপুর'। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'উজান' উপন্যাসে আছে বিক্রমপুরের কথা। প্রফুল্ল রায় বজ্রযোগিনীর, তাঁর 'কেয়াপাতার নৌকো' উপন্যাসে আছে বিক্রমপুরের কথা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'পূর্বপশ্চিম'-এ লিখেছেন মালখানগরের কথা।

মুন্সিগঞ্জের রাজকন্যা। পরী।
এ অঞ্চলের মানুষ সগর্বে বলে, আমি বিক্রমপুরের লোক।
মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতি নামে একটি সংগঠন আছে, প্রায় ৭৫ বছরের পুরনো। পৃথিবীর বিভিন্ন বড় শহরে যেখানে মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লোক আছে সেখানে এই সমিতির শাখা আছে। দেশব্যাপী বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার জনপ্রিয়। বিক্রমপুর নাম ধারণ করা চারটি পত্রিকা আছে, 'মাসিক বিক্রমপুর', 'আমাদের বিক্রমপুর', 'সাপ্তাহিক বিক্রমপুর বার্তা', 'মাসিক বিক্রমপুর সমাচার'। ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হতো 'বিক্রমপুর পত্রিকা', সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০২১ দুপুর ১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



