
ছবিঃ আমার তোলা।
ক্যাপশনঃ যাকাতের কাপড় নয়, নয় কোরবানির মাংস। তারা টিকা নিতে এসেছেন।
সুরভি কয়েকদিন ধরে ঘ্যান ঘ্যান করছে।
টিকা দিয়ে আসো। যাও। প্লীজ। আল্লাহর দোহাই লাগে। টিকার জন্য সে-ই আমাকে রেজিস্টেশন করে দিয়েছে। রেজিস্টেশন করেছি এক মাস পাঁচ দিন আগে। আজও ম্যাসেজ আসেনি। অথচ সাত দিনের মধ্যে ম্যাসেজ আসার কথা। শুনলাম এখন নাকি ১৮ বছর যার সে-ও টিকা পাবে। শুধু টিকা কেন্দ্রে গেলেই হবে। আমার ছোট ভাই কেন্দ্রে গিয়ে ফিরে এসেছে। কেন্দ্র থেকে বলেছে- টিকা নাই। শেষ। যাই হোক, আমার ম্যাসেজ না আসা স্বত্ত্বেও আমি আজ কেন্দ্র গেলাম। নগর মাতৃসদন, মুগদা।
আমার বাসা থেকে অনেক দূর। রিকশা ভাড়া ৭০ টাকা। টিকা দান কেন্দ্রে গিয়ে দেখি ভয়াবহ অবস্থা। অসংখ্য মানুষ জটলা পাকিয়ে আছে। কোনো নিয়ম কানুন নাই। এই ভিড়ের মধ্যে কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আমার ঠিক করোনা হয়ে যাবে। মেইন গেট বন্ধ। কখন খুলবে বা কখন ডাক পড়বে কেউ জানে না। কেন্দ্রের কারো সাথে দেখা বা কথার বলার সুযোগও পেলাম না। দূরে রোদের মধ্যে একঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে বাসায় চলে এলাম। রিকশা ভাড়া গেলো ১৫০ টাকা।
আজ কি এমন হতে পারতো না-
আমাকে দেখেই ডাক্তার বলবেন- আরে রাজীব সাহেব যে! আমাদের কি সৌভাগ্য! প্লীজ আসুন। বসুন। আগে এক কাপ চা নিন। গরম কলিজা সিঙ্গারা দুটো খেয়ে নিন। দুপুরে কিন্তু আমার সাথে খেয়েই যেতে হবে। প্লীজ মানা করবেন না। তাহলে খুব কষ্ট পাবো। আমি বলব, আগে টিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। ডাক্তার বলবেন, আপনাকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকা নিতে হবে না। আপনি ভিআইপি কামরায় আরাম করে বসুন। আমি এসি ছেড়ে দিচ্ছি। ডাক্তার চিৎকার করে পিয়নকে বলবে- রাজীব স্যারকে ঠান্ডা কোকের ক্যান দাও। কুইক। আমি কোক খেতে খেতে টিকা নেবো। ছবি তুলবো দুই আঙ্গুলে ভি চিহ্ন দেখিয়ে। ছবিটা ফেসবুকে দিবো। টিকা শেষে ডাক্তারের রুমে ভাত খাবো। নানান রকম খাবারের আয়োজন থাকবে। তবু খেতে খেতে ডাক্তার বলবে, অতি সামান্য আয়োজন। এজন্য আমি দুঃখিত। আমি যদি জানতাম আজ আপনি আসবেন তাহলে বিশেষ কিছু ব্যবস্থা অবশ্যই করতাম।
ফেসবুকে একটা গ্রুপ আছে, মাছ বেঁচে।
ওদের ফোন করে বললেই বাসায় এসে মাছ দিয়ে যায়। দামও স্বাভাবিক। বাজারের মতোই। ওদের কাছ থেকে মাছ কিনলে সুবিধা হচ্ছে মাছ কেটে ধুয়ে পরিস্কার করে বাসায় এসে দিয়ে যায়। এমন কি শিং মাছ কিনলেও ঘষে পরিস্কার করে দিয়ে যায়। গতকাল আমি একটা সাড়ে তিন কেজি রুই মাছ অর্ডার করলাম। এক ঘন্টার মধ্যে মাছ কেটে, ধুয়ে বাসায় এসে দিয়ে গেলো। ব্যাপারটা ভালো লাগছে। বাজারে যাওয়ার ঝামেলা নাই। দামাদামির ঝামেলা নাই। বাজার থেকে মাছ কিনলে, মাছ কাটার জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়। ওরা মাছ কাটা এবং ধুয়ে দেওয়ার জন্য আলাদা কোনো টাকা নিচ্ছে না। গতকাল দুপুরে ভাত খাওয়ার পর পরী বলছে আইসক্রীম খাবে। আমি বললাম, সন্ধ্যায় খেও। পরী বলল, আমি এখনই খাবো। অথচ আমার ছয় তলা থেকে নামতে ইচ্ছা করছিলো না। তখন অনলাইনে একবাটি ইগলুর ভ্যানিলা আইসক্রীম অর্ডার করলাম। বিশ মিনিটের বাসায় এসে দিয়ে গেলো।
গত কয়েকদিনে পরিচিত চারজন মারা গেছে করোনায়।
এদের সবার বয়স ৩২ থেকে ৩৮ এঁর মধ্যে। এরা কেউ অসুস্থ ছিলেন না। বেশ ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। তাদের করোনা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিলো। কিন্তু তাঁরা সবাই সাত দিনের মধ্যে মারা গেলেন। তাদের মৃত্যু আমাকে প্রচন্ড কষ্ট দিয়েছে। মর্মাহত করেছে। 'কামরুন নাহার' নামে একজন হাসি খুশি মানুষ মারা গেলেন। আমার সাথে তার কোথাও দেখা হলে বলতেন- ভাই কেমন আছো? তোমার মেয়েটা কেমন আছে? তিনি সাংবাদিকতার শিক্ষিকা ছিলেন। শিক্ষার্থীদেরও বন্ধু ছিলেন। শিক্ষার্থীদের কল্যাণকামী ছিলেন। ক্লাসরুমের বাইরেও ছিলেন আন্তরিক। প্রাণখোলা মানুষ। কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ব্যক্তিগত খোঁজখবরও নিতেন। পরিবারের খোঁজখবরও নিতেন। ক্লান্তিহীন, পরিশ্রমী জ্ঞানসাধক! এত অমায়িক ব্যবহার কম মানুষেরই থাকে!
আজ ১০ তারিখ। আগষ্ট মাস।
আরবী ১ মুহররম এবং বাংলা শ্রাবন মাসের ২৬ তারিখ। কথা হচ্ছে- আগে করোনা হলে লোকজন অনেকদিন করোনার সাথে ফাইট দিতে পারতো। এখন কেন করোনা হলে মানুষ এত দ্রুত মরে যাচ্ছে? আমার যদি করোনা হয়, আমি ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে মরে যাবো! মৃত্যু এত সহজ! আমার পরিবারের কি হবে? টিকা তো এখনও দিতে পারলাম না। আবার টিকা দিয়েওবা লাভ কি? গায়ক ফকির আলমগীর দুই ডোজ করোনার টিকা নিয়েও করোনায় মারা গেলেন। সব কিছু মিলিয়ে আমি ভয়াবহ চিন্তিত। যেদিকেই যাই, যেদিকেই তাকাই শুধু করোনা আর করোনা। ফেসবুক খুললেই দেখা যায়- লোকজন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন- অবশেষে 'করোনা পজেটিভ' আমার জন্য দোয়া করবেন। ভাবা যায়- সুস্থ সবল মানুষ, করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মরে যাচ্ছেন! এই মৃত্যু সহ্য করা যায়? প্রথম প্রথম বয়স্ক লোকেরা মারা যেত। এখন ৩০/৩৫ বছরের যুবকরা মারা যাচ্ছে!
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০২১ বিকাল ৩:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


