
ছবিঃ আমার তোলা।
আজ ১ অক্টোবর।
বাংলা আশ্বিন মাসের ১৬ তারিখ। আর আরবী সফর মাসের ২৩ তারিখ। এই অক্টোবর মাসেই আমার জন্ম। আমি যদি জন্ম না নিতাম তাহলে কি হতো? কিছুই হতো না। আমার বরাদ্দ অক্সিজেনটুকু অন্য কেউ নিয়ে নিতো। পৃথিবীতে আসার সময় আমি খালি হাতে এসেছি। এখন আমার অনেক কিছু আছে। ল্যাপটপ আছে, মোবাইল আছে, বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, কিছু জমিজমা আছে, এমন কি ব্যাংকে সামান্য টাকাও আছে। আত্মীয় স্বজন আছে, বন্ধুবান্ধব আছে। শত্রু আছে। স্ত্রী আছে, কন্যা আছে।
অনেক কিছুই আমার আছে।
আবার অনেক কিছুই নাই। আমার বাবা নাই। গত বছর ডিসেম্বরে বাবা করোনায় মারা গেছে। এই পৃথিবীতে একজন ছিলো- যাকে দেখলে আমি সাহস পেতাম, ভরসা পেতাম। এবং আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম আমার বিপদে অন্তত এই একজন মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়বে। আব্বাকে গ্রামে কবর দেওয়া হয়েছে। অনেকদিন গ্রামে যাই না। অথচ আমাদের গ্রাম ঢাকার খুব কাছে। পোস্তঘোলা ব্রিজ অথবা বাবু বাজার ব্রিজ থেকে মাত্র এক ঘন্টা সময় লাগে। আগামীকাল শুক্রবার। গ্রামে কি যাবো?
আব্বা মারা যাওয়ার পর অনেক কিছু বদলে গেছে।
আগে আমাদের আত্মীয়স্বজনরা খুব একটা আমাদের বাসায় আসতেন না। এখন সবাই নিয়মিত আমাদের বাসায় আসেন। সবচেয়ে বেশি আসেন আমার দুই চাচা। তাঁরা এসে রাতে আমাদের সাথে ডিনার করেন। দুই চাচা বলেন, তোমাদের বাসায় খেয়ে আরাম পাই। সুরভির হাতের রান্না অসাধারণ। এরকম ভালো রান্না খেতেই তোমাদের বাসায় বার বার আসতে ইচ্ছা করে। আমাদের বউরা এরকম ভালো রান্না করতে পারে না। পোড়া কপাল আমাদের। বাসায় ভালো মন্দ রান্না হলে আমিই চাচাদের ফোন দিয়ে ডেকে আনি।
আমার মুখের ভাষা অনেক সুন্দর।
আমি কখনও কাউকে গালি দেই না। তবে ইদানিং আমার মুখে অটোমেটিক গালি চলে আসে। যেমন ধরুন, রাস্তায় ভয়াবহ জ্যাম। সাথে ভয়ানক রোদ। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কিন্তু আরামে হাঁটতে পারছি না। একদল লোক ফুটপাতে বাইক উঠিয়ে দিয়েছে। তাদের খুব তাড়া। তাঁরা ক্রমাগত হর্ন দিয়েই যাচ্ছে। তখন আপনাতেই আমার মুখে গালি চলে আসে। ফুটপাতে হাঁটার জায়গা নেই, অথচ ফুটপাত দখল করে দোকান বসিয়েছে। তখন আমার মুখে আপনাতেই গালি চলে আসে। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারি না।
দুই বছর ধরে আমার মধ্যে একটা জ্যোতিষী ভাব এসেছে।
মানুষ দেখলেই আমি গভীর ভাবে তাকে দেখার চেষ্টা করি। বুঝার চেষ্টা করি। এবং আমি অতি অল্প সময়ে একটা সারমর্মে চলে আসি। আমার ধারনা সঠিক কিনা তা আমি জানি না। এমন কি আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি আজ বা আগামীকাল ঠিক কখন বৃষ্টি হবে। যেমন গত পরশু সকাল ৮ টায় আকাশের দিকে তাকালাম। চারিদিকে ঝলমলে রোদ। কিন্তু আমার মনে হলো আজ ঠিক বিকেল ৫ টায় আকাশ কালো করে ঝুম বৃষ্টি নামবে।
সত্যি সত্যি বিকেল পাঁচ টায় ঝুম বৃষ্টি নেমে গেলো। তখন আমি মতিঝিল। দৌড়ে রাস্তার পাশে এক চায়ের দোকানে আমি আশ্রয় নিলাম। লোকজন বলাবলি করছে, সারাটা দিন কড়া রোদ গেলো। আর এখন হুট করে বৃষ্টি শুরু হলো। আজিব! একজন বলল, বৃষ্টি আল্লাহর রহমত। আল্লাহর লীলাখেলা মানুষের পক্ষে বুঝা সম্ভব না। তখন অন্য একজন বললেন, আল্লাহর রহমতেরর পানি দিয়ে এখন ঢাকা শহরে গজব নামবে।
বাস্তবতার কাছে পৃথিবীটা বড্ড অসহায়ত্ব দেখায়। চারপাশের মানুষগুলো একটু মানবিক হলেই পৃথিবীটা সুন্দর হতো। জীবন মানেই দ্বন্দ্বের সমন্বয়। এটা শিখতে আমাকে বই পড়তে হয়নি। ইচ্ছা করছে কাউকে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাই। এত রাতে কাকে শোনাবো কবিতা?কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। মানুষের মতন চেহারার মধ্যে জানোয়ারের সংখ্যা খুবই বেশি- এই সমাজে। যার দুঃখবোধ আছে, পৃথিবীর তাবৎ দুঃখ তাকেই চুম্বকের মতন নিয়ত আকর্ষণ করে। নিজের দুঃখ তো বটেই, পরের দুঃখও।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০২১ রাত ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



