
আমার জীবনে আমি কিছুই করতে পারিনি।
যা যা করা হয়নি, তার তালিকা করলে, তালিকা লম্বা হতেই থাকবে। রাস্তায় প্রায় দেখা যায়, কিছু লোকজন ফুটপাতে দাড়িয়ে প্রস্রাব করছে। এই কাজটি আমি কোনোদিন করতে পারিনি। অনেককে দেখি রাস্তায় মেয়ে দেখলেই কুৎসিত ভাবে তাকিয়ে থাকে। আমি রাস্তায় কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি না। কেন জানি ইচ্ছাই হয় না। সমরেশ মজুমদারের একটা লেখায় পড়েছিলাম, পুরুষ মানুষ চিতায় উঠেও যায় একবার চোখ মেলার সুযোগ পায়, তবুও সেটা মেলবে মেয়েদের দিকে। একদিন হুট করে মরে যাবো, কত শত আফসোস থেকে যাবে। দরিদ্ররা আফসোস কম করে, ধনীরা আফসোস বেশি করে। অবশ্য আমার কোনো আফসোস নেই!
লোকাল বাসে আমি কখনো ঝগড়া করতে পারি নাই।
একবার কাওরানবাজার থেকে বাসে উঠেছি। মিরপুর দশ যাবো। ভাড়া দিলাম বিশ টাকা। কিন্তু কন্টাকটর শ্যাওড়াপাড়া গিয়ে আমার কাছে আবার ভাড়া চাইছে! বললাম, ভাড়া তো দিয়েছি। কন্টাকটর তার হলুদ দাত বের করে বলল, ১৮ বছর ধরে কন্টাকটরগিরি করি। লোক দেখলেই বুঝতে পারি, কে ভাড়া দেয়, আর কে ভাড়া মেরে খায়। আপনি ভাড়া দেন নাই। আমি বিরাট লজ্জায় পড়লাম। হারামজাদা কয় কি! এদিকে বাসের লোকজন আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। এখন আমি কি করবো? লজ্জায় আমি শেষ। অথচ আমি ভাড়া দিয়েছি। নতুন একটা বিশ টাকার নোট দিয়েছি। শেষে কন্টাকটরকে আবার ভাড়া দিলাম। কন্টাকটর বিজয়ের একটা হাসি দিলো।
রাত প্রায় ১২ টা!
মৎসভবন থেকে হেটে হেটে প্রেসক্লাবের দিকে যাচ্ছিলাম। কোনো রিকশা নেই। রাস্তাঘাট বেশ নিরিবিলি। আশ্বিন মাসের রাত। যে কোনো সময় হুট করে বৃষ্টি নেমে যেতে পারে। ঠান্ডা বাতাস বইছে! আকাশের চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। বিশাল এক মেঘ খন্ড চাঁদটাকে ঢেকে দিয়েছে। এক ভিক্ষুক ফুটপাতে শোয়ার ব্যবস্থা করছে, আমাকে দেখেই ভিক্ষা চাইল। আমি ভিক্ষুকের দিকে ফিরেও তাকালাম না। মনে মনে বললাম, সারাদিন অনেক হাটাহাটি করেছেন, এখন বিশ্রাম নিন। কিছু ভিক্ষুক আছে, দেখলেই বিরক্ত লাগে। ভিক্ষা দিতে ইচ্ছে করে না। বোকা ভিক্ষুক। ধনী এক মহিলাকে বিয়ে করলে তো আর ভিক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না। একটু বুদ্ধি না থাকলে, বেচে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়।
যাইহোক, প্রেসক্লাবের সামনে আসতেই একটা মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো।
দেখেই বুঝা যাচ্ছে, দরিদ্র একটা মেয়ে। জামা কাপড়ে স্পষ্ট দারিদ্রতার ছাপ। সস্তার মেকাপ চোখে মুখে। কিন্তু মেয়েটাকে দেখে ভালো লাগছে। মেয়েটার চোখে মুখে কোথাও একটা সরলতা আছে! চারপাশে জটিল কুটিল মানুষ। জটিল কুটিলের ভিড়ে একআধজন সহজ সরল মানুষ দেখলে ভালো লাগে। একবার আমি এক সহজ সরল মানুষ পেয়েছিলাম। সেই মানুষ টা আমায় বলেছিল, বাবু একটু পানি দাও চিড়া ভিজিয়ে খাবো। আবার আমায় ভিক্ষুক ভেবো না। আমি শহরে আসছি, আমার ভাইকে খুজতে। আমি লোকটাকে ভালো করে দেখলাম। আলাভোলা টাইপ মানুষ। লোকটার হাতে শুধু পানি আছে, চিড়া নেই। লোকটা চাইবে চিড়া। অথচ লোকটা ভুল করে বলছে, বাবু একটু পানি দাও, চিড়া ভিজিয়ে খাবো।
গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে! অনেক রাত!
প্রেসক্লাবের সামনে মেয়েটা বলল, তার সাথে কিছুক্ষন সময় কাটাতে। বিনিময়ে অল্প কিছু টাকা দিলেই হবে। আমি মানা করে দিলাম। যদিও আমার খুব ইচ্ছে করছিল, এই বৃষ্টির রাতে মেয়েটির সাথে কিছু আনন্দময় সময় কাটাই। কি হবে যদি কিছু ঘটে, ঘটুক! ব্যস্ততা এবং লজ্জায় মেয়েটার সাথে সময় কাটাতে পারলাম না। আমৃত্যু এই আফসোস আমার থেকে যাবে। বাসায় ফেরার পর মনে হলো, বৃষ্টির রাতে মেয়েটা এখন কি করছে! কার বুকে মাথা রেখেছে! আমার উচিৎ ছিলো মেয়েটার হাতে কিছু টাকা গুজে দেওয়া। বেচারি! আশা করে এসেছিল আমার কাছে! দরকারি কাজ গুলো কখনোই করা হয় না! ধরে নিলাম, মেয়েটির নাম সুরঞ্জনা! সুরঞ্জনা ভালো থেকো, আমি তোমাকে ভুলিনি। যদি আবার তোমার সাথে দেখা হয়, এবার সত্যি সত্যি সাহস সঞ্চয় করে তোমার সাথে সময় কাটাবো। কথা দিলাম। আমি কথা দিলাম।
গ্রামের নাম রসূলপুর। একদম সুন্দরবন ঘেষে এই গ্রাম!
নিরিবিলিতে সময় কাটানোর জন্য গ্রামে এসেছি। আর মন ভরে প্রকৃতির ছবি তুলবো। এখানে এসে পরিচয় হয় চাঁদনী নামে একটা মেয়ের সাথে। চাঁদনী সহজ সরল গ্রামের মেয়ে! মেয়েটা আমাকে ভালোবেসে ফেলে। আমি ঢাকা ফিরে আসার সময়, সে আমায় জড়িয়ে ধরে কি কান্না! সে আমাকে বিয়ে করবে। আমি বিয়ে না করলে মরে যাবে। কি বিপদে পড়লাম! চাঁদনী মেয়েটার সাথে আমার পরিচয় তিন দিনের। সে তিন দিন আমার সাথে ছিলো। আমি ছবি তুলেছি, মেয়েটা আমার সাথে ঘুরঘুর করেছে। শুধু বাংলা সিনেমার মতো একটা ঘটনা ঘটেছে। একদিন হুট করে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছে। বজ্রপাত হয়েছে, তখন মেয়েটা ভয় পেয়ে আমায় জড়িয়ে ধরেছে। এই মেয়ে একদিন বাসায় এসে হাজির! মাকে বলে, আপনার ছেলেকে বিয়ে করতে চাই। আমার মা মেয়ের কথা শুনে হাসে!
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




