somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হিপোক্রেটিস ও তাঁর শপথ:

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ বিকাল ৫:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হিপোক্রেটিস ও তাঁর শপথ:

হিপোক্রেটিস (প্রাচীন গ্রিক Ἱπποκράτης হিপ্পোক্রাত্যাস্ খ্রীষ্টপূর্ব ৪৬০ - খ্রীষ্টপূর্ব ৩৭০) প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাবিদ। তিনি পেরিক্লেসের সময়কালীন একজন প্রাজ্ঞ। তিনিই প্রথম রোগীদেরকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসা করেন। তার সময়কালে গ্রিসের সাধারণ লোকেরা বিশ্বাস করত রোগ দেবতাদের অভিশাপ বা অপদেবতাদের কারনে হয়। কিন্তু তিনি জোর গলায় বলেন রোগ প্রাকৃতিক ঘটনার অঙ্গ আর প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলে। আর তাই হিপক্রেটিসকে বলা হয় পাশ্চাত্য 'চিকিৎসাবিদ্যার জনক'। চিকিৎসাক্ষেত্রে হিপক্রেটিসের একটি অবদান হল পথ্য নির্দেশে নিয়ম শৃঙ্খলা। তিনি বলেছেন যে পথ্য নির্দেশে রোগীর বয়স, রোগীর স্বাস্থ্য এবং ঋতুর কথা বিবেচনা করতে হবে। তার জ্ঞানের ভিত্তিতে চিকিৎসাশাস্ত্রকে পৃথক ডিসিপ্লিন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা ইতিপূর্বে অলৌকিকতা ও দর্শনের অন্তর্গত করে রাখা হয়েছিলো। ধারণা করা হয়, হিপোক্রেটিস খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ সালে গ্রিসের 'কস' নামে এক ছোট দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নব্বই বছর বেঁচেছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি সম্ভবত মিশর সফর করেছিলেন, যেখানে তাঁর পরিচয় ঘটে মিসরীয় চিকিৎসাপদ্ধতির সাথে। তারপর তিনি গড়ে তোলেন তার নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি। তিনি পরবর্তীতে যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই তার চিকিৎসা পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। হিপক্রেটিসের রচনার মধ্যে অনেকগুলো ছোট বাক্য 'হিপোক্রেটিসের বচন' হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে। যেমনঃ

"জীবন সংক্ষিপ্ত কিন্ত কলা দীর্ঘস্থায়ী।"
"একজনের জন্য যা অমৃত অন্যের জন্য তাই বিষ।"
"যারা স্বভাবত মেদবহুল তারা ক্ষীনদেহী ব্যাক্তির চেয়ে স্বল্পায়ু হতে পারে।"
"শীতকালে গ্রীষ্মের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন হয়।"
"ক্ষীনদেহ ব্যাক্তিদের খাদ্যের প্রয়োজন কম, কিন্তু তা স্নেহজাতীয় হওয়া চাই। মেদবহুল ব্যাক্তির খাদ্যের প্রয়োজন বেশি, কিন্তু তাতে স্নেহবস্তু কম থাকা ভাল।"

এই হিপোক্রেটিসের নামেই রয়েছে 'হিপোক্রেটিসের শপথ' যা পৃথিবীর সব চিকিৎসকরাই নিয়ে থাকেন।

হিপোক্রেটিসের শপথনামা (Hippocratic Oath)
(একজন চিকিৎসকের কর্তব্য কর্ম):

একজন চিকিৎসকের জীবনের উদ্দেশ্য, দায়িত্ব, কর্তব্য, নৈতিক আইন বা আদর্শ ও সঠিক আচার-ব্যবহার কেমন হতে হবে, এ বিষয়ে তিনি চিকিৎসক সমাজের জন্যে একটা শপথনামা প্রণয়ন করেন। এটা চিকিৎসা জগতে বিশ্ববিখ্যাত 'হিপোক্রেটিসের শপথনামা(Hippocratic Oath)' নামে পরিচিত। প্রায় দু' হাজার বছর ধরে এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে পরিচালিত করেছে। এটা আদিমকাল থেকে আজ পর্যন্ত চিকিৎসা বিদ্যা বিষয়ক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলের ডিগ্রীপ্রাপ্তি অনুষ্ঠানে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে উচ্চারিত ও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এ শপথনামার নয়টা অনুচ্ছেদে যা বলা হয়েছে তা নিম্নরূপ--------
(১) আমি নিরাময়কারী অ্যাপোলোর নামে, স্বাস্থ্যের নামে ও আরোগ্যকারী সকল ক্ষমতার নামে শপথ করছি। সকল দেব-দেবীকে সাক্ষী রেখে শপথ করছি যে, আমি এ শপথ ও প্রতিজ্ঞাবানী আমার সকল সামর্থ্য ও বিচারক্ষমতা প্রয়োগ করে রক্ষা করতে প্রয়াস পাব।
(২) আমি আমার শাস্ত্রের শিক্ষককে (গুরুকে) সব ধরনের সম্মান প্রদর্শন করব, যেমন আমার পিতামাতাকে করে থাকি। আমি আমার জীবনকে তাঁর সাথে ভাগ করে নেব এবং তাঁর সব দেনা শোধ করব। আমি তাঁর সন্তানদেরকে আমার ভাই বলে মনে করব এবং যদি তাঁরা ইচ্ছা করেন, তাদেরকে বিনা পারিশ্রমিকে এ শাস্ত্র শিক্ষা দেব। আমি আমার গুরুর কাছে যে সব বিধান, বক্তৃতা ও অন্যান্য শিক্ষা লাভ করেছি, তা সব আমার পুত্রদেরকে দান করব। আর দান করব গুরুর পুত্রদেরকে, আর যারা যথাযথভাবে শিক্ষানবিশি গ্রহন করবে ও শপথ করবে তাদেরকে। এছাড়া আমি আর কাউকে তা দান করব না।
(৩) আমি আমার সামর্থ্য ও বিচার ক্ষমতার সব শক্তি রোগীদের সাহায্য করার ব্যাপারে প্রয়োগ করব। আমি আমার জ্ঞান প্রয়োগ করে কারও কোন ক্ষতিসাধন করব না।
(৪) কেউ চাইলেও আমি কাউকে প্রাণনাশক ওষুধ দেব না। আমি ও ধরনের কোন সংবাদ পরিবেশন করব না। আমি কোন মহিলাকে গর্ভপাত করানোর উপায় জানাব না।
(৫) আমি আমার জীবনে ও পেশায় চরিত্রবান ও ধর্মপরায়ণ হব।
(৬) আমি আমার শাস্ত্রের বাইরে অন্য কোন পেশা থেকে বিরত থাকব।
(৭) আমি যখন কোন বাড়িতে যাব, তখন কেবলমাত্র কোন রোগীকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাব এবং কখনই কারও কোন ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে যাব না। আমি আমার সুযোগ-সুবিধাকে নারী বা পুরুষ কারও সাথেই যৌন-সংযোগ ঘটানোর কাজে ব্যবহার করব না, হোক সে ব্যক্তি স্বাধীন কিংবা ক্রীতদাস।
(৮) আমি পেশাগত বা ব্যক্তিগতভাবে যাই দেখি বা শুনি না কেন, উক্ত বিষয় প্রকাশ করব না; আমি উহার সব গোপন রাখব এবং কাউকে জানাব না।
(৯) আমি যদি এ শপথবাণী মেনে চলি এবং এর ব্যতিক্রম ঘটতে না দেই, তবে আমি আশা করব, আমি জীবনে ও পেশায় যেন উন্নতি লাভ করি এবং সবকালের সবার মধ্যে সুনাম অর্জন করতে পারি। আমি যদি এ শপথ না মানি ও লংঘন করি, তবে আমার পরিণাম যেন অন্য রকম হয়।

উল্লেখ্য যে একদল পন্ডিত ধারনা করেন হিপোক্রেটিসের এই শপথ হিপোক্রেটিস নিজেই অথবা তাঁর কোন শিষ্য লিখেছেন, আবার আরেকদল পন্ডিত মনে করেন যে, হিপোক্রেটিসের জন্মের বহু আগেই পিথাগোরিয়ানরাই এই শপথবাক্য লেখেন এবং হিপোক্রেটিসের জন্মের আগে থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের শপথ বাক্য পাঠ করানোর নিয়ম প্রচলিত ছিল। এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৪৮ সালে হিপোক্রেটিসের শপথনামা অবলম্বনে চিকিৎসকদের একটা বিশ্বব্যাপী শপথনামা তৈরি করা হয়। এ নতুন World Medical Association (WMA) কর্তৃক তৈরী এই শপথনামার নাম 'জেনেভা ঘোষণা' (Declaration of Geneva)।

তথ্যসূত্রঃ
উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন আর্টিকেল।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দরজা ভাঙ্গে যে রাষ্ট্র।। দ্বীপ সরকার

লিখেছেন দ্বীপ ১৭৯২, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪০



দরজা ভাঙ্গে যে রাষ্ট্র

একদা এক রাতে-
রাষ্ট্র, কড়া নাড়তে নাড়তে দরজা ভেঙ্গে
ঢুকে পড়লো
আমি নিথর,নিস্তব্ধ এক জনগণ
বললাম,আমি ভয় পাচ্ছি
রাষ্ট্র হাসতে হাসতে ভাঙ্গা দরজা দিয়ে
এক পা দুই পা করে,লোকালয়ে মিশে গেলো

রাষ্ট্র কি ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×