somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পিতার গল্প (ছোট গল্প)

১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৩:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।
মাঝে ঘুরতে যাওয়ার সখ আমার। আর তাই একা একাই কোথাও না কোথাও যাই। একা একা যাওয়াটা আমার ভালো লাগে। নিজের ইচ্ছামতো ঘোরা হয়। কোনরকম খেয়াল খুশি বা অন্যের চাহিদা থাকেনা। এরকমই গিয়েছিলাম ঢাকার একটু অদূরে। নিতান্ত গ্রাম বলা চলে। ছোট একটা ব্যাগ গুছিয়েই কাঁধে ঝুলিয়ে চলে গেলাম। মাঝে মাঝে এরকমই হঠাৎ ঘুরতে যাওয়ার বাতিক আছে আমার। বাসে প্রায় ঘণ্টা খানেকের পথ। যেখানে যাচ্ছি সেখানকার নাম এই গল্পে মুখ্য বিসয় না। গিয়ে নামলাম যে বাসস্ট্যান্ডে তা অনেকটা ব্যাস্ত একটা জায়গা।বেলা প্রায় তখন ১২ টা ছুঁই ছুঁই। তবে নামার পর কিছুক্ষণ থাকার হোটেল খুঁজতে বোঝা গেল, নিতান্ত একটা মফস্বল এলাকা। আড়াআড়ি ভাবে দুই রাস্তার দুই পাশেই দোকানপাট আর ছোটখাটো কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়েই গড়ে উঠেছে এই মফস্বল এলাকা। পেয়ে গেলাম একটা ছোটখাটো আবাসিক হোটেল। ব্যবস্থা যা, তাতে আমার দিব্যি চলে যাবে। আমার এটা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। কারন এসব নিয়ে ভাবতে গেলে ঘুরতে যাওয়া যায়না। দুপুরের গোসল আর খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বিশ্রামের পর ঘুরবো বলে ঠিক করলাম। হাতে থাকা ক্যামেরা টা নিয়ে বিকেলে একটু বের হয়ে একটু গ্রামের দিকে এগুতে থাকলাম। কতশত নতুন কিছু যে চোখে পড়লো তা বলা যাবেনা। মজা লাগে এলাকার ভাষা শুনে। হুমায়ূন আজাদের বইতে পড়েছিলাম, প্রতি ১০ কিলোমিটার অন্তর অন্তর মানুষের মুখের ভাষায় পার্থক্য দেখা যায়। আসলেই তাই। অনেক শব্দই কখনও শুনিনি। আর তাই আনন্দ টা একটু বেড়ে গেল। গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষ কৃষির সাথে জড়িত। বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষক। এ আর নতুন কি! ছোট খাটো একটা টং দোকান চোখে পরতেই চা খাওয়ার জন্য আমার হা হুতাশ বেড়ে গেল। চায়ের অর্ডার করতেই চোখে পড়লো, দুই একজন আমার দিকে তাকাচ্ছে। এলাকায় নতুন দেখেছে কিনা তাই। একজন তো জিজ্ঞাসা করে বসলো “ভাই জান কি এই এলাকায় বেড়াইতে আইছেন?” “জী” জবাব দিতেই আবারও জিজ্ঞাসা করলো, “কোন বাড়ি আইছেন?” । “কোন বাড়ি আসি নাই। আমার ঘুরে বেড়ানোর শখ তাই মাঝে মাঝে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই।” “ও আইচ্ছা”। চা খাওয়া শেষে আবারও উঠলাম হাঁটতে। কোথায় যাচ্ছি জানিনা। না জেনে ঘুরতে যাওয়ার রহস্য টা আমার বেশ ভালো লাগে। সন্ধ্যা হয়ে আসতেই সেদিনের মত ঘোরা শেষ করে আবার চলে আসলাম। গ্রামের মানুষ বেশ সহজ সরল। তবে গরল যে নেই তা না, তবে শহরের মানুষের গরলতার কাছে তা নস্যি।
২।
এভাবে ২ দিন কেটে গেল । শেষ দিন আবারও বের হলাম। রাতের বেলা ঢাকা ফিরব, তাই বিকেলে আবার একটু বের হলাম। মাঝে মাঝে ডায়রিতে টুকটাক লিখে নিচ্ছিলাম আর মাঝে মাঝে দুই একটা ছবি তুলে আবার হাটা আর দেখা। এইদিন কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই আবার সেই লোকটার সাথে দেখা হল।
“ভাইজান, ভালো আছেন?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
“জী, আপনি ভালো আছেন তো ?”
“আলহামদুলিল্লাহ্‌, তা আপনে আইজকা কই যাইবেন? ”।
“তা তো জানিনা, তবে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরবো, এই আর কি। ও হ্যা আপনার নাম জানা হলনা, এখনও। কি নাম আপনার ?”
“আব্দুস সালাম।”
“আমি সোহেল। এটা ডাকনাম ।” আমি নিজেই আগে বললাম।
এভাবে টুকটাক আলাপ হতে থাকল দুজনের মধ্যে। এলাকার মানুষের প্রকৃতি, কাজ, উল্লেখযোগ্য স্থান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল আমাদের মাঝে। এক পর্যায়ে তিনি বললেন “ভাইজান, চলেন। এক জায়গায়। ”
“কোথায়?” জিজ্ঞাসা করলাম, তবে মনে মনে একটু ভয় পেলাম।
“আইজকা স্কুলের সামনে একখান সালিশ আছে।আমাদের এক ভাইয়ের। আনন্দ পাইবেন। ”
(বিচার সালিশে আনন্দের কি আছে জানিনা, তবে এটুকু বুঝি কারও ঘর পোড়ে, আর কেউ আলু পোড়ে।)
“নাহ, এসব বিচার সালিশ দেখার ইচ্ছা নাই। তাছাড়া এরকম জায়গায় কোন আগন্তুক যাওয়া টা ঠিক না” জবাব দিলাম।
“আসেন তো। কোন সমস্যা নাই। আফনে আমার সাথেই তো যাইবেন। আমার একটু দুরের আত্মীয় হয়। সমস্যা নাই। তাছাড়া এইডা কোন চুরি গুণ্ডামির সালিশ না। একটু অন্যরকম। কেউই ঠিক মত পুরা ব্যাপার জানেনা। তাছাড়া যার বিরুদ্ধে এই সালিশ, সে আমাগো এই এলাকার একজন ভালো লোক। কি এমন হইল যে, একেবারে সালিশ দরবার হইতাছে তাই দেখতে যাইতাছি। আফনেও চলেন। আর ঘুরতে আইছেন কিছু না কিছু তো দেখা হইল”। আন্তরিকতার অভাব ছিলনা, তাঁর কথায়। তবে অচেনা আগন্তুক, আর মনে একটু ভয় থাকাতে সাহস হচ্ছিল না। ভেবে দেখলাম যাওয়াটা ঠিক হবেনা, কিন্তু তাঁর এভাবে বলাতে আর হাতে কিছু সময় থাকাতে গেলাম তাঁর সাথে। বেশীক্ষণ হাঁটতে হলনা। ১০ মিনিট হাঁটার পরেই চলে আসলাম একটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে। আশে পাশে ঘুরে ফিরে দেখে আর তাঁর সাথে টুকটাক কথা বলাতে আরেকটু ফ্রি হয়ে গেলাম। সন্ধ্যার পরেই সালিশ শুরু হবে।
যথা সময়ে শুরু হতেই, মুরুব্বীমতন কয়েকজন আর কিছু লোক এলো সেখানে। এতক্ষণে যার সালিশ হবে তাকে দেখলাম। এক যুবক । বয়স আনুমানিক ৩০/৩২ হবে। বেশ সুদর্শন।
“বাপ-ব্যাটার সালিশ” সালাম বললেন।
“অতি সাধারন ব্যপার। এরকম তো অনেক শুনি”
“এইটা ভিন্ন।একটু পরেই বুঝবেন. ”
এভাবে আলাপ চারিতায় আর আশে পাশের লোকের মুখে একটু শুনে যা বুঝলাম, তা হল এই , এটা এক ধরনের মীমাংসা। লোকটির বাবা আব্দুল রব তালুকদার সরকারী স্কুলে চাকরি করতেন। এখন রিটায়ার্ড । দুই ছেলে, দুই মেয়ে তাঁর। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। এলাকায় বেশ কিছু জমিজমা থাকলেও এসব নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। খুবই ভালো লোক হিসেবে সবার সম্মানীত। মেয়েদের ভালো ছেলের কাছে পাত্রস্থ করেছেন। বড় ছেলে মাসুদ বিয়ে করেছে। ছেলে মেয়ে সবাই মোটামুটি শিক্ষিত। তবে বড় ছেলে নিজেদের জমিজমা দেখাশোনা করেন। আর ছোট ছেলে, জাভেদ শহরে চাকরি করছে। বিয়ে করাবে বলে, মেয়ে খুজছেন আব্দুর রব। তবে জাভেদ কিছুতেই বিয়ে করতে চাইছে না। এদিকে তিনি ইচ্ছা করেছেন হজ্জ করার আগে, ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেবেন আর সম্পত্তি ভাগ করে দেবেন। কিন্তু জাভেদ যেহেতু করতে চাইছে না, তাই আপাতত হজ্জ সেরে এসে ছেলে বিয়ে করাবেন। আর তাই হজ্জে যাওয়ার আগে সম্পত্তি ছেলেমেয়েদের নামে দিয়ে যেতে চান। কিন্তু ছোট ছেলে জাভেদ কিছুতেই সম্পত্তি নিতে চাইছে না। বাবা বোঝাচ্ছেন, তিনি রাগ করে নয়, বরং নিজ ইচ্ছা থেকেই করছেন। কিন্তু জাভেদের সাফ কথা সে নেবেনা। কিন্তু বাবা দেবেনই, তাই বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হবার পরেই আশে পাশের মুরুব্বি, আর কিছু আত্মীয় নিয়ে বসেছেন এই সমাধান করতে। যেহেতু তাদের বাড়ির সাম্নেই স্কুল, তাই সবাই এখানে বসেই মীমাংসা করতে রাজি হলেন।
৩০ জনের মত লোক উপস্থিত হয়েছে হয়তো। আমিই অচেনা আগন্তুক সেখানে আর তাই একটু সংকোচ লাগছিল।
একটু পরেই সবচেয়ে প্রবীণজন সবাইকে চুপ করতে বললেন আর ডাকলেন “ জাভেদ, কেমন আছো ?”
“জী কাকা, ভালো। আপনি ভালো তো? ”
“আমি তো আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালই আছি, কিন্তু তোমার বাবার কাছ থেকে কথা শুনে বেশ খারাপ লাগছে।তাকে এই বয়সে আর এই কষ্ট টুকু না দিলেও পারতে?”
“জী, কাকা। তবে আমার কিছু করার নেই। আমি এই জমি নিতে পারবো না।”
কথা শুনে বেশ মার্জিত মনে হল জাভেদকে। তবে পাশ থেকে সালাম আমাকে ফিস্ফিসিয়ে বলছে “কেমন বলদ দেখছেন? পড়াশোনা কইরা কি মানুষ এই রকম বলদ হয়? ”। আমি চুপ থাকতে ইশারা দিলাম।
“কেন নিবানা? জাভেদ। আইজ হউক আর কাইল হউক এই সম্পত্তি তো তমাদেরই। তোমার বাবার কথা শুনলে তো আমি কোন সমস্যা দেখছি না। ”
“” আমি নিতে পারবো না কাকা।”
এমন সময় একপাশ থেকে জাভেদের বড় ভাই জোরে জোরে বলল, “কাকা, জাভেদ চাইলে সব সম্পত্তি নিতে পারে। আমরা ভাই বোন কেউ চাইনা। ”
“আমি কি তা বলেছি কখনও? আমি ঐ জমির এক কণাও নেবনা। তাছাড়া আমি তো চাকরি করি।” ভাই কে বলল জাভেদ।
“কিন্তু তোমার বাবা হজ্জে যাওয়ার আগে, এই ইচ্ছা টুকু করছেন, তা মানা উচিৎ বলে আমি মনে করি। তাছাড়া শুধু দলিল কইরা তোমার বাবাকে একটু সান্তনা দিলেই তো হয়। জমি না হয় পরে না নিলা” মুরুব্বি বললেন আবার।
“আমি পারবো না। তাছাড়া কাকা, যা পরে করবো তা আগে করলেই তো ভালো। আর যে জমি আমি নেবনা তা দলিল করলেই কি আর না করলেই কি” জাভেদের উত্তর। এর প্রতিউত্তর জানা নেই তাঁর।
।“কেন নিবানা ? ” জানতে চাইলেন বাবা ।
চুপ জাভেদ। এই একটা কথার কোন জবাব জাভেদ এই পর্যন্ত দেয়নি। আর এটা নিয়ে বাবা ছেলের সমস্যা। সবাই একে একে এই একটি কথাই জিজ্ঞাসা করছে, কিন্তু জাভেদ এখানেই চুপ।
“জীবনে কোনদিন কারও ক্ষতি করিনি। কেউ আমার নামে একটা বাজে কথা বলতে পারিনি। আর এই আমিই এই বয়সে এতো মানুষের সামনে এরকম অপদস্থ হবো বুঝি নাই” বলেই আব্দুর রব তালুকদার কান্নায় ভেঙ্গে পরলেন। জাভেদের ভাই বাবাকে ধরে রেখেছে। জাভেদ তবুও নির্বিকার। এভাবে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে, বলল “বাবা, আমাকে কাফ করেন। আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাইনি। তবে আমি এখন যা বলব, তাতে আরও বেশি কষ্ট পেতে পারেন। তাই আগেই মাফ চেয়ে নিচ্ছি।” বলে আবার একটু চুপ হয়ে গেল জাভেদ। কিছুক্ষণ পরে জোরে নিশ্বাস ফেলে বলে শুরু করলো জাভেদ...।।
“আমি তখন সবে মাত্র অনার্সে ভর্তি হয়েছি। বেশ ভালই কাটছিল। নতুন পরিবেশে বন্ধু, ক্লাস, পরীক্ষা সব কিছু নিয়ে খুব ভালভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বাড়ি আসতাম। ছোট ছেলে বলে বাবা-মা, ভাই বোনদের আদর একটু বেশি পেয়েছি। বাবা প্রতিমাসেই হাতখরচ বাবদ যে টাকা পাঠাতো তাতে হাতে টাকা জমতো না ঠিকই তবে ভালভাবেই চলে যেত। টাকা জমাতে পারতাম না, আমি চাইতামও না। দরকার কি? চাকরি শুরু করলেই হয়ে যাবে। এভাবেই দিন চলে যেত। দেখতে দেখতে ফার্স্ট ইয়ার শেষ। সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝিতে কলেজে ভর্তি শুরু হয়। বরাবরের মত ভর্তি শেষ হল। আমার তেমন আগ্রহ থাকতো না এসব নিয়ে। এভাবে স্যারের কাছে কচিং শেষে একদিন কলেজে ক্লাস করতে গিয়ে দেখি ক্লাস হবেনা। তাই বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ফিরছিলাম। এমন সময় গেটের কাছে আসতেই দেখলাম, একটি মেয়ে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেল। দৌরে গিয়ে তাকে ধরলাম। এর মধ্যে আরও কয়েকজন চলে আসলো। সবাই মিলে তাকে ধরাধরি করে একটা বেঞ্চে শুইয়ে রেখে, কেউ পানি আনতে গেল, কেউ বাতাস করছিল। কিছুক্ষণ পরে তার জ্ঞান যখন ফিরল। তখন তাকে ধরে বসিয়ে দিল কয়েকটি মেয়ে। তারপরে একটু ভালো বোধ করতেই সে উঠে সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাসায় চলে গেল।
এর কয়েকদিন পর, আবার দেখা হল তার সাথে। আমাকে চিনতে পারেনি। তবে সেদিনের কথা বলতেই কিছুটা আন্দাজ করে আমাকে আবারও ধন্যবাদ দিল। জানাল সে এখন সুস্থ। কোন বিভাগে পড়ে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম। আমাদের বিভাগেরই ছাত্রী। ফার্স্ট ইয়ার। নাম জানতে চাওয়াতে সে জানালো, তার নাম তাহেরা। এয়াভাবেই মাঝে মাঝে তার সাথে দেখা হত। এর বেশি কিছু জানতে চাইতাম না। সেও বলেনি তখনও। এক সময় ভালো লেগে গিয়েছিল তাকে। কিভাবে বলব, বুঝিনি। যতটুকু দেখেছি তার সরলতা আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছিল। অবশেষে একদিন সাহস করে তাকেই বলেই ফেললাম আমার মনের কথা। জবাবে সে কিছু বলেনি। চলে গিয়েছিল। আমিও লজ্জিত হলাম। ভাবলাম সে হয়তো ভেবেছে যে, তাকে একদিন একটু সাহায্য করেছি তাই তার দুর্বলতার সুযোগ নিলাম। কিন্তু আসলেই তাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। এসব ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরে গেলাম।
তার পরের দিন কলেজে গিয়ে তাকে খুঁজলাম। কিন্তু পেলাম না। হয়তো আমার কারনেই আসেনি। তার ফোন নাম্বারটাও ছিলনা আমার কাছে যে জিজ্ঞাসা করবো। খুব খারাপ লাগছিল। এভাবে দুই দিন পরে আবারও তাকে কলেজে দেখলাম। তবে সে কিছু বলেনি, শুধুমাত্র হাতে একটা ছোট কাগজ দিয়ে দ্রুত পায়ে চলে গিয়েছিল। আমিও কিছুটা আনন্দে আবার কিছুটা দ্বিধায় সেদিন তারাতারি বাসায় চলে এসেই কাগজের ভাঁজ খুললাম। এতো সুন্দর করে কেউ চিঠি লিখতে পারে জানা ছিলনা। চিঠিতে সে আমাকে জানিয়েছিল, আমাকেও তাঁর ভালো লেগেছে। কিন্তু একটা কথা বলতে সে দ্বিধা করেনি। আর তা হল, তাঁর বাবার পরিচয়। কলেজের উল্টা দিকে যে চায়ের দোকান টা ছিল, সেই দোকানদার তাঁর বাবা। তারা চার বোন। সে সবার বড়। এভাবে সব কিছুর বর্ণনা দিয়ে শেষে জানতে চেয়েছিল, তাকে আমি গ্রহণ করতে পারবো কিনা? কিন্তু সকল দ্বিধার ভেঙ্গে তাকে পাওয়ার জন্যই আমি ছিলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পরের দিন দেখা হতেই তাঁকে আমি মুখেই যা বলার বলে দিলাম। শুরু হল আবার নতুন করে চলা। দিনগুলি বেশ ভালো যাচ্ছিল এরপরে থার্ড ইয়ারের মাঝামাঝিতে। হঠাৎ একদিন সে জানালো তাঁর বাবা তাঁকে বিয়ে দেবার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। কেন জানতে চাইলে বলল, ওদের পাড়ার ছ্যাঁচড়া গুন্ডা টাইপের একজন তাঁকে বিয়ে করতে চায়। কয়েকবার হুমকি দিয়েছে। তাই ওর পরিবার তাঁকে বিয়ে দিতে চাইছিল। তাছাড়া ওর পরেও আরও তিন বোন ছিল। সেসব ভেবেই এই সিদ্ধান্ত। তাহেরা কে বললাম, আমি ওর বাবার সাথে কথা বলব। ও তখন বলল, ও নিজেই জানাবে। এর দুইদিন পরে। ওর সাথে আবার দেখা। ও আমাকে এসে বলল, গেটের কাছে ওর বাবা দারিয়ে আছে। আমার সাথে কথা বলতে চায়। আমি দ্রুত এগিয়ে গেলাম। তাঁকে তো আগে থেকেই চিনতাম। তাই আরও অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু কি আর করা। সালাম দিলাম যথারীতি। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, বাবা, আমরা খুবই গরীব তোমার কাছে মেয়ে দেবার ক্ষমতা আমার নাই। আমার এই মাইয়া, জীবনে মুখের ওপর কথা কয় নাই। যখন যা দিছি, তাই নিছে। যা খাওয়াইছি তাই খাইছে। এমন ঈদ গেছে ওরে একটা নতুন জামা পর্যন্ত দিতে পারি নাই। কিন্তু কোনদিন এই সব নিয়া ওর দুঃখ দেখি নাই। ওর চোখের পানি দেখা হয়নাই। এতটুকু বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপরে আবার বললেন, গত দুই দিন আগে এই মাইয়া কিছু খায় নাই। ওর মা, অনেক কষ্টে জানতে পারল ওর কি হইছে। বাবা, এখন বল, আমরা কি করতে পারি? আমার তো সেই সাধ্য নাই, যে মাইয়ার সুখের জন্য সব করতে পারি। এই বলে তিনি চুপ করে রইলেন। এরপর অনেক কষ্টে, তাঁকে শুধু বললাম, আমি ওকে বিয়ে করতে রাজী। কিন্তু তিনি আমাকে বারবার ভেবে দেখতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি ছিলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাড়িতে কাউকে বলতে সাহস পাই নাই। ভেবেছিলাম পড়াশোনা শেষ করে, চাকরি নিয়ে যেভাবেই হোক সবাইকে রাজী করাবো।। কয়েকদিন পরে খুবই সাদামাটা ভাবে বিয়ে করে ফেললাম। ”
সবাই একথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। চুপ হয়ে শুনছিল রুমভর্তি সবাই। বিস্ময়ে কেউ কথা বলতে পারছে না। শুধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল সবাই। জাভেদ আবারও বলা শুরু করলো “ বিয়ে করার পর দুই দিন ছিলাম ওদের বাসায়। তারপর মাঝে মাঝেই যেতাম ওদের বাসায়। আর ঐ পাতিগুন্ডা কেন যেন চুপ মেরে গিয়েছিল। এক সময় ভুল হোক আর না হোক, ও প্রেগন্যান্ট হয়ে গিয়েছিল। ওর শরীরের অবস্থা খুব বেশি ভালো ছিলনা। কিন্তু আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি। আর ও আমাকে কিছু বুঝতেও দেয়নি। ও আমাকে বলল কোন চিন্তা করতে না। ওর বাবা মা সব ব্যবস্থা করতে। কিন্তু আমি চাইছিলাম কিছু করতে। আর তাই কোন রকমে দুইটা টিউশানি জোগাড় করলাম। কিন্তু তাতে আর কত টাকা হয়। এভাবে বন্ধুদের কাছে কিছু ধার দেনা করে হাতে জমলো ১০ হাজার টাকা। একেবারে শেসের দিকে কোন উপায় না পেয়ে আমার বাবার কাছে ২৫ হাজার টাকা চাইলাম। তারা শুনে অবাক হলেন, আমি এতো টাকা চাওয়াতে। কিন্তু কেন জানতে চাইলেও তাদেরকে বলতে পারিনি। আমি জানতাম বাবার কাছে তখন টাকা আছে। আর সেই টাকায় বাবা কিছু জমি কেনার জন্য বায়না আগেই করে রেখেছিলেন। আমি টাকার জন্য অনেক পীড়াপীড়ি করার পরেও বাবা তখন টাকা দেননি। কি আর করা। অবশেষে ডেলিভারি করারসব ব্যবস্থা ওর বাসাতেই হল। আর পাড়ার দাই এনে এই কাজ করার জন্য ঠিক করেছিল ওর বাবা। তিনি তাঁর সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। আমি শুধু ১০ হাজার টাকা দিতে পেরেছিলাম মাত্র। কিন্তু সারাজীবন কষ্ট করা মেয়েটার দুর্ভাগ্য তখনও তাঁর পেছনে লেগেই ছিল। ভেবেছিলাম ও সেরে উঠলে ওর সব কষ্ট আমি যেভাবে পারি মুছে দেব। কিন্তু পুরো ৭ ঘণ্টা যুদ্ধ করে অবশেষে হার মানল। একা চলে যায়নি , সাথে নিয়ে গিয়েছিল পরীর মত একটা মেয়ে”।
রুমভর্তি মানুষ গুলোর চোখে পানি দেখতে পেলাম। আর জাভেদ, অঝোর ধারায় কাঁদছে। আমার চোখের কোনেও পানি জমে উঠলো।
কান্না থামিয়ে জাভেদ আবারও বলল, “বাবা টাকা দিলে ওকে বাঁচাতে পারতাম কিনা জানিনা, তবে আরেকটু ভালোভাবে ওর জন্য চেষ্টা তো করতে পারতাম। যে জমির জন্য আমি আমার স্ত্রী কে হারালাম, মেয়েকে হারালাম। সেই জমি কি আমি নিতে পারি? আমার বাবা তো তাঁর সন্তানের সুখের জন্য এসব করলেন, কিন্তু আমি তো কিছুই করতে পারলাম না। এই জমি আমার কি কাজে লাগবে, বাবা? ”
কারও মুখে কোন জবাব নেই। আমিও আর পারছিলাম না। তাই অতি দ্রুত সেখান থেকে চলে ঢাকা চলে এলাম। তবে যে স্মৃতি নিয়ে এবার ফিরলাম, তা আমার সারাজীবন মনে থাকবে। এই স্মৃতি অমলিন।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৩:২৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গত ৪৮ ঘণ্টায় সামু'র সর্বোচ্চ পঠিত ২ ব্লগার হচ্ছেন - অপলক এবং সৈয়দ কুতুব

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১৭

গতকাল রাত ৮টা ১২ মিনিট থেকে এখন রাত ৯ টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত সামুতে পোস্ট এসেছে মোট ১৬টি, আমার এই পোস্টটি ছাড়া।
এই পোস্টগুলোতে উত্তর ও প্রতিউত্তর মিলিয়ে কমেন্টেসের সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

একদিন আমরা ক’জনা মিলে …….

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১২



ব্লগের একাধারে নম্র ও প্রাজ্ঞ এবং গবেষক সহ-ব্লগার শ্রদ্ধেয় ডঃ এম এ আলীর “ব্লগের সুদিন ফিরিয়ে আনতে ব্লগ টিমের প্রতি বিনীত আবেদন”... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে-----

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৪



জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় ..।

দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে
যেদিন মানুষ নিজের কাছে
মিথ্যে বলা বন্ধ করবে
অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে
সত্যের পথে দৃঢ় পায়ে চলবে।

যেদিন বিবেক জাগবে মনে
লোভ হারাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার কি ইউনূস সাহেবকে ভয় পাচ্ছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৩


ব্যাপারটা এখন আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বর্তমান সরকার, সবাই যেন একজন কমন করফাঁকিদাতা খুঁজে পেয়েছে। সেই করফাঁকিদাতার নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×