somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্যানভাসে আঁকা

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ৯:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইরার এক চোখে অশ্রু অন্য চোখে নির্লিপ্ততা।বেলায়েত হোসেন কফির মগে চুমুক দিয়ে নড়েচড়ে বসলেন।একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করছে কিন্তু রোগী দেখার সময় তিনি ধূমপান করেন না।মাঝে মাঝে নিজের সৃষ্ট নিয়মের কাছে নিজেকেই শৃঙ্খলিত মনে হয়।দর্শন নিয়ে এ মুহূর্তে তিনি চিন্তা করতে চাচ্ছেন না।কিন্তু তার অবচেতন মন তাকে ইরা নামক মেয়েটির মুখোমুখি হতে দিচ্ছে না।একজন সফল মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বেলায়েত হোসেন নিজেই নিজের কাছে পরাজিত হচ্ছেন।ডাক্তার এবং রোগীর সম্পর্কের সীমারেখা তিনি জানেন।সেই সীমারেখা কখনও তিনি অতিক্রম করেননি। কিংবা বলা যায় অতিক্রম করার প্রয়োজন হয়নি।কিন্তু ইরার ব্যাপারটি সেরকম নয়। ইরার সমস্যাটি বুঝতে হলে ইরার মনোজগতের আনাচে কানাচে তাকে ভ্রমন করতে হবে।শুধু ভ্রমন করলেই চলবে না,মনের কোন এক অন্ধকার কোনে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসটিকে সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে।কিন্তু তিনি যতই গভীরে যাচ্ছেন ততই ইরার মনোজাগতিক জগতে হারিয়ে যাচ্ছেন।ইরার সমস্যাটিকে ঠিক প্রথাগত পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা যায় না। বেলায়েত হোসেনের যুক্তির সিঁড়ি বারবার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যাচ্ছে।

ইরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।শৈশবে কথা বলতে শেখার আগেই ইরা আঁকতে শিখেছিল।স্কুলে ইরার কোন বন্ধু ছিল না। তাকে প্রশ্ন করা হলে সে খাতায় এঁকে সেই প্রশ্নের জবাব দিত।স্বাভাবিক ভাবেই অন্যান্য ছেলে মেয়েরা তাকে ভয়ে এড়িয়ে চলত।কিন্তু এছাড়া ইরার মধ্যে অন্য কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না।তাই ইরার বাবা মা ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তিত ছিল না। সমস্যার শুরু হয় ইরার আঠারতম জন্মদিনের আগের দিন।তার একটি পোষা বিড়াল ছিল।বিড়ালটিকে কখনও চোখের আড়াল হতে দিত না সে।বিড়ালটির নাম সে দিয়েছিল গ্রীক উপকথার রুপবান যুবক নার্সিসাসের নামে।নার্সিসাস জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই নিজের প্রেমে পরেছিল। প্রতিবিম্বের মধ্যে নিজেকে খুঁজে ফিরেই জীবন কাটে নার্সিসাসের। নার্সিসাসের সাথে ইরার জীবনের কোথায় যেন একটা মিল আছে।জন্মদিনের আগের দিন ইরা একটি ছবি আঁকে। ছবি আঁকা শেষ হলে সে বিস্ময় নিয়ে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকে।অবিশ্বাস্য মনে হয় তার নিজের সৃষ্টকর্মকে।ক্যানভাসে আঁকা ছবিটিতে দেখা যায় একটি বিড়াল গলাকাটা অবস্থায় মরে পড়ে আছে।বিড়ালটি দেখতে হুবুহু নার্সিসাসের মত। প্রচণ্ড আতঙ্ক নিয়ে ইরা তার ক্যানভাসে রং মিশাতে থাকে। নার্সিসাস তার পায়ের নিচেই বসে ছিল। ইরা তাকে নিজের কোলে তুলে নেয় এবং নার্সিসাসকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকে।এক সময় ইরা ঘুমিয়ে পড়ে। তার ঘুম ভাঙ্গে মায়ের চিৎকারে।ঘুম ভেঙ্গে সে দেখে নার্সিসাস তার কোলে নেই।বারান্দা থেকে পরিচিত কিন্তু আতংকিত গলার স্বর ভেসে আসছে।অজানা ভয়ে কেঁপে উঠে ইরা।দৌড়ে যায় সে বারান্দার দিকে।তারপর দেখে ক্যানভাসে আঁকা ছবির মত পড়ে আছে নার্সিসাসের গলাকাটা মৃতদেহ। স্বাভাবিক হতে মাসখানিক সময় লেগেছিল ইরার।ক্যানভাসে আঁকা ছবির কথা সে কাউকে বলেনি।যদিও নার্সিসাসের পরিনতির জন্য নিজেকেই দায়ী করে ইরা।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম দিনগুলো ভালোই কাটছিল তার।খুব দ্রুত ভুলে গেল সে নার্সিসাসের কথা।

নির্ঝরের ডায়েরী থেকে

আমার আমিত্ব এভাবে ইরার অদেখা ভুবনে হারিয়ে যাবে তা কখনও ভাবিনি।ইরার চোখে চোখ রেখে খুঁজে ফিরি বেঁচে থাকার তীব্র আনন্দ।কিন্তু নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কি আসলে বেঁচে আছি?

ক্যানভাসে আঁকা ছবির মত অপার্থিব মনে হয় ইরাকে।আমার পার্থিব জগৎ থেকে অপার্থিব ইরাকে মনে হয় দূর থেকে ভেসে আসা মূর্ছনার মত।যার আওয়াজ আমাকে মোহিত করে কিন্তু যার উৎস আমি খুঁজে পাইনা।

আমরা ভালবেসেছিলাম,আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম একের ভেতর অপর।ইরার ঠোঁটের স্পর্শে সেদিন যা খুঁজে পেয়েছিলাম তার জন্ম এই ভুবনে না,অন্য কোথাও। মুহূর্তের মোহনায় আমরা আঁকড়ে ধরেছিলাম একে অপরের অস্তিত্বকে।ইরা আমার জীবন্ত ক্যানভাসে এঁকেছিল তৃপ্তির অতৃপ্ত চুম্বন।

আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।ইরাকে হারিয়ে ফেলার ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।ইরার নেশায় আসক্ত আমি।মৃত্যু ছাড়া এ নেশা থেকে আমার কোন মুক্তি নেই।ইরাকে বলেছিলাম আমায় তুমি মেরে ফেল।সে বলেছিল তোমায় আমি ক্যানভাসে জন্ম দিব।তারপর তুমি মুক্তি পাবে।

কাল ইরার জন্মদিন।জন্মদিনে আমি তাকে কোন উপহার দিতে পারব না।আমাদের মধ্যে এটাই নিয়ম।তার জন্মদিনে প্রথমবারের মত ইরা ক্যানভাসে আমার ছবি এঁকেছে।সে কখনই আমার ছবি আঁকতে চাইত না।ইরার আঁকা ছবিতে আমি উড়ছি।আমার দুপাশে দুটি পাখির ডানা।ইরার কাছে জানতে চাইলাম উড়ে আমি কোথায় যাচ্ছি!ইরা হাসিমুখে বলেছিল তোমার মুক্তির পথে,যদিও তার দুচোখে আমি কান্না দেখেছিলাম।

বেলায়েত হোসেনের নোটবুক থেকে

নির্ঝরের ডায়েরী পরে মনে হল তার অবসেসিভ ডিসঅর্ডারের সমস্যা ছিল।ইরার সাথে তার সম্পর্কটি কোন ভাবেই স্বাভাবিক ছিল না।ইরাকে সে মানবী নয় বরং দেবী ভেবে তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিল।ইরাকে নিয়ে তার মধ্যে এমন একটি মোহ তৈরি হয়েছিল যা তাকে বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।ইরা চেয়েছিল সে উড়ুক।তাই সে ইরার জন্মদিনে দশ তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল।নির্ঝরের মধ্যে অনেকগুলো সমান্তরাল সত্ত্বা ছিল। তার একটি সত্ত্বা চাইছিল ইরাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে।অপর স্বত্বাটি মুক্তির পথ খুঁজছিল।

ইরার ধারনা ক্যানভাসে ছবি এঁকে মানুষকে প্রভাবিত করার ভয়ংকর ক্ষমতা তার আছে। প্রভাবিত করার ক্ষমতা সব আর্টিস্টদেরই থাকে। কিন্তু ইরার ধারনা সে ছবি এঁকে মানুষ খুন করতে পারে।তার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য আমার কাছে দুটি উদাহরন রয়েছে।নির্ঝর এবং ইরার পোষা বিড়াল।কিন্তু এ দুটি ক্ষেত্রে ইরাকে খুনি বলা যাবেনা।বিড়ালটি কে মেরেছিল সেটি একটি অমীমাংসিত রহস্য।

সেদিন ইরাকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল।নিজের কাছেই নিজের চিন্তাকে অবাঞ্ছিত মনে হয়।ইরাকে পাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক বলয়ে আমি ঢুকতে চাচ্ছি না।কিন্তু তাকে নিয়ে অযৌক্তিক চিন্তাকে আমার মনোজগত থেকে উচ্ছেদও করতে পারছি না।এমন অবস্থায় কারো চিকিৎসা করা যায় না।ইরাকে অন্য কারো কাছে রেফার করব ভাবছি।


ইরার ক্যানভাস থেকে

দেয়ালের এক কোনে একটি টিকটিকি আলোর দিকে ধাবমান পোকাগুলোকে তাড়িয়ে বেরাচ্ছে । তার নিচে ছোপ ছোপ রক্তের ফোটা।সেই রক্তের দিকে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বেলায়েত হোসেন।তার এক হাতে ক্যানভাস এবং অন্য হাতে রঙতুলি। তার পাশেই পড়ে আছে ইরার নিথর দেহ যার এক চোখে অশ্রু এবং অন্য চোখে নির্লিপ্ততা।


কাল ইরা একুশতম বছরে পা ফেলবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৪৬
৮টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দরজা ভাঙ্গে যে রাষ্ট্র।। দ্বীপ সরকার

লিখেছেন দ্বীপ ১৭৯২, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪০



দরজা ভাঙ্গে যে রাষ্ট্র

একদা এক রাতে-
রাষ্ট্র, কড়া নাড়তে নাড়তে দরজা ভেঙ্গে
ঢুকে পড়লো
আমি নিথর,নিস্তব্ধ এক জনগণ
বললাম,আমি ভয় পাচ্ছি
রাষ্ট্র হাসতে হাসতে ভাঙ্গা দরজা দিয়ে
এক পা দুই পা করে,লোকালয়ে মিশে গেলো

রাষ্ট্র কি ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×