somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ভাড়াটিয়ার স্বপ্ন

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১.
ঘরভাড়া এগারো টাকা। শুনে লোকে প্রথমে হাসে। আসমানিটোলা লেনে চার হাত বাই ছয় হাত ঘরের ভাড়া এখন সাতশো, আর এগারোর কথা শুনে হাসি থামিয়ে সবাই একই প্রশ্ন করে, শর্ত কী?

শর্ত একটিই। মাসে একবার প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে নেমে এসে নিজের একটি স্বপ্ন বলে যেতে হয়। আমি সেই স্বপ্ন খাতায় তুলি, তারিখ বসাই, তারপর তার ডান হাতের বুড়ো আঙুলে কালি লাগিয়ে টিপসই নিই।

মোটা খাতা, লাল সালুতে মোড়া মলাট। পাতা ছকে ভাগ করা: তারিখ, ঘর, নাম, স্বপ্নের সার, মন্তব্য, টিপসই। স্বপ্নের সারের ঘর সবচেয়ে চওড়া, এবং ওই ঘরে যা লিখতে হয় তা ভাড়াটিয়ার নিজের কথায় লিখতে হয়, আমার ভাষায় নয়।

: তুমি সাজায়া লিখলে জিনিস নষ্ট হয়া যায়। যেমন কইছে তেমন লেখো।

আমি বানান ঠিক করি না। কেউ যদি বলে পুলের রেলিং আছিল না, আমি লিখি পুলের রেলিং আছিল না। সন্ধ্যাবেলা সরদার সাহেব খাতা নিয়ে ওপরে চলে যান এবং কোনো কোনো লাইনের পাশে পেনসিলে ছোট দাগ কেটে রাখেন।

এই বাড়িতে আমিও ভাড়াটিয়া হয়েই এসেছিলাম। তিন মাস পর সরদার সাহেব ডেকে বললেন আমার স্বপ্ন কাজে লাগছে না, এবং একই নিঃশ্বাসে বললেন হাতের লেখা ভালো।

: ভাড়া লাগব না। খাতা লেখো।

চার বছর ধরে আমি কোনো স্বপ্ন দেখি না। এখনই বলে রাখলাম, পরে বললে ব্যাখ্যা মনে হবে। ঘুম আমার ঠিকই হয়, রাত দশটায় শুই, ফজরের আগে উঠি, আর মাঝখানের পুরো সময় কালো।

২.
মাসের প্রথম শুক্রবার, সকাল আটটা। বৈঠকঘরের পুবমুখী জানালা। শীতের সকালে আলো এসে পড়ে টেবিলের ডান কোণে, তারপর বেলা বাড়লে সরে গিয়ে দেয়ালের নিচে জমে থাকে, তাই খাতা আমি সবসময় বাঁ দিকে রাখি।

প্রথমে নামে হাফিজউদ্দিন। চশমার এক ডাঁটি সাদা সুতায় বাঁধা। নবাবপুরে আটাশ বছর তার ঘড়ির দোকান ছিল। দোকান উঠে যাওয়ার পর সে এখন ঘরে বসে লোকের ঘড়ি খোলে আর জোড়া দেয়, এবং কাজ শেষে ঘড়ি কানের কাছে ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে শোনে। তার স্বপ্নে সবসময় কিছু কম থাকে। রেলিংবিহীন পুল, কাঁটাবিহীন ঘড়ি, সিঁড়িবিহীন দোতলা। সরদার সাহেব তার একটি স্বপ্নও কোনোদিন বাতিল করেননি, কারণ স্বপ্নে যা কম থাকে তা পরে বসিয়ে নেওয়া যায়।

তারপর ছবুরা বিবি, তিনতলার চিলেকোঠায়, ডান পায়ে টেনে হাঁটেন। তার ছেলে মোতালেব শ্রাবণ মাসে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যায় এবং লাশ পাওয়া যায় তিন দিন পর শ্যামবাজারের ঘাটে। এরপর থেকে তিনি ছেলেকে প্রায় প্রতি মাসেই স্বপ্নে দেখেন। এই স্বপ্নগুলোর জন্য ছবুরা বিবিকে খাতায় পর পর তিন মাসের ঘরে টিপসই দিতে হয়।

নিতাই পাল থাকেন দোতলার পেছনের ঘরে, শাঁখারীবাজারে শাঁখা কাটেন। তার আঙুলের ডগা সারা বছর সাদা, শাঁখার গুঁড়া চামড়ার ভেতরে ঢুকে গেছে, আর টিপসই দেওয়ার সময় সে বুড়ো আঙুল কালিতে ডুবিয়ে দুইবার ঝাড়ে যাতে ছাপ ঘোলা না হয়।

আলাউদ্দিন মিস্ত্রি থাকে নিচতলার পেছনে। টিনের ট্রাংক বানায়। তার ঘরের শব্দ হাতুড়ির নয়, কাঁচির, আর টিন কাটার ওই লম্বা টানা আওয়াজ রাতে থেমে গেলে বোঝা যায় সে ঘুমিয়েছে।

সবশেষে রমজান। সতেরো বছর বয়স, ঠাটারীবাজারের এক রিকশা গ্যারেজে কাজ করে, আর সে-ই একমাত্র যে খাতায় নিজের নাম নিজে লিখতে চায়।

: খাতায় কি নাম থাকে?
: থাকে।
: কতদিন থাকে?

জবাব দিইনি।

সেই বছরের আশ্বিন থেকে মন্তব্যের ঘরে নতুন শব্দ উঠতে শুরু করল। অগ্রহণযোগ্য। প্রথম মাসে দুটি, পরের মাসে পাঁচটি, তার পরের মাসে নয়টি।

: বাতিল জিনিস খাতায় দুইবার উঠব না। তুমি আগে বাইছা নিবা।

সেই মাস থেকে বাতিল স্বপ্নগুলো আগে আমাকে বাছাই করতে হতো। সত্য স্বপ্নে সবসময় কিছু ভুল থাকে। যে সত্যি দেখেছে সে বলবে ঘরে তিনজন ছিল অথচ গুনলে চারজন, আর যে বানিয়ে এনেছে সে সব মিলিয়ে আনবে, এবং তখনই ধরা পড়ে।

৩.
প্রথম চাহিদাপত্র এল এক মাঘ মাসে। আধখানা কাগজ, টেবিলের ওপর পাথর চাপা দেওয়া।

চাহিদা, ফাল্গুন

১. একটি রাস্তা। দৈর্ঘ্য যত খুশি। অন্তত দুই বাঁক।
২. জল। তবে নদী নয়।
৩. সন্ধ্যার আলো, ছয়টার পরের।

ঘর সংক্রান্ত স্বপ্ন বিশেষ বিবেচনায়।

সরদার সাহেবের কাছ থেকে আসা চাহিদাপত্র ছিল এই প্রথম। চাহিদাপত্র নিয়ে জিজ্ঞাসা করা যায় না। পাঁচ কপি করে পাঁচ ঘরের দরজার নিচে গলিয়ে দিলাম, আর তার পরের চব্বিশ দিন এই বাড়িতে কেউ ভালো করে ঘুমাল না। স্বপ্ন হুকুম মানে না। ভাড়াটিয়ারা যত তাড়াতাড়ি তা বুঝল, আমি তত তাড়াতাড়ি বুঝলাম যে ভাড়াটিয়াদের বোঝানো এখন আমার দায়িত্ব।

আমি নিয়ম বানালাম। কাগজে লিখে বিলি করলাম। বাঁ কাতে শোবেন। খাটের নিচে পিতলের বাটিতে পানি রাখবেন। রাতে অল্প নুন খাবেন, পানি খাবেন না। যে জিনিস চাওয়া হয়েছে তা চোখ বন্ধ করার ঠিক মুহূর্তে ভাববেন, তার আগে নয়। নিয়ম কাজ করল। ফাল্গুনের প্রথম শুক্রবার রমজান যে রাস্তার কথা বলল তাতে বাঁক ছিল তিনটি এবং শেষ বাঁকের মাথায় একটি টিউবওয়েল, আর মন্তব্যের ঘরে উঠল গৃহীত, উত্তম।

রমজানের সহজ হয়ে গেল। ছেলে প্রতি মাসে রাস্তা আনে। কোনো মাসে ইটের, কোনো মাসে কাদার, একবার এমন এক রাস্তা এনেছিল যার দুই পাশে দোকান কিন্তু দোকানে কোনো লোক নেই, এবং সেই মাসে সরদার সাহেব তার ভাড়া মওকুফ করে দিলেন।

এরপর প্রতি মাসেই চাহিদাপত্র এল। সাত বছরে সংখ্যা দাঁড়াল চুরাশি। প্রথম দিকের কাগজে চাওয়া হতো রাস্তা, জল, আলো, দেয়াল, পরের দিকে চাওয়া শুরু হলো এমন জিনিস যা চাইতে হয় না বলে কেউ কোনোদিন চায়নি।

চাহিদা, শ্রাবণ

১. একটি মোড়। সোজা রাস্তায় কেউ থাকে না।
২. এমন শব্দ যাহা দূর হইতে আসে।
৩. কারো পিছন দিক। মুখ লাগিবে না।

আলাউদ্দিন তিন মাস কিছু আনতে পারল না। চতুর্থ মাসে যা বলল তা এত গোছানো যে তিন লাইন শুনেই থামালাম।

: এইডা আপনের না।
: আমার ভাগ্নার।
: বাইরের মাল খাতায় উঠব না।

যিনি এই গল্প লিখছেন তিনি আসমানিটোলা লেনে কোনোদিন যাননি। তিনি শুধু ভাড়ার অঙ্ক দুই জায়গা থেকে মিলিয়ে নিয়েছেন, বাকিটা খাতা লেখকের বয়ান।

৪.
সেই বছর শীত এল দেরিতে। পৌষের মাঝামাঝি পর্যন্ত রাতে ফ্যান চলল, তারপর এক রাতে ঠান্ডা নামল এবং সকালে দেখা গেল জানালার কাচে ভেতরের দিকে বাষ্প জমেছে।

ছবুরা বিবি নামলেন বেলা এগারোটায়। দাঁড়ালেন, বসলেন না।

: ভাই, খাতায় লেহা আছে আমার পোলার সিঁথি কোন দিকে আছিল?

পুরনো খাতা নামালাম। বাহাত্তর নম্বর পাতা, তেইশে শ্রাবণ, চিলেকোঠা, স্বপ্নের সারের ঘরে লেখা আছে, ঘরে ঢুইকা দেখি মোতালেব সিঁথি করতেছে ডাইন দিকে আর তার নিচে তার নিজের বুড়ো আঙুলের ছাপ।

: ডান দিকে।
: ও।

তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেন, আর সিঁড়িতে তার ডান পায়ের টান শোনা যেতে থাকল অনেকক্ষণ।

যে স্বপ্ন খাতায় ওঠে, সেই স্বপ্নের ভেতরের মুখ তিন মাসের মধ্যে ঝাপসা হতে শুরু করে। ছয় মাসের মাথায় ভাড়াটিয়া নিজের খাতা দেখে মনে করে, আর এক বছর পর খাতা দেখেও কিছু হয় না, তখন সে শুধু জানে স্বপ্ন সত্যি ছিল কারণ কাগজে লেখা আছে।

নিতাই পাল ফাল্গুনে একটি গলির স্বপ্ন জমা দিয়েছিল। দুই পাশে দেয়াল, দেয়ালে সাদা গুঁড়া, মাথার ওপর দড়িতে ভেজা কাপড়। বৈশাখ মাসে সে একদিন রাত সাড়ে দশটায় বাড়ি ফিরে সিঁড়িতে বসে পড়ল।

: রাস্তা ভুইলা গেছি।
: কোন রাস্তা।
: সবটি না। খালি শেষের গলিখান।

তার পরের মাস থেকে সে শাঁখারীবাজার থেকে ফেরার সময় একজন লোককে পয়সা দিয়ে সঙ্গে আনে, ছয় টাকা।

হাফিজউদ্দিনের ক্ষতি অন্য রকম। সে কিছু ভোলেনি। সে শুধু কাজ শেষ করে ঘড়ি কানের কাছে ধরে বসে থাকে আর ঘড়ি চললেও তার মনে হয় চলছে না, তাই সে খুলে আবার জোড়ে, আবার শোনে, আবার খোলে, এবং তিন দিনের কাজ এখন তার এগারো দিন লাগে।

৫.
আশ্বিনে আলাউদ্দিন স্বপ্ন জমা দেওয়া বন্ধ করল। তৃতীয় মাসে সরদার সাহেব নিজে নিচে নেমে এলেন, যা তিনি করেন না।

: রাইতে যাইবা। ঘুমের মইধ্যে জিগাইবা। ঘুমের মানুষ মিছা কয় না।

রাত দুইটার দিকে আলাউদ্দিনের ঘরের শিকল বাইরে থেকে খুলি। ঘরে টিনের গন্ধ, মেঝেতে কাটা টিনের ফালি, আর জানালা বন্ধ থাকায় ভেতরের বাতাস দিনের গরম ধরে রেখেছে। খাটের পাশে মোড়া নিয়ে বসি। কানের কাছে মুখ নিয়ে নাম ধরে ডাকি, দুইবার, তিনবার। ঘুমন্ত লোক নিজের নাম শুনলে জবাব দেয়, এই একটি জিনিস আমি চার বছরে শিখেছি।

: কী দেখতেছ আলাউদ্দিন।
: টিনের চাল। বৃষ্টি পড়তেছে।
: আর কী।
: চালের নিচে কেউ নাই।

সকালে সে কিছু মনে করতে পারে না। খাতায় স্বপ্ন ওঠে, আর আমি তার আঙুল ধরে নিয়ে টিপসই দিই, আর সরদার সাহেব মন্তব্যের ঘরে লেখেন গৃহীত।

এরপর বাতিল স্বপ্ন আর ফেরত যায়নি। চাহিদাপত্রের সঙ্গে দ্বিতীয় একটি কাগজ আসতে শুরু করল, তাতে শুধু নাম, ঘর নম্বর আর নামের পাশে তারিখ, কোন রাতে কার কাছে যেতে হবে। কাগজের মাথায় লেখা থাকত আদায়যোগ্য।

তিন মাসের মধ্যে ভাড়াটিয়ারা ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগাতে শুরু করল। সরদার সাহেব আমাকে একটি লোহার পাত দিলেন, পাতলা, ছয় ইঞ্চি, এক মাথা বাঁকানো। কপাটের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে ছিটকিনি তোলা যায়, শব্দ হয় না, নিতাই পালের দরজায় তিনবার চেষ্টা করতে হয় কারণ ওই কপাট ফুলে আছে। ছবুরা বিবি কোনোদিন ছিটকিনি লাগাননি।

একদিন দুপুরে উঠানে রমজান সামনে এসে দাঁড়াল, হাতে গ্রিজের কৌটা।

: আপনে রাইতে আহেন?
: হ।
: আমি জাইনা রাখলাম।

সেই দিনের পর হাফিজউদ্দিন আর আমাকে ঘড়ি ধরতে দেয় না, নিতাই পাল সিঁড়িতে দেখা হলে দেয়াল ঘেঁষে নামে, আর আলাউদ্দিনের টিন কাটার শব্দ এখন রাত তিনটা পর্যন্ত চলে।

আলাউদ্দিন এক রাতে জবাব দিল, দুই পাশে দেয়াল, দেয়ালে সাদা গুঁড়া। পরের সপ্তাহে রমজান বলল, ঘড়ির কাঁটা দিয়া বানানো রেলিং, আর তার পরের রাতে হাফিজউদ্দিন বলল, রাস্তার দুই পাশে দোকান, দোকানে কেউ নাই।

সরদার সাহেব সেই মাসে মন্তব্যের ঘরে নতুন একটি শব্দ লিখলেন।

পুনরাবৃত্তি।

৬.
ফাল্গুনের এক দুপুরে সরদার সাহেব আমাকে ওপরে ডাকলেন। তিনতলায় আমি আগে উঠিনি। লম্বা বারান্দা, এক পাশে তিনটি দরজা, শেষখানা টিনের। রেলিং ভাঙা, ভাঙা জায়গায় বাঁশ বাঁধা, আর মেঝেতে রোদ পড়ে না কারণ পাশের বাড়ি ছয়তলা হয়ে গেছে গত বছর। তার ঘরে একটি খাট, একটি আলমারি, দেয়ালে কোনো ছবি নেই। পায়ের কাছে চারটে খাতা, হাতে আরও একটি খাতা, খোলা।

: চাইরশো একষট্টি হইছে।
: কী চারশো একষট্টি?
: স্বপ্ন। গৃহীত। আর একখান লাগব।
: কার?
: তোমার খাতায় তোমার নাম নাই।

আমি সেদিন একটি স্বপ্ন বানিয়ে বললাম। ছাদের কথা বললাম, ছাদে জমা বৃষ্টির পানি, পানিতে আকাশের ছায়া, এবং কথা শেষ করার আগেই তিনি হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।

: বানানো।
: হ।
: তুমি চাইর বছর ধইরা কিছু দেহো না। আমি জানি।
: তাইলে ডাকলেন ক্যান।
: দেখাইতে। খাতা লেখকের ঘুম আলাদা খাতে যায়, ওই খাতা তুমি দেহো নাই।

তিনি আলমারি খুলে একটি চাবি বের করলেন, লম্বা, লোহার, মাথায় সুতা বাঁধা।

: শেষ ঘর। চাবি এখন থিকা তোমার কাছে থাকব। আমার হাত কাঁপে।

৭.
শেষ ঘরের দরজা কাঠের নয়, টিনের, আর টিনের গায়ে হাতুড়ির ছোট ছোট গর্ত, একেবারে সমান দূরত্বে। তালা পিতলের। খুলতে শব্দ হলো না।
ভেতরে সন্ধ্যা।

বাইরে তখন রাত দুইটা, কিন্তু ভেতরে সন্ধ্যা ছয়টার পরের আলো, যে আলোয় সবকিছুর রং থাকে অথচ ছায়া পড়ে না, এবং সেই আলো কোথা থেকে আসছে খুঁজে বের করা যায় না কারণ ওপরে ছাদ নেই আবার আকাশও নেই। ঘর বারো হাত বাই চোদ্দ হাত। দরজায় দাঁড়িয়ে সামনের দেয়াল দেখা যায় না।

চৌকাঠ থেকে একটি রাস্তা শুরু হয়েছে, ইটের, খাড়াভাবে বসানো। শুকনো নর্দমা। রাস্তা দশ কদম গিয়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়েছে, তারপর ডানে, আর তৃতীয় বাঁকের মাথায় টিউবওয়েল, যার হাতল চাপলে পানি আসে এবং পানি গরম, যেমন সারা দিন রোদে থাকা কলের পানি সন্ধ্যায় গরম থাকে। পুল পড়ল সাত মিনিট পর। নিচে জল, স্থির, কোনো দিক থেকে আসেওনি কোনো দিকে যায়ওনি। রেলিংয়ের শিক ঘড়ির কাঁটা দিয়ে বানানো, বড় ঘড়ির কাঁটা লম্বা, কয়েকশো, পাশাপাশি বসানো এবং উপরে একটি লোহার পাত দিয়ে আটকানো। পুল পেরিয়ে গলি। দুই পাশে দেয়াল, দেয়ালে সাদা গুঁড়া, মাথার ওপর দড়িতে ভেজা কাপড় যা শুকায় না। তিনবার হেঁটে দেখলাম বেরোনোর মুখ নেই, ঘুরে ঢোকার মুখেই ফিরে আসতে হয়। আর তিনবার চেষ্টা করার পর আমি বুঝলাম এই গলি নিতাই পালের এবং সে নিজেই এখান থেকে বেরোতে পারেনি।

তারপর মাঠ। মাঠে খুঁটির ওপর বসানো টিনের চাল, দেয়াল নেই। এমন চাল আমি গুনেছি সাতষট্টিখানা, নিচে চৌকি নেই, চুলা নেই, কেউ নেই, শুধু চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ হয় অথচ মাটি শুকনা। ইস্কুল একটি। একতলা। দোতলার সিঁড়ি উঠেছে সাত ধাপ, তারপর শেষ। দোকান আছে বাইশটি, সব খোলা, সব খালি। মোড়ে মোড়ে টিনের ফলক। আছিয়া সড়ক, আছিয়া দিঘি, আছিয়া বালিকা বিদ্যালয়, আর পুলের গোড়ায় বড় করে লেখা আছিয়াবাদ, নিচে ছোট হরফে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।

আছিয়া খাতুন সরদার সাহেবের স্ত্রী। তেষট্টিতে বিয়ে, ছিয়াত্তরের শ্রাবণে মৃত্যু, কবর আজিমপুরে, নয় নম্বর ব্লক। এইটুকু আমি খাতার প্রথম পাতা থেকে জানি, কারণ সেখানে তারিখের হিসাব লেখা আছে। আমি তাকে খুঁজেছি। দিঘির পাড়ে নেই, ইস্কুলে নেই, সাতাশটি রাস্তার একটিতেও নেই। আজিমপুরে তার কবরের গায়ে যে নামফলক, ওই ধরনের ফলক আছিয়াবাদের কোথাও বসানো হয়নি, অথচ রাস্তার নাম, দিঘির নাম, ইস্কুলের নাম, সব তার।

শেষ রাস্তার মাথায় একটি খালি জমি। চারপাশে ইটের সীমানা। বাঁশের খুঁটিতে টিনের ফলক, ফলকে কালি দিয়ে লেখা মকবুল হোসেন, আর জমির ভেতরে ঘাস পর্যন্ত নেই। দরজা আমি খোলা রেখে নেমে এসেছিলাম। ইচ্ছা করে নয়, ভুলে।

৮.
পরের মাসের প্রথম শুক্রবার আমি আটটায় বসলাম। নয়টা বাজল। কেউ নামল না।

আমি উঠে গেলাম। পাঁচজনই সেখানে। হাফিজউদ্দিন পুলের ওপর রেলিংয়ের একটি শিক আঙুল দিয়ে ঘষছে বারবার, যেভাবে সে দোকানে বসে কাঁটা পরিষ্কার করত। নিতাই পাল গলির ভেতর হাঁটছে। রমজান টিউবওয়েলের গোড়ায় বসে আছে।

: এইডা আমার। এইডার লেইগা আমি তিন মাস নুন খাইছি।

আলাউদ্দিন দাঁড়িয়ে আছে এক চালের নিচে, হাত বাড়িয়ে খুঁটি ধরে, যেন খুঁটি ছাড়লে চাল উড়ে যাবে।

ছবুরা বিবি ইস্কুলের সামনের রাস্তায়। সেখানে একজন বাতিওয়ালা হাঁটে, কাঁধে লম্বা বাঁশ, বাঁশের মাথায় সলতে, আর সে একটির পর একটি বাতি জ্বালিয়ে যায় যদিও চারদিকে ইতিমধ্যেই সন্ধ্যার আলো।

: মুখ ঝাপসা ক্যান।

জবাব দিলাম না। খাতা সঙ্গেই ছিল। বাহাত্তর নম্বর পাতা খুলে সামনে ধরলাম, তিনি পাতা থেকে চোখ তুলে বাতিওয়ালার দিকে তাকালেন, তারপর আবার পাতায়, তারপর আর তাকালেন না। বাতিওয়ালা আমাদের পাশ দিয়ে গেল। থামল না, তাকাল না, কাঁধের বাঁশ সোজা রেখে হেঁটে গেল, আর তার হাঁটার ভঙ্গি ছবুরা বিবি চিনতে পারলেন কারণ তিনি হাত তুললেন, কিন্তু হাত অর্ধেক উঠে থেমে গেল।

আছিয়াবাদে রাস্তা সাতাশটি। দিঘি একটি। পুল একটি, ইস্কুল একটি, তার দোতলা নেই। ঘর নেই একটিও। চাহিদাপত্রে সরদার সাহেব ঘর চেয়েছেন উনত্রিশবার। পাঁচখানা খাতার প্রতিটি পাতা আমি উল্টেছি, একবার নয়, দুইবার।

উল্টাতে গিয়ে প্রথম খাতার শুরুর দিকে নিজের নাম পেয়েছি। তিনটি এন্ট্রি। ভাড়াটিয়া মকবুল হোসেন, দোতলা, সিঁড়ির মুখ, আর তিনটির পাশেই লাল পেনসিলে গোল দাগ, দাগের নিচে অগ্রহণযোগ্য, তিনটির নিচেই আমার নিজের বুড়ো আঙুলের ছাপ যা তখন আরো চওড়া ছিল।

প্রথমটি: উঠানে খাড়ায়া আছি, কেউ নাম ধইরা ডাকতেছে, ঘুইরা দেখি কেউ নাই।
দ্বিতীয়টি: মায়ে ভাত বাড়তেছে, প্লেট একখান।
তৃতীয়টি: ইস্টিশনে বইসা আছি, টেরেন আহে না।

আমি তিনবার পড়েছি। পড়তে গিয়ে মনে হলো অন্য কারো কথা পড়ছি, আর শেষ লাইনে পৌঁছে টের পেলাম ইস্টিশনের নাম কী ছিল তা আমি জানি না। এই তিনটি সরদার সাহেব নেননি। কেন নেননি তা তিনি সেদিন বলেননি, আজও বলেন না, তবে পাঁচখানা খাতা ঘেঁটে আমি বুঝেছি তিনটির কোনোটিতে কোনো জায়গা নেই। উঠান আছে, বাড়ি নেই। প্লেট আছে, ঘর নেই। ইস্টিশন আছে, নাম নেই।

শেষ চাহিদাপত্র এল অগ্রহায়ণে। আধখানা কাগজ, লেখা কাঁপা, তারিখ নেই।

চাহিদা
১. একটি ঘর। যেকোনো ঘর। দেয়াল চারটি হইলেই হইব।

রমজান গেল প্রথমে, গ্যারেজ বদলে যাত্রাবাড়ীতে। নিতাই পাল গেল শাঁখারীবাজারে, দোকানের ওপরেই থাকে, বলেছে আর ফিরবে না। আলাউদ্দিন ট্রাংক নিয়ে গেল রিকশাভ্যানে, দুই বার খেপ লেগেছিল। হাফিজউদ্দিন মারা গেল আশ্বিনে, নিজের ঘরে, ভোরবেলা, বুকের ওপর একটি খোলা ঘড়ি নিয়ে।

ছবুরা বিবি নামলেন না। চিলেকোঠার দরজা খোলা। দড়িতে দুইখানা জামা ঝুলছে, শুকনা, আর গত সাত মাসে আমি ওই দুইখানা জামা একবারও নড়তে দেখিনি।

তিনতলার শেষ ঘরে তালা আমি আর লাগাই না। লাগানোর দরকার হয় না। এই বাড়িতে এখন সিঁড়ি ভাঙার লোক দুইজন, আর তাদের একজন সিঁড়ি ভাঙতে পারে না। সরদার সাহেব এখন সিঁড়ি ভাঙেন না। দুপুরে তার ঘর থেকে খাটের শব্দ আসে, বাকি সময় কিছু আসে না। খাবার ওপরে দিয়ে আসি, প্লেট নামিয়ে আনি, আর প্লেট বেশিরভাগ দিন যেমন রাখি তেমনই থাকে।

অগ্রহায়ণের প্রথম শুক্রবার আমি আটটায় বসলাম। জানালার আলো টেবিলের ডান কোণে পড়ল, তারপর সরে গিয়ে দেয়ালের নিচে জমল। কেউ এল না।

বেলা দুইটা পর্যন্ত বসে রইলাম। তারপর খাতা টেনে তারিখ লিখলাম, ঘরের ঘরে লিখলাম সিঁড়ির নিচ, নামের ঘরে লিখলাম মকবুল হোসেন। স্বপ্নের সারের ঘর খালি রেখে কলম নামিয়ে রাখলাম, কালির প্যাডের ঢাকনা খুললাম, উঠে গিয়ে টেবিলের ওই পাশের চেয়ারে বসলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:০৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের ৭১- কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুপকথাও হার মানে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৫৪



আমাদের উঠানে একটা কবর আছে। কবরটা কার, আমি জানি না।
জানি না, এই কথাটা মিথ্যা। আমি জানি কার। কিন্তু নামটা বললে বিপদ হতে পারে। তাই নাম বলি না।

​শুধু প্রতি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

লংমার্চ নাকি ‘ফোর-হুইল ড্রাইভ’—ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম!

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭

জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলের আজকের লংমার্চ—ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা। শুনে মনে হলো, ইতিহাস বুঝি আবার হাঁটতে শুরু করেছে!

কর্মসূচির ছয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিমান যখন ঝরে যায়.........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭

অভিমান যখন ঝরে যায়.........

আপনারা যারা 'বসন্ত বিলাপ' সিনেমাটা দেখেছেন তাদের কি শেষ দৃশ্যটা মনে আছে? যেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখে অপর্ণা সেন জিজ্ঞেস করছে, "আপনি যান নি?"
সৌমিত্র একগাল হেসে বলছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাকে দিয়ে সেলস হবে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫

আমাকে বাংলাদেশের এক ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি তাদের সেলসে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। কোম্পানি ভালো, বাজে কোন রেকর্ড নেই। আমার কাজ হচ্ছে, আমার পরিচিত মানুষদের সাথে তাদের মার্কেটিং টিমের যোগাযোগ করায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×