নমনীয় এক সৌন্দর্য ছিল তার পুরো অঙ্গে। সি্নগ্ধ ত্বকে পাউরুটির মত তুলতুলে আমেজ ও পটলচেরা চোখের চাহনীর গভীরে আমি তা দেখেছি। সেই সঙ্গে কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া সোজা কালো চুলে এক চিরন্তন সৌন্দর্যের ঢেউ খেলছিল। হয়তো ইন্দোনেশিয়া বা আন্দিনের মত প্রাচীন সে সৌন্দর্য, তবে মহাকালিক। তার পরিধেয় প্রতিটি পোশাকে ছিল সূক্ষ্ম রুচির পরিচয়-সূক্ষ্ম ফুল অঙ্কিত কালো রঙের ওড়না, চিকন ডোরা বিশিষ্ট ঢিলেঢালা জামা আর জিন্স কাপড়ের ট্রাউজার। আমি দরজার পাশের একটি রিডিং রুমে অপেক্ষা করছিলাম। আর ঠিক তখনই আমি তাকে দেখলাম, জান্নাতী হুরের মত ছোট ছোট পা ফেলে সন্তর্পণে হেঁটে আসছে। আমার মন তখন অবচেতনভাবেই বলে উঠল, ‘এ পর্যন্ত দেখা সকল মেয়ের মধ্যে তুমি সবচেয়ে সুন্দর’।
ঠিক অতি প্রাকৃত কোন আত্না এ মুহুর্তের জন্য এল আর চোখের নিমিষে সামনে থাকা চেয়ারে বসে গেল।
তখন রাত আট’টা বাজে। এ বছরের প্রথম রোজা। মাত্র দশ দিন আগে এপেনডি সাইড অপারেশন হওয়ায় রোজা রাখিনি। রমজান মাস হওয়া সত্বে ও সারাদিন বৃষ্টি ঝরার কারণে সন্ধার দিকে রাস্তায় যানবাহন তুলনামূলক বেশিই ছিল। হাইওয়েগুলোতে গাড়ির গতি ছিল বেশ ধীর। রাস্তার দু’পাশে ট্রাকগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। বৃষ্টির আধিক্যে অটোমোবাইলগুলোও নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। তবে রুমের ভিতরের আবহাওয়াটা বসন্তের মেজাজেই ছিল।
নাস্তা আনতে আন্টি চলে গেলো পাশের ঘরে। একটা গান চলছিল পাশের রুমে, কেউ শুনছিলো না। শুধু আমরা দু’জন, এক … জগতে, একাকী…।
শতাব্দীর বড় ঝড় থেমে গিয়েছিল । সে মূহূর্তে আমি তাকে দেখলাম। নিবিড়ভাবে। শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি মেপে। তার কপালে স্বপ্ন উড়ে যাচ্ছিল। পানির ওপর ভেসে থাকা মেঘের ছায়ার মত। জীবনের স্পন্দনও শুধু সেখানেই ছিল। গলার হারটি সোনালি ত্বকের মাঝে ডুবেছিল। শুভ্র চেরী ফুলের মত আঙ্গুল থেকে গোলাপী আভা ছড়াচ্ছিল। আর বাম হাতের লম্বা সাদা নখগুলো প্রকৃতির দেয়া অলংকার স্বরূপ রুপের দ্যূতি ছড়াচ্ছিলো। সব মিলে ষোল বছরের বেশি মনে হল না। আমি জেরার্দো ডিয়েগোর চমৎকার সনেটটি মনে মনে আবৃত্তি করছিলাম। তখন শ্যাম্পেনের উপর জমে থাকা বুদ্বুদের চূড়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমার অপলক দৃষ্টির সামনে বসে থাকা তোমার প্রতি আমার নিঃস্বার্থ অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততা প্রমাণ করাটাই আমার স্বস্তি।’ তারপর আমি সামনের দিকে কিছুটা হেলে বসলাম। এতো কাছে তবু অনের দূরে মনে হলো আমার। কণ্ঠের মতই গম্ভীর ছিল তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি। আর ত্বক থেকে বেরিয়ে আসা কোমল গন্ধটা ছিল তার সৌন্দর্যের একরকম বিশেষায়ন। সে সময় ইয়াসুনারি কাউয়াতার একটা উপন্যাসের কথা মনে পড়ে গেল। বইটা আমি গত বসন্তে পড়েছিলাম। প্রাচীন কিয়োটা বুর্জোয়াদের ওপর লেখা। সেখানে তারা শহরের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েদের ঘুমন্ত ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে প্রচুর সময় ব্যয় করত কিন্তু তারা সেই মেয়েগুলোকে স্পর্শ করে জাগানোর চেষ্টা করত না। ঘুমন্ত রমণীদের অবলোকন করার মাঝেই ছিল তাদের সুখ। সেই সন্ধায় সুন্দরীকে অবলোকন করতে গিয়ে আমিও ঠিক একই জরাগ্রস্ত আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১২ রাত ১:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



