
বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকায় তরুণ প্রজন্ম দিন দিন আরো বেশি করে ভোগবাদী হয়ে যাচ্ছে।
এরা দামী রেস্তোরায় খেতে যাওয়া, দামী ব্র্যান্ডের দামী কাপড় পরা,বড়সড় শপিং মলগুলোতে গিয়ে কেনাকাটা করাটাকে স্মার্টনেস মনে করে, ভালো রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে ফেসবুকে চেকইন দেওয়াটাই আজকালের স্মার্টনেস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা খাওয়ার জন্য শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা চষে ফেলবে( একইধরনের খাবার আশেপাশে পেলেও শহরের ওই মাথার রেস্তোরায় গিয়ে খাওয়া চাই , ট্রাফিক জ্যাম কিংবা সময় এক্ষেত্রে বিষয় না) অধিকাংশ সময় শপিংমলে ঘুরে বেড়াবে , দেখে মনে হবে পুরোপুরি ভোগের জন্যই এদের মনপ্রাণ নিবেদিত। পূঁজিবাদী সমাজ এরকম তরুণদের স্মার্ট হিসেবে দেখাবে সবসময়, এদের এগিয়ে থাকা অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে ( ভোগ্য পণ্যের বিজ্ঞাপনগুলো দেখলেই বুঝবেন)। অবশ্য এদের এই প্রপাগান্ডার পেছনে সামাজিক দায়ের চেয়ে ব্যবসায়িক মুনাফাই বড় প্রশ্ন। যত বেশি এইরকম ব্রেনওয়াশ করে ম্যানিয়াক বানানো যাবে ততই ব্যাবসা রমরমা।
.
এই ছেলেমেয়েদের কখনো রক্ত দিতে বলেন, কোন আর্ট এক্সিবিশনে যেতে বলেন, সাহিত্য আড্ডা, বিতর্ক উৎসব, গণিত, বিজ্ঞান উৎসবে যেতে বলুন, কথা দিচ্ছি এদের বেশিরভাগকেই পাবেন না । প্রায় সবাই ব্যস্ততা, ট্রাফিক জ্যাম, দূরত্বের অজুহাত দিবে তখন। একবার বলে দেখুন ," চল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাই, বাতিঘরে যাই, বেঙ্গল বুক, পাঠক সমাবেশ কিংবা দীপনপুরে যাই!" পাবেন না ওদের। একে মানসিক শূন্যতা ছাড়া আর কি বলা যাবে! ভোগবাদ আমাদের মন ও মননকে ক্রমশ এতোটাই দাস করে ফেলছে যে মুক্তভাবে চিন্তা করা, চিন্তার খোড়াক যোগানোর চেয়ে নিজের খাওয়া-পরাই আজকাল মুখ্য হয়ে গেছে। এবং এই শূন্যতার আগুনে ঘি ঢালছে আমাদের অতিআধুনিক পূঁজিবাদী সমাজ, এদের লক্ষ্য একটাই বিপুল আর্থিক মুনাফা। দেশের তরুণরা গোল্লায় যাচ্ছে যাক।
আবার এই সমস্যাটা সমাধান করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে কারণ যারা এর ভিক্টিম তারা একে পজিটিভলি দেখছে, নিজেদের বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে ভেবে বসে আছে। অন্যদের চেয়ে নিজেদের চমৎকারীত্ব, স্বাতন্ত্র্য বোঝানোর জন্য তাই এদের ভোগবাদী আচরণ বেড়েই চলে। কেননা তারা এটাকে কখনোই দূর্বলতা হিসেবে জানেনা, জানে এটা তাদের শক্তি। অথচ এটি যে শক্তির আড়ালে কতবড় দূর্বলতা সেটা বুঝতে না পারার পেছনে আছে বড় বড় কোম্পানী , টিভি চ্যানেলের আইওয়াশ। সেই সাথে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব আছে না?
.
আবার মফস্বলের ছেলেমেয়েরাও এক্ষেত্রে সুযোগের অভাবে অনেকখানি পিছিয়ে থাকে। তবুও তাদের ভোগবাদী চরিত্র বাড়ছে দিনদিন। বিশ্বায়নের যুগে বাজার দখলই যখন প্রধানতম লক্ষ্য তখন মফস্বল আর গ্রামগুলোই বা বাদ থাকবে কেন?
কিন্তু এখানে পূঁজিবাদী সমাজ শহরের মত সুবিধা করতে পারেনা। একেতো শহরের তুলনায় এখানে মানুষের আয় কম, তার উপর সুযোগও ঢাকার মত বড় শহরের চেয়ে অনেক কম।
আর যদি সবচেয়ে বড় কারণটি বলতে চাই আমার মতে সেটি হচ্ছে , মফস্বল বা গ্রামের মানুষের সাইকোলজি শহরের মানুষের সাইকোলজির চেয়ে বেশ খানিকটা আলাদা। এখানে অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণ মানসিক শূন্যতা, ভোগবাদীতাকে নিজেদের দূর্বলতা হিসেবেই জানে। সেক্ষেত্রে তাদের চেষ্টা থাকে এর থেকে উত্তরণের। ফলে এইসব আইওয়াশ, ব্রেনওয়াশ খুব বেশি শেকড় ছড়াতে পারেনা।
.
সামগ্রিক দিক বিবেচনা করলে এই সময় সমাজের ভোগবাদী চরিত্র ক্রমশই বাড়ছে, আর বাড়ছে মানসিক দেউলিয়াত্ব। এই বিষয়গুলো নিয়ে গভীরতর বিশ্লেষণের প্রয়োজন বোধ করি। এবং এগুলো নিয়ে ভাবা উচিত এখন থেকেই। নাহলে পরের প্রজন্মের মানুষগুলো ভালো খাওয়া-পরা, একাডেমিক সার্টিফিকেটধারী পড়াশোনা, উচ্চবেতনের চাকরি, উচ্চ হারে ঘুষ খাবার সুযোগ আছে এমন চাকরি প্রাপ্তি ছাড়া আর কোন কিছু নিয়েই ভাববে না। কিছুই করবে না নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে। একদল অনুগত ভেড়ার পাল চাইলে অবশ্য এসবকে বাড়তে দেয়াই উচিত। যদি চিন্তায় ও মননে স্বাধীন মানুষ চান তাহলে এসব অশনীসংকেত দেখে চোখ বুজে থাকলে চলবে না। কিছু করতেই হবে।
বিঃ দ্রঃ
১। কাউকে আঘাত করা এই লেখা উদ্দেশ্য নয়। কেউ নিজের উপর নিয়ে কষ্ট পাবেন না।
২। এগুলো আমার ব্যাক্তিগত অভিমত। পর্যবেক্ষণ থেকে যা পেয়েছি অকপটে বলে দিয়েছি। তাই ভুল থাকতে পারে। এই বিষয়টা নিয়ে আরো সময় নিয়ে ভালো বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৯ ভোর ৫:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


