বাংলাদেশে আমি জাবি-র স্টুডেন্ট ছিলাম। 1997 সালের কোন এক সুন্দর সকালে জাবি-র সুন্দর মায়া ভরা ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলাম। তারপর একে একে সাতটি শীতে অতিখি পাখিদের স্বাগত জানানোর সৌভাগ্য (?) আমার হয়েছিল। সাতটি শরতের শিশির ভেজা সকাল কাঁটিয়ে 2004 সালে যখন ক্যাম্পাস ছেড়ে আসি, তখন আমার কেমন লেগেছিল সেটা পাঠকদের সাথে শেয়ার করার ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে দেননি। চোখের দৃষ্টিটা কেমন যেন ঝাঁপসা হয়ে আসছিল। হল থেকে বেড়িয়ে যখন রিঙ্ায় চেপে বসলাম, মনে হল পেছন থেকে কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি চোখ ফেরাইনি। রাস্তার দু'পাশে সবুজ শন ক্ষেত আর নাম না জানা গাছের সাড়ি। ছেলে-মেয়েরা হেটে বেড়াচ্ছে। শান্ত নিস্তব্দতার মাঝে আমার মনটা কেবলই অশান্ত হয়ে উঠছিল। দু'পাশের জড়-জীব সব কিছুই যেন বলছিল, কোথায় যাচ্ছ হে অতিথি, থেকে যাওনা আরো কয়েকটি ক্ষণ। দেখে যাও আরো কয়েকটি পত্র ঝড়া বসন্ত। অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে ঘুম ভাঙ্গুক আরো কয়েকটি সকালে। শরতের সকালে সবুজ ঘাসের উপর জমে থাকা শিশির বিন্দু আরো কয়েকটি বার তোমার পা ছুঁয়ে সালাম করুক। কি এমন ব্যস্ততা তোমার, চলে গেলে এমন মায়া আর কোথায় পাবে বলো।
এমন মায়ার আহ্বানকে উপেক্ষা করে চলে আসতে হয়েছিল সেদিন। তারপর প্রায় একটি বছর একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ছাত্্র পড়িয়েছি। কিন্তু সেটা ছিল শুধুই সময় কাটানো। অপেক্ষা করছিলাম একটি ভাল খবরের। জাবি থেকে বের হওয়ার পরপরই জাপানের একটা ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপের জন্য এপ্লাই করেছিলাম। আমি খুবই আশাবাদী ছিলাম সিলেকশনের ব্যাপরে। কিন্তু সে অনেক দিনের মামলা। এতদিন বসে থাকব। বি সি এস দিচ্ছিলাম আর ছাত্্র পড়িয়ে সময় পার করছিলাম। আর মাঝে মাঝেই মায়া টানে চলে যেতাম জাবিতে। দু-এক দিন কাটিয়ে আবার চলে আসতাম।
আমি তখন আজিজ সুপার মার্কেটের একটি মেসে থাকি। রাত করে মেসে ফিরলেও প্রতিদিন মেইল চেক করতাম একটি সুখবরের জন্য। তারপর সকল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই সোনার মেইল আসল আমার কাছে। মেইলের সাবজেক্ট ছিল 'কনগ্রাচুলেশান'! আমি মেইল খুলে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেল্লাম। প্রফেসর আমাকে জানালেন যা লিখেিিছলেন তার সারমর্ম হল, ওই ইউনিভার্সিটিতে বিভিন্ন দেশের মোট উনিশ জন ছাত্্র স্কলারশিপের জন্য এপ্লাই করেছিল। আমি তাদের মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছি। সুতরাং, আমার স্কলারশিপ প্রায় নিশ্চিত। আমাকে প্রসতুতি নিতে শুরু করতে বল্লেন আমার প্রফেসর।
আমার ইন্টাভিঊ নিয়েছিলেন তিনজন প্রফেসর। তবে ইন্টাভিউর অভিজ্ঞতাটা ছিল আমার জন্য প্রথম। এক কথায় বলতে গেলে ওটা ছিল 'নেট ইন্টারভিউ'- ইন্টানেট-এর মাধ্যমে ইন্টারভিউ নেয়া। ভীষণ এঙ্াইটেড লাগছিল। তিন জন প্রফেসর তিন দিন তিনটি করে মোট সাতাশটি প্রশ্ন করেছিল। প্রশ্ন গুলো ছিল আমার মাস্টার্সের থিসিস-এর উপর। তাই এনসার করতে আমাকে মোটেও অসুবিধায় পরতে হয়নি। ইন্টাভিউ আশাতীত রকম ভাল হয়েছিল, সেটা আমার প্রফেসর আমাকে পরে ই-মেইল-এ জানিয়েছিলেন। সে দিনই তিনি আমার ব্যাপারে তার আশার কথা শুনিয়েছিলেন।
যদিও কিছুটা দ্বিধা ছিল, তবু প্রফেসরের কথা মত কিছু কিছু প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। বাংলাদেশের অফিস আদালতের ব্যাপার তো। কত সময় লাগতে পারে সে ব্যাপারে অফিসাররা সঠিক কোন তথ্য দিতে পারেননা। তাই হাতে খানিকটা বেশী সময় নিয়েই প্রস্তুতি শুরু করলাম। ভাইয়া ও তখন জাপানে পি. এইচ. ডি. করছিলেন। তিনি 'প্লানিং কমিশনে' তার কয়েকজন কলিগ-এর ঠিকানা দিয়ে বল্লেন, কোন দরকার হলে যেন ওদের সহযোগীতা নেই। তবে আমি চেষ্টা করতাম ওই আমলা তান্ত্রিক জটিলতাকে এড়িয়ে চলতে। তবে ভাইয়ার একজন কলিগের সাথে আমার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। জয়েন্ট সেক্রেটারী রেংকের ওই ভদ্রলোককে আমি স্বপনদা বলে ডাকতাম। আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। খুবই মজার লোক। আমি আমার অনেক ব্যাপারেই, এমনকি ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়েও আলোচনা করতাম ওনার সাথে, পরামর্শ নিতাম। আমি যতবারই ওনার অফিসে গিয়েছি, কখনোই ওনার ডেস্কে কোন ফাইল দেখিনি। একদিন আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন ওনার টেবিলে কোন ফাইল থাকেনা। বল্লেন, আমি কোন কাজ জমিয়ে রাখিনা। তাছাড়া ফাইল জমিয়ে আমি কি করব। ওটা চালাতে তো আর আমি পয়সা নেইনা কারো কাছ থেকে। শতভাগ সৎ এই মানুষটি ছাত্র হিসাবে ভীষণ মেধাবী ছিলেন। স্বাধীনতার পর কোন এক সময় (সালটা ঠিক মনে নেই) তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এপ্লাইড ক্যামেস্ট্রিতে অনার্স এবং মাস্টার্স দুটোতেই ফাস্ট ক্লাশ ফাস্ট ছিলেন। ওনার খুব আগ্রহ ছিল শিক্ষক হিসাবে জয়েন করবেন। কিন্তু তৎকালীন বর্ণবাদী ভিসি ওনাকে নিয়োগ দেননি। তারপর মনের দঃখে বি সি এস দিয়ে মিনিস্ট্রিতে জয়েন করেছিলেন। কিন্তু কাজে কখনোই মন দিতে পারেননি। চাকরি করে যাচ্ছেন শুধু বেচেঁ থাকার জন্য। প্রমোশনের জন্য কারো কাছে কোন তদবির নিয়ে যান না। শিক্ষক না হতে পারার দুঃখটা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন।
আমি যখন আমার জাপানের প্রফেসরের কাছ থেকে ফাইনাল সিলেকশানের খবরটা পেলাম, সেদিন কি যে খুঁশি হয়েছিলাম। এমন আনন্দ মনে হয় আর কখনো হয়নি। মনের মধ্যে লালন করা উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গমনের অনেক দিনের স্বপ্নটা এবার সত্যি হতে চলেছে। শুরু হয়ে গেল আমার আসল প্রস্তুতি। জাপান থেকে ভাইয়া-ভাবী মা কে ফোন করে বল্লেন আমাকে বিয়ে করিয়ে দিতে। হাতে সময় খুবই কম। তাই আত্মীয় সজন সবাই মেয়ের খোঁজে নেমে পড়লেন। এত তাড়াতাড়ি মেয়ে পাওয়া কি এতই সহজ ? তবু হাল ছাড়লেন না কেউ। সবার সাথে আমিও নেমে পড়লাম বউ খুঁজতে। সত্যি ভীষণ এঙ্াইটিং। কিন্তু সমস্যা বাদল অন্য জায়গায়। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


