somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নজরুলের শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলি !!!

২৫ শে মে, ২০১৫ রাত ৩:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহাকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামের খড়ের ছাওয়া এক মাটির ঘরে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহন করেন। সেই মাটির ঘরের পূর্বদিকে রাজা নরোত্তমের গড়, দক্ষিণে পীর পুকুর, পুকুরের পূর্ব পাড়ে হাজি পালোয়ানের মাজার, পশ্চিম পাড়ে মসজিদ। নজরুলের বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। ১৯০৮ সালে নজরুলের বাবা কাজী ফকির আহমদ মারা যান। তখন নজরুলের বয়স মাত্র নয় বছর। দশ বছর বয়সে নজরুল গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর গ্রামের মক্তবের শিক্ষকতা, হাজী পালোয়ানের মাজারে খাদেম এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজে নিযুক্ত হন। মূলত পিতার অকাল মৃত্যুতে পরিবারের ভরণপোষণের জন্য নজরুলকে এসব দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।

নজরুলের চাচা কাজী বজলে করিম ছিলেন ওই অঞ্চলের লেটো দলের একজন নামকরা ব্যক্তি। তাঁর আরবী, ফারসী ও উর্দু ভাষায় অগাধ জ্ঞান ছিল। যাঁর কাছ থেকে নজরুল সঠিক ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন । এছাড়াও কাজী বজলে করিম মিশ্রভাষায় কবিতা ও গান রচনা করতেন। চাচার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে লেটো দল নজরুলকে আকর্ষণ করেছিল। নজরুলের কবি ও সংঙ্গীতজ্ঞ জীবনের শুরু ওই লেটো দল থেকেই। লেটোদলের জন্য পালা গান রচনা করতে গিয়েই হিন্দু পুরাণের সঙ্গেও নজরুলের পরিচয় ঘটেছিল। লেটো দলের কিশোর কবি নজরুলের সৃষ্টি চাষার সঙ্, শকুনি বধ, রাজা যুধিষ্ঠরের সঙ্, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ্, কবি কালিদাস, বিদ্যাভুতম, রাজপুত্রের সঙ্, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ , মেঘনাদ বধ প্রভৃতি।

লেটো দলের পর ১৯১০ সালে নজরুল পুনরায় ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। জনশ্রুতি হল, নজরুলের পাড়াপড়শিরা তাঁকে প্রথমে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ঐ স্কুল ছেড়ে নজরুল মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুল বা নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউটে ষষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হন। তখন ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। তিনি তাঁর ছাত্র সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে- "ছোট সুন্দর ছেলেটি, আমি ক্লাস পরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত। আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম। সে বড় লাজুক ছিলো।" কিন্তু আর্থিক কারণে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর ছাত্র জীবনে আবার বিঘ্ন ঘটে। মাথরুন স্কুল ছেড়ে তিনি সম্ভবত: প্রথমে বাসুদেবের কবিদলে যোগদেন। তারপর বর্ধমান-অন্ডাল ব্রাঞ্চ রেলওয়ের এক খ্রিষ্টান গার্ড সাহেবের খানসামার এবং শেষে আসানসোলের এক বেকারি ও চা-এর দোকানে চাকুরি নেন। এভাবে দারিদ্র্যের কারণেই স্কুলের পড়াশুনা ত্যাগ, গার্ডের বয় বিয়ারার, আসানসোলের বেকারি ও গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে চায়ের দোকানের কিশোর শ্রমিক নজরুল কৈশোরেই জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হন। এজন্য তাঁর অপর নাম দুঃখু মিঞা।

আসানসোলের চা-রুটির দোকানে চাকুরির সুবাদেই তিনি পুলিশের দারোগা রফিজউল্লাহর সঙ্গে পরিচিত হন। এবং তাঁর অনুগ্রহে ১৯১৪ সালে ময়মনুসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হতে পেরেছিলেন। দরিরামপুর স্কুলের পর নজরুল পুনরায় নিজের এলাকায় ফিরে যান এবং সম্ভবত: ১৯১৫ সালে প্রথমে নিউ স্কুল বা অ্যালবার্ট ভিক্টর ইন্সটিটিউশনে এবং পরে রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এ স্কুলে নজরুল ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সাল একটানা অষ্টম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন এবং ১৯১৭ সালের জুলাই মাসের পর সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। নজরুলের ছাত্রজীবনের শেষ বছরগুলিতে তিনি সিয়ারসোল রাজ স্কুলের চারজন শিক্ষক-দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী ভাবধারায় নিবারনচন্দ্র ঘটক, ফারসি ভাষায় ফারসি শিক্ষক হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্যে-চর্চায় প্রধান শিক্ষক নগেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়।

নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর প্রশিক্ষণের জন্যে প্রথমে কলকাতা ফোর্ট উইলিয়াম, পরে লাহোর হয়ে নওশেরা এবং ট্রেনিং শেষে করাচি সেনানিবাসে তাঁর সৈনিক জীবন অতিবাহিত হয়। ১৯১৭ সালের আগষ্ট-সেপ্টেম্বর থেকে ১৯২০ সালের মার্চ - এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় পৌনে তিন বৎসর তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। এ সময়ে তিনি সাধারণ সৈনিক থেকে ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। সেনাবাহিনীতে সৈনিক জীবনের কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যেও তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত ছিল। এই সময়ে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলভীর কাছে তিনি ফারসি শেখেন। সঙ্গীতানুরাগী সহসৈনিকদের বিনোদনের জন্যে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী বাদ্যযন্ত্র সহযোগে তখন তিনি সঙ্গীত চর্চা করতেন। আর গদ্য-পদ্য সাহিত্যে চর্চা তিনি অব্যাহত রাখেন। করাচি সেনানিবাসে রচিত এবং কলকাতায় প্রেরীত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীর মধ্যে ছিল "বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী" - নজরুলের প্রথম প্রকাশিত রচনা (সওগাত,মে ১৯১৯), প্রথম প্রকাশিত কবিতা "মুক্তি"(বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, জুলাই ১৯১৯), করাচিতে রচিত অন্যান্য রচনা- গল্প "হেনা", "ব্যথার দান", "মেহের নেগার", ঘুমের ঘোরে",কবিতা "আশায়" এবং "কবিতা-সমাধি" প্রভৃতি। করাচিতে সেনানিবাসে থেকেও তিনি কলকাতার সমকালীন প্রধান প্রধান সাহিত্য পত্রিকা যেমন:- "প্রবাসী", ভারতবর্ষ, "ভারতী", "মানসী", সবুজপত্র", সওগাত", "বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা" প্রভৃতির গ্রাহক ছিলেন।এছাড়াও তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র এবং ফরাসি কবি হাফিজের কিছু গ্রন্থও ছিল। ফলে নজরুলের আনুষ্ঠানিক সাহিত্য চর্চার শুরু আসলে করাচি সেনানিবাস থেকেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ সালে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।



২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সব হারিয়েও বেঁচে থাকা: একজন রোকসানা রুমার নিঃসঙ্গ গল্প

লিখেছেন ওয়াদুদ সোহেল মোল্লা, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬


জীবন আসলে বড় অদ্ভুত এক গোলকধাঁধা। আমরা ভাবি মেধা, ডিগ্রি আর সাফল্য দিয়ে পুরো জীবনটা সাজিয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মানুষকে কোথায় এনে দাঁড় করায়, তা কেউ জানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিটারে টাকা ভরতে গিয়ে এ কি হলো আমার সাথে। না পড়লে চরম মিস।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১২

বিদুৎ মিটার, দুই প্রকার। এক হচ্ছে প্রিপেইড আরেকটি পোস্ট পেইড। আমার কাছে পোস্ট পেইড ভালো লাগে। কারন এখানে বিলের কপি দিয়ে যায়। ও বিলের কপি নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে জমা দিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=নীলাম্বরী সেজে আছি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৩৮



এই এসো না কাছে এসো,
নীল শাড়ীতে নীলাম্বরী
ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষাতে
এসে ভাসাও প্রেমের তরী।

নীল সমুদ্দুর ডেকেছে আজ
তাই দাঁড়িয়ে আছি একা
এসো তুমি হাওয়ায় উড়ে
এসে করো একটু দেখা।

হাঁটতে ইচ্ছে বালিচরে,
তুমি আমার - পাশে হাঁটবে?
মনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল্যস্ফীতি বাড়লে বা কমলে আমরা টের পাই না কেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১


গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে বাংলাদেশে এখন কয়টা ঋতু আছে তা কেউ বলতে পারে না। আমার মনে হয় গ্রীষ্ম আর বর্ষার একটা মিশ্র ঋতু আছে, আর আছে শীত। এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×