somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রামপাল নিয়ে প্রতিবাদ হলেও মহেশখালী কয়লা বিদ্যুৎ নিয়ে রহস্যময় নিরবতা কেন?

৩০ শে জুলাই, ২০১৫ রাত ২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশে দুইটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এখন পরিচালনাধিন। সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড’ ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন’ (এনটিপিসি) ও জাপানি বহুজাতিক জাইকা যৌথভাবে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করছে। একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প হচ্ছে বাঘেরহাট জেলার সুন্দরবনের খুব কাছাকাছি রামপাল এলাকায়। এই প্রকল্পটি করছে ভারতের এনটিপিসি কোম্পানি। অন্য কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি হচ্ছে কক্সবাজার জেলার মহেশখালির মাতারবাড়ি ইউনিয়নে। এই প্রকল্পটি করছে জাপানি বহুজাতিক কোম্পানি জাইকা।

এই প্রসঙ্গে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ৩৬০০ মেগাওয়াটের কাড্ডালোর কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটির কথা স্মরণযোগ্য। ভারতের পিচাভারম কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৮ কিমি দূরে ১১ বর্গ কিমি আয়তনের ছোট্ট একটি ম্যানগ্রোভ বন। ভারতের তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন ১৯৮৭ অনুসারে ও ইআইএ (এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট) গাইড লাইন ২০১০ অনুসারে, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কিমি সীমার মধ্যে কোনো সংরক্ষিত বনভূমি, জাতীয় উদ্যান বা নগর থাকা চলবে না। ফলে তামিলনাড়ুর রাজ্য সরকার ২০১০ সালে কাড্ডালোর কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশ ছাড়পত্র দিলেও পরবর্তী সময়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রীন ট্রাইবুনাল ২০১২ সালের ২৩ মে সেই ছাড়পত্র স্থগিত করে দিয়েছে।

একই ভাবে ২০০৮ সালেও ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের ২০ কিমি এর মধ্যে চামালাপুর গ্রামে ১ হাজার মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারেনি ভারত। রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের বিস্তৃতি ৬৪৩ বর্গকিমি জুড়ে। যা সুন্দরবনের আয়তনের মাত্র ১৬ ভাগের এক ভাগ। যে ভারত নিজের দেশে সুন্দরবনের ১৬ ভাগের একভাগ আয়তনের রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্ক এবং ৯০০ ভাগের একভাগ আয়তনের পিচাভারম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ২৫ কিমি সীমার মধ্যে তাপ ভিত্তিক কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে অনুমোদন দেয়নি, সেই ভারত বাংলাদেশে সুন্দরবনের মতো একটি প্রাকৃতিক ঢাল, একটি বিশ্ব ঐতিহ্য, জীব বৈচিত্রের অফুরন্ত বনাঞ্চল, রামসার সাইট এবং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বলে ঘোষিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মাত্র ১৪ কিমি এর মধ্যে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

ভারতের উদ্দেশ্য দিনের আলোর মত পরিস্কার। বিদ্যুৎ নির্মাণের নামে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই ভারতের একান্ত কাম্য। এর আগে গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে গোটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে মরুভূমি করার স্থায়ী ব্যবস্থা করেছে ভারত। তিস্তা নদীর অগ্রভাগে টিপাইমুখী বাঁধ দিয়ে এখন গোটা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমি বানানোর প্রক্রিয়া চলছে। অর্থ্যাৎ ভারতের উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে চরমভাবে শোষণ করা।

বলতে গেলে গোটা বিশ্ব থেকেই কয়লা বিদ্যুৎ পরিবেশের জন্য চরমভাবে ক্ষতিকর হওয়ার কারণে গত একশ বছর ধরে উন্নত দেশগুলাতে এটা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়াতে খোদ ভ্লাদিমির লেলিনের শাসনামলেই পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর এই বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গুলো মারাত্মক পরিবেশ দূষণ এবং নানারকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটায় বলেই বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহেও জনবসতি অথবা সংরক্ষিত বনভূমির কমপক্ষে ১৫–২০ কিলোমিটারের মধ্যে এই ধরনের প্রকল্প অনুমোদন করে না। অথচ রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি জনবসতি ও সুন্দরবন থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অন্যদিকে মহেশখালীর মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি জনবসতির প্রায় ১কিলোমিটারের মধ্যে।

এমনকি ভারতীয় যে কোম্পানিটি বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে, সেই এনটিপিসি ভারতের মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাডুতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবেদন করলে ১৯৭২ সালের ভারত বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইনের দোহাই দিয়ে তা বাতিল করে দেয়। এছাড়া ২০১০ সালের আগস্টে ভারত সরকারের তৈরি করা ইআইএ (এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট) গাইডলাইন বলছে, ২৫ কিলোমিটারের ভেতর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না।

তাহলে কোন যুক্তিতে সেই ভারতীয় বহুজাতিক কোম্পানি এনটিপিসি ও জাপানের বহুজাতিক কোম্পানি জাইকা বাংলাদেশে এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করতে চায়? আর বাংলাদেশের বুর্জোয়া সরকার কেন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের এমন মারাত্মক ক্ষতির আশংকা স্বত্ত্বেও এই প্রকল্পগুলো করতে প্রচণ্ডভাবে আগ্রহী? এখানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির চেয়ে অন্য কোনো স্বার্থ ও ব্যবসায়সিক লেনদেনই যে জড়িত, এটা হয়তো সরকার বাহাদুর মুখে বলার মত সামর্থ্য রাখে না। কিন্তু হাবভাব আর তুঘলগি কাণ্ড দিয়ে সবাইকে তাই বুঝিয়ে দিতে চাইছে।

সবচেয়ে মজার ব্যপার হল, বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পক্ষে যারা ওকালতি করেন, বা যারা পরিবেশ নিয়ে সচেতন বিভিন্ন কমকাণ্ড করেন, তারা একযোগে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধীতা করলেও মহেশখালীর মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে আশ্চার্যজনক ভাবে নিরব। যেনো মহেশখালীর কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ততোটা পরিবেশ বা জীববৈচিত্রের ক্ষতি করবে না। মহেশখালীর ব্যাপারে বাংলাদেশের পরিবাদী সংগঠনগুলোর এই আশ্চার্যজনক নিরবতাও অনেক রহস্যজনক প্রশ্নের হয়তো জবাব জানে। নাকি আমাদের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো মুখে রামপাল নিয়ে লোক দেখানো প্রতিবাদ করছে আর ভেতরে ভেতরে মহেশখালী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে নিরব থাকার জন্য আর্থিক লেনদেনে একটা রফাদফা করেছে?

যদি বাংলাদেশের অন্য সব সংস্থা ও সরকারি অফিসের মত পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এ ধরনের প্রতিবাদ থেকে পিছিয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে সত্যি সত্যিই কেউ ভাবে না। যতোটা মুখে বলে, তার পেছনে পকেট ভারী করার নানান কিসিমের ধান্দা জড়িত। সেই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে দেশি ও বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। মাঝখান থেকে সরকারের ভেতরের কিছু অসৎ মানুষ সরকার বাহাদুরকে নানান ভুল ব্যখ্যা দিয়ে পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরূপ এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প করাতে উৎসাহ যোগাচ্ছে। যাদের প্রত্যেকের পকেট প্রকল্পের শুরু থেকেই মোটাতাজায় পাল্লা দিয়েছে।

যে কোনো কয়লা বিদুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বিষাক্ত সালফার এবং নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড উৎপাদন করে। এসব বিষাক্ত সালফার এবং নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড যাতে নিকটবর্তী নদীতে ফেলানো সম্ভব হয় সেজন্য কয়লা বিদ্যুতের স্থান শনাক্তের সময় নদী থাকাটা একটা অত্যন্ত জরুরী। হাজার হাজার টন বিষাক্ত সালফারযুক্ত ছাই ভূ–উপরিস্থিত পরিবেশকে প্রচণ্ড ভাবে দূষিত করবে। বাতাসে এই ছাই মিশে গাছপালা ও প্রাণিদের জীবন যাপনকে অত্যন্ত বিপন্ন করে তুলবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনী থেকে ১২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার ধোয়া নির্গমণ হবে। যা ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুন বাড়িয়ে দেবে।

এছাড়া নদী বা স্থলপথে লাখ লাখ টন আমদানিকৃত কয়লা জাহাজে ও ট্রলারে বহন করা হবে। কয়লার ভাঙ্গা টুকরো, জাহাজের তেল এইসব এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশকে ভয়ংকর ভাবে বিনষ্ট করবে। প্রতিদিন শত শত গভীর নলকূপের মাধ্যমে শত শত কিউসেক ভূগর্ভস্থ মিঠাপানি উত্তোলন করা হবে। এতে ওই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির আধার নিঃশেষ হয়ে যাবে। সুন্দরবনের রামপালের কাছে যেমন রয়েছে পশুর নদী, তেমনি মাতারবাড়ির পাশের খাল যুক্ত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। অতিমাত্রায় সালফারের কারণে এসব নদীর মৎস্যসম্পদ ও প্রাণীজগতের জন্য মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশের জমিতে উৎপাদিত ফসল, শাকসবজি থেকে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়বে অ্যাজমা, ফুসফুসবাহিত নানা রোগ। এমনকি এসব অঞ্চলে মহামারি আকারে ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।

রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় প্রতিদিন পশুর নদীতে প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ও ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড ফেলা হবে। পশুর নদী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। যে কারণে অদূর ভবিষ্যতে পশুর নদী একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। হাজার হাজার টন ভস্মিভূত কয়লার ছাই মিশে গোটা সুন্দরবন অঞ্চলের গাছপালা এবং প্রাণিদের জীবন যাপনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনি থেকে ১২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার ধোয়া নির্গমন হবে। ফলে ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যাবে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদী পথে বছরে অন্তত ৫০ লাখ টন আমদানিকৃত কয়লা জাহাজে বহন করা হবে। এই কয়লার ভাঙা টুকরা, জাহাজের তেল সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম সম্পূর্ণ ভেঙ্গে ফেলবে।

বহুজাতিক কোম্পানির চরিত্র বোঝার জন্য আরেকটি বিষয় বোঝা খুব জরুরী। পরিবেশ অধিদপ্তরকে নানান কিসিমের অযুহাত দেখিয়ে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশী অর্থাৎ ১৮৪৭ একর জমির অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পে তাপবিদ্যুতের জন্য প্রতিদিন ৭২টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ১৪৪ কিউসেক ভূগর্ভস্থ মিঠাপানি উত্তোলন করা হবে। যা খুব দ্রুত ওই অঞ্চলের ভূ–গর্ভস্থ মিঠাপানির আধার নিঃশেষ করবে। যে কারণে ঘরবাড়িসহ আশপাশের স্থাপনা সমূহ কয়েক ফুট ডেবে যাবে। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অন্তত ৮ হাজার পরিবারকে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হবে।

অন্য যে বিষয়টি খুবই দৃষ্টিকটু তা হল, করমুক্ত সুবিধাসহ ভারত মাত্র ১৫% বিনিয়োগ করে রামপাল কয়লা বিদ্যুতের ৫০% ভাগ মালিকানা পাবে। যার বিপরীতে বিদেশী ৭০ ভাগ ঋণের সুদসহ ঋণ পরিশোধের দায় চাপবে বাংলাদেশের ঘাড়ে। তাছাড়া দেশীয় কোম্পানির চেয়ে এই প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দ্বিগুন অর্থাৎ ৮ টাকা ৮০ পয়সা। একেবারে খালি চোখে যেটা দেখা যায় তা হল, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরাসরি লাভ হবে ভারতীয় পক্ষের। পাশাপাশি দেশীয় দখলদার ও কমিশনভোগীদের অবস্থা হবে পোয়াবারো। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প একটি চরম ক্ষতি ডেকে আনবে। আগামী ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আমাদের সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতিও হবে। তুলনামূলকভাবে বিদ্যুতের অতিরিক্ত দামের জন্য এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত সম্ভাব্য অন্যান্য ক্ষতি যোগ করলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সুন্দরবন ধ্বংস হওয়া সহ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের ফলে আগামীতে খুলনা শহরসহ এই বিভাগের মানুষ ও বন্য প্রাণির জীবন জীবিকা খাদ্য ও বাসস্থানের সম্ভাব্য ভয়াবহ ক্ষতি কি এই মুহূর্তে টাকার অংকে নিরুপণ করা সম্ভব?

সুন্দরবনের কারণে রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মিডিয়ায় প্রচার পেয়েছে। পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনও এখনো দায়সারা গোছের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মহেশখালীর কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে খোদ মিডিয়াও আশ্চার্যজনক নিরব। এমনকি পরিবেশবাদী সংগঠন গুলো মহেশখালী নিয়ে ততোটা তৎপর নয়। মহেশখালীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে স্থাপিত হবে। মহেশখালীর যে স্থানে এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হবার কথা, সেখানে লবন ও চিংড়ী চাষ করে স্থানীয় দুই ইউনিয়নের প্রায় দেড়লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। মহেশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে এই দেড় দুই লাখ মানুষ কর্মহীন বেকার হয়ে যাবে। শুধু বেকার হলে তো কথা ছিল ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে এরা চিরজীবনের জন্য উদ্বাস্তু হবে। আর কয়লা বিদ্যুতের পরিবেশ বিষয়ক ক্ষতির কারণে অদূর ভবিষ্যতে মহেশখালীও মরুভূমিতে পরিনত হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র বড়পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট। বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার পর থেকেই বড়পুকুরিয়ার নানান কিসিমের পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা সারা বছর জুড়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম। স্থানীয় জনবসতিদের অভিযোগের শেষ নাই। তারা বারবার এসব সমস্যার সমাধানে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ঘেরাও করছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পানি সমস্যা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি টেনে নেবার কারণে এলাকাবাসী চাষাবাদ ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের পানি পাচ্ছেন না। গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন যে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন ১৪ টি পাম্পের কারণে দুধিপুর, তেলিপাড়া, ইছবপুরসহ আশপাশের গ্রামে বর্তমানে পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে।

বড় পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ছাই। মাত্র ২৫০ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রটি চালু রাখতে প্রতিদিন কয়লা জ্বালাতে হয় ২ হাজার ৪০০টন। যা প্রতিদিন ৩০০ মেট্রিকটন ছাই তৈরি করে। পুরো এলাকা এই কালো ছাইয়ে ছেয়ে যাচ্ছে। পাশ্ববর্তী একাধিক পুকুরে প্রতিদিন এই ছাই জমা হচ্ছে। ইতমধ্যে এই পুকুরগুলোর চারভাগের তিনভাগের বেশি ছাইয়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পুকুরের পানিও শুকিয়ে গেছে। এই ছাইমিশ্রিত পানি চুইয়ে চুইয়ে মাটির নীচে ও আশপাশের জলাভূমিতে গড়িয়ে যাচ্ছে। বড় পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশে গেলেই দেখা যায়, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নালা বেয়ে কয়লা ধোয়া কালো পানির স্রোত মিশে যাচ্ছে আশপাশের কৃষিজমিতে। ফলে আশপাশের কৃষিজমিগুলোর রঙ এখন নিকষকালো। বড়পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশ দূষণের আংশিক চিত্র যদি এতোটা ভয়াবহ হয়, তাহলে একবার কল্পনা করুন ১৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল ও ১২০০ মেগাওয়াটের মহেশখালী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশ, জনবসতি, জীববৈচিত্র্য ও কৃষিজমির উপর কতোটা ভয়ংকর সর্বনাশা ডেকে আনবে।

এখানে সুস্পষ্টভাবে সরকার বাহাদুর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের নামে দেশী ও বিদেশী লুটেরাদের স্বার্থরক্ষা করার এক চরম সর্বনাশা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। সুন্দরবন আমাদের অস্তিত্বের সাথে সর্বত ভাবে জিড়ত। সুন্দরবন আমাদের গোলপাতা, কাঠ, মোম, মধু, মাছের উৎস। সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘূর্ণিঝড় থেকে সুন্দরবন আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তাই রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে আমরা সুন্দরবনের ধ্বংস কামনা করতে পারি না।

অন্যদিক মহেশখালী আমাদের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। মহেশখালীর মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এই প্রবাল দ্বীপের পরিবেশ ধ্বংস করে এর জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। প্রায় দেড় লাখ মানুষকে উদ্বাস্তু বানাবে। বিনিময়ে বিদ্যুতের নামে পকেট ভারী করবে দেশি ও বিদেশি লুটেরা বাহিনী ও তাদের কমিশনভোগী সরকারি আমলা ও সরকার দলীয় দালালরা। সুন্দরবন আলোচনায় থাকলেও মহেশখালীর ব্যাপারে পরিবেশবাদী সংগঠন ও আমাদের মিডিয়াগুলো আশ্চার্যজনক নিরবতা পালন করছে। নাকি সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অসৎ মানুষগুলো পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ও মিডিয়াকে টাকার বিনিময়ে ইতোমধ্যে পকেটস্থ করেছে?

সরকার বাহাদুর এখন পর্যন্ত ফুলবাড়ি–বড়পুকুরিয়ার কয়লা খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উক্তোলনের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেনি। পিছু হটেনি রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেও। পিছু হটেনি মহেশখালী মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেও। পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর এসব প্রকল্পের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন গ্যাস ব্লক একতরফা সুবিধা দিয়ে বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। কুইক রেন্টালের নামে ১৪ থেকে ১৭ টাকা বা তারও বেশি দামে বিদ্যুৎ ক্রয় করা হচ্ছে। কোনো ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি না করে এবং প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করেই সরকার বিদেশি কোম্পানি নির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহনের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সরকার বাহাদুরের এমন আত্মঘাতি সিদ্ধান্তের পেছনে জনস্বার্থকে উপেক্ষা করার পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি লুটেরা বাহিনীদের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি সুস্পষ্ট। মাঝখান থেকে সরকারের ভেতরের কিছু অসৎ মানুষ এমন সর্বনাশা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য লেগে আছে।

আমাদের যেটা মনে রাখতে হবে, ভারত বা জাপান আমাদের একটি সুন্দরবন বা একটি প্রবাল দ্বীপ দিয়ে যাবে না। তাদের প্রয়োজন মুনাফা, সেই মুনাফা শেষ হলে তারা এখান থেকে সটকে পড়বে। এটা দিনের আলোর মত পরিস্কার। আর সুন্দরবন ধ্বংসের পর অথবা প্রবাল দ্বীপ ধ্বংস হবার পর বাংলাদেশের জন্য চিরস্থায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টিকারী সরকারের ভেতরের অসৎ মানুষ গুলো কিন্তু ততদিনে বিদেশে স্বপ্নের সেকেন্ডহোম বা থার্ডহোমে আরামে বসবাস করবে। তাদের পরিবারও সেখানে চলে যাবে। এই বাংলাদেশের আগামী দুর্দশা নিয়ে এসব দালালদের কোনো ভাবনা নেই। অতএব সাধু সময় থাকতে সাবধান। একটি সুন্দরবন ধ্বংস করার জন্য বা একটি প্রবাল দ্বীপ ধ্বংস করার জন্য হয়তো আগামীতে আওয়ামী লীগ সরকারের নামে বাংলাদেশের দুর্দশাগ্রস্থ মানুষেরা একটি চিরস্থায়ী গালি চালু করবে। কারণ তখন হয়তো বাংলাদেশে কোনো আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকবে না। আমরা যেনো সেই সুদূর ভবিষ্যতের দুর্দশার কথা বর্তমান সময়ের তোষামোদী দালালদের খপ্পরে ভুলে না যাই।

.......................................
৩০ জুলাই ২০১৫
ঢাকা
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০১৫ রাত ৩:১০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আহা প্রেম!

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে জুন, ২০১৯ বিকাল ৫:৪০



ইনবক্সের প্রেমের আর কী বিশ্বাস বলো
এসব ধুচ্ছাই বলে উড়িয়ে দেই হরহামেশা
অথচ
সারাদিন ডেকে যাও প্রিয় প্রিয় বলে.....
একাকিত্বের পাল তুলে যে একলা নদীতে কাটো সাঁতার
সঙ্গী হতে ডাকো প্রাণখুলে।

এসব ছাইফাঁস আবেগী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রলিং, বাঙালি জাতি ও খাদ্যে ভেজাল।

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ১৯ শে জুন, ২০১৯ রাত ১০:১৬

ট্রলিং বিষয়টা আমার অসহ্য লাগে। এমন না যে আমার সেন্স অফ হিউমার নেই, বা খারাপ। কিন্তু বাঙালি ট্রলিংয়ের সীমা পরিসীমা সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখে না। ফাজলামি করতে করতে আমরা এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাছাকাছি থেকেও চির-অচেনা

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৯ শে জুন, ২০১৯ রাত ১১:২৪



স্ত্রীর জন্য স্যান্ডেল কিনতে বের হয়েছি; আমি ট্রেনে যাবার পক্ষে ছিলাম, গাড়ীর পার্কিং পাওয়া মোটামুটি অসম্ভব ব্যাপার; আরো ২/১ যায়গায় যেতে হবে, শেষমেষ গাড়ী নিয়ে বের হতে হলো; রেসিডেন্সিয়েল... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাস্তায় পাওয়া ডায়েরী থেকে- ৯৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে জুন, ২০১৯ রাত ১২:২১


বাংলাদেশের জয় উদযাপন।

১। ভালো লেখক হতে হলে সর্বাগ্রে ভালো পাঠক হতে হবে। পাঠক হবার আগেই যদি সমালোচক হতে চাও, তবে তা হবে বোকামী। বিচারক হতে যেও না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে শিক্ষা তারপর সমালোচনা।

লিখেছেন মাহমুদুর রহমান, ২০ শে জুন, ২০১৯ দুপুর ২:৪১



পাঠকেরা সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করবেন, ভালো না লাগলে চুপ করে কেটে পড়বেন, লেখার সমালোচনা করা যাবে না, লেখার উপর বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না; তা'হলে, ব্লগ আপনার জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×