somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাবা হারালে কেন ঘোরলাগা এক বোবায় ধরে!!!

২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বাবা মারা গেছেন সেই ১৯৯৬ সালে। ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখ। এরও চার বছর আগে বন্ধু তুহিনের বাবা মারা যায় ১৯৯২ সালে। সেটাও কী ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে? নাকি নভেম্বর মাসে? তারও আগে বন্ধু প্রকাশের বাবা মারা যায়। সেটাও ডিসেম্বর মাস ছিল। বছরটা ঠিক মনে পড়ছে না, দিনটা ছিল ১৮ তারিখ। আমরা তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবার আগে বাবাকে হারিয়েছিল প্রকাশ। আমার বড় ভাইয়ের শ্বশুর, মানে আমার নিরু ভাবী'র বাবা মারা যান ১৯৯৩ সালের ১১ ডিসেম্বর। গত ১৩ ডিসেম্বর মারা গেছে বন্ধু মুকুলের বাবা। আজ মারা গেল বন্ধু আসমানী'র বাবা। গোটা ডিসেম্বর মাস জুড়ে আমার স্মৃতিতে অনেক বাবা হারানোর ঘটনা কেবল বারবার মনে পড়ছে কয়েকদিন ধরে। ডিসেম্বর মাসে আমি বাবাকে খুব মিস করি। কোনো বন্ধু'র বাবা মারা গেছে এই খবরটি সঙ্গে সঙ্গে আমার বাবাকে মনে করিয়ে দেয়। আর তখন বাবার সঙ্গে আমার হাজার হাজার স্মৃতি ঝাঁকে ঝাঁকে দল বেধে মনের বারান্দায় এসে হাজির হয়।
এখনও বাবা'র একটি সাদা মাফলার আমার কাছে স্মৃতি হিসেবে আছে। বাবার কথা মনে পড়লে আমি সেই মাফলারটা বের করে বাবাকে স্পর্শ করি। বাবাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। তাতে আমার মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু মুশকিল হলো বাসা বদলের পর বাবার সেই স্মৃতির ধন আমি যে কোন কার্টুনে বা ব্যাগে রেখেছি, এখনও খুঁজে পাচ্ছি না। আমার কাছে বাবা'র একটিমাত্র সাদা কালো ছবি আছে। সেই ছবি'র দিকে আমি কত ঘণ্টা যে অকারণে তাকিয়ে থাকি। বাবার সঙ্গে অনেক বিষয়ে কতবার যে মত বিনিময় করি। আমাদের সেসব কথা কোথাও লেখা হয় না। রেকর্ড করা হয় না। কোনো ভাষায় সেসব কথা কোথাও অনুবাদ করাও হয় না। কিন্তু আমাদের সেই বিনিময়ের ভাবানুবাদের ভেতর আমার নিজের জন্য একটা বিশাল শান্তনা কাজ করে। বাবাকে মনে পড়লেই আমার কল্পনায় তার সুস্পষ্ট ছবি ভেসে ওঠে। সেই ছবির সঙ্গেও আমার অনেক না বলা কথা হয়। নতুন-পুরানা অনেক সমস্যা নিয়ে মত বিনিময় হয়। উদানিং মাঝে মাঝে পালিয়ে যাবার নির্দেশ পাই বাবার কাছ থেকে। আবার মনে হয় আমি বুঝি ভুল ব্যাখ্যা করছি এসবের। পালিয়ে আমি আর কোথায় যাব? কে আমাকে আশ্রয় দেবে? কিংবা আমি পালাব কেন? হোয়াই? নাকি এসব আমার মনের অজান্তে একটা কুহেলীকা তৈরি করছে!
আমাদের মত যাদের বাবা নেই, তাদের কী কোথাও পালিয়ে গেলেও বাবার সঙ্গে আর দেখা হবে? যাদের বাবা নেই তাদের শান্তনা দেবার ভাষাও আমার জানা নেই। কী বলে আমি তাদের শান্তনা দেব। বাবা যে সন্তানের কাছে কতটা আপনজন, তা আমি কীভাবে বুঝাই। সেই আপন মানুষটি যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, অজানা এক রহস্যপুরীতে যিনি বাকি জীবনের জন্য উধাউ হন, তার দেখা পাওয়া কী এত সহজ? বাবা হারানো সেই বন্ধুকে আমি আর কিবা বলতে পারি। কোন শান্তনার বাণীতে আমার বন্ধু'র মন ভালো হবে, বলো? সেই ভাষা, সেই বাক্য, সেই দরদ কী আমি জানি! শুধু জানি, বন্ধু'র বাবা হারানোর কষ্ট যে কত বেদনার, সেই অতলান্ত বেদনাময় সময়ে আমার না জানা ভাষা, আমার না উচ্চারিত বাক্য, আমার শোকানুভূতি কী আসলে কোনো কাজে লাগবে? বাবাকে হারিয়ে অন্তরের গভীরে যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেই শূন্যস্থান তো কোনো ভাষা, কোনো বাক্য, কোনো কলিজার টানে পূরণ হবার নয়। যা আমিও বুঝি। বাবাকে হারিয়ে আমিও যে ১৯টি বছর ধরে এখনও নিঃস্ব। সেই নিঃস্বতার কোনো পরিসীমা নেই। সেই অসীম অনন্ত শূন্যতা পূরণের কোনো নিয়মও আমার জানা নেই রে বন্ধু।
গত বছর বন্ধু হুমায়ুনের বাবা মারা গেল। সেদিন হুমায়ুন ওর বাবা'র স্মৃতিচারণ করতে করতে হঠাৎ সময়টা খুব ভারী করে তুলেছিল। আমি হুমায়ুনের কথার কোনো জবাব দিতে পারিনি। একটা বোবা কষ্ট কেবল আমার ঘাড় থেকে সারা শরীরে বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে গেল। আমি সত্যি সত্যি কোনো কথা বলতে পারিনি। প্রসঙ্গটা উঠেছিল আরেক বন্ধু জাফরের বাবা মারা যাবার পর। পরে পটিয়া থেকে জাফর ফেরার পর আমরা আবার জাফরের মুখে বাবা হারানোর ঘটনার স্মুতিচারণ শুনি। তখনও আমি জাফরকে কোনো শান্তনার বাণী শোনাতে পারিনি। কেবল একটা বোবা কষ্ট আমার ভেতরটা তোলপাড় করে তুলেছিল। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বন্ধু নজরুল কবীরের বাবা মারা যায়। তখনও নজরুলকে আমি কী বলে শান্তনা দেব, সেই ভাষা খুঁজে পাইনি। সেদিন সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমি'র বইমেলায় বন্ধু আলফ্রেড খোকন এসে বিস্তারিত শোনালো। বলল, নজুরুলের বাবা'র জানাজা পড়ে মেলার দিকে আসলাম রে। মনটা ভালো নেই। বন্ধু'র বাবা মারা গেলে মন যে ভালো থাকার কথা নয় রে বন্ধু।
সেদিন রাতে মুকুলকে ফোন করেও আমি কোনো শান্তনা বাণী খুঁজে পাইনি। আমি বারবার বাবা হারানো বেদনায় কাতর হয়ে হয়ে যেন একটা অবুঝ বোকা মানুষে পাল্টে যাই। বাবা হারানোর কষ্ট আসলে কাউকে বোঝানো যায় না। যাদের বাবা নেই হয়তো কেবল তারাই সেই বোবা কষ্টের কিছুটা অনুধাবন করতে পারবে। আজ আসমানীকেও আমি কোনো শান্তনা দিতে পারিনি। হঠাৎ এমন অপ্রস্তুত বাবা হারানোর খবরে আমার ভেতরে একটা তোলপাড় শুরু হয়। একটা অবুঝ ঘোর লাগে। আমি ভাষা হারিয়ে ফেলি। বারবার তখন আমার বাবার কথা মনে পড়ে। বাবার সঙ্গে স্মৃতিগুলো স্ন্যাপশটের মত ঝাঁক বেধে একেএকে সামনে আসে। কোনটা রেখে আমি কোনটা দেখব। এভাবে একটা অচেনা অবুঝ ঘোরলাগা তৈরি হয় আমার ভেতর। বাবাকে হারানো এক অব্যক্ত বোবা কান্নার ঘোরলাগা সেই মুহূর্তেরও কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে আসলে নেই।
হয়তো কোনো দিন যদি চিল হয়ে উড়ে উড়ে আকাশের ওই গহীন অসীমে খুঁজে খুঁজে বাবাকে আবার পাওয়া যেত, বাবার সঙ্গেই সেই ঘোরলাগা বোবা সময়ের তখন বিনিময় করতে পারতাম। কিন্তু সেই সুযোগ কী আমাদের আছে? আমরা কী কেউ কখনো চিল হয়ে অসীম আকাশের অনন্ত নিসীমে হারিয়ে যেতে পারব? খুঁজে বের করতে পারব আমাদের হারানো বাবাকে? আমরা কেবল দূর থেকে একটাই কামনা করতে পারব, বাবা তুমি যেখানে থাকো, আকাশের ওই নীলিমার যেখানেই তুমি মিশে থাকো না কেন, তুমি শান্তিতে থেকো বাবা। তুমি মন খারাপ করে থেকো না বাবা। শুধু এই সত্য জেনো, একদিন আমিও তোমার কাছে নীলাকাশের ওই অসীম শূন্যতার মাঝে বিলীন হব। তখন আবার আমাদের দেখা হবে। অনেক কথা হবে। তখন তুমি তোমার জমানো সব কথা আমাকে বোলো। আমিও তখন অন্তরে জমানো সব কথা তোমাকে বলব বাবা। অবশ্যই বলব বাবা। না বললে যে আমি শান্তি পাব না। বাবা, তোমার সাথে যে এখনও আমার অনেক কথা বলার বাকি!!

............................
২০ ডিসেম্বর ২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১২:৩৭
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাউন্টেন গোট (Mountain Goat) বা পার্বত্য ছাগল....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৮

মাউন্টেন গোট (Mountain Goat) বা পার্বত্য ছাগল....



পড়া, টিভি, মুভি এগুলো- এগুলো বেকারদের অবলম্বন। বেশীরভাগ বয়স্কদের পছন্দ- ডিসকভারি চ্যানেল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, বিবিসি আর্থ ইত্যাদি ইত্যাদি চ্যানেল। আমার হাতে টিভির... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত ৪৮ ঘণ্টায় সামু'র সর্বোচ্চ পঠিত ২ ব্লগার হচ্ছেন - অপলক এবং সৈয়দ কুতুব

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১৭

গতকাল রাত ৮টা ১২ মিনিট থেকে এখন রাত ৯ টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত সামুতে পোস্ট এসেছে মোট ১৬টি, আমার এই পোস্টটি ছাড়া।
এই পোস্টগুলোতে উত্তর ও প্রতিউত্তর মিলিয়ে কমেন্টেসের সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

একদিন আমরা ক’জনা মিলে …….

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১২



ব্লগের একাধারে নম্র ও প্রাজ্ঞ এবং গবেষক সহ-ব্লগার শ্রদ্ধেয় ডঃ এম এ আলীর “ব্লগের সুদিন ফিরিয়ে আনতে ব্লগ টিমের প্রতি বিনীত আবেদন”... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে-----

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৪



জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় ..।

দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে
যেদিন মানুষ নিজের কাছে
মিথ্যে বলা বন্ধ করবে
অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে
সত্যের পথে দৃঢ় পায়ে চলবে।

যেদিন বিবেক জাগবে মনে
লোভ হারাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার কি ইউনূস সাহেবকে ভয় পাচ্ছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৩


ব্যাপারটা এখন আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বর্তমান সরকার, সবাই যেন একজন কমন করফাঁকিদাতা খুঁজে পেয়েছে। সেই করফাঁকিদাতার নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×