somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

'রেহানা মরিয়ম নূর' দেখার পর প্রতিক্রিয়া!

১৬ ই নভেম্বর, ২০২১ রাত ১১:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ 'রেহানা মরিয়ম নূর' চলচ্চিত্রে যে এক্সপারিমেন্ট করেছেন, এটি চলচ্চিত্রের চিত্রভাষে মোটেও নতুন কিছু নয়। বরং যে সকল বৈশিষ্ট্যের কারণে ছবিটি এত আলোচিত, ঠিক সেই সকল স্থানেই ছবিটি খুবই দুর্বল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছরপুর্তির সময় অর্থ্যাৎ ২০১১ সাল বা এর কাছাকাছি সময়কে এটি ধারণ করেছে। রেহানা একটি সাইকো চরিত্র। মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক হিসেবে রেহানা তার সহকর্মীর সাথে বা ছাত্রছাত্রীদের সাথে যে ভাষায় কথা বলেন, তা অনেকটা যেন আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির নিম্নশিক্ষিত কর্মচারীদের ভাষা! বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজের কোনো শিক্ষক এভাবে কথা বলেন কিনা তা নিয়ে বরং বিদেশিদের কাছে এই ছবি ভুল বার্তা দেয়।

একজন ছাত্রীর নকল ধরার জন্য রেহানা যে আচরণ করেন, তা যেন সাদের শিখিয়ে দেওয়া একটা কৌশল! কারণ আদতেই ওই ছাত্রী নকল করেছে কিনা তা প্রমাণের জন্য রেহানা কোনো উদ্যোগ নেয় না। একজন শিক্ষকের রুমে একজন ছাত্রীর সাথে কী ঘটেছে, তা নিজের চোখে না দেখেই নিজের মনগড়া একটা দর্শনের উপর রেহানা লড়াই করেন। অথচ ওই ছাত্রীও ওই ঘটনার বিচার চায় না। নিজের ৬ বছর বয়সী শিশুর সাথে রেহানা যে আচরণ করে তাও অমানবিক।

রেহানার চরিত্রে এরকম নেগেটিভ মোটিভ থাকার কোনো প্রেক্ষিত ছবিতে দেখানো হয় না। খেয়াল করুন- মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক যিনি নামাজ পড়েন, ভাইকে বাজারের টাকা কড়ায়গণ্ডায় হিসেব করে দেন, কলেজের সবকিছুতে প্রতিবাদী, তিনিই আবার নিজের শিশু সন্তানকে হিটলারের মত স্বৈরশাসনে অভ্যস্ত! রেহানা পুরোপুরি একটা সাইকো চরিত্র। এই চরিত্র নারীবাদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে, ভুল হাইপোথিথিস নিয়ে প্রতিবাদী হয়, শেষে নিজের কলেজের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে নিগৃহীত হয়।

ছবিতে সাদ এমনকি মেডিকেল কলেজ পুরোপুরি স্টাবলিস্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মনে হয়েছে এটা কোনো একটা বিল্ডিং যেখানে কিছু সাইনবোর্ড বা পোস্টার টানিয়ে মেডিকেল কলেজ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ক্যামেরা সারাক্ষণ রেহানাকে অনুসরণ করে। অথচ রেহানার পরিবার বা তার অন্দরমহল ছবিতে দেখানো হয় না। আবার রেহানা তার স্বামীর দেওয়া আংটি সারাক্ষণ যত্নের সাথে আকড়ে থাকে। এই ছবিতে কোনো আকাশ নাই, কোনো প্রকৃতি নাই, কেবল রুমের ভেতর রেহানাকে অনুসরণ করে। এই ছবিতে দিন বা রাত ঠাওর করা যায় না।

সাদ যে ভঙ্গিতে ছবি বয়ান করেন সেখানে ক্যামেরা সবসময় রেহানার চরিত্রের মত অস্থির। ক্যামেরার ওই অস্থিরতা দর্শকের চোখের জন্য একটা পীড়ন। অর্থ্যাৎ সাদ দর্শককে ইচ্ছা করেই পীড়ন দিতে চেয়েছেন। রেহানা হাসপাতালে যতটুকু নীতিবান, নিজের সংসার ও সন্তানের জন্য ঠিক তার উল্টো, যেন ততটাই স্বৈরশাসক। ছাত্রী কড়া পারফিউম ব্যবহার করেছে, যা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়, সেটাও রেহানার দৃষ্টিতে খারাপ। পুরো ছবিতে রেহানার কোনো হাসি মুখ নাই। অর্থ্যাৎ সাদের শিখিয়ে দেওয়া নাকফুলানো রাগিরাগি একটা ভাব রেহানা সারাক্ষণ ধরে রাখে। যা মোটেও স্বাভাবিক দৃশ্য নয়।

সাদ ছবিতে ক্লোজ আর মিডশট ব্যবহার করেছেন। কোনো মাস্টার শট নাই। অন্য কোনো শট তো একদমই নাই। মানে ছবিতে সাদ ইচ্ছে করেই অনেক কিছু এড়াতে চেয়েছেন। রেহানার আশেপাশের পরিবেশ, প্রতিবেশ, সমাজ-সংসার দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় দর্শক। দর্শক কেবল রেহানার মানসিক দুর্দশা দেখতে পায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদ মিউজিক ব্যবহার না করে কিছু সাউন্ড ব্যবহার করেছেন। সেসকল সাউন্ডের বক্তব্য খুব একটা স্পষ্ট নয় বরং মনোটোনাস একঘেয়েমি ও বিরক্তি তৈরি করে।

রেহানা চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন সাদের শিখিয়ে দেওয়া ফরমেটে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। আমার কাছে অবশ্য ভালো লেগেছে ছোট্ট শিশু ইমু চরিত্রে আফিয়া জাহিন জাইমার অভিনয়। বরং ইমু চরিত্রটি এই ছবিতে একমাত্র সাবলীল। অধ্যাপক আরেফিন চরিত্রটিকে সাদ রেহানার কলিগের পরিবর্তে পুরানা প্রেমিকের ছাপ দিয়েছেন। বাস্তবে একজন প্রফেসর তার কলিগের সাথে এভাবে কথা বলে না। অধ্যক্ষ চরিত্রটিকে মনে হয়েছে রেহানার মায়ের চরিত্র। তাকে আবার শাঁখা-সিদুর পড়ানো হয়েছে। আর মিমকে আদিবাসি বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

সাদ রেহানা চরিত্রের মধ্যে এতবেশি মনোযোগী ছিলেন যে অন্য চরিত্রগুলো খুব একটা স্টাবলিস্ট হয়নি। অ্যানিকে কখনো কখনো মনে হয়েছে রেহানার ছোট বোন, ছাত্রীর রুমে রেহানা যায় কিন্তু নিজের বাড়িতে যায় না, কেমন অদ্ভুত ব্যাপার! আদতে সাদ একটি সাইকো চরিত্র ডিল করতে চেয়েছেন, যেখানে রেহানা ছাড়া অন্য চরিত্রগুলো পুরোপুরি ডিল করতে সাদ ব্যর্থ হয়েছেন। ঘটনা, স্থান, কাল তিনটি বিষয়ই ছবিতে অস্পষ্ট। আর এই অস্পষ্টতার কারণেই অনেকে এটাকে নন্দনতত্ত্বের ছাপ দিচ্ছেন। আদতে সাদের বয়ানকৃত মন্তাজগুলো পায় প্রত্যেকক্ষেত্রেই মিজোঁসেন বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

দর্শকদের মধ্যে অনেকেই ছবিটি কান ঘুরে আসায় বিশেষ মর্যাদা দিচ্ছেন। সমালোচনা করলে কী জানি কী হয় এমন একটা দ্বিচারিতায় দর্শক। কিন্তু বিদেশিরা যে কারণে এই ছবিটি পছন্দ করেছে, সেখানে লোবিস্ট নিয়োগ একটা বড় ফ্যাক্টর। সাদ ভালো লোবিস্ট নিয়োগ করে ভালো ফলাফল পেয়েছেন। কিন্তু ছবিটি দেখার সময় একজন সাধারণ দর্শকের জন্য যে বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে, তা হয়তো সাদ জেনেশুনেই এই ভঙ্গিটি বেছে নিয়েছেন। খেয়াল করুন- ব্যাকগ্রাউন্ডে একবার ইসলামী গজল বা কোরআন তেলোয়াত শোনা যায়। মেডিকেল কলেজের ভেতরে যা একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবহার।

ছবিটি যেসব কারণে এত আলোচনা হচ্ছে, তা আদতে কালের হাওয়ার ধরণ। এক চামচ মৌলবাদ, এক চামচ নারীবাদ, এক চামচ নির্যাতন আর এক চামচ ইমোশোন ভালো করে ঝাঁকিয়ে মিশিয়ে দিলেই হয়ে যায় আধুনিক বাংলা সিনেমা! বাহ! আর তা নিয়ে সবাই উঠে পরে লেগে যায়।

সাদের এই আলোচিত ছবিটি ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগেনি। আমার প্রত্যাশাপূরণে সাদ ব্যর্থ হয়েছেন। বরং সাদের প্রথম ছবি 'লাইভ ফ্রম ঢাকা' আমার কাছে এটার চেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। তবে একটি ছবি সকলের ভালো নাও লাগতে পারে। বাংলা সিনেমার যখন মরার কাল চলছে তখন সাদ যে নতুন এক্সপারিমেন্ট করলেন সেজন্য সাধুবাদ জানাই। বরং এই নতুনত্বের মধ্যেই আমরা বাংলা সিনেমার নতুন ভবিষ্যৎ দেখার অপেক্ষা করছি। নতুন নতুন বাহাস করার প্রেরণা পাচ্ছি। সাদ ও ' রেহানা মরিয়ম নূর' টিমের জন্য শুভ কামনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০২১ রাত ১১:৫১
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে যাচ্ছি ০২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪


কাহিনীটা ৯০ এর দশকের শুরুতে। বুশ তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট- মার্কিনিদের আগ্রাসন চলছে তখন ইরাক জুড়ে। হাটে মাঠে ঘাটে আড্ডায় গল্প আলোচনা মিডিয়ায় এমনকি বাসর ঘরেও তখন নব পরিণীতার সাথে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×