somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শ্রাবন মাসের ২২ তারিখের বৃষ্টি

১৪ ই আগস্ট, ২০১৬ রাত ৯:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটা অরাজনৈতিক দুষ্ট প্রেমের কবিতা আমি যে সময়ে লিখে ফেলতে পারি তার পুরোটা সময় আমি নিখিলেষের ঘোলাটে চশমার ফাকে ক্লান্ত চোখ দুটোর রঙ আবিষ্কারে ব্যাস্ত ছিলাম। কথোপকথনের শুরুটা হয়েছিল একটা নীল প্রজাপতির ডানা ভাঙগার গল্প দিয়ে, তারপর তার বান্ধবীর অ্যাবোরশান হয়ে কথা গড়িয়েছে হাফিজ মামার মেমোরি কার্ডে, এর মাঝে কথায় কথা উঠায় নিখিলেষের মুখে শুনতে পেলাম রূপাদির খোলাচুলে একদিন নীল প্রজাপতি বাসা বাঁধে, সেদিন ই নিখিলেষ রূপাদির খোলা - ভেজা চুলের ফাকে ধবধবে সাদা পিঠে কালো তিলের অস্তিত্ব বুঝতে পারে। সেদিন ছিল শ্রাবন মাসের ২২ তারিখ, রূপাদি বৃষ্টিতে ভেজার জন্য ছাদে এসেছিল। এ শহরের সবই অচেনা ছিল রূপাদির কাছে। কিন্তু রূপাদিতো জানতোই আজ শ্রাবন মাসের ২২ তারিখ, আজ এই অপরিচিত শহরে সেই পরিচিত বৃষ্টিতো আসবেই। আজ শ্রাবন মাসের ২২ তারিখ, আজ বৃষ্টি হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক, এরকম ভাবতে ভাবতে রূপাদি ভিজছিল বৃষ্টিতে। রূপাদির হলুদ শাড়ির ব্লাউজের ফাকে বৃষ্টির ফোটাগুলো অন্তর্বাসের চেয়েও গভীরে চলে যাচ্ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় হ্লুদ শাড়ির ফাকে অর্ধভেদ্য ঝিল্লীর মত রূপাদির সাদা ধবধবে শরীরের মানচিত্র বুঝা যাচ্ছিল। কেউ একজন কফির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ফেল ফেল করে তাকিয়ে ছিল রূপাদির দিকে। রূপাদি তার দিকে ফিরতেই নিখিলেষ জানালার পর্দা টেনে দিল।
রূপাদি মফস্বলের মেয়ে। জামার ফাকে অন্তর্বাসের ফিতে সম্পর্কে অযথা সবসময় সতর্ক থাকে। এ শহরে বেড়াতে এসেছে খালার বাসায়, এটুকুই শুনেছি কানাকানি করে। আর নিখিলেষ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ছে, তারচেয়ে বড় পরিচয় সে এলাকার ফুটবল টিমের গোলকিপার। তখন ফুটবলের মৌসুম চলছিল, নিখিলেষ ছাড়া এ এলাকায় গোলকিপার আর কেউ ভালো নেই। কিন্তু নিখিলেষ কোথায়? প্রায় দিনই এখন আর তাকে মাঠে দেখা যায়না। বিকেল বেলার সময়টাতে নিখিলেষ কে দেখা যায় রূপাদির খালার বাসার ছাদে নয়তো ওই বাসার পাশে অন্য আরেকটা বাসার ছাদে। নিখিলেষের বাসায় তেমন কেউ নেই। বাবার সাথে নিখিলেষের মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। বড় ভাই পড়ালেখা করেনি, পরিবারের হাল ধড়তে পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে। আর রূপাদির পরিবারের কথা পাড়ার কেউ ই তেমন জানেনা। তবে আমার জানা মতে নিখিলেষ আর রূপাদিকে একসাথে কোথাও দাঁড়িয়ে কথা বলতে এ শহরের কেউ কখনো দেখেনি।
রূপাদি যে খালার বাসায় ছিলেন তিনি আপন খালা নন। আর রূপাদির পিছনে যে নিখিলেষ ঘুড়ছিলেন তার বয়স রূপাদির থেকে এক দশকের কিছু কম। আর একথা নিখিলেষকে রূপাদি আমার মাধ্যমেই বলিয়েছিলেন। আমার সাথে রূপাদির তেমন পরিচয় ছিলনা। রূপাদির খালার বাসা আর আমাদের বাসা ছিল এক বিল্ডিং এ। আর নিখিলেষ আমার কথা গেটের দাড়োয়ানকে বলেই আমাদের ছাদে আসত। রূপাদি যে খুব বেশি সুন্দরী ছিলেন তা নয়। বয়সের ছাপ বুঝা ছিল মুশকিল। তবে রূপাদিকে নিয়ে রাত জেগে দু একটা কবিতা লিখা যেতে পারতোই, বয়স এর পার্থক্য আর পরীক্ষা যন্ত্রনায় তা আর হয়ে উঠেনি। আর নিখিলেষ ছিল রোগা-পাতলা, আমি ভাবতাম এই বাতাসে উড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে কিভাবে গোলকিপিং করে। থাক সে কথা। আমি কখনো রূপাদি আর নিখিলেষকে একসাথে দেখিনি। নিখিলেষ একটু কথা বলার সুযোগ খুজতো আর রূপাদি বয়সের দাম্ভিকতা নিয়ে নিখিলেষকে এড়িয়ে যেত।
এতদিনে রূপাদি এশহরের সবকিছু না চিনলেও বাসা থেকে গলির মুদি দোকান পর্যন্ত পথটুকু বেশ ভাল ভাবেই চিনে গেছেন, মূলত বাসার গেটের একটু সামনেই ছিল দোকান। আমার বাসার সামনের বারান্দা দিয়ে স্পষ্টই দেখা যেত দোকানে কারা আড্ডা দিচ্ছে। সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎই অনেক বৃষ্টি। গলির রাস্তা মুহূর্তেই ফাকা। আমি বারান্দার কাপড়-চোপড় বাসার ভিতরে আনতে যেয়ে দেখি রূপাদি ঐ মুদির দোকানে বৃষ্টিতে আটকা পড়েছেন। আমি কাপড় গুলো ভিতরের রুমে দিয়ে এসে দেখি রূপাদি দোকানের সামনে নেই, দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
সেই সন্ধ্যার পর রূপাদিকে অনেক দিন দেখিনা। হঠাৎ একদিন আমাকে তিনি ডেকে বসেন। নিখিলেষকে ডেকে দিতে হবে। আমি নিখিলেষকে খবর দিলাম। তারও অনেকদিন পর নিখিলেষ আমাকে শহরের একটা ক্লিনিকে ডেকে পাঠায়। আমি যাই সেখানে। আমি নিখিলেষকে রূপাদির হাতব্যাগ কোলে নিয়ে বসে থাকতে দেখি ক্লিনিকে। নিখিলেষের চশমার মোটা গ্লাস ঘোলা হয়ে আছে, আমি তার ভিতর দিয়ে নিখিলেষের চোখ দেখার চেষ্টা করি। নিখিলেষ আমার দিকে না তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করে, "কয়েকদিন আগে এক সন্ধ্যায় হাফিজ মামার মুদি দোকানে রূপাদির রেইপ হয়....."
আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম, আগ্নেয়গিরির লাভা যেন আমার দুই কান দিয়ে বেড়িয়ে আসছিল। আমার মুখে কথা গুলো কেমন যেন জড়িয়ে পড়ছিল। সেই সন্ধ্যায় আমিতো রূপাদিকে দেখেছিলাম হাফিজ মামার মুদি দোকানে। আমি এ কথা বলার সাহস পেলাম না নিখিলেষ কে। নিখিলেষ আমাকে জানায় সে আর রূপাদিকে নিয়ে ওই এলাকায় ফিরছেনা, খালা রূপাদির রেইপ হওয়ার কথা জানলেও রূপাদির ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নন। তাই নিখিলেষ রূপাদিকে নিয়ে অন্য এক শহরে গিয়ে থাকবে। যে শহরের কেউ জানবেনা রূপাদি নিখিলেষের চেয়ে এক দশকের বড়, রূপাদির রেইপ হয়েছিল হাফিজ মামার দোকানে, কেউ কিচ্ছু জানবেনা এমন একটা শহরে নিখিলেষ আর রূপাদি সংসার করবে। সেদিন রাতে আমি নিখিলেষ, তার বুড়ো মা আর রূপাদিকে ট্রেনে উঠিয়ে দিলাম। নিখিলেষ যাওয়ার আগে আমাকে একটা চিরকুট দিয়েছিল, চিরকুটে লিখা ছিল নতুন শহরের নাম আর লাল কালিতে লিখা ছিল হাফিজ মামার মেমোরি কার্ড। নিখিলেষ আর রূপাদি রাতের অন্ধকারে ট্রেনে চেপে চলে গেলেন এক অচেনা শহরে।
পরদিন সকালে আমি হাফিজ মামার মোবাইল আর মেমোরি কার্ডটা চুরি করি। আমি রূপাদির রেইপ হওয়া ভিডিওটা দেখি কয়েক বার, তারপর বাথরুমে মুখে গামছা চেপে ধরে কাঁদি। আমি মেমোরি কার্ডটা রেখে দেই আমার ডায়েরীর ভিতর।

আজ পাঁচ বছর পর....
শ্রাবন মাসের ২২ তারিখ। আমি নিখিলেষদা আর রূপাদির সেই নতুন শহরের নতুন বাসায় এসেছি। নিখিলেষদা এখন আদালত পাড়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় উকিল। রূপাদি এখন অন্তঃসত্তা। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিখিলেষদার বাসায় নতুন অতিথি আসবে। আগে নিখিলেষদা কে নিখিলেষ বলেই ডাকতাম। আমি চাই লোকটা আমার মনে নিখিলেষদা হয়েই বেচে থাক। আজ ছিল শ্রাবন মাসের ২২ তারিখ, তাই একটু বৃষ্টিতো হবেই। আমি নিখিলেশদা আর রূপাদির কাছে বিদায় নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফিরে আসি রেল স্টেশনে। আমার বুক পকেটে পাঁচ বছর আগের নিখিলেষদার সেই চিরকুট আর হাফিজ মামার মেমোরি কার্ডটা ছিল। আমি হাসতে হাসতে মেমোরি কার্ডটা ভেংগে ফেলে দেই ডাস্টবিনে। তারপর ট্রেনে চেপে আমি ফিরে আসি আমার শহরে।

নিখিলেষদা আর রূপাদি ভাল থাকুক সেই অচেনা শহরে। সেই শহরের সবই আমার অচেনা, চেনা শুধু নিখিলেষদা, রূপাদি আর শ্রাবন মাসের ২২ তারিখের বৃষ্টি।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১৬ রাত ৯:৩৩
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোথাও একটা ভুল হচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৪২

একটা ছোট নৌকা পাল তুলে পাড়ি দিচ্ছে-
অনন্ত নক্ষত্রবীথি।
পেরিয়ে যাচ্ছে- গ্রহ নক্ষত্র, মহাজাগতিক উল্কা।
দূরে কোথাও সংঘর্ষ হচ্ছে।
ধীর, অতি ধীর তার গতি। নৌকায় কয়েকজন মানুষ!
একটি শিশু,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পড়ালেখার গুরুত্ব

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৫



পড়ালেখার গুরুত্ব কি, আর কেনো পড়ালেখা করতে হবে? আমার মনে হয় উত্তর সকলের কম বেশি জানা আছে। কিন্তু আমরা বাস্তবে কি করছি? আমাদের দেশে মনে হয় ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাহিনীটা কী?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৭

কাহিনীটা কী?
বিএনপিকে যারা ২৪ ঘণ্টা অভিশাপ দেয়, গালমন্দ করে, "বিএনপি দেশটা শেষ করে দিয়েছে- আর ছয়মাসও টিকবে না", তারাই আবার বিএনপি কাকে মন্ত্রী বানালো, কাকে উপদেষ্টা করলো- এই হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

জজ মিয়া চিত্রনাট্য নিয়ে নির্মিত হোচ্ছে ভয়ংকর নতুন সিক‍্যুয়াল!!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৪:৪৭



বিএনপির পুলিশ এতো করিৎকর্মা যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে । খুনের তদন্ত করে একেবারে আদালতের রায় সহ রিপোর্ট দিয়ে দেয় ! পৃথিবীর সবচেয়ে আপগ্রেডেড আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন শিলং সালাউদ্দিনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালবেলার মুগ্ধতা থেকে নবকুমারের গ্ল্যামার দুনিয়ায়

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০



সমরেশ মজুমদার আমার বরাবরই প্রিয় লেখকদের একজন। কৈশোর আর যৌবনের এক বড় অংশ জুড়ে তিনি ছিলেন আমার মনোজগতে। বই কিনে পড়া, পাড়ার লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×