মুভি রিভিউ: মোষ্ট ওয়েলকাম ২
*** This review may contain spoilers ***
ব্যাপক বিনোদন। পুরো ২:৩০ ঘন্টার উন্নতমানের টেকনোলজিকাল বিনোদন। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ (?!) এখানেই। আমরা অফিসের কলিগরা অনেকদিন থেকেই এই মিশনে ছিলাম কোন ভাবেই এই বস্তু মিস করা যাবে না। অতঃপর গতকাল সেই মিশন সাকসেসফুল হলো। এখন মূল কথায় আসি।
যেহেতু স্যার অনন্ত জলিলের সিনেমা তাই অভিনয় শিল্পীদের আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। তারপরও যারা স্যার অনন্ত জলিল ও বিউটি কুইন হার মেজেস্টি বর্ষাকে চিনেননা তাদের জন্য এই রিভিউ না।
স্যার অনন্ত জলিলের মুভির প্রতি মূহুর্তে চমক থাকবেনা সেটা কখনো হয় না। আর হাইলেভেলের চমকানোর মানুষিকতা নিয়েই গতকাল সদলবলে গিয়েছিলাম বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্সে। কিন্তু এই হাই লেভেলের চমক যে নাম দেখানো থেকেই শুরূ হবে সেটা ভাবি নাই। আর চমক থাকবেই না বা কেন, স্যার অনন্ত জলিলতো একই সাথে 'নায়ক, গায়ক, কবি, রম্য লেখক, সায়েন্স ফিকশন লেখক, ডুবুরী, মস্ত নিশানাবাজ। তো যথারীতি মুভি শুরু হলো জাতিও সংগীতের মধ্যদিয়ে। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। জাতিও সংগীত শেষ হতে হতেই ধৃম-ধ্রাম মিউজিক শুরু হয়ে গেল। তারপরই স্ক্রিনে লেখা আসলো 'সুপারস্টার এ্যাকশন হিরো অনন্ত জলিল' ও 'গ্ল্যামার গার্ল বর্ষা' তারপর একে একে অন্য সবার নাম। স্যারের নাম আসার সাথে সাথে আমরা আবার দাঁড়িয়ে গেলাম। সবশেষে আসলো 'স্ক্রিপ্ট রাইটার, পরিচালক, প্রযোজক অনন্ত জলিলের মুভি। তবে স্যার পারলে ক্যামেরাম্যানের দায়িত্ব নিয়ে নেন। সেলফি স্টাইলে ক্যামেরা ধরে শুটিং করতেন।
পরিচয় পর্ব শেষ হতেই স্ক্রিনে একে একে আসলো আল-জাজিরা, বিবিসি, সিএনএন সহ বিশ্বের বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল এবং সেখানে একটাই ব্রেকিং নিউজ, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী হাসান মইন ক্যান্সারের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে ফেলেছেন। সারা বিশ্বের মিডিয়ায় এতো তোলপাড় কিন্তু আমাদের দেশিও মিডিয়ায় কোন নিউজ নাই (আফসোস), যেহেতু এটা (সম্ভবত) বিরোধী দলের সাফল্য তাই বিটিভি তে ও এর কোন নিউজ নাই। এখানেও আমরা সরকারের সেচ্ছাচারিতা লক্ষ্য করলাম (বিরোধী দলের পক্ষ্য থেকে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে)। যাই হোক বিজ্ঞানী হাসান মইন সাহেব একটা হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলন করছেন যেখানে দেখলাম উনার মাথার চুল সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধোয়া ধবধবে সাদা এবং দুই স্তর বিশিষ্ট গোঁফ, দুই স্তরের রং দুই রকম। সম্ভবত বেশি বেশি গবেষনা করলে মানুষের দুই স্তরের গোঁফ গজায়। এরপর দেখলাম সংবাদ সম্মেলনের দর্শক সারিতে বসা এক লোক তার টাইয়ের নিচের চুলকাইতেছে, ও না সে চুলকাচ্ছে না, সে তার সার্টের বোতামে হাত রাখলেন এবং সেটা হয়ে গেল একটা নীল রংয়ের লেজার ক্যামেরা; সেটা ক্যান্সারের প্রতিষেধক আবিষ্কার নিয়ে করা প্রেজেন্টেশনটা ভিডিও করে ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ড নিনোর কাছে পাঠাচ্ছে। এর মধ্যেই হলো সন্ত্রাসী হামলা। হুঁশ হুঁশ করে অনেকগুলো গাড়ি চলে আসলো এবং পুলিশদের গুলি করতে শুরু করলো। ঠিক তখনি হাসপাতালের দোতলার কাঁচ ভেঙ্গে নিচে রাখা একটা গাড়ির উপর লাফিয়ে পড়লেন স্যার অনন্ত জলিল আর সাথে সাথেই পাশে রাখা ২টা গাড়ি উল্টিয়ে পাল্টিয়ে তিন চার ডিগবাজি দিয়ে দুইদেকে ছিটকে পড়লো। এরপরই শুরু হলো এ্যাকশন। ও মা ছে কি এ্যাকছন, ছে কি এ্যাকছন। স্যার যে গাড়ির উপর পড়ছিলেন সেই গাড়ি স্যারের চাপ সহ্য করতে না পেরে আগুন ধরে গেল। পরে অবশ্য কোনরকম সাহায্য ছাড়াই আগুন নিভে গেল এবং দোতলাতেও কোন ভাঙ্গাচুরা কাঁচ দেখা গেলো না। তখন আমরা মেনে নিলাম পরিচয় পর্বে যে সুপারস্টার এ্যাকশন হিরো বলা হয়েছিল সেটা ১০০% ঠিক ছিলো।
এইবার স্যারকে দেখা গেলো এক শিশু ভিক্ষুকের সাথে কথা বলতে। স্যার তার কষ্টের কথা শুনে ছুটলো ভিক্ষুক লিডারের কাছে। সেইখানে কিছুক্ষণ নিতিবাক্য বলার পরই শুরু হয়ে গেল ছেই এ্যাকছন ওরে মায়রে বাপ। সেখানে ডাঙ্গা ও পানির মধ্যে সেরাম মারামারি হইলো। কিন্তু পরের দৃশ্যে স্যারের গা শুকনো, পানিতে উনার ব্লেজার স্যুট একটুও ভিজে নাই। মারপিট থামার পরপরই বৃষ্টির মতো পুলিশ ও সাংবাদিক চলে আসলো। তখন দেখলাম আরেক আজিব বস্তু সাংবাদিকদের হাতে মাইক্রোফোনের পরিবর্তে এক ইন্ঞি ব্যাসের উপিভিসি পাইপের মধ্যে টিভি চ্যানেলের মনোগ্রাম লাগানো লাঠি। আর সাংবাদিকদের সে কি প্রশ্ন অনেকটা মুন্নি সাহার 'এখন আপনার অনুভুতি কি' এর মতো। এর পরই সবচেয়ে বড় চমক, এই মহান সাক্ষাৎকার দেখাচ্ছে এজে টিভিতে (AJ TV)। আর আমাদেরতো হাসতে হাসতে দম ফাটার অবস্থা।
এরপরই বিজ্ঞানী হাসান মইন সাহেবেকে কিডনাপ করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। কিন্তু স্যারের অসামনেসের কারনে সেই চেষ্টা ব্যার্থ হয়। স্যার ছুটলেন গাড়ি নিয়ে এরপর একটা গেটে ধাক্কা দিলেন আর যায় কই সেই লোহার গেট হাজার টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। কেমনে কি??!! এরপরই গ্রামীণফোনের থ্রিজি ইউজ করে বিজ্ঞানী সাহেবের বাসার সিকুরিটির ব্যবস্থা করেন আমাদের মহান স্যার। এরপরই বিজ্ঞানী সাহেবের নাতনি গ্ল্যামার গার্ল বিউটি কুইন বর্ষা ছুটলেন থানায় গিয়েই স্যারের হাত খামচে ধরলেন আর শুরু হলো গান। হাত ধরতে দিলে দিবো ঝালমুড়ি কিস করতে দিলে দিবো ক্যাডবেরী.... চিকেন তান্দুরী। শুরু হলো ড্যান্স ওরে আল্লাহ এ এক আজব বস্তু। স্যারের কোমর দোলানো দেখে পারলে আমরা সিট ছেড়ে উঠে দাড়াইয়া যাই।
বিউটি কুইন বর্ষাকে ঢাকা থেকে কিডনাপের চেষ্টা করে কিন্তু কোথা থেকে কি হলো দেখা গেলো গ্ল্যামার গার্ল বর্ষাকে দেখা গেল স্যার অনন্তের সাথে মটর সাইকেলে। মটর সাইকেল ছুটে চলেছে পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে। এই আবার হটাৎ হাতিরঝিলে চলে আসলো ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। তারপর গুন্ডারা স্যারকে লক্ষ্য করে গুলি করতে শুরু করলো। M16 Grenade launcher দিয়ে প্রথমে হোমিওপ্যাথি শিশির সাইজের গুলি, পরে অনেকটা পটল সাইজের এরপর তোরমুজ সাইজের বাজুকার গুলি বের হতে লাগলো এবং সেগুলো স্যার জলিলকে সাইড দিয়ে গিয়ে লাগলো রাস্তার র্যানডম গাড়ি গুলোতে। স্যার জলিল এখানে অনেকটা ম্যাট্রিক্স মুভির মতো অঙ্গভঙ্গি করলেন। অসাম। পিউর অসাম।
এই সিনেমার সবচেয়ে আকর্ষনীয় বস্তু হলো গান গুলো। প্রতিটা গানেই ক্রোমা শট দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে স্টিল পিকচার বসিয়ে দিয়েছেন আমাদের স্যার। একই গানে এই হাতিরঝিল, আশুলিয়া, ব্যাংকক, দুবাই, পাহাড় পর্বত, নদী নালা, বরফ সবকিছুই আছে (যদিও পুরান জিনিস)। আর ড্যান্স সে এক জিনিস। পুরাই মাইরালা। মনে হয় জিমে ওনারা ব্যায়াম করতে গেছেন।
সিনেমার এক দৃশ্যে ভিলেনরা বিজ্ঞানী হাসান মইন সাহেবকে হেলিকপ্টারে করে উঠিয়ে নিয়ে যার তখন স্যার জলিল ছোট্ট এক লাফ দিয়ে হেলিকপ্টারের লেজ ধরে ঝুলে রইলেন এবং ২বার অলিম্পিকের খেলার মতো ঘুরানি দিলেন। সেকি এন্টারটেইনমেন্ট। ওয়াও। মাটি দৃশ্য আছে, আছে পানির দৃশ্য, হেলিকপ্টার দৃশ্য থাকবে না সেটা কি হয়। এরপর দায়িত্বে অবহেলার কারনে স্যার জলিলের চাকরি চলে যায়। উনাকে পুলিশ গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে উল্টা দিকে ঝুলায়ে আচ্ছামতো মাইর দেওয়া হয়। রক্ত পইরা পুরাই ছেরাভেরা অবস্থা। কিন্তু আবারো কোথা থেকে কি হলো স্যার জলিল জেলের ভিতর ঝুলন্ত অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে স্যুট পরে বাড়িতে চলে আসলো। ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামলেনই বা কেমনে আর জেল থেকে বেরই বা হইলেন কেমনে আল্লাহ মালুম। এক দৃশ্যে স্যার জলিলের পেটে মিসা ঘুসি মারে স্যার একটুও নড়ে না। খিচ্চা খাড়াইয়া থাকে। মিসা চাচ্চু ঘুসি মেরে তার হাত মচকাইয়া যায় মাগার স্যারের কিছু হয় না। তারপর ছুরি দিয়া পেটে একটা মারলো কিন্তু ছুরি পেটে ঢুকলো না। হাল্ক। ঘোররররররররর।
যে ভাইরাস নিয়া এতো কাহিনি সেই ক্যানসারের ভাইরাস দেখি আবার ছোঁয়াছে। রোগীর গায়ে ছোয়া লাগলেই তারও ক্যানসার। সন্ত্রাসীরা কুত্তার গায়ে ভাইরাস পুস কইরা দিলো আর সাথে সাথে সারা শহরে ক্যানসার ছড়াইয়া পড়লো। আর যাবি কই মমিন।
এখন বলি পুরো সিনেমায় প্রযুক্তির ব্যবহার। স্যার জলিলকে দেখা গেলো একেক মারপিটের দৃ্শ্যে একেক চুলের স্টাইল, কালার। মারামারির সময় স্যারকে ফাঁকি দিয়ে যেসব গুলি বিভিন্ন গাছে গিয়া লাগলো সাথে সাথে গাছগুলা ছিদ্র হইয়া গেলো। পরক্ষণেই আবার সেই দাগ গাছ থেকে মুছে গেলো। কেমনে করলিরে মমিন। এ কোন প্রযুক্তি?? মারামারি দৃশ্যে যে ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে সেটাও স্ক্রিনে দেখা যায়, যে দরি দিয়া স্টানম্যানকে পেছনে টানা হয় সেটাও দেখলাম। ডিগবাজি খাইয়া যে ফোমের বিছানায় পড়লো তাও চখে পড়লো। হায় রে হায়। পুরা সিনেমায় প্রযুক্তির এই উন্নতমানের ব্যবহার দেখে আমরাতো পুরাই টাসকি।
সর্বোপরি স্যার অনন্ত জলিল ও গ্ল্যামার গার্ল বিউটি কুইন হার মেজেস্টি বর্ষা যাই করেন তাই অসাম। লাইফটাইময়ের এনটারটেইনমেন্ট। পয়সা উসুল। বিনোদন ব্যাপক বিনোদন। ধন্যবান স্যার, ইট ওয়াজ এ প্রিভেলেজ ওয়াচিং ইউ ইন একশন।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১৪ বিকাল ৫:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



